মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ – তিন

মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ – তিন

-আবু ইসহাক হোসেন

মনোরঞ্জন গোঁসাই: বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ

মনোরঞ্জন গোঁসাই বাউল পথ-মত তথা লালন ফকিরের দর্শনকে পরিপূর্ণভাবে বুঝতে চেষ্টা করেছেন। সহজ-শুদ্ধ সাধনার ধারার যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে তিনি লালন ফকিরের পথ-মতকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন যোগ্যতর ভাবে। বাউল নামধারী আন্দাজী ধান্দাবাজদের তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন।

আমরা আমাদের আলোচনায় ইতোমধ্যে দেখাতে সক্ষম হয়েছি যে কিভাবে সেই শুরু থেকেই নানান ভেজাল সাজাবাউল লালন ফকিরের পথ-মতের দোহাই দিয়ে নিজেদের ব্যভিচারকে লালন ফকিরের পথ-মতের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন- কিছুক্ষেত্রে তারা হয়তো সফলও হয়েছেন।

কিন্তু সাথে সাথে এটাও লক্ষণীয় যে লালন ফকিরের শিষ্য পরম্পরায় কিছু শুদ্ধ সাধক সেই কদাচারী সাজাবাউলদের আন্দাজী ধান্দাবাজির প্রতি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শুদ্ধ সাধনার ধারাকে তুলে ধরেছেন ভক্ত-অনুরাগীদের সামনে।

ফলে লালন ফকিরের পথ-মত বিকৃতির হাত হতে ঠিকই রক্ষা পেয়েছে। এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে যে ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই লালন ফকিরের পথ-মতের চতুর্থ সিঁড়ির সাধক। তাঁর পরম্পরা হলো লালন ফকির > ফকির ভোলাই শাহ্ > ফকির কোকিল শাহ্ > ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই।

এখানে বলা প্রয়োজন যে, ভোলাই শাহ্ ফকির লালন সাঁইজির অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। ফকির লালন সাঁইজি ভোলাই শাহকে এতোটাই স্নেহ করতেন যে তাঁর পালক কন্যা পিয়ারির সাথে ভোলাই শাহের বিবাহ দিয়ে আখড়াতেই রাখেন।

এ সম্পর্কে হিতকরীতে বলা হলো, ‘শিষ্যদিগের মধ্যে শীতল এবং ভোলাই দুইজনকে ইনি (লালন-লেখক) ঔরসজাত পুত্রের ন্যায় স্নেহ করিতেন।’

ফকির লালন সাঁইজির দেহত্যাগের পর ভোলাই শাহ্ এবং শীতল শাহ্-ই আখড়াবাড়িকে বুকের পাঁজর দিয়ে আগলে রাখেন এবং লালন ফকিরের গানের ধারায় যে আখড়াই ঘরানার কথা বলা হয়েছে- তার বিস্তার এই ভোলাই শাহ্ এবং শীতল শাহও লালন ফকিরের পথ-মতকে পরিশুদ্ধতার সাথে শিষ্য পরম্পরায় ছড়িয়ে দিতে থাকেন।

তাই লালন ফকিরের তথাকথিত অনুসারী নামে পরিচিতি দিয়ে যারা লালন ফকিরের সত্য-সুপথের শুদ্ধাচারী সাধনাকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলছিল- সেইসব বিপদগামী। লালন সাঁইজি দুই ধারাকেই ‘কানা’র চর্চা বলে উল্লেখ করেছেন। লালন ফকিরের ভাষায় পণ্ডিত এবং সাধক দুইজনই কানা (অন্ধ)। আর এ কারণেই এ প্রবন্ধ শুরু করা হলো লালন ফকিরের পদের উদ্ধৃতি দিয়ে।

খুব কম পণ্ডিত বা সাধকই বাউল দর্শনকে পরিপূর্ণভাবে পাঠ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বাউলের দর্শনটাকে নিয়েছেন- নিয়ে ঋদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু বাউলের সাধনাকে তিনি নেন নি। তেমনি অনেক সাধককে আমি দেখেছি- যারা সাধনার অন্তর্নিহিত দর্শনটাকে কখনোই বুঝার চেষ্টা করেন নি।

