লালন ফকির

-দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

অধ্যাত্মবাদী দর্শনের উৎস কেন শুধুমাত্র শাসক-শ্রেণীর মানুষের চেতনায়? -এ-প্রশ্ন পরে তোলা যাবে। আপাতত তার চেয়েও জরুরী প্রশ্ন হলো, বস্তুবাদী দর্শনের সঙ্গে জনসাধারণের নাড়ির যোগটা নিয়ে। এই যোগাযোগ সম্ভব হলো কেমন করে?

ভারতীয় দর্শনের দলিলপত্র থেকেই এ-প্রশ্নের একটা ভারি আশ্চর্য জবাব পাওয়া যাচ্ছে। খুব মোটা ভাষায় বললে বলা যায়, দেশের সাধারণ মানুষ খেটে খাওয়ায় বিশ্বাস হারায় নি, তাই।

কিন্তু খেটে খাবার প্রশ্ন উঠছে কেন? দার্শনিক আলোচনার আসরে এ-ধরনের প্রসঙ্গ খুবই স্থূল আর খাপছাড়া শোনায় না কি?

তবু উপায় নেই। লোকায়ত দর্শনের ধ্বংসস্তুপ থেকে যে-দু’চারটে ভাঙা-চোরা চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে তার থেকেই ও-দর্শনের আসল রূপটিকে চেনবার চেষ্টা করতে হবে। আর এই সব চিহ্নের মধ্যে একটি চিহ্ন সত্যিই ওই খেটে খাবার প্রসঙ্গই তুলছে!

শ্রম বা কর্মজীবন সম্বন্ধে শাসক-সমাজের মনোভাবটা এই জাতীয় আইন-কানুন থেকেই আন্দাজ করা যাবে। এবং এইখান থেকে মূলসূত্র পেয়েই আরো একটি কথা বুঝতে পারা যাবে : ওই শাসক সমাজের দার্শনিক চেতনা যখন চূড়ান্ত ভাববাদের রূপ পেলো তখন কেন ঘোষিত হলো যে, যে-কোনো রকম কর্মই প্রকৃত দার্শনিক জ্ঞানের পক্ষে অন্তরায় মাত্র।

চিহ্নটা কী রকম?

বার্হস্পত্যসূত্রম[৩০], প্রবোধচন্দ্রোদয়[৩১] ইত্যাদি পুরোনো কালের একাধিক পুঁথিপত্রে লেখা আছে, লোকায়ত মত অনুসারে বার্ত্তাই হলো একমাত্র বিদ্যা। (অবশ্যই, শুধু বার্ত্তার কথাই নয়, তার সঙ্গে দণ্ডনীতিও।) লোকায়ত দর্শনের রহস্য উদঘাটন করবার ব্যাপারে এই সূক্ষ্ম সূত্রটি যে কতো জরুরী সে-কথায় আমরা বারবার ফিরতে বাধ্য হবো। আপাতত দেখা যাক, এই কথাটি থেকেই খেটে খাবার প্রসঙ্গ কেন উঠতে বাধ্য।

বার্ত্তা মানে কী? কৌটিল্য[৩২] বলছেন, বার্ত্তা মানে হলো কৃষি, পশুপালন আর বাণিজ্য। অবশ্যই, বাণিজ্য বলতে আজকাল আমরা যা বুঝি কৌটিল্যের যুগেও, -অর্থাৎ যীশুখ্রীষ্ট জন্মাবার প্রায় সোয়া তিন শ’ বছর আগেও,–তাই বোঝাতো কিনা খুবই সন্দেহের কথা। কিন্তু সে-কথা ছেড়ে দিলেও এ-বিষয়ে নিশ্চয়ই কোনো তর্ক উঠবে না যে বার্ত্তা শব্দের মুখ্য অর্থ হলো চাষবাস।

তাহলে, লোকায়তিকদের কাছে চাষবাসের কথাটাই ছিলো সবচেয়ে জরুরী।

এই মনোভাবটির সঙ্গে দেশের শাসকশ্রেণীর মনোভাবটির যে কতোখানি তফাত তা স্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার। মনু[৩৩] বলছেন, ব্রাহ্মণের পক্ষে কৃষিকাজ নিষিদ্ধ। একবার নয় আধবার নয়, বারবার বলছেন। আর শুধু মনুর আইনই নয়, পুরোনো কালের অন্যান্য আইনের বইতেও[৩৪] সরাসরি লেখা আছে যে বেদজ্ঞানের সঙ্গে কৃষিকর্মের সঙ্গতি নেই।

শ্রম বা কর্মজীবন সম্বন্ধে শাসক-সমাজের মনোভাবটা এই জাতীয় আইন-কানুন থেকেই আন্দাজ করা যাবে। এবং এইখান থেকে মূলসূত্র পেয়েই আরো একটি কথা বুঝতে পারা যাবে : ওই শাসক সমাজের দার্শনিক চেতনা যখন চূড়ান্ত ভাববাদের রূপ পেলো তখন কেন ঘোষিত হলো যে, যে-কোনো রকম কর্মই প্রকৃত দার্শনিক জ্ঞানের পক্ষে অন্তরায় মাত্র[৩৫]।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………………..
৩০. S. N. Dasgupta HIP 3.532.
৩১. Ibid.
৩২. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ১:৬।
৩৩. মনু ১০.১১৬।। cf. SBE 25:86, 106sq., 420sq., 420n.
৩৪. SBE 14:176
৩৫. শঙ্করভাষ্য ব্রহ্মসূত্র : ১.১.১।

…………………..
লোকায়ত দর্শন (১ম খণ্ড : পটভূমি) -দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!