ভবঘুরে কথা
বেণীবাধব ব্রহ্মচারী

-শ্রী সুভাষ চন্দ্র বর্মণ

দীর্ঘ তিন বছর বেণীমাধবসহ লোকনাথ পর্বত আরোহণের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে অবস্থান করেন। এর ফলে তাঁদের শরীরের চর্ম বরফের সংস্পর্শে সাদা ও পুরু হয়ে যায় অর্থাৎ শুভ্র চর্মচ্ছেদ গঠিত হয়, যা দেখতে বরফের ন্যায় সাদা। শীত তখন কঠিন চর্মস্তর ভেদ করে দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। এক কথায় বেণীমাধব ও লোকনাথের শরীর এখন বরফ প্রুফ।

এবার বেণীমাধব ও লোকনাথের যাত্রাপথ মরু অঞ্চলের উদ্দেশ্যে বের হওয়া। কিন্তু বাঁধা পরল। কাশীধঅমে হিতলাল মিশ্র তাঁদেরকে বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনবোধে আমিই তোমাদের খোঁজ করে নেব।’ ঐ সময় হিতলাল মিশ্র বদরিকা আশ্রমে উপস্থিত হলে সকলেই আনন্দিত হলেন। বেণীমাধব ও লোকনাথের অনুরোধে হিতলাল মিশ্র ঠাকুর বদরিকা আশ্রমে তিন বছর অবস্থান করেন। বেণীমাধব ও লোকনাথ বদরিকা আশ্রমে মোট ছয় বছর অবস্থান করেন। অবশেষে সর্বশেষ বহির্বাসটুকু পর্যন্ত ত্যাগ করে তাঁরা হিমালয়ের এক সু-উচ্চ শৃঙ্গাস্থিত বরফরাশির উপর আরোহণ করেন। সুমেরু অভিযান শুরু হলো।

বেণীমাধব, লোকনাথ ও হিতলাল মিশ্র ঠাকুর নিদ্রা ও ক্লান্তি সবই জয় করেছেন। তাঁরা যে পথে চলছেন তা কোথাও বরফ বিরল প্রস্তরময়, আবার কোথাও গভীর বরফে আবৃত। কদাচিৎ প্রয়োজন হলে প্রস্তুরভেদী কিঞ্চিৎ কন্দমূল (মানকচুর গোড়ার অংশের ন্যায়, এর দৈর্ঘ্য দু’হাত পর্যন্ত হয়। ভিতরের অংশ দেখতে ও খেতে শাক আলুর ন্যায়) আহার করলে তাঁদের ক্ষুধা নিবৃত্তি হতো। এভাবে বরফে চলতে চলতে তাঁরা (অর্থাৎ তিনজন) তিব্বত ও সাইবেরিয়া অতিক্রম করে উত্তর মহাসাগরে উপস্থিত হন।

বরফের বিরাম নেই, বেণীমাধব, লোকনাথ ও হিতলাল মিশ্রের চলার বিরক্তি নেই। তাঁরা সুমেরুর উদ্দেশ্যে প্রায় দম বছরকাল ক্রমাগত উত্তর দিকে চলতে চলতে অবশেষে এমন এক স্থানে গিয়ে উপনীত হলেন যে স্থানে সূর্যের উদয়াস্ত নেই, নিরন্তর নিবিড় অন্ধকারে সমাবৃত। যাবার সময় তাঁরা মানস সরোবরের তীরে যেয়ে উপস্থিত হন। এই মানস সরোবর আমাদের তিব্বত দেশীয় মানস সরোবর নয়। উহা পৃথিবীর উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। শাস্ত্রে ইহা ‘উত্তর মানস’ নামে পরিচিত। তাঁরা অন্ধকারময় দেশ চলতে চলতে শেষে আর অগ্রসর হতে পারেননি। এই তমসাবৃত দেশে কিছুকাল থেকে তাঁদের দৃষ্টিশক্তির এমন এক আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটলো যে, তাদের তাঁরা বিড়ালের ন্যায় অন্ধকারেও স্পষ্টরূপ দেখতে পান।

ঐ সময় তাঁদের গায়ে কোন আবরণ ছিল না। সম্পূর্ণ উলঙ্গ ছিলেন। কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায় তাঁদের গায়ের উপর শ্বেতবর্ণ এমন এক চর্মাবরণের সৃষ্টি হয়। যার ফলে শীতের অসহ্য কষ্ট অনুভব করতে হয়নি। তাঁরা তখন যে দেশে ছিলেন সে দেশের অধিবাসীরা এক থেকে দেড় হাত লম্বা ছিলেন। বর্ণ সম্পূর্ণ শুভ্র। ওদের ভাষা বুঝতে পারেননি। আর অগ্রসর হতে না পারায় তাঁরা সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন। ফিরে আসতেও ১০ বছরকাল কাটলো। পৃথিবীর যে অংশে অবস্থান করেছিল হিন্দুশাস্ত্র ও ভারতীয় ভূগোলশাস্ত্র মতে তার নাম ‘ইলাবৃত বর্ষ’।