অর্থাৎ তারা না বুঝেই সাধনায় নিমগ্ন হয়েছেন। আর এই না বুঝার ফাঁক গলেই অনেক অনাকাঙ্খিত বিষয় নির্বিচারে ঢুকে পড়েছে বাউল সাধনার ভেতরে- যা বাউরে শুদ্ধাচারি সাধনাকে করেছে কলুষিত।

এ সম্পর্কে আমরা পাক্ষিক হিতকরী’র ভাষ্য তুলে ধরতে পারি। আমরা প্রবন্ধে বারবার হিতকরী’র ভাষ্যের সাহায্য নিয়ে আমাদের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবো। তার কারণ লালন ফকির এবং তাঁর জীবনাচার ও বিশ্বাস সম্পর্কে হিতকরীর উল্লেখ একমাত্র ঐতিহাসিক দলিররূপে সর্বমহলে স্বীকৃত।

হিতকরীতে লালন ফকিরের পথ-মত সম্পর্কে যা বলা হয়েছে- তা যেমন গবেষকগণ কর্তৃক, তেমনি লালন ফকিরের প্রত্যক্ষ অনুসারীদের দ্বারা সমর্থিত। বসন্ত কুমার পাল লালন ফকিরের সাক্ষাৎ শিষ্য-ভোলাই শাহ্ ও পাঁচুকে- যাঁরা তখনো জীবিত ছিলেন এবং আখড়ায় বাস করতেন।

লালন ফকির সম্পর্কে হিতকরীতে প্রকাশিত তথ্যের সত্যতা বিষয়ে তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা বলেন হিতকরীতে লালন সাঁইজি সম্পর্কে যা লেখা হয়েছে তা সত্য। মীর মোশারফ হোসেন কর্তৃক সম্পাদিত পাক্ষিক হিতকরীর ৩১ অক্টোবর, ১৮৯০ সালের সংখ্যায় ‘মহাত্মা লালন ফকির’ শিরোনামের নিবন্ধে এ সম্পর্কে লেখা হলো, ‘সম্প্রতি সাধুসেবা বলিয়া এই মতের নূতন সম্প্রদায় সৃষ্টি হইয়াছে। সাধুসেবা হইতে লালনের শিষ্যগণের না হউক নিজের মতের বিশ্বাস অনেকটাই ভিন্ন ছিল।

সাধুসেবা ও বাউলের দলে যে কলঙ্ক দেখিতে পাই, লালনের সম্প্রদায়ে সে প্রকার কিছু নাই। আমরা বিশ্বস্তসূত্রে জানিয়াছি সাধুসেবায় অনেক দুষ্ট লোক যোগ দিয়া কেবল স্ত্রীলোকদিগের সহিত কুৎসিত কার্য্যে লিপ্ত হয় এবং তাহাই তাহাদের উদ্দেশ্যে বলিয়া বোধ হয়।

মতে মূলে তাহার সহিত ঐক্য থাকিলেও এ সম্প্রদায়ে (লালন সাঁইয়ের সম্প্রদায়ে- লেখক) তাদৃশ ব্যভিচার নাই। ‘পরদার ইহাদের জন্য মহাপাপ।’ হিতকরী পত্রিকার ভাষ্যে দু’টি জিনিস খুব গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। তা হলো সাধুসেবার নামে পরদ্বারে ব্যভিচার এবং এ সম্প্রদায়ে তাদৃশ ব্যভিচার নাই।

আরো বলা হলো যে, ‘পরদ্বার ইঁহাদের জন্য মহাপাপ।’ অর্থাৎ লালন ফকিরের সমকালেই বাউল নামে পরিচিত কোনো কোনো সম্প্রদায়ে স্খলিত বৈষ্ণবদের অনুসরণে পরনারী নিয়ে ব্যভিচার প্রচলিত ছিল। তারাও বাউল নামে সমাজে সাধারণভাবে পরিচিত ছিল।

কিন্তু বাউল আর বৈষ্ণব যে এক নয় তা আমার ‘বাউল দর্শন ও লালনতত্ত্ব’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করে দেখানো হয়েছে। অনুসন্ধানী পাঠক তা থেকে তাদের তৃষ্ণা মেটাতে পারেন।

