শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী

শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী

-সাজ্জাদুর রহমান লিমন

উনবিংশ শতকের যোগীশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী আনুমানিক ১১৩৮ বঙ্গাব্দে তৎকালীন যশোর জেলা আর বর্তমানের চবিবশ পরগনা জেলার চৌরাশি চাকলা গ্রামে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রামনারায়ণ ঘোষাল এবং মাতা কমলাদেবী। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের ৪র্থ পুত্র।

আধ্যাত্মিক শক্তি : লোকনাথ ব্রহ্মচারী একজন ত্রিকালদর্শী, জাতিস্মর ও মুক্তপুরুষ ছিলেন। বহুকাল ধরে তপস্যা করবার পর বাবা লোকনাথ বুঝেছিলেন যে জীবে জীবে ঈশ্বর অধিষ্ঠান হয়ে আছেন। তাঁর প্রচারিত দর্শন ছিল স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় ‘জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ বাবা আরও বলেছিলেন- ‘তোদের ভগবানের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি-আমি দেখেছি আমাকে। আমি  বদ্ধ আছি কর্মে, কর্ম বদ্ধ আছে সংসারে, সংসার বদ্ধ আছে জিহ্বা আর উপস্থে- যে এই দুটিকে সংযম করতে পেরেছে সেই মুক্ত হয়েছে।’


বাবা লোকনাথের আধ্যাত্মিক শক্তি সম্বন্ধে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন, তিনি জাতিস্মর; দেহ হতে বহির্গত হতেন এবং অন্যের মনের ভাব অবলীলায় তিনি জানতে পারতেন। এছাড়াও, অন্যের রোগ নিজ দেহে এনে রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারতেন।

ভক্তদের তিনি ঐশী শক্তির মাধ্যমে ঈশ্বর ও ধর্ম সম্পর্কে যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তা অতুলনীয়। লোকনাথ ব্রহ্মচারী পাহাড়-পর্বতে, বনে-জঙ্গলে বহু ক্লেশ সহ্য করে যে ধন উপার্জন করেছেন, তা লোকালয়ে এসে সাধারণ মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। বাবা লোকনাথের আধ্যাত্মিক শক্তি সম্বন্ধে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন, তিনি জাতিস্মর; দেহ হতে বহির্গত হতেন এবং অন্যের মনের ভাব অবলীলায় তিনি জানতে পারতেন। এছাড়াও, অন্যের রোগ নিজ দেহে এনে রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারতেন।

সাধনা : সেই সময়কার মানুষের ধারণা ছিল কোনো এক পুত্রকে যদি সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করানো যায় তাহলে তার বংশ উদ্ধার হয়। সে জন্য রামনারায়ন তার প্রথম সন্তান থেকেই চেষ্টা করেছিলো প্রতিটি সন্তানকে সন্যাসী বানানোর জন্য। কিন্তু স্ত্রীর জন্য পারিনি। তবে চতুর্থ সন্তনের বেলায় আর সেটা হইনি। এ জন্য শ্রী রামনারায়ন লোকনাথকে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করানো জন্য ১১ বছরে উপনয়নের কার্য সমাপ্ত করে পাশ্ববর্তী গ্রামের জ্যোর্তিময় দেহধারী ভগবান গাঙ্গুলীর হাতে তুলে দেন। এ সময় লোকনাথের সঙ্গী হন তারই বাল্যবন্ধু বেনীমাধব। লোকনাথের নাম দিয়েছিলেন ভগবান গাঙ্গুলী নিজেই।


সেখান থেকে লোকনাথ ও বেনীমাধব বিভক্ত হয়ে যান। বেনীমাধবের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে লোকনাথ একা একা চলে আসেন কামাখ্যা হয়ে ত্রিপুরা জেলার দাউদকান্দি গ্রামে। সেখানে কোন এক সুভক্ষণে দেখা হয় ডেঙ্গু কর্মকারের সঙ্গে। ডেঙ্গু কর্মকারের বাড়ি কিছু দিন অবস্থান করার পর তারই সঙ্গে নারায়নগঞ্জের বারদীতে আসেন। সে সময় থেকেই “বারদীর ব্রহ্মচারী” হিসেবে লোকনাথ পরিচিতি পান।

ভগবান গঙ্গোপাধ্যায় লোকনাথ ও তাঁর বাল্যবন্ধু বেণীমাধব বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীক্ষাও উপনয়ন সংস্কার করে তাঁদেরকে নিয়ে পরিব্রাজন করতে হিমালয়ে চলে যান। তাঁরা হিমালয় ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন স্থানে পরিব্রাজন ও সাধনা করতে থাকেন।