উত্তরাঞ্চল হতে তাঁরা প্রত্যাবর্তন করতে করতে সমতলে আসলেন। মেরু অঞ্চল হতে তাঁরা চীনদেশে আসলেন। সেখানে চীনের কারাগারে কিছুকাল কাটলো। চীনের রাজকর্মচারীগণ বুঝতে পারলেন যে তাঁরা সন্ন্যাসী, তাই তাঁদেরকে মুক্ত করে দিলেন। মুক্তি পেয়ে হিতলাল মিশ্র ঠাকুর লোকনাথকে বললেন, ‘তুমি নিম্নভূমিতে যাও সেখানে, তোমার কাজ রয়েছে।’ বেণীমাধবকে কামাখ্যাভিমুখে যেতে হবে। ইহা হিতলাল মিশ্র ঠাকুরের নির্দেশ ছিল।

লোকনাথ চিন্তা করলেন গুরু ভগবান গাঙ্গুলী কাশীধামে দেহত্যাগ করে বিদায় নিলেন। দীর্ঘদিন প্রায় ৩০ বছর বরফে থেকে গুরুদেব হিতলাল মিশ্রও বিদায় নিলেন। বেণীমাধবকে বললেন, ‘চলো ভাই আমরা দুইজন আরও কিছুদিন একসাথে কাটাই।’ তারই লোকনাথ বেণীমাধবকে চন্দ্রনাথ পাহাড় পর্যন্ত এনেছিলেন। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে কিছুদিন একসাথে অবস্থান করার পর বেণীমাধবকে বললেন- ‘বেণী তোকে ছাড়া আমার কষ্ট হবে কিন্তু আমার নিম্নভূমিতে কাজগুলি শেষ করতে হবেরে ভাই। গুরুকে উদ্ধার করা এবং মাকে খুঁজে বের করা। তুমি কামাখ্যায় যাও। তবে তুমি আমাকে যখন স্মরণ করবে তখনই আমাকে পাবে। তুমি চিন্তা করো না।

আমি তোমার সাথে থাকবো অভিন্ন আত্মারূপে।’ চোখের জলে বিদায় নিলেন আত্মার বন্ধন গুরুভাই বেণীমাধব। দীর্ঘ ১২৪/১২৫ বছর এক সাথে সুখ-দু:খের সাথী হয়ে রয়েছেন। একান্ত আপনজন। এতবড় উচ্চস্তরের মিলন আর হতে পারে না, পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। জগতের মঙ্গলের জন্য তাঁরা যে আত্মত্যাগ করে গেলেন যতদিন পৃথিবী থাকবে সেই ইতিহাস নিয়ে গবেষকরা গবেষণা করবে যুগ যুগ ধরে। গবেষণা কোনদিন শেষ হবে না। ধন্য গুরু ভগবান গাঙ্গুলী, হিতলাল মিশ্র (তৈলঙ্গ স্বামী), ধন্য লোকনাথ ও বেণীমাধব। তোমাদের ত্যাগের বিনিময়ে জগতের মঙ্গল বয়ে আনুক, শান্তি বর্ষিত হউক। মানুষ যেন সত্যের সন্ধান খুঁজে পায়।

ব্রহ্মাণ্ড মহাপুরুষ বেণীমাধব চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে গুরুর নির্দেশিত স্থান কামাখ্যায় চলে গেলেন। সেখান থেকে হৃষিকেশ। সম্ভবত দীর্ঘদিন হৃষিকেশে অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষ বেণীমাধব লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন। তাই তাঁকে নিয়ে গবেষণা কম রয়েছে।

শ্রদ্ধেয় শ্রীকেদারেশ্বর সেনগুপ্ত শ্রীশ্রীলোকনাথ মাহাত্ম্য গ্রন্থে তাঁর গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি প্রথমেই তাঁর শ্রীচরণে প্রণতি জানাই। তিনি বলতে চান যখন বেণীমাধব ব্রহ্মচারীর বয়স ১৮৩ বছর তখনও তিনি জীবিত আছেন। তাহলে সানটা ১৩২০ বঙ্গাব্দের কাছাকাছি ১৬ মাঘ (মাঘী পূর্ণিমা) উক্ত মহাপুরুষ কলকাতা নগরীতে পদার্পণল করে বঙ্গদেশকে কৃতার্থ করেছেন। এ সংবাদটি কিভাবে জানতে পারলাম সে সংবাদটি ভক্তদের জানাতে চাই।

