ভবঘুরে কথা
ভারতের মানচিত্র

এখন সারা পৃথিবী ভোগবাদের কবলে পরেছে। ভারতও তার থেকে বাদ যেতে পারে না। ভোগবাদ হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতা। পাশ্চাত্য সভ্যতা সদাই দেহ, মন ও ইন্দ্রিয়ের ভোগ মেটাতে ব্যস্ত। সেজন্য পাশ্চাত্য দেশে ত্যাগবাদের লেশ মাত্র নেই। পাশ্চাত্য দেশ মনে করে- দেহ, মন ও ইন্দ্রিয় এই তিনটের মিলিত সমষ্টিই সে নিজে।

ভারত কিন্তু তা নয়। ভারত চিরকালই ত্যাগবাদে বিশ্বাসী। সেই ত্যাগবাদী ভারত এখন ভোগবাদে ডুবে গেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ভোগবাদে শান্তি নেই। ভোগবাদে যে শান্তি আশা করা হয় তা হল দেহ, মন ও ইন্দ্রিয়ের শান্তি। এ শান্তি ক্ষণস্থায়ী। ভোগবাদ হল কলিযুগের শেষ কামড়। এই ভোগবাদ আসে প্রাণের অধিক চঞ্চলতা থেকে।

প্রত্যেক মানুষ যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে আপন আপন প্রাণের চঞ্চলতার আধিক্যকে কমাতে পারে তাহলে ইন্দ্রিয়দের ভোগবাদ থেকে দূরে থাকতে পারবে এবং আপনা হতে সকলের জীবনে শান্তি আসবে। অনন্তকাল ধরে ভারতের মুনি ঋষিরা বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই পথেরই সন্ধান করেছেন এবং ভারতকে শান্তির দেশ বলে ঘোষণা করেছেন। তাই ভারত কখনও পর রাজ্য গ্রাস করে নি বরং সে নিজেই বারবার পরের দ্বারায় আক্রান্ত হয়েছে।

অনেক নামী দামী মানুষ ভারতবাসীকে উপদেশ দেন যে ভারতবাসী তাকিয়ে দেখো পাশ্চাত্য দেশগুলো কত উন্নতি করেছে, তোমরা কেন করতে পারছ না? তাদের মতো তোমরাও উন্নতি কর।

বিচার করে দেখা যাক পাশ্চাত্য দেশ কেন জাগতিক জীবনে উন্নতি করতে পেরেছে আর ভারত কেন পারে নি?

উন্নত পাশ্চাত্য দেশগুলোর বেশীর ভাগ স্থানই প্রবল ঠাণ্ডা কবলিত। এমন অনেক স্থান আছে যেখানে তিরিশ থেকে চল্লিশ ডিগ্রি মাইনাস টেম্পারেচার। তাই তারা ঐ ঠাণ্ডা থেকে বাঁচবার জন্য বাধ্য হয়েছে বিদ্যুৎ আবিষ্কার করতে। প্রকৃতি তাদের এই কাজে বাধ্য করেছে।

বহু অতীতে যখন ঐ সব স্থানে বিদ্যুৎ ছিল না তখন সেখানকার মানুষটা প্রচুর কষ্ট পেত শীতকালে সেসব স্থান বরফে পরিপূর্ণ হয়ে যায় বিদ্যুতের মাধ্যমে তারা ঘর গরম করা, জল গরম করা, আলো ইত্যাদি লাভ করতে পেরেছে। এভাবে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে ঠাণ্ডার দেশের লোকেরা বেঁচে থাকার তাগিদে স্থূল বিজ্ঞানের বহুবিধ সাহায্য নিতে বাধ্য হয়েছে।

এর ফলে স্থূল বিজ্ঞান মনস্ক হওয়ায় পাশ্চাত্য দেশগুলো জাগতিক জীবনের সবদিকে উন্নতি করতে পেরেছে কিন্তু বিজ্ঞানের মাধ্যমে আধ্যাত্ম দিকে অগ্রসর হওয়ার মানসিকতা বা পরিবেশ তাদের জীবনে আসে নি। ফলে তারা উষ্ণ দেশ থেকে আমদানী করা অধ্যাত্মবিদ্যাকে স্থূল ভাবে শান্তি লাভের উপায় স্বরূপ জীবনে গ্রহণ করেছে।

