ইবাদত

রমজান: সংযমের সাধন :: দুই

-মূর্শেদূল মেরাজ

রমজান: বাতেন

‘জল পড়ে পাতা নড়ে’- শব্দগুলো পড়ে ‘অতি সাধারণ চিন্তা’র মানুষের মধ্যে হয়তো তেমন কোনো ক্রিয়া হবে না। ‘সাধারণ চিন্তা’র মানুষ হয়তো কল্পনায় জল পড়ছে পাতা নড়ছে এসব ভাবনা ভাবতে যাবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত জন এর অর্থ ছন্দ ঠিক আছে কিনা, এটি কোন কারকে কোন বিভক্তি তা নিয়ে ভাবতে পারে। বা কে বলেছে-কেনো বলেছে-কোন প্রসঙ্গে বলেছে-সমকালীন কিনা তা অনুসন্ধান করতে পারে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

শিক্ষার্থীরা হয়তো এর ভাবসম্প্রসারণ করবে; অধিক নাম্বারের আশায় বিভিন্ন জ্ঞানীগুণীজনের কোটেশন দিয়ে পরীক্ষার খাতার পাতা ভরিয়ে তুলবে। ভাবুক জন জল পাতার তরঙ্গে কল্পনার আকাশ রাঙিয়ে তুলবে। শিল্পানুরাগী হয়তো আরেকটু এগিয়ে এর ভাবে ডুবে যাবে। হয়তো এর থেকেই নতুন কোনো শিল্প সৃষ্টির নেশায় মত্ত হয়ে উঠবে।

ভাষা ধ্বনি নিয়ে যারা কাজ করেন তারা হয়তো শব্দের প্যারামিটার মেপে মেপে এর ভুল-ত্রুটি বা যথার্থতা নিয়ে ভাববেন। শব্দের শাব্দিক অর্থ নিয়ে যারা গভীরে ভাবেন তারা হয়তো শব্দগুলোর সংখ্যাতত্ত্ব-নান্দনিকতা-শিল্পের উৎকর্ষতা নিয়ে আলোচনা করবেন।

যে যার মতো করে ভাববে বা বলা যায় যেমন বিচরণ ক্ষেত্রে; সে তার সেই গণ্ডিতে ভাববে এটাই স্বাভাবিক। এতে দোষের কিছু নেই। বরঞ্চ এটাতেই মানুষ বেশি অভ্যস্ত ও সাচ্ছন্দ বোধ করে থাকে। তবে এই বাঁধাধরা ছকেই ভাবনার সমাপ্তি টানতে হবে বা একই ভাবনার পথকেই বারবার পুনরাবৃত্তি করতে হবে এমনো কোনো কথা নেই।

প্রত্যেকেই তার প্রয়োজন ও জ্ঞান-বুদ্ধি-বিচার-বিবেচনার দ্বারাই চিন্তা করবে। সেই ভাবনা থেকে প্রাপ্তবস্তু কেউ মনে নিবে-কেউ মেনে নেবে-কেউবা পূর্ব নির্ধারিত উত্তর সন্তুষ্ট না হয়ে ভাবনার নতুন পথ খুঁজতে চাইবে। পৌঁছাতে চাইবে মূল সত্যে। আর এইভাবেই জন্ম হয় সাধকের। জন্ম নেয় সাধুভাবনার।

প্রকাশ্যে যা কিছু প্রচারিত সর্বজনের জন্য, সাধক তা থেকেই নিংড়ে নিতে চায় গুপ্ত তত্ত্ব। সেই তত্ত্ব জ্ঞান, যা সুপ্ত অবস্থায় প্রকাশ্যের মাঝেই গোপনে অবস্থান করে।

যিনি সাধক-যিনি ব্রহ্মাণ্ড জ্ঞানের সন্ধান করেন, তিনি সকলের মতো একই চোখে দেখেন কিন্তু ভিন্নতা থাকে দৃষ্টিতে-দৃষ্টিভঙ্গিতে। সে দেখে সাক্ষীরূপে-দ্রষ্টারূপে। কোনো কিছুতে মহিত হয়ে নয়। মায়া-মোহের বশে আসক্ত হয়ে নয়। ভয়ে-ক্রোধে নয়। সে দেখে ভক্তিতে-শুদ্ধতায়। অর্থাৎ প্রেমে।