বিগত ১৬ মাঘ ১৩২০ বঙ্গাব্দের মাঘী পূর্ণিমা ছিল। তার পূর্ব দিবস ১৫ মাঘ বঙ্গদেশের মহাতীর্থ কালীঘাটে, কালী করুণাময়ীর ভগ্ন মন্দিরে একজন মহাপুরুষ উপস্থিত হয়েছেন। মহাপুরুষের কাঞ্চনগৌর দেশশোভা আজানুলম্বিত সুললিত বাহুযুগল ব্রহ্মজ্ঞানোদ্ভাসিত স্মিত শান্তমূর্তি, শতাধিক বছরের তাঁর যোগসিদ্ধ দেহের অলৌকিক জ্যোতি:রাশি করুণাময়ীর আনন্দ মন্দির আলোকিত করেছিলেন। মহাপুরুষের কেশবিহীন শিরোভাগ শ্মশ্রুগুচ্ছ রেখা বিরহিত প্রদীপ্ত মুখমণ্ডল এবং লোকনাথের ন্যায় জীর্ণ অথচ জ্যোতির্ময় দেহষষ্ঠি তাঁর দ্বিশতবর্ষব্যাপী যোগ জীবন সূচিত করে। তাঁর নয়নদ্বয়ে পলক ছিল না, অঙ্গ সঞ্চালনে চঞ্চলতার লেশমাত্র ছিল না। মাহাপুরুষ ব্রহ্মানন্দময় অপরূপ ভাববিলাসে যেন করুণাময়ীর করুণাধারা উপচে পরছে।

১৬ মাঘ রাতে কালিয়াবেন্দা নিবাসী মহাত্মা সর্ববিদ্যাবংশীয় মাননীয় শ্রীযুক্ত ক্ষিতীশ ভট্টাচার্য্য মহাশয় সাধক প্রবর মধুসূদন ভট্টাচার্য্য আগমবাগীশ মহাশয়ের পুত্র ছিলেন। বিগত ২ চৈত্র ১৩২০ বঙ্গাব্দ তারিখে উক্ত ক্ষিতীশ চন্দ্র ভট্টাচার্য্য মহাশয় আমার নিকট বেণীমাধব ব্রহ্মচারী সম্বন্ধে যা বলেছেন, আমি তাই প্রকাশ করলাম। মহাপুরুষ বলেছিলেন- আমার বাড়ি বঙ্গদেশে ছিল। আমি ব্রাহ্মণ, বয়স ১৫০ বছরের অধিক হয়েছে।

তোমাদের বঙ্গদেশে যোগীর অভাব। কিন্তু আমাদের একজন যোগসিদ্ধ মাহাপুরুষ ঢাকা অঞ্চলের কোন এক স্থানে তাঁর জীবনের শেষভাগ অতিবাহিত করে নানারূপ অলৌকিক লীলা করে গিয়েছেন। ক্ষিতীশ ঠাকুর মহাশয় তৎক্ষণাৎ বাবা লোকনাথের নাম বলার সাথে সাথে তিনি চমকে গেলেন, বলছেন- “লোকনাথ আমার গুরুভাই। আমরা একই গুরুর শিষ্য। আমি যখন তাকে স্মরণ করি তখনই তিনি আমাকে দর্শন দেন।” সম্প্রতি হিমালয়ে উত্তরাখণ্ডে হৃষিকেশে আমার আশ্রম আছে। সাথে মাহারাষ্ট্রীয় একজন শিষ্য ছিলেন। তিনিও জটাজুটবিমণ্ডিত ব্রাহ্মণ ছিলেন।

বড় দু:খের বিষয় বেণীমাধব সম্পর্কে আর কিছু জানা যায়নি। তবে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বেণীমাধব ব্রহ্মচারী বাবা লোকনাথের গুরুভাই এবং মহাজ্ঞানী গুরু ভগবান গাঙ্গুলীর দ্বিতীয় শিষ্য। তিনিও শীঘ্রই বাহ্যলীলা সম্বরণ করবেন তাঁর শেষ উক্তি তারই ইঙ্গিত বহন করে। আজ বেণীমাধব সম্বন্ধে দু’একটি কথা বলতে পারায় নিজেকে ধন্য ও সৌভাগ্যবান মনে করছি। উল্লেখ্য, এই ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষের কোন ছবি সংগ্রহ করা যায়নি। তাতে ক্ষতি নেই। আমাদের অন্তরে উদ্ভাসিত হোক তাঁর দিব্যমূর্তি; তাঁর ব্রহ্মজ্ঞান আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে আমাদের আলোকিত করুক। জগত হয়ে উঠুক পরম শান্তির নিলয়।।

…………………………………………………………..
গ্রন্থসূত্র:
১. শ্রীশ্রীলোকনাথ মাহাত্ম্য -শ্রী কেদারেশ্বর সেনগুপ্ত।
২. শিবকল্প মহাযোগী শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী -শ্রীমৎ শুদ্ধানন্দ ব্রহ্মচারী।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!