এই স্থূল অধ্যাত্মবিদ্যা ঐ উন্নত দেশগুলির নিজেদের আবিষ্কৃত নয়। ঐ দেশগুলি সর্বদা স্থূলত্বে বিশ্বাসী হওয়ায় তাদের মধ্যে আগ্রাসী মনোভাব এসেছে এবং অন্যান্য দেশ আক্রমণ করে সে সব দেশের ধনসম্পদ লুঠ করে নিয়ে গেছে। এই আগ্রাসী মনোভাবের দরুণ তারা পৃথিবীকে ধ্বংস করার জন্য আণবিক বোমা পর্যন্ত আবিষ্কার করেছে।

এ সবই স্থূল বিজ্ঞানের প্রভাব। ভারত এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ভারত নদীমাতৃক দেশ। উত্তরে গিরিরাজ হিমালয় এবং তিনদিকে সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত। হিমালয় থেকে বহু বহু নদী বেরিয়ে এসে সমুদ্রে মিলিত হয়েছে এবং এই দেশকে প্রাকৃতিকভাবে শস্যশ্যামলা করে তুলেছে।

ভারতের প্রকৃতি মানুষের কাছে কঠোর নয় এবং এমনই দয়াশীল যে ভারতবাসী তাদের জীবনে সামান্যতম প্রয়োজনীয় বস্তুগুলি অনায়াসে পেয়ে থাকে। এ কারণে ভারতবাসী দয়াশীল, প্রেমিক, অহিংস হওয়ায় স্থূল বা ভৌত বিজ্ঞানের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় নি।

চিরকালই তারা অল্পে সন্তুষ্ট থেকেছে। প্রকৃতি ভারতবাসীর জীবনে আগ্রাসী মনোভাবের বিকাশে সহায়তা করেনি। তাই ভারতের কবি গেয়েছেন-

চাই না মাগো রাজা হতে, পাই যেন দুবেলা খেতে;
দ্বারে যদি অতিথি আসে মা, না হয় যেন মুখ লুকাতে।

ভারতবাসী চিরকালই প্রকৃতিকে পূজা করেছে। তাই তারা বলে বরুণ দেবতা, অগ্নি দেবতা, পবন দেবতা, ভূমি মাতা, গঙ্গাসহ সমস্ত নদী মাতা, শস্য মাতা ইত্যাদি।

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের প্রকৃতির তারতম্য, গুণগত পার্থক্য এবং স্বভাবগত পার্থক্যের দরুন কে কোন বিজ্ঞানে বিশেষ পারদর্শী হয়েছে তার আলোচনা করা যাক।

প্রথমেই দেখা যায় পাশ্চাত্য দেশ স্থূলবিজ্ঞানে অধিক অগ্রসর হওয়ার দরুন জীবনের ভোগবাদে ডুবে গেছে। ফলে তারা জীবনের শান্তি থেকে বহু দূরে সরে গেছে।

প্রাচ্য স্থূলবিজ্ঞানে অগ্রসর হতে না পারায় ভোগবাদে না গিয়ে অনন্ত শান্তি লাভের জন্য চূড়ান্ত আধ্যাত্ম বিজ্ঞানে প্রবেশ করেছে এবং জীবনে চির শান্তির পথ খুঁজে পেয়েছে। একদিকে স্থূলবিজ্ঞান এবং ভোগবাদ ফলে চির অশান্তি। অপরদিকে চূড়ান্ত আধ্যাত্মবাদ এবং চির শান্তি। এই দুই দিকের মধ্যে মানব জীবনে কোনটা কল্যাণপ্রদ?

কেউ যদি ভাবেন বা বলেন যে পাশ্চাত্য দেশের স্থূলবিজ্ঞান এবং ভোগবাদ ভারতবাসীর জীবনে আনতে পারলে ভারতবাসীর কল্যাণ হবে তবে তা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক কথা এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করা। যে দেশের যেমন প্রকৃতি সে দেশের মানুষকে প্রকৃতি সে ভাবেই তৈরি করে নেবে এটাই বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞানের বিরুদ্ধতা করলে মানব জীবনে অনিষ্ট অনিবার্য।

পাশ্চাত্যদেশ স্থূলবিজ্ঞান এবং ভোগবাদে পরিচালিত হওয়ায় সেখানকার মানুষ অধিক সংখ্যায় মাংসাশী, মদিরা প্রিয় এবং এক পুরুষ এক নারীতে বিশ্বাসী নয়। ফলে তারা দেহ, মন এবং ইন্দ্রিয়কেই আপন বলে মনে করে এবং এই তিনের সেবাকেই নিজের সেবা বলে ভাবে।

