আচার্য শঙ্করাচার্য

আচার্য শঙ্কর জানতেন তিনি স্বল্পায়ু। তাঁর স্বল্পকালীন জীবনের মধ্যে তাঁকে এক বিরাট ব্রত উদযাপন করতে হবে। কিন্তু একা এ কাজ সম্ভব নয়। এজন্য চাই নিত্য শুদ্ধ বৃদ্ধ মুক্ত একদল সন্ন্যাসী শিষ্য। তাই তিনি কয়েকজন শিষ্যকে যোগসিদ্ধি ও শাস্ত্রজ্ঞান আয়ত্ত করতে বললেন। তিনি নিজে তৎপর হয়ে তাদের সব কিছু শেখাতে লাগলেন।

শিষ্যদের মধ্যে সনন্দনকে সবচেয়ে ভালবাসতেন শঙ্কর। তাঁকে ভালবেসে যোগশক্তি ও শাস্ত্রজ্ঞানের অনেক কিছু দান করেন। এ কারণে অন্যান্য শিষ্যরা সনন্দনকে ঈর্ষা করত। একদিনের এক ঘটনায় সনন্দনের গুরুভক্তি ও যোগশক্তি সকলের সামনে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত হওয়ায় শিষ্যদের চৈতন্য হয়। তাদের জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়।

একদিন আচার্য শঙ্কর অলকানন্দার তীরে বসে শিষ্যদের কাছে কয়েকটি নিগূঢ় দার্শনিকতত্ত্ব ব্যাখ্যা করে বোঝাচ্ছিলেন। সনন্দন তখন সেখানে ছিল না। সে তখন একটি ওষধি আনার জন্য নদীর ওপারের বনে গিয়েছিল। হঠাৎ একসময় একটি বিষয়ের মীমাংসার জন্য শিষ্যদের প্রশ্ন করলেন আচার্য শঙ্কর। কিন্তু উপস্থিত শিষ্যরা সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। তখন তিনি তাঁর প্রিয় মেধাবী শিষ্য সনন্দনের খোঁজ করতে লাগলেন।

তখন একজন শিষ্য জানালেন, গুরুদেব! সনন্দন ওষধি সংগ্রহের জন্য নদীর ওপারের বনে গেছে। নদীর ওপারে তাকিয়ে আচার্য দেখলেন, সনন্দন কাজ সেরে নদীর এপারে আসার জন্য রওনা হয়েছে। খরস্রোতা উদ্দাম পাহাড়ী নদী সাঁতার কেটে পার হওয়া সম্ভব নয়।

তাই পারাপারের জন্য কিছুদূরে একটি কাঠের সেতু ছিল। সনন্দন নদীপারের জন্য সেই সাঁকোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় তাকে ডাকলেন আচার্য। বললেন, সনন্দন আমরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। এখানে এসে বসো।

গুরুদেবের এই আহ্বান শোনামাত্র চঞ্চল হয়ে উঠল সনন্দন। সে আর সাঁকোর দিকে না গিয়ে গুরুর পাদপদ্ম স্মরণ করে পাহাড়ী নদীর উদ্দাম স্রোতের উপর ঝাঁপ দিল। বিপদের কথা সব ভুলে গেল। সকলে আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল। ভাবল স্রোতের বেগে সনন্দন তুলোর মত ভেসে যাবে। তার প্রাণরক্ষা সম্ভব হবে না।

কিন্তু এপারে রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে শিষ্যরা যখন দেখতে লাগল, সনন্দনের পা নদীর জলে মোটেই ডুবছে না। সে জলের উপর একটি করে পা রাখছে আর তার প্রতি পদক্ষেপে তার পায়ের তলায় একটি করে জলপদ্ম ফুটে উঠছে।

এইভাবে গুরুগতপ্রাণ যোগসিদ্ধ সনন্দন অবলীলাক্রমে ও অনায়াসে এপারে এসে উঠে গুরুকে প্রণাম করলেন। এদিকে আচার্য শঙ্করের বুকটা তখন শিষ্যের গৌরববোধে ভরে উঠেছে। প্রসন্নমধুর এক হাসি হেসে তিনি হাত তুলে আশীর্বাদ করে সস্নেহে বললেন, সনন্দন! তোমার গুরুভক্তি ও যোগশক্তি সকলের শিক্ষণীয় হোক। তুমি প্রতি পদক্ষেপে এক একটি পদ্ম ফুটিয়ে অলকানন্দা পার হয়েছ তাই আজ থেকে তোমার নাম হবে পদ্মপাদ।

