সুখ দুঃখের ভব সংসার

-দ্বীনো দাস

সুখ সম্পদ, মান, যশ, খ্যাতি প্রভৃতি এলেই মানুষ তার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। চিত্ত উদভ্রান্ত হয়ে মানুষ নিজের লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সুখ-সম্পদের অলস নেশার মধ্যেই ডুবে তলিয়ে যায়। তাই অনেক মহাপুরুষ দুঃখকে বলেন ‘সৃষ্টিকর্তার আর্শিবাদ’, সুখসম্পদকে বলেন ‘অভিশাপ’।

দুঃখ, দুর্ভোগ, লাঞ্ছনা, অপমানের আঘাত, এগুলো হলো আত্মারাম প্রিয় আমিত্বের মোহ থেকে আমাদের চেতনাকে জাগিয়ে তোলার চাবুক। মাঝে মাঝে এমন চাবুক খাবার দরকার হয়, নতুবা জীবনে মনের চেতনায় মরচে ধরে যায়।

অপূর্ণ মানব জীবনের যাত্রাপথের মধ্যে তাই বৈচিত্ররুপে ঐগুলোকে স্থান দেওয়া হয়েছে, যাতে সংগ্রামের অভাবে মনের ধার ভোতা হয়ে না যায়।

দুঃখেই আমাদের অন্তরের সুষুপ্ত চেতনাকে নাড়া দিয়ে জাগাতে পারে, সুখ তা পারে না। সাঁইজি লালন ফকির বললেন- সুখের সময় মানুষ সুখোভোলা হয়ে যায়। আর দুঃখের সময় স্রষ্টার কথা স্মরণ হয়। তাই তিনি বলছেন-

চিরদিন দুঃখের অনলে
প্রাণ জ্বলছে আমার
আমায় দাও হে দুঃখ যদি;
তবু তোমায় সাধী
তোমা বিনে দোহাই আর দিব কার।।

দুঃখের কঠোর আঘাত পেলেই আমাদের জড়তা ও মূঢ়তা ছুটে যায়। ভেতরে সংবিৎ জেগে ওঠে, সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরে। তখন দেখতে পাই যে আমাদের মধ্যে এমন একটা অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে যা কিছুতেই দমবার নয়, সকল দুঃখকেই সে অনায়াসে কাটিয়ে উঠতে পারে।

সেই শক্তির নাম আশা। যতই দুঃখ পাই, আশা কিছুতেই মরে না। এই আশার ক্ষমতা কম নয়, এ নিজের জোরে উপরের মহাশক্তিকে পর্যন্ত টেনে আনতে পারে,। এবং তার সাহায্য নিয়ে অনেক অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে। সাঁইজি বললেন- ‘আশা সিন্ধুতীরে বসে আছি সদায়।’

তাই এগুলোর কোন স্থায়ী মূল্য নেই। স্তর বদলে গেলেই দুঃখও বদলে যাবে। কেউ কেউ এমন উচ্চ আধ্যাত্মিক স্তরে রয়েছে যেখানে কোন দুঃখের লেশমাত্রা নেই। কোন এক অপূর্ব আনন্দের সাথে সব দুঃখই হয়ে গেছে আনান্দময়।

দুঃখের মধ্যেই হতে পারে এই আশার ক্রিয়া, সুখের মধ্যে এর বিশেষ কোন ক্রিয়া নাই। দুঃখ বা সুখ কোনটাই স্থায়ী অবস্থা নয়। একটা যখন আসে তখন অন্যটা যায়। এর মধ্যে জোয়ার-ভাটা খেলে। মানুষের ব্যক্তিগত ক্রম-বিবর্তনের ব্যাপারের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।

মানুষ যখন যেমন স্তরে বাস করে তখন সেই অনুসারেই তার দুঃখ সুখের মূল্য নিরূপিত হয়।

এক স্তরের বেলাতে যেটা দুঃখ, অন্য স্তরের বেলাতে তা হয়তো দুঃখই নয়। একই জীবনের মধ্যে মানুষের অবস্থার সেই স্তরভেদ ঘটে। বাহ্যবিলাসের স্তর, সৌন্দর্য প্রিয়তার স্তর, কবিত্বের স্তর, কামাবেগের স্তর, অর্থলিপ্সার স্তর, সাংসারিক স্তর, ধার্মিকতার স্তর এমনি কত না স্তরে মানুষ সাময়িকভাবে অবস্থান করে।

যে স্তরে যে চিন্তা ও দুঃখ বা অভাববোধ সেটাই তখন তার কাছে সর্বাপেক্ষা বড় বলে বোধ হয়। তাই কারো কাছে শরীরের দুঃখটাই বড় দুঃখ, কারো কাছে অর্থের দুঃখটাই বড় দুঃখ। এর বাইরে উচ্চ স্তরে যারা চলে গেছে তাদের কাছে এগুলো তখন তুচ্ছ হয়ে গেছে।