এর অতীতে আর কিছু থাকতে পারে তা তাদের চিন্তার অতীত। ফলে এই জীবনই প্রথম এবং শেষ এটাই তাদের সিদ্ধান্ত। এ কারণে তারা উচ্ছৃঙ্খল প্রিয়। স্থূলবিজ্ঞানকেই তারা জীবনের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছে।

ভারতবাসী প্রকৃতির তাড়নায় অধ্যাত্মবিজ্ঞানে বিশ্বাসী হওয়ায় তারা স্থূলবিজ্ঞানের দিকে বেশী না ঝুঁকে দেহ, মন এবং ইন্দ্রিয়ের অতীতে তার মূল সত্তাকে জানবার চেষ্টা করেছে।

ফলে ভারতবাসী প্রাণ বা আত্মাকে জেনে মানবজীবনের শান্তির পথ উন্মুক্ত করেছে। স্থূলবিজ্ঞান বা ভোগবাদের পথ ক্ষণস্থায়ী এবং শান্তির থেকে বহুদূরে। অধ্যাত্মবিজ্ঞানের পথ বা আত্মজ্ঞানের পথ চিরস্থায়ী এবং শান্তিদায়ক।

তাই ভারতবাসী উচ্ছৃঙ্খল প্রিয় নয়, বহু বিবাহে বিশ্বাসী নয়, মাংসাশী বা মদিরা প্রিয় নয়।

ভারতবাসীর এই সুন্দর সহজসরল জীবনে কিছু স্থূলত্ববাদী মানুষ যারা ভারতে জন্মেও পাশ্চাত্যের ভোগবাদকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেছে। তারা ভারতবাসীর জীবনে সর্বনাশ এনে দিয়েছে। যারা মনে করে পাশ্চাত্যের চোখ ধাঁধানো সম্পদ ভারতবাসীর জীবনে এনে দিতে পারলে ভারতবাসীর মঙ্গল হবে, তাদের এ চিন্তা সম্পূর্ণ ভুল।

যদি ভোগবাদের মাধ্যমে মানুষ শান্তি পেত তবে পাশ্চাত্য দেশের অসংখ্য মানুষ এই গরীব ভারতে এসে অধ্যাত্ম পথকে জানতে চায় কেন ?

কৈ ভারতবাসী তো পাশ্চাত্যদেশে গিয়ে অধ্যাত্ম বিজ্ঞানকে জানতে চায় না।

ভারতের এই ক্ষতি করছে কারা?

কিছু অতি বুদ্ধিমান মানুষ, কিছু রাজনীতিবিদ এবং কিছু ধনী ব্যবসায়ী। আসলে ভারতবাসীর মঙ্গল কিসে হবে তা এরা জানে না। যুগ যুগ ধরে বহু মুনি ঋষি এবং সময়ে সময়ে দীন দুনিয়ার মালিক ভারতে আবির্ভূত হয়ে ভারতের মাটি, আকাশ, বাতাস পবিত্র করে যে শাশ্বত আদর্শকে স্থাপন করেছেন এ বিষয়ে ঐ স্বার্থান্বেষী মানুষগুলোর কোন জ্ঞান না থাকায় তারা ভারতের এই ক্ষতি সাধন করতে পেরেছে।

সারা পৃথিবীর ধর্মের রাজধানী এই ভারতে কলিযুগের শেষপাদে এসে যে ক্ষতি হয়েছে এবার ভারতকে ফিরে যেতে হবে তার সেই ফেলে আসা অধ্যাত্ম বিজ্ঞানে। কিভাবে তা সম্ভব? ভালো থেকে মন্দে চলে যাওয়া যত কঠিন তার চেয়ে মন্দ থেকে ভালতে ফিরে আসা বেশী কঠিন।

মানুষের জীবনে মন্দ আসে কখন?