এখানে আরেকটি কথা খুব গুরুত্বের সাথে উল্লেখ যে, হিতকরীর নিবন্ধকারের মতে সাধুসেবাকে বাউল সম্প্রদায়ের একটি মত বা উপসম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হলেও আমাদের মতে, সাধুসেবা বাউল সম্প্রদায়ের কোনো উপসম্প্রদায় নয়। তা মূলত সাধারণে বাউল নামে পরিচিত বৈষ্ণবদের স্খলিত একটি ধারা।

এ সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথ মিত্রের মন্তব্য তুলে ধরলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। তিনি তার বাউল প্রবন্ধে স্খলিত বৈষ্ণবদের চরিত্র নিরূপণে প্রকৃত বাউলদের নামে যে মিথ্যাচার করা হয় তার প্রতিবাদ করে বলেছেন, ‘বাউল সম্বন্ধে অনেকের অনেক অদ্ভুত রকমের ধারণা আছে।

সে সব ধারণা যাদের সম্বন্ধে চলে, তারা প্রকৃত বাউল নয়। নানা রকমের ঘৃণা আচার অনুষ্ঠান তাদের মধ্যে প্রচলিত আছে। বৈষ্ণব এবং সহজিয়া আন্দোলন বিকারগ্রস্ত হয়ে যখন পঁচে উঠল। তখন এই পৈশাচিক দলের সৃষ্টি হয়; এদের সাথে মরমি বাউলের লেশ মাত্র মিল নেই।’

তাহলে বোঝা গেলো সাধুসেবা সম্প্রদায় এবং বাউল সম্প্রদায়কে এক করে দেখার কারণেই হিতকরীর নিবন্ধকারের এই ভুল ধারণা হয়েছে। বিশেষ করে সতের শতকের দ্বিতীয়পাদে মুসলমান রমণী মাধব বিবির শিষ্য বীরভদ্রের হাত ধরে যে বাউল সম্প্রদায় যাত্রা শুরু করে- সেটাই মূলত বাউল সম্প্রদায়। যাকে অক্ষয় কুমার দত্ত উপাসক সম্প্রদায়, সুধীর চক্রবর্তী গৌণধর্ম আর রবীন্দ্রনাথ ছোট ধর্ম বলে অভিহিত করেছেন।

তাই স্খলিত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মত এবং বাউল মত এক নয়। বাউল মত বললে যে দর্শনকে বুঝায় তা পুরোপুরি শুদ্ধাচারি সাধনা ভিত্তিক ধর্মদর্শন। লালন ফকিরের শিষ্য দুদ্দু শাহ্ যাকে দরবেশি বাউল বলেছেন। তিনি তার পদে উল্লেখ করলেন-

দরবেশি বাউলের ক্রিয়া
বীরভদ্র জানে সেই ধারা,
দরবেশ লালন সাঁইয়ের কথায়
দুদ্দু জানায় তাই।।

অর্থাৎ মাধব বিবির শিষ্য বীরভদ্র কর্তৃক প্রচারিত ধর্ম- শুদ্ধাচারী সাধনার ধর্ম। দুদ্দু শাহ্ বলেছেন, ‘দরবেশি বাউলের ক্রিয়া।’ ‘দরবেশ’ ফার্সি শব্দ। যার শাব্দিক অর্থ হলো পরিশুদ্ধতা।

অর্থাৎ দরবেশ সেই ব্যক্তি যে তাঁর আচার-বিচারে, কার্য-ব্যবহারে এবং চিন্তা-চেতনায় পরিশুদ্ধ জীবনযাপন করে থাকেন। তাই দরবেশ শব্দের অর্থ দিয়ে যদি আমরা বাউল সাধনাকে বিচার করি তবে তা এক শুদ্ধাচারী সাধনার ধর্মকে ইংগিত করে।

আমরা বাউল সাধনার আচরিক দিক যদি বিশ্লেষণ করি, সেখানেও এই কথার সাক্ষ্য মেলে। সাধুসঙ্গ বাউল ধর্মের অতি আবশ্যিক এক ধর্মীয় আচার- যেখানে সকল কিছুকে ছাপিয়ে শুদ্ধ মতি, শুদ্ধ রতির সাধনা করা হয়।