যদি এমন কোনো সাধক এই ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ শব্দ কয়েকটিই দেখে বা পড়ে। তাহলে কিন্তু তিনি প্রচলিত পথে ভাবতে বা বুঝতে যাবেন না মোটেও। তিনি এই কয়েকটা শব্দের ভেতরেই অনুসন্ধান করতে শুরু করবেন ব্রহ্মাণ্ডের জ্ঞানকে।

তবে শব্দগুলো যদি নিছক সাহিত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে হয়। যদি কোনো কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী বা শিল্পানুরাগী কেউ খেয়ালের বশে তা লিখে থাকেন। তাহলে এতে খুঁজতে গেলে বিভ্রান্তিও ঘটতে পারে। তাই প্রকৃত সাধককুল নিজ দেহের বাইরে কেবল সিদ্ধপুরুষের বাণী বা বচনের গভীরতার সন্ধান করতে ডুব দেয়।

আর তা থেকে সাধক যে জ্ঞানের সন্ধান পায়। সেটাকেই আমরা সহজ প্রচলিত ভাষায় বলি ‘বাতেনি জ্ঞান’। এই বাতেনি জ্ঞান হাটেঘাটে মেলে না। মাইকে রাষ্ট্র করেও বলা হয় না। এই জ্ঞান প্রাপ্তির জন্য সাধককে যেমন তপস্যা-সাধন-ভজন করতে হয়। তেমনি এই জ্ঞান বুঝতে হলে অনুরাগীকে রীতিমতো নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। সাধ্য সাধনা করতে হয়।

অল্পে যারা উত্তেজিত হয়ে উঠে, তাদের জন্য এই জ্ঞান নয়। যারা ভাবনার গভীরে প্রবেশ করতে পারে বা করতে চায়, এই জ্ঞান কেবল তাদের কাছেই ধরা দেয়। আর এই ভাব বা বস্তুর মাঝে লুকায়িত জ্ঞানই হলো বাতেনি জ্ঞান। তবে এ কথাও ঠিক বাতেনি বুঝতে হলে জাহেরি বোঝা জরুরী। কারণ মূলে পৌঁছাতে গেলে ভাব ও বস্তুকে চিনতে হয়। ফকির লালন সাঁইজি বলছেন-

আগে শরিয়ত জান বুদ্ধি শান্ত করে।
রোজা আর নামাজ শরিয়তের কাজ
ঠিক শরিয়ত বলছ কারে।।

রোজা নামাজ হজ কালেমা যাকাত
তাই করিলে কি হয় শরিয়ত
বলো শরা কবুল কর রে;
ভাবে জানা যায়, কলমা শরিয়ত নয়
শরিয়তের অর্থ কিছু থাকতে পারে।।

রে-ফের বেইমান যারা
শরিয়তের আঁক চেনে না
শুধু মুখে তোড় ধরে;
চিনতো যদি আঁক, অদেখা নিয়াত
নিয়ত বাঁধতে না কভু বর্জোখ ছেড়ে।।

শরিয়তের গম্ভু ভারি
যে যা বোঝে সে ফল তারি
হয় আখেরে;
লালন বলে মোর, ভক্তিহীন অন্তর
মারি অস্ত্র মূলে, লাগে ডালের পরে।।

বাতেনি বুঝতে গেলে যেমন জাহেরি বুঝতে হয়। তেমনি জাহেরি বা শরিয়ত বুঝতে গেলেও মারফতের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তবেই শরিয়তের মূল ভাব অনুধাবন করা যায়। নয়তো লালনের ভাষাতেই বলতে হয়, ‘মারি অস্ত্র মূলে, লাগে ডালের পরে’।

রমজানের জাহেরি বা প্রকাশ্য বিষয়গুলো সহজ ভাষায় গতপর্বে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। এবারের আলোচনা ‘রমজান’-এর বাতেনি তত্ত্ব। তবে সমস্যার বিষয় হলো, বাতেনি মত বা তত্ত্ব প্রকাশ্যে বলার বিধান নেই। এর জন্য ভাষায় ব্যবহার করতে হয় পর্দা-ইশারা-রূপক। এটাই এর বিধান।