এরপর আচার্য সনন্দনকে সেই তত্ত্বজ্ঞান প্রশ্নটি করতে সনন্দন তার সঠিক উত্তর দিলে শিষ্যরা তার তত্ত্বজ্ঞানের পরিচয় পেয়ে আরও আশ্চর্য হলো। ভাষ্য রচনার মধ্য দিয়ে অদ্বৈতবাদ ও জ্ঞানসাধনা প্রচারের ভিত্তিপ্রস্তুত হয়ে গেলে আচার্য শঙ্কর এবার ব্যাস গুহা ছেড়ে শিষ্যদলকে নিয়ে উত্তর ভারতের কয়েকটি তীর্থ দর্শনের পর উত্তরকাশীতে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

উত্তরকাশীতে আসার পর এক ভাবান্তর দেখা গেল আচার্য শঙ্করের মধ্যে। দেখা গেল অধ্যাপনা আর তত্ত্বপদেশ দানের কোন উৎসাহ নেই। সব সময় তিনি আত্মসমাহিত ও গম্ভীর হয়ে থাকতেন। আচার্য শঙ্কর প্রায়ই ভাবতে থাকেন, গুরু গোবিন্দপাদ ও বিশ্বেশ্বরের সব আদেশ যথাযথভাবে পালন করেছেন‌। ভারতের দিকে দিকে অদ্বৈত বেদান্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং এবার তাঁর কাজ শেষ। এবার যদি সমাধিযোগে এই পূণ্যভূমি উত্তরকাশীতে মরদেহ ত্যাগ করেন তাহলে কোন ক্ষতি হবে না।

এদিকে আচার্যের এই মানসিক অবস্থা দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ল পদ্মপাদ ও অন্যান্য শিষ্যরা। তারা ভাবল, আচার্যের বয়স তখন ষোল পূর্ণ হতে চলেছে। তারা শুনেছিল আচার্যের আয়ু খুবই কম। তবে কি তাঁর দেহরক্ষার কাল সমাগত? একথা ভেবে সকলেই বিষন্ন ও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ল।

উত্তরকাশীতে অবস্থানকালে একদিন রাত্রিকালে আচার্য শঙ্কর যখন দেহত্যাগের কথা চিন্তা করছিলেন তখন অলৌকিকভাবে ব্যাসদেব আবির্ভূত হলেন তাঁর সামনে। কৃষ্ণবর্ণ, বিশালবপু, জটাজুটমণ্ডিত, পুরাণপুরুষ মহামুণি ব্যাসদেবকে আবির্ভূত হতে দেখে ভক্তিভরে তাঁর স্তব করতে থাকেন আচার্য। তার স্তবে তুষ্ট হয়ে তাকে বর দিতে চান ব্যাসদেব।

প্রথমে তিনি শঙ্করকে আশীর্বাদ করে বললেন, বৎস, বিধিনির্দিষ্ট কাজ তুমি সম্পন্ন করেছ। আমি আশীর্বাদ করছি তোমার অদ্বৈতবাদের ভাষ্যগুলি জগতে চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাক। শঙ্কর তখন করযোড়ে বললেন, প্রভু! কৃপা করে এবার তাহলে অনুমতি দিন আমি এই দেহের বন্ধন ত্যাগ করে মুক্তিলাভ করি।

ব্যাসদেব বললেন, না বৎস! এই বিশেষ কর্তব্যকর্ম পালনের জন্য আরো কিছুকাল বেঁচে থাকতে হবে তোমায়। একথা জানাবার জন্যই আমি এসেছি তোমার কাছে। তুমি অদ্বৈতবাদের ভাষ্যরচনার মাধ্যমে তার তত্ত্বগুলি ব্যাখ্যা করলেও এখনো বড় বড় পণ্ডিতদের সমাজে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁরা এখনো তা গ্রহণ করেননি।