তাই এগুলোর কোন স্থায়ী মূল্য নেই। স্তর বদলে গেলেই দুঃখও বদলে যাবে। কেউ কেউ এমন উচ্চ আধ্যাত্মিক স্তরে রয়েছে যেখানে কোন দুঃখের লেশমাত্রা নেই। কোন এক অপূর্ব আনন্দের সাথে সব দুঃখই হয়ে গেছে আনান্দময়।

সুখ, দুঃখ বাইরের যেমন হয়। তেমন মনের ভেতরেও হয়। সাধারনত আমরা তিনটা ভেতরকার জিনিসে আমরা ক্লিষ্ট হই-

১. রাগ।
২. ভয়।
৩. মনোবেদনা।

রাগ:

রাগ হচ্ছে দুঃখেরই। রাগের সময়ে তা আমরা সঠিক বুঝিনা, কিন্তু তার পরেই আসে রাগের প্রতিক্রিয়া।এই রাগ বাইরের জিনিস, একটা কিছু ছুতা পেলেই সেটাকে ধরে ভেতরে ডুকে পড়ে, শান্ত মনকে অশান্ত করে তোলে।

রাগকে মোটে আসতে দেবো না সংকল্প করলেও অনেক সময় তাতে কৃতকার্য হওয়া যায় না। তবে বাইরে থেকে আসছে জেনে তাকে প্রত্যাখানের জন্য বার বার চেষ্টা করতে করতে ক্রমশ সে শক্তি কতকটা আয়ত্তের মধ্যে আসে। তখন রাগ আসছে বা হচ্ছে দেখলেই সময় থাকতে সাবধান হওয়া যায়।

ভয়:

ভয়ের আবার অন্য ব্যাপার। সজাগ দ্রষ্টাপুরুষকেও সে ফাঁকি দিতে পারে। ভয়ের জন্য যখন সজাগ থাকি তখন তার দেখা নেই। কিন্তু যখন নিশ্চিত হয়ে আছি, অমনি সে এক সত্যের মুখোশ নিয়ে এসে হাজির হয় তখন সতর্কতার সংকল্পটাই হারিয়ে ফেলে বিমূঢ় হয়ে পড়ি।

ভয়কে জয় করার একমাত্র উপায় হলো দয়াময় স্রষ্টার উপর একান্ত নির্ভরতা। এই ভয়ও বাইরের জিনিস, অভাব থাকলেই কিছু একটা উছিলা নিয়ে এসে হাজির হয়।

নির্ভরতার সাধনার মধ্যে আমরা প্রায়ই এক রকমের অহেতুক মনোবেদনাতে কষ্ট পাই। এমন কাম্যবস্তু না পাওয়ার দুঃখ যার কোন নামই জানি না।

মনের মধ্যে মোচড় দেয় আরো অনেক কারণে, সেগুলো হলো নিজেদের দোষত্রুটি ও পদস্খলন। কঠিন পথে চলতে গেলে পদস্খলনতো হবেই। তাই নিয়ে অনেকে পাপপুন্যের হিসাব কষতে বসে। আর মনে অযথা কষ্ট পেতে থাকে।

এর থেকে বরং স্বীকার করে নিতে হবে আমার অপূর্ণতা ঘোচেনি, আমি দুর্বল, এখনও ত্রুটি রয়েছে। নিজের এই ত্রুটি স্বীকার করে নেওয়ায় উন্নতি সাধনের প্রথম লক্ষণ।

আর যে এটা স্বীকার করে নিতে পারে না, তার উন্নতি হতে অনেক দেরি আছে। অতএব নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে নিয়ে অবিচল চিত্তে চেয়ে থাকতে হবে সেই পরম স্রষ্টার দিকে।

রাখ মারো হাত তোমারো,
তাইতে দয়াল ডাকি আমি।।
-ফকির লালন সাঁই

কারণ পরিবর্তন আসবে পরম স্রষ্টার থেকেই। দুঃখ পরিবর্তনের থেকে স্তর পরিবর্ত বাঞ্ছনীয় এবং তার চাবিকাঠি খোদ কর্তার হাতে। এর জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হবে, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। গায়ের জোরে পরিবর্তন আসে না।

উপরের শক্তিই তা এনে দিতে পারে। নিজের যথাসাধ্য প্রচেষ্টার সঙ্গে সেই পরম প্রভুর দিকে অন্তরের প্রত্যাশা নিয়ে অটুট আশা ভরে চেয়ে থাকতে হবে, হতাশ হয়ে বসে থাকলে হবে না।