পর্দা-ইশারা-রূপক ব্যবহার করলেও জ্ঞানীরা তাদের নিজ নিজ জ্ঞানের স্তর অনুযায়ী তা ঠিকই আচ্ করে নিতে পারে। তাতে সমস্যা হয় না। আর তাদের জন্যই এই ইশারা। যে যতটা ডুবেছে এই জ্ঞানে তার কাছে ততটাই অর্থ ধরা দেয়। খানিক ডুবে, গভীর জলের খোঁজ পাওয়া যায় না। গুরুকৃপা না করলে সেই সাধ্য কারো হয় না।

প্রকৃতপক্ষে রমজান কিন্তু শুধু রোজাতেই সীমিত নয়। তার সাথে জড়িয়ে আছে ইফতার, সেহেরি, তারাবীহ, ইতেকাফ, শবেকদর, ঈদ ইত্যাদি বিষয়গুলো। আর এসব বিষয় যিনি নতুনরূপে তার অনুসারীদের পালন করার জন্য প্রবর্তন করেছেন সেই নবী মোহাম্মদও রয়েছেন জড়িয়ে এর মাঝে।

নবী মোহাম্মদ চৌদ্দ’শ বছর আগে কি নতুন বিধান দিয়ে গেছেন তার অনুসারীদের কাছে? শুধু প্রচলিত নিয়মের কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত? কলেমা পড়লে, নামাজ-রোজা আদায় করলে, হজ পালন করলে আর যাকাত দিলেই কি সর্ব সাধন সিদ্ধ হয়ে যাবে? নাকি আরো কিছু বলেছেন নবী?

নাকি এই সকল সাধন-ভজনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অব্যক্ত সব সাধন? নবীজি যা বলেছেন তারই অতলে আছে অনন্ত সাধন?? ফকির লালন সাঁইজি এখানে বলছেন-

কী কালাম আনিলেন নবী সকলের শেষে।
রোজা বন্দি সালাত যাকাত
পূর্বেও তো জাহের আছে।।

ঈসা মুসা দাউদ নবী
বেনামাজি নহে কভি,
শেরেক বেদাত সকল ছিল
নবী কি জানালেন এসে।।

ইঞ্জিল তৌরাত জব্বুর কিতাব
বাতিল হলো কিসের অভাব,
তবে নবী পয়গম্বর কী খাস
ভেবে আমি না পাই দিশে।।

ফোরকানের দরজা ভারি
কিসে হলো বুঝতে নারি,
তাই না বুঝে অবোধ লালন
বিচারে গোল বাঁধিয়েছে।।

ফকির লালন এখানে প্রশ্ন রাখছেন, নামাজ-রোজা-যাকাত আগেও বিভিন্ন নবীদের সময় প্রচলিত ছিল। তাহলে নবীজি কি আইন আনলেন নতুন করে তার অনুসারীদের জন্য? তবে কি গোপন কিছু রয়ে গেছে এইসবের আড়ালে? যা প্রকাশ্যে জারি করা থাকলেও সকলে তা ধরতে পারছে না?

নাকি সবই কল্পনা মাত্র?? কল্পনা ভেবে নিলেও প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। ‘নতুন কি আইন আনলেন মোহাম্মদ?’ আর এই মোহাম্মদের নতুন আইনে বুঝতে গেলে-আরব অঞ্চলের ভজন-সাধন-সাধনপ্রকৃয়া বুঝতে গেলে আরবের ইতিহাস, নবী-রসুলের সিলসিলা, ইসলাম, নবী মোহাম্মদ, সাহাবীবৃন্দ, নবীজির শেষ ভাষণ ইত্যাদি অনেক কিছুই বুঝতে হয়-জানতে হয়। না হলে সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে একটু কষ্টকর হয়ে পরে।

সে এক বিশাল কারবার। সে গভীরতায় না গিয়ে ‘রমজান’কে সাধারণভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক বরঞ্চ। তবে রমজানকেও এককভাবে বোঝা কঠিন। রমজানের স্বরূপ বুঝতে গেলে প্রথমে শবে কদরের মহিমা বুঝতে হবে। আর শবে কদরকে বুঝতে গেলে শবে মেরাজশবে বরাতকে বোঝা আবশ্যক। কারণ এ সবই সাধনার ধারাবাহিকতা মাত্র।