তাঁরা গ্রহণ না করলে সাধারণ লোকে তোমার মত মানবে না। চারিদিকে ঘুরে বেরিয়ে, তোমাকে এখন দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতদের স্বমতে আনতে হবে। এই কঠিন কাজটি এখনো বাকি আছে এবং তা সম্পন্ন করার জন্য তোমাকে আরও ষোল বছর বাঁচতে হবে। তুমি হচ্ছ ঈশ্বরপ্রেরিত পুরুষ এবং এটাই হল ঈশ্বরের বিধান।

এই কথা শোনার পর অবিলম্বে উত্তরকাশী ত্যাগ করে শিষ্যদের নিয়ে দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতদের জয় করার জন্য বার হয়ে পড়লেন শঙ্কর। উত্তর ভারত হতে দক্ষিণ ভারতের রামেশ্বর, পরশুরামের ক্ষেত্র প্রভৃতি প্রধান প্রধান ধর্মকেন্দ্রগুলি ঘুরে অদ্বৈতবাদ প্রচার করতে লাগলেন। দিকে দিকে বিজয় পতাকা উড্ডীন হতে লাগল তাঁর।

শঙ্কর বলেছেন, ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা‌। ব্রহ্ম নির্গুণ, নিরুপাধিক ও জ্ঞানস্বরূপ। তিনিই একমাত্র নিত্য বস্তু আর বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সব বস্তুই অনিত্য এবং মায়ার লীলামাত্র। এই অদ্বৈততত্ত্বের কথা তাঁর পূর্ববর্তী আচার্যগণ বলে গেলেও যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যার দ্বারা দ্বিগুণভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

তখন ভারতের ধর্মক্ষেত্রে বৈদিক কর্মকাণ্ডের অর্থাৎ যাগযজ্ঞের ও আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মের খুব প্রাধান্য ছিল। শঙ্করাচার্যের অদ্বৈততত্ত্ব ও মায়াবাদ এই কর্মকাণ্ডের প্রাধান্যের উপর এক প্রচণ্ড আঘাত হানল। বেদের কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে জ্ঞানকাণ্ডের ব্যাখ্যা করে তাঁর নিজের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করলেন।

বেদের সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্মের কথা থাকলেও শঙ্কর শুধু নির্গুণ ব্রহ্মের উপরেই জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জীব যতক্ষণ পর্যন্ত নির্গুণ নির্বিশেষ ব্রহ্মকে, মায়াময় বিশ্বজগতের সঙ্গে সম্বন্ধহীন পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে না পারবে ততক্ষণ জীবের মুক্তি নেই।

তিনি আরও বললেন, ব্রহ্ম ও জীব এক এবং অভিন্ন; কিন্তু মায়ার আবরণের জন্যই এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। জ্ঞানের আলোকদ্বারা মায়ার অন্ধকার অপসারিত করতে পারলে সেই জীব ও ব্রহ্মের সব পার্থক্য দূর হয়ে যায়। ‘তত্ত্বমসি’ মহাজ্ঞান লাভ হয়।

শ্রুতিতে যে সগুণ ব্রহ্মের কথা আছে শঙ্কর সেই সগুণ ব্রহ্মকেও মিথ্যা, মায়া ও অনিত্য বলেছেন। শক্তি ও মন বলতে যা কিছু আছে তা আছে সগুণ ব্রহ্মে। তাঁর মতে এই সগুণ ব্রহ্ম মিথ্যা, অনিত্য। তিনি শুধু মেনেছেন ব্রহ্মতত্ত্ব। এই তত্ত্বই তিনি যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠা করেছেন সারা বিশ্বের সামনে।

ধীরে ধীরে ভারতের অধ্যাত্মক্ষেত্রে আত্মজ্ঞানী ব্রহ্মজ্ঞানী মহাশক্তিধর নেতারূপে খ্যাতিলাভ করেন আচার্য শঙ্কর। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল হতে বহু মুমুক্ষু সাধক এসে এই তরুণ আচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ধন্য হন। নূতন সাধক ও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ব্রহ্মসাধনার নানা সহজ পথ ও পদ্ধতি দেখিয়ে দেন।