বাউল ধর্মের দেহ সাধনা যুগল সাধনা মানে পুরুষ-প্রকৃতির যুগল সাধনা। কিন্তু তা শুদ্ধচারি। এই সাধনায় অমাবশ্যায় পূর্ণিমা যোগের তালাশ করে মনের মানুষের সাথে মিলিত হয়। কারণ লালন ফকির বলেছেন-

অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয়
সেই দিনে মহাযোগ উদয়।।

অর্থাৎ অমাবস্যা যদি কামের প্রতীক হয়, তবে পূর্ণিমা হচ্ছে প্রেমের প্রতীক। অর্থাৎ বাউল সাধকের কাম যখন প্রেমে পরিণত হয়। তখনই সেই মহাযোগ উদয় হয়। যে যোগে সেই পূর্ণচন্দ্র মনের মানুষ ধরা দেয়।

বাউল বস্তুবাদী। আর এই বস্তু হলো পিতৃধন। বস্তু রক্ষাই বাউল সাধনার সারাৎসার। বস্তু রক্ষার সাধনা হলো কামকে জয় করে প্রেমের পথে পরিচালিত হবার সাধনা। মদন রাজার আজ্ঞা ধারি হলেই পতন। তাইতো লালন ফকিরের সাবধান বাণী-

বারে বারে করিরে মনা
কামের দেশে আর যে না,
রেখ তেজের ঘর তেজিয়ানা
ঊর্ধ্ব চাঁদ ধরে।।

আর এ কারণেই হিতকরী’র নিবন্ধকারের ভাষ্য, ‘বাউল, সাধুসেবা ও লালনের মতে এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কোন শ্রেণিতে একটি গুহ্য ব্যাপার চলিয়া আসিতেছে লালনের দলে তাহাই প্রচলিত থাকায় ইহাদের সন্তান জনমের পথ একেবারে রুদ্ধ।

‘শান্ত রতি’ শব্দের বৈষ্ণব শাস্ত্রে যে উৎকৃষ্ট ভাব বুঝায়। ইহারা (সাধুসেবা নামে পরিচিত সম্প্রদায়ের অনুসারীগণ- লেখক) তাহা না বুঝিয়া অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ইন্দ্রিয় সেবার রত থাকে। এই জঘন্য ব্যাপারে এ দেশ ছারেখারে যাইতেছে, তৎসম্বন্ধে পাঠকবর্গকে বেশি কিছু জানাইতে স্পৃহা নাই।’

হিতকরীর’ ভাষ্যে এটা প্রমাণ হচ্ছে যে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে ‘শান্ত রতি’ নামে যে সাধনা আছে তা লালনের সম্প্রদায়েও প্রচলিত থাকার অনুমান হিতকরী’র নিবন্ধকারের। ‘শান্ত রতি’ হচ্ছে নিষ্কামী, নির্বিকারী শুদ্ধাচারী দেহ সাধনা। এই সাধনায় কামকে পরাজিত করে রতিকে রক্ষা করতে হয়।

প্রাণায়ামের মাধ্যমে জলন্ত অগ্নিকে প্রেমের জলে জ্বাল দিয়ে শুদ্ধরতিতে রূপান্তরিত করতে হয়। লালন ভাব শিষ্য পাঞ্জু শাহ্ তাঁর ‘ছহি গওহর এক্সে ছাদেকী’ গ্রন্থে সাধনার এই প্রকৃয়াকে ‘পানি দিয়ে অগ্নি জ্বাল’ করার পন্থা বলেছেন।

প্রশ্ন আসতে পারে পানি দিয়ে অগ্নিজ্বাল কিভাবে সম্ভব? এটাই সাধনার সারাৎসার। কামরতি অগ্নি স্বরূপ। প্রাণায়ামের জল দিয়ে এই কামরতিকে ক্রমাগত জ্বাল দেবার ফলে তা প্রেমের মিছরিতে পরিণত হয়।