বড়পীর আবদুল কাদির জিলানী বলেছেন, ‘পানাহার এবং যা কিছু করলে সিয়াম ভঙ্গ হয় তা করা থেকে বিরত থাকা শরিয়তের বিধান মতে সিয়াম। অপর পক্ষে হারাম, কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসা ও নিষেধ হওয়া সব কাজ থেকে বিরত থাকাই তরিকতের সিয়াম। নিষেধ হওয়া কাজে তরিকতের সিয়াম নষ্ট হয়ে যায়। শরিয়তের সিয়াম নির্দিষ্ট সময়ের জন্য; কিন্তু তরিকতের সিয়াম আজীবন সর্বক্ষণ।’

হজরত জুনাইদ বোগদাদী বলেছেন, ‘রোজা তরিকতের অর্ধাংশ। মানুষ তার ইন্দ্রিয় অর্থাৎ চোখ, কান, নাসিকা, জিহবা, ত্বক ইত্যাদি দ্বারা নেক ও পাপ কাজ করতে পারে। এ ইন্দ্রিয়গুলো আল্লাহর আনুগত্য ও নাফরমানির জন্য সমান উপযোগী। মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে সে নিজ ইন্দ্রিয়গুলো নিয়ন্ত্রণে রেখে তা ইলম, আকল ও রুহের মাধ্যমে ব্যবহারের চেষ্টা করবে কিংবা নফসের কামনা-বাসনার ওপর ছেড়ে দেবে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য রোজা পালনের চেয়ে উত্তম কোনো উপায় নেই।’

সুফি সাধক হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া বলেছেন, ‘রোজা আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে একটা রহস্য। যে ব্যক্তি রমজানের আগমনে সন্তুষ্ট হয়, আল্লাহ তাকে সারাবছর সন্তুষ্ট রাখেন এবং তার কর্মে বরকত দান করেন। আর যে ব্যক্তি রমজান মাসের বিদায়ে অন্তরে ব্যথা অনুভব করে, আল্লাহ তাকে ইহকাল ও পরকালে সৌভাগ্যবান করেন এবং সে কখনও দুঃখিত হবে না। …রমজান মাস এক অত্যাশ্চর্য মাস। সারা মাসটিতে রয়েছে শুধু বরকত আর রহমত। রমজান ছাড়া বছরের এগারোটি মাসে যে পরিমাণ করুণা ও বরকত নাজিল হয়, সেই সমপরিমাণ বরকত নাজিল হয় রমজান মাসের প্রতিটি দিনে। রমজান মাসে রোজা পালন করলে সারা বছর ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায় এবং অগণিত পাপ আমলনামা থেকে মুছে যায়। তিনি বলেন, রমজানের শেষ দশ দিনের মধ্যে শবেকদর হয়। এ রাতের নেয়ামত সব রাতের মধ্যে একত্র।’

খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতী তার প্রধান খলিফা কুতুবুদ্দিন কাকীর উদ্দেশ্য পত্রে উল্লেখ করেন- “মহানবী বলেন হে ওমর, রোজা শুদ্ধতার অর্থ হচ্ছে মানুষ তার অন্তর বা অন্তর থেকে সর্বপ্রকার দ্বিন ও দুনিয়ার আশা আকাঙ্খা দূরীভূত করবে। কারণ দ্বিনের খাহেশ, যেমন-বেহেশতের আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও হুরের আকাঙ্খা-আবেদ ও মাবুদের মাঝে পর্দার অন্তরাল সৃষ্টি করে। এ রকম আকাঙ্খা বিদ্যমান থাকাবস্থায় বান্দা কখনো তার মাবুদরে মর্মের নৈকট্য লাভ করতে পারে না।

অপরদিকে দুনিয়ার খাহেশ হলো- ধন-দৌলত, শান-শওকত, ক্ষমতার দম্ভ, নফসের খাহেশ ইত্যাদি জাগতিক বিষয়াদির আকাঙ্খা মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে নেয় এবং এগুলো একেবারে শিরক। গায়রুল্লাহর প্রতি খেয়াল ও চিন্তা করা- কেয়ামতের ভয়, বেহেশতের আশা ও আখেরাত সম্পর্কে চিন্তা করা- এ সবগুলোই রোজা শুদ্ধতা নষ্ট করে।