যখন মানুষ অধিক প্রাণের চঞ্চলতায় অবস্থান করে। প্রাণের এই অধিক চঞ্চলতাই ভোগবাদের কারণ। অপরদিকে ভারতের অধ্যাত্ম বিজ্ঞানের মাধ্যমে যে যত বেশি তার প্রাণের অধিক চঞ্চলতাকে সরিয়ে দিতে পারবে ততই সে চিরশান্তির দিকে অগ্রসর হবে। তাই ভারতীয় যোগী বলেন-

পৃথিবীর বস্তু দেখতে সুন্দর, পরিণামে বিষবৎ। চঞ্চলতাই দুঃখ, স্থিরত্বই সুখ।

ভারতের ঋষি বলেছেন,

নিশ্চলং ব্রহ্ম উচ্যতে।
ইন্দ্রিয় সুখকে পরিত্যাগ করে আত্মসুখী হও।

একটা শিশু যখন মাতৃগর্ভে থাকে তখন সে শ্বাসগ্রহণ করে না, ও শ্বাসত্যাগ করে না। ফলে শিশুটির ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা থাকে না। এ কারণে শিশুটি খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করে না। এ অবস্থায় শিশুটি মলমূত্রও ত্যাগ করে না। এই শিশুটিকে বলা হয় সর্বত্যাগী।

কারণ শিশুটি কিছু গ্রহণ করে না, কিছু ত্যাগও করে না। অধ্যাত্ম বিজ্ঞান বলছে গ্রহণ করলেই ত্যাগ করতে হয়। সেই শিশুটি যখন মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হল অমনি কেঁদে উঠল। সাথে সাথে সে শ্বাস টেনে নিল এবং পরমূহুর্তে শ্বাস ত্যাগ করল। এখন শিশুটি মাতৃগর্ভের নিশ্চল অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রাণের এক লক্ষ তরঙ্গে পতিত হল। এখন থেকে শিশুটি এই পৃথিবীর সবকিছু চায়। কিন্তু কত দিন ?

যতদিন শ্বাস চলছে এবং বেঁচে আছে ততদিন।

তাই ভারতীয় যোগী বলছেন, মাতৃগর্ভে ছিলাম যোগী, ভূমে পড়ে গেলাম মাটি। অর্থাৎ নিশ্চল ব্রহ্ম থেকে এক লক্ষ তারঙ্গে ক্ষিতি তত্ত্বে চলে এলো। ভারতীয় অধ্যাত্ম বিজ্ঞান বলে এমন কর্ম কর যাতে করে মানুষ তুমি এই ক্ষিতি তত্ত্ব থেকে অর্থাৎ প্রাণের এক লক্ষ তরঙ্গ থেকে নিশ্চল ব্রহ্মে অর্থাৎ তোমার উৎস স্থলে বা নিস্তরঙ্গে ফিরে যাও।

গীতার ভাষায় এই কর্মকে কর্মযোগ বলে এবং পতঞ্জল যোগসূত্র অনুসারে কর্মকে ক্রিয়াযোগ বলে। জীব কোন এক অজ্ঞাত কারণে তার উৎসস্থল চির নিশ্চল অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে চঞ্চলতার ফেরে পড়ে‌। বহু বহু জন্ম অতিক্রম করতে করতে অবশেষে তাকে তার উৎসস্থল নিশ্চল ব্রহ্মে ফিরে যেতেই হবে।

এটাই ভারতের বেদান্তের শিক্ষা-নদী যেমন সাগরে মেলে। নদীর উৎসস্থল সমুদ্র। সেখান থেকে সে বিচ্যুত হয়ে বাষ্প, মেঘ, ঝরণা, ছোট নদী, বড় নদী হতে হতে বহু নাম ও রূপ অতিক্রম করতে করতে অবশেষে সমুদ্রে ফিরে যায়।

জীবনের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। সেই নিশ্চলে ফিরে গেলে আর জন্ম নাই, সুখ, দুঃখ, জ্বরা, ব্যাধি, মৃত্যু নাই চিরশান্তি। এই চিরশান্তির পথ ভারতের আবিষ্কার, স্থূল বিজ্ঞান বা ভোগবাদ নয়। ভারতের এই অধ্যাত্মবিজ্ঞানকে সুপ্রিম সাইন্স বলা হয়। ভারতের মানুষকে কখনই পাশ্চাত্য দেশের মত পুরোপুরি জড়বাদ বা ভোগবাদের দিকে নেওয়া যাবে না।

এখনই ভারতবাসী জড়বাদ বা ভোগবাদ হটাও বলে আওয়াজ তুলছে।

…………………………………..
সূত্র: বাচস্পতি অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়

পুণঃপ্রচারে বিনীত -প্রণয় সেন

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!