ত্যাগী সাধকদের জন্য জ্ঞানসাধনা আর সাধারণ সুখী সাধকদের জন্য পূজা অর্চনা ও সাধন ভজনের ব্যবস্থা করেন। সাধারণ সাধকদের জন্য তিনি অন্নপূর্ণা প্রশস্তি, শিবাষ্টক, গঙ্গা যমুনার স্তুতি ও গোবিন্দ প্রশস্তি রচনা করেন।

শঙ্কর এবার তাঁর তত্ত্বপ্রচার ও দিগ্বিজয়ের জন্য প্রথমে গেলেন প্রয়াগে কুমারিল ভট্টের কাছে। মীমাংসাদর্শনের শ্রেষ্ঠ আচার্য চোলদেশীয় পণ্ডিত কুমারিল ভট্টের তখন প্রচুর খ্যাতি সারা দেশে। যাগযজ্ঞসমন্বিত বৈদিক কর্মকাণ্ডের পুনঃ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বড় বড় তাত্ত্বিকরা পরাস্ত হত তাঁর কাছে।

শঙ্কর সোজা কুমারিল ভট্টের কাছে গিয়ে বললেন, মহাত্মন! বেদান্তের অদ্বৈতসিদ্ধান্ত প্রচারের জন্য সারা ভারত পরিভ্রমণ করে বেড়াচ্ছি। কিন্তু আপনার মত দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতদের স্বীকৃতি না পেলে তো আমার কাজ সফল হবে না। আমি জানি আপনি বেদের কর্মকাণ্ডের এটি করে দিলে আমার অদ্বৈতবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

রাগে জ্বলে উঠলেন কুমারিল ভট্ট। কিন্তু সে রাগ প্রকাশ না করে ষোড়শবর্ষীয় তরুণ সন্ন্যাসী শঙ্করের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। তাঁকে এত বড় কথা বলার দুঃসাহস কোথা হতে পেল সে তা ভেবে পেলেন না তিনি। তবে কি সে দৈব প্রতিভা ও শক্তির অধিকারী?

কুমারিল ভট্টের শিষ্যরা শঙ্কর ও তাঁর অনুচরদের পরিচয় জানতে চাইল। পরিচয় পেয়ে কিছুটা নরম হয়ে ভট্টপাদ বললেন, আচার্য! আমি জানি, আপনি গোবিন্দপাদের শিষ্য এবং অলৌকিক প্রতিভা ও শক্তির অধিকারী। উত্তর খণ্ড থেকে আপনি যে সব ভাষ্য রচনা করেছেন তার খ্যাতিও দেশে সর্বত্র প্রচারিত হয়েছে।

শঙ্কর তখন নিজের রচিত ভাষ্যগুলি দেখিয়ে বললেন, ভট্টপাদ! এই গ্রন্থগুলো পড়ে আজ আপনাকে আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। ভট্টপাদ বললেন, কিন্তু আচার্য! আপনি বড় অসময়ে এসে পড়েছেন। কারণ আমি সংকল্প করেছি এখনি আমি তুষানলে প্রাণত্যাগ করব। শঙ্কর আশ্চর্য হয়ে বললেন, সে কি কথা, আপনার মত মহাপণ্ডিত আত্মহত্যা করতে যাবেন কেন?

ভট্টপাদ বললেন, বৌদ্ধ ন্যায়শাস্ত্র শেখার জন্য আমি কিছুকাল নালন্দা বিহারে অবস্থান করি। সেখানে আচার্য ধর্মকীর্তির কাছে অধ্যায়ন করতাম। একদিন এক বৌদ্ধ আচার্য যুক্তিবিচারে আমারই কাছে পরাস্ত হন। তখন তিনি তুষানলে প্রাণত্যাগ করেন। তাই আমি মনে করেছি আমি আজ তুষানলে প্রাণত্যাগ করে গুরুদেবের প্রায়শ্চিত্ত করব।

শঙ্কর বললেন, কিন্তু মহাত্মন! আমি যে তর্কবিচারে আপনাকে আহ্বান জানাচ্ছি তা এড়াতে গেলে আপনার অপযশ ঘোষিত হবে।