রোজা শুদ্ধতা তখনই সঠিক হবে যখন মানুষ আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছু অন্তর থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। যাতে গায়রুল্লার এলম পর্যন্ত থাকে না এবং সব রকমের আশা ও ভয় অন্তর থেকে দূরীভূত করে।”

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের প্রথমটি ‘কলেমা’ ; যা জেনে-বুঝে বিশ্বাস করে পথচলা শুরু করতে হয়। অর্থাৎ সাধনার শুরুতেই তা করতে হয়। আর অপর তিন স্তম্ভ- নামাজ, যাকাত, হজ ইত্যাদিতে স্বাক্ষী পাওয়া যায়। এগুলো শরিয়ত মতে আদায় করলে বা না করলে লোকে দেখতে পারে-জানতে পারে বুঝতে পারে। কিন্তু একমাত্র রোজাই হলো এমন ইবাদত যার স্বাক্ষী স্বয়ং সাধক নিজে। এর কোনো স্বাক্ষী নাই।

তাই রোজাকে অন্য সব ইবাদতের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। নিজের মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অনুভব করার বা স্রষ্টার সাথে ভাব বিনিময়ের সবচেয়ে উত্তম পথ হলো রোজা। যে সুযোগ রমজান মাসে সর্বাধিক। এই পুরোটা সময় সাধক কঠিন সংযম করে সকল প্রকার ভোগ-বিলাশ থেকে। স্বল্পাহার গ্রহণ করায় এই সময়কালে সাধকের মাঝে স্থিরতা যেমন বৃদ্ধি পায়; তেমনি মনোসংযোগ করার প্রেরণা লাভ করে।

স্রষ্টা বা পরম হলো সর্বোচ্চ শুদ্ধতার স্বরূপ। আর রোজার উদ্দেশ্য হলো যাবতীয় অশুদ্ধতাকে মন ও দেহ থেকে দূর করে শুদ্ধতার চর্চা করা। আর নিজে শুদ্ধ হতে শুরু করলেই সেই পরম বা স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে সাধক।

রোজায় ষড়রিপু অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য বিসর্জন দিয়ে অন্তরে সর্বদা স্রষ্টা বা পরমে ভক্তিভাব জাগ্রত রাখতে হয়। আর এখানেই হলো সংযম। এই ষড়রিপু সকল সময়ই দেহ-মনে জাগ্রত হওয়ার শঙ্কায় থাকে। সাধককে এই রিপুকে বশে রেখে সাধনায় মনোনিবেশ করতে হয়।

রোজার শিক্ষা হলো আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধিতা, ধৈর্য, ত্যাগ স্বীকার, সহমর্মিতা বোধসহ অসংখ্য সদগুণ সৃষ্টি করা। একই সঙ্গে সব ধরনের পপাচার থেকে বিরত থাকা।

সাধকের মনে যখন পরমকে প্রাপ্তি বা স্রষ্টা প্রাপ্তির বাসনা তীব্র হয় তখনই সে রোজার মর্ম সম্যক উপলব্ধি করতে পারে। রোজার মাধ্যমে সাধক তখন তার কু-প্রবৃত্তিকে নির্মূল করে জাগতিক ভোগবিলাস থেকে নিজেকে বিরত রাখে। রোজার কারণে প্রবৃত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রবৃত্তির কামনাকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণে রাখাই রোজার মর্ম। কিন্তু বুঝতে হবে প্রবৃত্তি কি?

রোজা পালনে যে সাধক কু-প্রবৃত্তিকে দমন করে স্রষ্টা লাভ করতে সক্ষম হয় সেই সফল। তার জন্যই রমজান শেষে খুশির ঈদ। মহানবী বলেন, আল্লাহ্ বলেছেন- ‘রোজা আমার জন্য এবং এর প্রতিদান আমি নিজেই।’ (বোখারী শরীফ ১ম খণ্ড পৃ-২৫৪)

“রোজা সম্পর্কে কিমিয়ায়ে সাআদাত গ্রন্থে ইমাম গাজ্জালী বলেছেন-

প্রকৃত রোজা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, রোজা পালনকারী তিন স্তরে বিভক্ত-
১. সাধারণ স্তরের রোজা।
২. মধ্যম স্তরের রোজা।
৩. উচ্চ স্তরের রোজা।