তখন তার নাম হয় ‘শান্ত রতি’ জ্বলন্ত কামরতি যখন শান্ত রতিতে পরিণত হয়- তখন প্রেমের ভাবে দেহমন গৌর বরণ ধারণ করে। কিন্তু হিতকরী’র ভাষ্য মতে, লালন ফকিরের সমকালে ‘শান্তরতি’র নামে নানা ধরণের ব্যভিচার প্রচলিত ছিল।

আর বলাই বাহুলো যে, এই স্খলিত সাধনার ধারা এতোটাই সংক্রামিত হয়েছিল যে সমাজে তা মহামারি আকার ধারণ করেছিল। যার কারণে হিতকরী’র নিবন্ধকারের উচ্চারণ, ‘এই জঘন্য ব্যাপারে এ দেশ ছারেখারে যাইতেছে, তৎসমন্ধে পাঠকবর্গকে বেশি কিছু জানাইত স্পৃহা নাই।’

সেই অকৈতব সাধনার ধারা যাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল- তারা লালন ফকিরের অনুসারী নয়। কারণ লালন ফকিরের সাধনার ধারা হচ্ছে শুদ্ধ প্রেমরসের ধারা।

লালন ফকির তাই বলেছেন-

শুদ্ধ প্রেমিক রসিক বিনে
কে তারে পায়।।

তারপরও সমাজের অনেকেই যারা এই কচাদারী সাধনার ধারার সাথে সম্পৃক্ত ছিল হয়তো লালন ফকিরের শিষ্য বলে নিজেদের প্রচার করতো। তাইতো হিতকরী’তেই নিবন্ধকার বলেছেন, ‘শিষ্যদিগের ও তাহার সম্প্রদায়ের এই মত ধরিয়া লালন ফকিরের বিচার হইতে পার না। তিনি এ সকল নীচ কার্য্য হইতে দূরে ছিলেন ও ধর্ম-জীবনে বিলক্ষণ উন্নত ছিলেন বলিয়া বোধ হয়।’

অর্থাৎ অনেক ঝুটা মানুষই লালন ফকিরের শিষ্য বলে নিজেদের হয়তো প্রচার করতো। নইলে নিবন্ধকার কেনো এ কথা বলবেন? আবার নিবন্ধকারের এই ভাষ্যে অনেকেই ধারণা করতে পারেন যে লালন ফকিরের সম্প্রদায়েও হয়তো সেই ধরনের কদাচারি সাধনার ধারা প্রচলিত ছিল।

কিন্তু আমাদের মত হলো, লালন ফকিরের সম্প্রদায়ে এই ধরনের কোনো রকম কদাচারি সাধনা বিদ্যমান ছিল না বা এখনো নেই। লালন ফকিরের ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে হিতকরী যেমন উন্নত ধারণা পোষণ করেছে। একি কথা আমরা শুনতে পাই কাঙাল হরিনাথের বয়ানে।

তিনি তাঁর বহ্মাণ্ডবেদে লালন ফকির সম্পর্কে লিখলেন, ‘নূরনবী হজরত মুহম্মদের পরে মুসলমান কুলে আর কোনো ভক্ত জন্মগ্রহণ করেন নাই, কেহ পাছে এরূপ মনে করেন। সেই আশঙ্কায় আমরা বলিতেছি যে, মুহম্মদের পরে অনেক ভক্ত মুসলমানকুল পবিত্র করিয়াছেন।

অনেক ভক্ত ফকিরের বৃত্তান্ত অনেকেই অবগত আছেন। …নদীয়া জেলার অন্তর্গত কুষ্টিয়া বিভাগের নিকটবর্তী ঘোড়াই গ্রামে লালন সাঁই নামে যে ফকির বাস করেন, তিনিও পরম যোগী। তাঁহার গুরু সিরাজ সাঁই সিদ্ধযোগী ছিলেন।’

সুতরাং লালন ফকির সম্পর্কে হিতকরী’র মন্তব্য বিষয়ে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ কারোরই থাকা সমীচীন নয়।

এখন প্রশ্ন আসে সাধুসেবার নামে যে কদাচার প্রচলিত ছিল। তার সাথে লালন ফকিরের শিষ্যদের সম্পর্ক কতটুকু ছিল? হিতকরী’র ভাষ্যে বলা হচ্ছে, ‘শিষ্যদিগের ও তাহার সম্প্রদায়ের এই মত ধরিয়া লালন ফকিরের বিচার হইতে পারে না।’