ভট্টপাদ তখন বললেন, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতির অবৈদিকদের উচ্ছেদ করার জন্য আমি বেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে এসেছি সারাজীবন। আসলে কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ বেদের প্রতিষ্ঠাই ছিল আমার কার্য। কিন্তু আমি সময় পাই নি সব কাজ করার।

সুতরাং আপনার ও আমার মতবাদের মধ্যে খুব একটা বেশী পার্থক্য থাকার কথা নয়। যাই হোক, আপনি আমার শিষ্য মণ্ডন মিশ্রের কাছে যান। শিষ্য হলেও সে আমার শ্রদ্ধার পাত্র, কারণ তার জ্ঞান ও প্রতিভা অতুলনীয়। মণ্ডন আপনার কাছে পরাস্ত হলে ধরে নেবেন আমিই পরাস্ত হয়েছি। এই কথা বলার পর ধীরে ধীরে অগ্নিকুণ্ডে গিয়ে প্রবেশ করলেন কুমারিল ভট্ট।

দক্ষিণ ভারতের নর্মদা ও মাহিষ্মতী নদীর সঙ্গমের কাছে মাহিষ্মতী নগরে বাস করতেন মণ্ডন মিশ্র। নদীর ধারেই প্রাসাদের মতো বিরাট বাড়ি। বেদবিদ্যা বিশারদ, যাজ্ঞিক ও ধর্মগুরুরূপে তাঁর ঐশ্বর্য ও খ্যাতির সীমা নেই। শঙ্কর তাঁর বাড়ির কাছে গিয়ে দেখলেন, উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ির সীমানার মধ্যে যজ্ঞের কাজে ব্যস্ত আছেন মণ্ডন মিশ্র।

তাঁর কাছে তখন অনেক বেদবিদ ব্রাহ্মণ ও শিষ্য ছিলেন। দ্বারপালেরা কিছুতেই বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দিল না শঙ্করকে। শঙ্কর তখন যোগবিভূতিবলে পূর্ণ মার্গে উঠে গিয়ে যজ্ঞস্থলে মণ্ডন মিশ্রের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

তাঁর সামনে অনাহুত এক তরুণ সন্ন্যাসীকে দেখে একই সঙ্গে বিস্ময় ও ক্রোধের আবেগে অভিভূত হয়ে গেলেন মণ্ডন মিশ্র। কত ধনী ও রাজা মহারাজা তাঁর শিষ্য। কিন্তু তাঁরাও কেউ তাঁর বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে না যজ্ঞস্থানে। কিন্তু কে এই সন্ন্যাসী? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আগন্তুকের মুখপানে তাকিয়ে রইলেন বিস্ময় বিমূঢ় মণ্ডন মিশ্র।

শঙ্কর বললেন, আচার্যবর! আমি মহাযোগী গোবিন্দপাদের শিষ্য শঙ্করাচার্য। কিছুদিন আগে আমি আপনার গুরু ভট্টপাদ কুমারিলকে পরাস্ত করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সুযোগ পাই নি‌। তিনি তখন মরদেহ ত্যাগ করতে যাচ্ছিলেন। যাবার সময় আমাকে আপনার কাছে আসতে বলেন।

তিনি বলেন, আপনাকে পরাস্ত করতে পারলেই আপনার পরাজয়ই তাঁর পরাজয় বলে গণ্য হবে। আমি চাই আপনি বেদের কর্মকাণ্ড ছেড়ে আমার প্রচারিত জ্ঞানসাধনা ও অদ্বৈতবাদ গ্রহণ করুন। মণ্ডন মিশ্র প্রথমে রেগে গেলেন, পরে আলাপ করে বুঝলেন এই তরুণ সামান্য নয়, এক অলৌকিক শক্তির অধিকারী।

মণ্ডন বললেন, যতিবর! আপনার বিচার দ্বন্দ্বের আহ্বান আমি গ্রহণ করলাম। কিন্তু আগে যিনি পরাস্ত হবেন তাঁকে কী দণ্ড গ্রহণ করতে হবে? শঙ্কর সঙ্গে সঙ্গে বললেন, শুনুন আচার্য! পরাস্ত ব্যক্তিকে বিজয়ী ব্যক্তির শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে হবে।

মণ্ডন বললেন, উত্তম কথা। কিন্তু এই বিচারসভার মধ্যস্থ কে হবে?