সাধারণ স্তরের রোজা:
সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী-সহবাস থেকে বিরত থাকিলে রোজার অবশ্য পালনীয় কাজ সম্পন্ন হয়। এটা সর্বনিন্ম শ্রেণীর রোজা। এ ধরনের রোজা প্রাণহীন দেহস্বরূপ। এটা সাধারণ লোকের রোজা। মহানবী বলেন- ‘এমন বহু রোজাদার আছে যাদের ক্ষুধা তৃঞ্চার কষ্ট ব্যতীত রোজা থেকে আর কিছুই লাভ হয় না।’

মধ্যম স্তরের রোজা:
সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থেকে রোজা পালন করাকে মধ্যম স্তরের রোজা বলে। ছয়টি বিষয়ে এই শ্রেণীর রোজার পূর্ণতা লাভ হয়-

১. চোখ দিয়ে যে সকল বস্তু দেখলে আল্লাহ ও মহানবীর দিক থেকে মন বিমুখ হয়ে যায় তা না দেখা।
২. অযথা ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে জিহ্বা ও মুখকে সংযত করে নিরব থাকা।
৩. অশ্লীল বাক্য শোনা থেকে কানকে বিরত রাখা।
৪. হাত-পা’কে মন্দ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখা।
৫. রোজার সময় রাতে পরিমিত আহার করা। মহানবী বলেন- ‘পরিপূর্ণ উদর আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক নিকৃষ্ট ভাণ্ডার।’
৬. ইফতারের পর রোজা কবুল হবে কিনা এই ভয় অন্তরালে রাখা।

উপরের ৬টি বিষয় মেনে রোজা রাখলে মধ্যম শ্রেণীর রোজা পালিত হয়ে যাবে যা পরবর্তীতে উচ্চ শ্রেণীর রোজার দ্বার প্রান্তে নিয়ে যাবে। এ সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন- ‘আমার বান্দা কেবল আমার জন্যই পানাহার স্ত্রী-সহবাস বর্জন করেছে। একমাত্র আমিই এর বিনিময় প্রদান করতে পারি।’

উচ্চ স্তরের রোজা:
সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার, পাপাচার ও পাপের কল্পনা থেকে বিরত থেকে সর্বক্ষণ ক্বালবে আল্লাহর জ্বিকির বা স্মরণে নিমগ্ন থেকে রোজা পালন করাকে উচ্চ স্তরের রোজা বলে। এটা উচ্চ শ্রেণীর মানুষের রোজা। আল্লাহ ও রাসূল ব্যতিত পার্থিব কোন বিষয়ে মন দিলেই রোজা এই স্তরের অন্তর ্ভুক্ত হবে না। এ সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন- ‘রোজা কেবল আমার উদ্দেশ্যেই রাখা হয় এবং আমি এর বিনিময় প্রদান করব।’ আল্লাহ আরো বলেন- কামনা-বাসনা দমনকারীদের আল্লাহ তার বিনিময়ে যা প্রদান করবেন তা অসংখ্য, অপরিমিত ও অসীম।”

ভারতবর্ষের বৈদিকযুগের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও জোর দেয়া হয়েছে প্রতি মাসে অন্তত দুইবার উপবাস থাকার। প্রতি পনের দিন পর পর একদিন উপবাস থেকে শরীরকে সঠিকভাবে চালানোর এই বিধি কেবল শারীরিক সুস্থতার জন্যই নয়। মানুষিক সুস্থ্যতাও এর সাথে যুক্ত। চাঁদের এগারো তারিখে একাদশী ব্রত পালনের মাধ্যমে বিভিন্ন শারীরিক ও মানুষিক কাঠামোর মানুষের জন্য উপবাসের বিভিন্ন পন্থার কথাও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

ধারণা করা হয় এই বিধি আরো পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। কেবল সনাতন মতোবাদেই নয় অন্যান্য প্রায় সকল সাধনাতেই স্বল্পাহার বা উপবাসের বিধান পাওয়া যায়। অবশ্য বিভিন্ন অঞ্চলভেদে জলবায়ু ও মানুষের গঠনের উপর ভিত্তি করে উপবাসের নিয়মের তারতম্য রয়েছে।

