ভবঘুরে কথা
মাই ডিভাইন জার্নি

কথায় কথায় লাশ ফেলে দেয়ার রাজনীতি তখনো শুরু হয়নি। তখন ছিল শক্তি প্রদর্শনের মহড়া। এই যেমন এক মহল্লার ছেলেপেলে আরেক মহল্লায় হামলা করে আসলো। কিছু দোকানপাট ভাংচুর হলো, কারো কারো বাড়ির দরজায় আঘাত করা হলো। হাতের কাছে পেয়ে দুই একজনকে চড়-থাপ্পড়। আর মনে মনে পছন্দের নারীটি যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়ির সামনে একটু বাহাদুরি দেখিয়ে আসা। এই পর্যন্তই।

এই ধারা জনপ্রিয় হতে শুরু করলে লাঠিসোঠার সাথে যুক্ত হতে শুরু করলো মারাণাস্ত্র। অবশ্য প্রথমে এসব মারণাস্ত্র শুধু প্রদর্শনের জন্যই রাখা হতো। বিষয়টা এমন ছিল যে, আজ ওরা হামলা করলে কাল এরা হামলা করবে। তারই ধারাবাহিকতায় নিয়মমেনে বিচার বসতো; তারপর মিটমাট। সম্ভবত মাদকের সহজলভ্য হয়নি বলেই সেইসময় মারামারি-কাটাকাটি এক লিটারের কাঁচের বোতলের কোক-সেভেন আপেই মিটে যেত। আর ফান্টা মেরিন্ডা হলে তো কথাই নাই।


আমি দেখেছি ডাস্টবিন থেকেও মানুষ খাবার সংগ্রহ করে খাচ্ছে। সে সব দেখার পর আমি এত আয়োজন করে এত খাবার কীভাবে খাই তোমরাই বলো? তোমরা এগুলো খেয়ে রাতে ঘুমাতে পারবে? এত এত পদ দিয়ে খাওয়ার সময় তোমাদের একবারও সেই সব না খেয়ে থাকা মানুষের কথা মনে পড়বে না? এই কয়জন মানুষের জন্য এত আয়োজন এত অপচয় তোমরা করো কীভাবে? তোমরা কি মানুষ!!!

সময়টা এমন ছিল যে, অস্ত্রশস্ত্র প্রভাবশালীদের হাত গলে পাড়ার বড়ভাইদের কাছে চলে আসলেও সেগুলো চালানোর মতো সুযোগ তখনো তৈরি হয়নি। অস্ত্র আছে শুনলেই লোকে ভয় পেতো। সেসবের চেহারাও দেখাতে হতো না। যেহেতু ব্যবহার নেই তাই সেগুলো ঠিকঠাক আছে নাকি বিকল হয়ে গেছে তা বোঝারও কোনো উপায় থাকতো না। একটু বড় হবার পর টের পেতে শুরু করলাম বিষয়টা তেমন না। এইসব অস্ত্র চালানোর জন্য সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও দিনক্ষণ নির্দিষ্ট আছে। তার মধ্যে ছিল শবেবরাত, সাকরাইন ও ১৫ ডিসেম্বরের রাত। কারণ এই তিন দিনই পুরান ঢাকার পাড়া-মহল্লায় প্রচুর পটকা ফাটাতো উঠতি বয়সীরা। আজকের মতো এতো আতশবাজি না হলেও বড়দের কান ঝালাপালা না হওয়া পর্যন্ত তা থামতো না কিছুতেই।

লালন আখড়া, কুষ্টিয়া

সাকরাইনের আয়োজনটায় প্রায় সন্ধ্যার পরপরই শেষ হয়ে যেত বলে এই তিনদিনের মধ্যে এর গুরুত্ব একটু কমই ছিল। অন্যদিকে ১৫ ডিসেম্বর আর শবেবরাতের আয়োজন চলতো রাতব্যাপী। বছরে এই কয়টা দিনই আমরা নিজেদের মতো করে বড় হয়ে উঠতে পারতাম। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে এলেও বাড়ির বাইরে থাকার অনুমতি মিলতো। অবশ্য বয়সের উপর নির্ভর করত কে কতটা রাত অবদি বাড়ির বাইরে থাকতে পারবে। সেই এক একটা রাত ছিল এক একটা বিশ্বজয়ের ইতিহাস।

এই বিশেষ দিনগুলোতে পাড়ার লুকিয়ে থাকা অস্ত্রগুলো প্রকাশ্যে চলে আসতো। মহল্লার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বাড়ির ছাদে বা প্রভাবশালী ব্যক্তির দখলকরা ভবনের ছাদে সেইসব অস্ত্র চালানোর মহড়া চলতো। এক মহল্লা টের পেত অন্য মহল্লার কাছে কি কি অস্ত্র আছে। কার শক্তি কতটা তা আকাশের দিকে গুলি ছুঁড়ে শব্দ করে জানান দেয়া হতো। অনেকটা টারজান সিনেমার শিমপাঞ্জীর বুক চাপড়ে জানান দেয়ার মতোই।

সাত্তার ফকির

বিস্তারিত পড়ুন…

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!