অর্থাৎ লালন ফকিরের সম্প্রদায়ে এবং তাঁর শিষ্যদের মধ্যে এই কদাচারি সাধনার ধারা প্রচলিত ছিল। আমরা হিতকরী’র এই মতের সাথে একমত নই। কারণ লালন ফকিরের সম্প্রদায় মানেই দরবেশি বাউল সম্প্রদায়- যেটা আমরা লালন শিষ্য দুদ্দু শাহের জবানে জেনেছি।

দরবেশি বাউল সম্প্রদায়ে কখনোই এইরূপ কদাচারী সাধনার ধারা প্রচলিত ছিল না। লালন ফকিরের সাধারণ শিষ্যদের হাত থেকে লালন ফকিরের পথ-মত এবং আখড়াকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন তারা।

লালন ফকিরের জীবদ্দশায় সাজা বাউল বা বিপদগামী তথাকথিত বাউল লালন ফকিরের পথ-মতকে কলঙ্কিত যেমন করতে পারেনি। তেমনি লালন ফকিরের দেহত্যাগের পরও তাঁর প্রকৃত শিষ্যদের দ্বারা তাঁর পথ-মত সত্যিই সত্য-সুপথে পরিচালিত হয়েছে।

লালন ফকিরের একনিষ্ঠ এই সব ভক্তদের দ্বারা তাঁর পথ-মত যে রক্ষা পাবে তা হিতকরীও বিশ্বাস করতো। হিতকরী’র ভাষ্যে বলা হলো, ‘শিষ্যদিগের মধ্যে শীতল, মহরম সা, মানিক সা, ও কুধু সা প্রভৃতি কয়েকজন ভালো লোক আছেন। ভরসা করি, ইঁহাদের দ্বারা তাঁহার (লালন ফকিরের- লেখক) গৌরব নষ্ট হইবে না।’

ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই এঁদেরই উত্তরসাধক। তাই এই অবক্ষয়ের সময় আমরা যখন সাজা বাউল, গায়ক বাউল এবং সাধক বাউলের তফাৎ না বুঝে রালন ফকিরের কয়েকটি গান জানা অজ্ঞানীজনের জীবনাচার এবং বিশ্বাসকে লালন ফকিরের পথ-মত বলে ভুল করছি।

তখন মনে হয় সময় এসেছে লালন ফকিরের সত্য-সুপথের শুদ্ধাচারী সাধনার সন্ধানে মনোরঞ্জন গোঁসাইয়ের মতো শুদ্ধাচারী বাউল সাধনার পণ্ডিত ও সাধক ব্যক্তিদের অনুসরণীয় পথকে অনুসরণ করে বাউল পথ-মতকে সত্য ভাবে জানা এবং মানা।

নইলে মিডিয়ায় সাজা বাউলদের আজগুবি আচার-বিচার এবং ভ্রান্ত বাত-চিতকে সত্য মেনে লালন ফকিরের পথ-মত সম্পর্কে ভুল বার্তা নিয়ে সেই কলঙ্কিত বাউল সাধনার ধারা লালন ফকিরের সত্য-সুপথের শুদ্ধাচারী সাধনার ধারা হুমকির মুখে পতিত হবে।

এবং যথার্থ অর্থেই ‘তথাকথিত বাউল সাধানার কলঙ্ক’ হয়তো আবার ফিরে আসতে পারে। এখনই সময় সত্যকে জানার এবং সত্যকে জানাতে হলে শুদ্ধাচারী সাধকের জীবনাচারকে জানতে হবে, অনুসরণ করতে হবে তাঁদের সধনার পথকে।

(সমাপ্ত)

……………………………….
আরো পড়ুন:
মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -এক

মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -দুই
মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -তিন

ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই
আমার দেখা কবিরাজ গোঁসাই
আমার পিতা ভক্ত মনোরঞ্জন গোঁসাই ও তাঁর দর্শন

মরমী সাধক মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী

……………..
আবু ইসহাক হোসেন: লালন গবেষক

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!