দেহ ও মনকে কেন্দ্রীভূত করতে সাধকরা সাধনকালে সর্বসময়ই স্বল্পাহারি হয়ে থাকে। অধিক ও রসনাপূর্ণ খাবার গ্রহণে দেহ ও মনে অবসাদ বাসা বাঁধে এতে সাধনকার্য সুচারুরূপে করা কঠিন হয়ে পরে।

ঋষি পতঞ্জলী তার অষ্টাঙ্গ মার্গে যে বিধি বর্ণনা করেছেন। তার প্রথম দুটি হলো যম ও নিয়ম। মূলত এই দুটি পালন করতে পারলেই পরবর্তী ছয়মার্গে সাধক প্রবেশ করার অধিকার লাভ করে। আর এই দুই মার্গেই হলো কিছু আচার মানা। যা মূলত সাধকের নিজের প্রতি ও অপরের প্রতি আচরণের শুদ্ধতা রচনা করে।

এই দুই মার্গে পাঁচটি পাঁচটি করে মোট দশটি বিধি আছে। প্রথম মার্গ যমের বিধি- অহিংসা, সত্য, আচৌরি, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ। অর্থাৎ- কারো প্রতি বা কোনোকিছুর প্রতি বিরূপ মনোভাব না পোষন করা, সদা সত্য বলা, অন্যের অধিকার আছে এমন কোনো কিছু শারীরিক বা মানুষিকভাবে না বলে গ্রহণ না করা, রতি স্খলন না করা-জননিন্দ্রীয়কে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু মানুষিক বা শারীরিকভাবে গ্রহণ না করা।

আর দ্বিতীয় মার্গ নিয়মের বিধি- শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রণিধান। অর্থাৎ বাহ্যিক ও মানসিক শুচিতা, বাহ্যিক ও মানসিক সন্তুষ্টি, নিজকে পড়া, সহ্যশক্তি বা সহনসীলতা এবং পরমের প্রতি বিশ্বাস-সমর্পন-আস্থা-ভক্তি।

সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে দেখলে দেখা যাবে আরবের নবী মোহাম্মদ মুসলমানের পেয়ারা নবী হজরত তার অনুসারীদের রোজা বা সিয়ামরূপে যে ইবাদত দিয়েছেন। তার মধ্যে একত্রে এই দশবিধিই রয়েছে। আর এটা একটানা বিরতিহীনভাবে একমাস করতে হয় বলে সাধক একটা পূর্ণ সময় পায় সবগুলো বিধি পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে।

তবে আরো গভীরে ডুবলে জানা যায়, প্রকৃত সাধকদের কলেমা-নামাজ-রোজা-হজ-যাকাত সর্বক্ষণই চলমান থাকে। তারা প্রতি দমে সাধনা করে। লগ্ন-ক্ষণ-যোগ-কাল তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের ইবাদত চলে সর্বক্ষণ-অবিরত। বিরামহীন এই সাধনাই সাধকের মনোস্থিতি সকল পরিস্থিতিতে স্থির রাখতে সহায়তা করে।

কলেমা অর্থাৎ পরমের প্রতি বা নিজের প্রতি বিশ্বাস করেই তারা শুরু করেন সাধনা। দমেদমে চলে দায়েমী সালাত। জীবনের প্রতিটি নি:শ্বাসে শুদ্ধতার চর্চা ও পাপাচার-পাপচিন্তা থেকে মুক্ত থেকে পরমের ভাবনায় রত থেকে আদায় করেন সিয়াম। জীবনের যা কি অর্জন তা দান করে দিয়ে প্রতিক্ষণেই পালন করেন যাকাত। এভাবেই চলে হজব্রতও।

(চলবে…)

………………………………….
আরো পড়ুন:

রমজান: সংযোমের সাধন:: এক
রমজান: সংযোমের সাধন:: দুই
রমজান: সংযোমের সাধন:: তিন
মানুষের জন্য সিয়াম: এক
মানুষের জন্য সিয়াম: দুই

শবে বরাত: নাজাতে ফিকির
শবে মেরাজ: ঊদ্ধলোকের রহস্যযাত্রা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!