শঙ্কর বললেন, আপনার সহধর্মিণী উভয়ভারতী দেবীর শাস্ত্রজ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও সত্যনিষ্ঠার কথা আমি আগেই শুনেছি। আমার ইচ্ছা তিনিই আমাদের এই সভার মধ্যস্থ হোন।

মণ্ডন মিশ্র এ প্রস্তাব মেনে নিলেন। বিচার সভা শুরু হলো। মাহিষ্মতী নগরীর পণ্ডিতরা দর্শক ও শ্রোতা হিসাবে সে সভায় এসে যোগদান করলেন।

পণ্ডিতদের সামনে আঠারো দিন ধরে বিতর্ক চলল। অবশেষে শেষ হলো বিচার। বিচারে আচার্য শঙ্করের জয় ঘোষণা করলেন উভয়ভারতী।

বেদবিদ্যা বিশারদ মণ্ডন মিশ্রের পরাজয়ে কুমারিল ভট্টেরও পরাজয় হয়। সারা দক্ষিণ ভারতে আচার্য শঙ্করের জয় জয়কার পড়ে যায়। শঙ্কর এবার অনুভব করতে লাগলেন বিজয়- গৌরবের আনন্দ। তিনি এবার মণ্ডন মিশ্রকে সন্ন্যাসদীক্ষা দেবার জন্য প্রস্তুত হলেন।

কিন্তু এমন সময় উভয়ভারতী বাধা দিয়ে বললেন শঙ্করকে, মুনিবর থামুন। প্রকৃতপক্ষে আপনার এ জয় অর্ধসমাপ্ত, কারণ আপনি আমাকে এখনো পরাস্ত করতে পারেন নি। আমার স্বামী পরাস্ত হলেও আমি আপনাকে শাস্ত্রবিচারে আহ্বান করছি।

সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কর বললেন, আচার্যপত্নী! আমি আপনার আহ্বান গ্রহণ করলাম। কোন্ শাস্ত্র নিয়ে বিচার হবে আপনিই তা ঠিক করুন।

উভয়ভারতী বললেন, আমাদের এ বিচার হবে কামশাস্ত্র নিয়ে।

শঙ্কর দেখলেন, এ শাস্ত্র সম্বন্ধে তাঁর কোন জ্ঞান নেই। কারণ আজীবন তিনি ব্রহ্মচর্য ও সন্ন্যাসব্রত পালন করে আসছেন। কোন অভিজ্ঞতাই নেই তাঁর এ বিষয়ে। তাই তিনি বললেন, দেবী! আপনি এ বিষয় ছেড়ে অন্য কোন বিষয় নিয়ে বিচার করুন।

উভয়ভারতী বললেন, আচার্য! আপনি সর্বশাস্ত্র-বিশারদ ও মহাজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত। তাহলে কামশাস্ত্রইবা আপনার জ্ঞানের বাইরে হবে কেন? তার উপর আপনি যখন ব্রক্ষজ্ঞ তখন এ শাস্ত্র আলোচনায় আপনার কুণ্ঠা থাকা উচিত নয়।

শঙ্কর বললেন, ঠিক আছে দেবী, আমি আপনার আহ্বান গ্রহণ করলাম। তবে আমাকে এ বিষয়ে প্রস্তুতির জন্য একমাস সময় দিতে হবে। উভয়ভারতী দেবী তাতে সম্মত হলে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেলেন শঙ্কর। বাইরে গিয়ে শিষ্যগণের সঙ্গে মিলিত হলেন। তারপর মাহিষ্মতী নগরের প্রান্তে এক অরন্যের মধ্যে আসন পেতে বসলেন।

(চলবে)

…………………………………
আরো পড়ুন:
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: এক
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: দুই
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: তিন
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: চার
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: পাঁচ
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: ছয়

………………………………..
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে: ভারতের সাধক-সাধিকা
পুণঃপ্রচারে বিনীত-প্রণয় সেন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!