যোগপথ হলো সুদীর্ঘ পর্বতারোহণের কষ্টকর যাত্রা। পথটি খুবই দুর্গম সন্দেহ নেই, একা একা নিজের পথ নিজে চিনে নিয়ে ধাপে ধাপে কষ্ট করে উঠতে হবে, তখন কেউ কারো সাথী থাকবে না। পদে পদে পদস্খলনের আশংকা রয়েছে।

কেবল চলার পথ আমাকে দিয়ে সবটায় চালাবেন বলে এতদিন নিজে সামনে এসে ধরা দেননি। আর এ কথাও তখন বুঝে আসবে যে কোনো দুঃখটাই ব্যর্থ হয়নি। প্রত্যেক দুঃখই কাজে লেগেছে। সকল দুঃখকষ্টের মূল হলো আমাদের অজ্ঞানতা, আমাদের অহংমূলক ভেদজ্ঞান।

হঠাৎ নানারকম রিপু, ইন্দ্রয়ের রাহাজনিরও আশংকা রয়েছে। তারপরও চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে বসে পড়ার আশংকা। মনে হবে খুবই অসহ্য কষ্ট, এ আর পারা যায় না। তবে সকলের বলাতেই যে এমন হবে, আবার নাও হতে পারে।

যাকে যতই দুর্গম অভিযান করতে হোক, আর তাতে যতখানিই বিলম্ব হোক। নির্ভরতার আলোটি হাতে ধরা থাকলে আর কোনো ভাবনা নেই। আর এই আলোটাই হলো গুরুজ্ঞান। এই আলোই পথ দেখাবে। আর এই পথের দূরূহতার মধ্যে মাঝে মাঝে কিছু আনন্দের রসদও মিলবে।

চড়াই উৎড়াই পার হতে হতে যতই উপরের দিকে যাওয়া যাবে ততই উপরকার মুক্ত আনন্দের বাতাস গায়ে লাগবে। তখন বোধ হতে থাকবে যে এটি কেবল দুঃখ ও দুর্দশার পথ নয়। মনে হবে আনান্দ ও সৌভাগ্যেরই পথ। শেষে যখন পথের শেষ চূড়ায় পৌঁছানো যাবে, তখন তো কষ্ট বলে কিছুই নেই।

সেখানে শুধুই স্বর্গীয় আনন্দধারা বইবে,। তার সুবিমল জ্যোতিতে চারিদিক উদ্ভাসিত। আর সেখানে গেলেই দেখা মিলে যাবে তার। যিনি লুকিয়ে এতদিন আমার সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। যিনি সকল বিপদ কাটিয়ে শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন, একবারও একা অসহায় হতে দেন নি।

কেবল চলার পথ আমাকে দিয়ে সবটায় চালাবেন বলে এতদিন নিজে সামনে এসে ধরা দেননি। আর এ কথাও তখন বুঝে আসবে যে কোনো দুঃখটাই ব্যর্থ হয়নি। প্রত্যেক দুঃখই কাজে লেগেছে। সকল দুঃখকষ্টের মূল হলো আমাদের অজ্ঞানতা, আমাদের অহংমূলক ভেদজ্ঞান।

যখন এটি ঘুচে যাবে, যখন প্রত্যক্ষ উপলব্ধি আসবে যে আমিও তিনি একই। আমি বলে আলাদা কিছু নেই, তখন সকল দুঃখকষ্ট আপনি থেকে কোথায় মিলিয়ে যাবে। তখন সর্বময় আমি বা গুরুময়, তাই সাঁইজি লালন ফকির এখানে বললেন-

গুরু তুমি পতিতপাবন পরম ঈশ্বর।
অখণ্ড মণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচর।।

আর এক জায়গায় সাঁইজি বললেন-

মনছুর হাল্লাজ ফকির সেতো
বলেছিলো আমি সত্য,
সই পলো সাঁইর আইন মত
শরায় কি তার মর্ম পায়।।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………….
আরো পড়ুন:
অবশ জ্ঞান চৈতন্য বা লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া
ঈশ্বর প্রেমিক ও ধৈর্যশীল ভিখারী
সুখ দুঃখের ভব সংসার
কর্ম, কর্মফল তার ভোগ ও মায়া
প্রলয়-পূনঃউত্থান-দ্বীনের বিচার

ভক্তি-সংসার-কর্ম

………..
বি.দ্র.
আমার এই লেখা কিছু ইতিহাস থেকে নেওয়া কিছু সংগৃহীত, কিছু সৎসঙ্গ করে সাধুগুরুদের কাছ থেকে নেওয়া ও আমার মুর্শিদ কেবলা ফকির দুর্লভ সাঁইজি হতে জ্ঞান প্রাপ্ত। কিছু নিজের ছোট ছোট ভাব থেকে লেখা। লেখায় অনেক ভুল ত্রুটি থাকতে পারে তাই ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।। আলেক সাঁই। জয়গুরু।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!