দিনে দিনে গুরুর বয়স একশত বছর ও শিষ্যদের বয়স পঞ্চাশ বছর হলো। গুরুদেব ভগবান গাঙ্গুলী শিষ্য দুজনকে শ্রী তৈলঙ্গস্বামীর (হিতলাল নামে যিনি পরিচিত) হাতে তুলে দিয়ে পরলোক গমন করেন। এবার লোকনাথ ও বেনীমাধব সুমেরু থেকে চন্দ্রনাথ পর্বতে আসেন। সেখান থেকে লোকনাথ ও বেনীমাধব বিভক্ত হয়ে যান। বেনীমাধবের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে লোকনাথ একা একা চলে আসেন কামাখ্যা হয়ে ত্রিপুরা জেলার দাউদকান্দি গ্রামে। সেখানে কোন এক সুভক্ষণে দেখা হয় ডেঙ্গু কর্মকারের সঙ্গে। ডেঙ্গু কর্মকারের বাড়ি কিছু দিন অবস্থান করার পর তারই সঙ্গে নারায়নগঞ্জের বারদীতে আসেন। সে সময় থেকেই “বারদীর ব্রহ্মচারী” হিসেবে লোকনাথ পরিচিতি পান।

বারদীর আশ্রমের নাম প্রসিদ্ধ হলো এবং তীর্থ স্থান রূপে গণ্য হলো। “শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী” বাবার আশ্রমে প্রতিনিয়ত ভক্তের সমাগম বাড়তে থাকে এবং সাধারণ লোকজন ও অনেক জ্ঞানী-মহাজ্ঞানী, রাজা মহারাজারা বাবার দর্শন ও আশীর্বাদ এর জন্য আসতে থাকেন। একদিন ভাওয়ালের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় বাহাদুর লোকনাথ বাবার একটি ছবি তোলার অনুমতি চাইলেন। বাবা প্রশ্ন করেন যে তাঁর ছবি দিয়ে কি হবে। ভাওয়ালের রাজা বলেন যে তাঁর ছবি সাধারণ মানুষ এবং বাবার ভক্তদের প্রয়োজনে লাগবে, প্রতি ঘরে ঘরে পূজিত হবে। বাবা অনুমতি দেন এবং তিনি একটি মাত্র ছবি তোলেন। বাবার ঐ একখানি ছবি থেকেই তৈরী বাবার বিভিন্ন ছবি আজ আমরা দেখতে পাই এবং সংগ্রহ করি। বাবার কৃপায় অসংখ্য মানুষ উপকৃত হতে থাকেন। বাবার আশীর্বাদে ভক্তদের দুঃখ কষ্ট দূর হয়ে যায়, বাবার ভক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে, ঘরে ঘরে বাবার পূজো শুরু হয়।


“ওরে তোরা এত চিন্তায় কাতর হছিস কেন? আমি কি মরে যাব। কেবল এই জীর্ণ পুরাতন শরীরটা পাত হবে, কিন্তু আমি আছি , যেমন তোমাদের মাঝে ছিলাম, ঠিক তেমনই তোদের কাছেই থাকবো। আমার মৃত্যু নেই। তোরা ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে আমাকে একটু আদর করে ডাকলে দেখবি আমি তোদের কত কাছটিতে আছি, এখনও শুনছি , তখনও শুনব। এ কথা মিথ্যা হবে না। ”

দেহত্যাগ : মহাপ্রয়াণের কয়েকদিন আগে ভক্তদের কাছে প্রশ্ন করে বসেন – ” বল দেখি দেহ পতন হলে কিরূপ সৎকার হওয়া ভাল ? ” এবং ভক্তদের অগ্নি দ্বারা দগ্ধ করার নির্দেশ দান করেন এবং ১৯শে জ্যৈষ্ঠ দেহ ত্যাগ করবেন বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেবার ১৯শে জ্যৈষ্ঠ সকাল হতে হাজার ভক্তের সমাগম হয় বারদীর আশ্রমে। দুঃখভারাক্রান্ত মনে গোয়ালিনী মা বাল্যভোগ তৈরি করে নিজ হাতে খাইয়ে দেন লোকনাথ বাবাকে। ভক্তদের কান্না শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে বলেন – “ওরে তোরা এত চিন্তায় কাতর হছিস কেন? আমি কি মরে যাব। কেবল এই জীর্ণ পুরাতন শরীরটা পাত হবে, কিন্তু আমি আছি , যেমন তোমাদের মাঝে ছিলাম, ঠিক তেমনই তোদের কাছেই থাকবো। আমার মৃত্যু নেই। তোরা ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে আমাকে একটু আদর করে ডাকলে দেখবি আমি তোদের কত কাছটিতে আছি, এখনও শুনছি , তখনও শুনব। এ কথা মিথ্যা হবে না। ” সকল ভক্তদের খাবার গ্রহনের নির্দেশ দিয়ে তিনি আসন গ্রহন করেন। সময় সকাল ১১.৪৫ । বাবার আর কোন নাড়াচড়া না দেখে ভ্ক্তগণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সমবেত কন্ঠে তখন উচ্চারিত হয় – জয় বাবা লোকনাথ – জয় বারদীর ব্রহ্মচারী ।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!