ফকির লালন সাঁইজি সাধুসঙ্গ মায়া

কর্ম, কর্মফল তার ভোগ ও মায়া

-দ্বীনো দাস

কর্ম তিন প্রকার-

১. মোহবশের কর্ম- তামসিক
২. পাওয়ার বা লোভের বশে কর্ম- রাজসিক
৩. নিষ্কাম ও সেবাকরার কর্ম- সাত্মিক

সাধু কর্ম হল জীবজগৎ-এর সেবা চিন্তা করা।

সাধনার উচ্চর্মাগের পৌঁছাতে গেলে, অবশ্যই আমাদেরকে (আহার) খাদ্য সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে কারণ খাদ্যের গুণ মোতাবেক প্রবৃত্তি বা কর্ম বয়।

আধ্যাত্ম শক্তি যা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বা সমন্বয় বিকশিত করে এবং স্থাপিত করে। এই শক্তি অর্জন করতে হলে কিসে ভালো কিসে মন্দ, কেমন আহার বিহার তার করা উচিত এটা আগে ভাবতে হবে।

খাদ্য বিচারে দেখা যায়- জীবের শরীর থেকে প্রাণ ত্যাগ হবার পরপরই শরীরের প্রতিকূল বিষ। শক্তি একত্রিত হয়ে পড়ে এবং খুব দ্রুত তা বাড়তে বা ছড়াতে থাকে।

এর শেষ পরিণাম হল শরীরে পচন। তাই মানুষ মারা গেলে আমরা লাশকে তাড়াতাড়ি সমাধীকার্য শেষ করি এবং শেষে আমরা স্নান-গোছল করি। যাতে ঐ পচনশীল জীবাণু আমাদের কোন ক্ষতি করতে না পারে। প্রাণশক্তির ভিত্তিতে মানুষের শরীর আর জানোয়ারের শরীরের তেমন কোন পার্থক্য নেই।

উদ্ভিদদের মধ্যে বিদ্যমান চেতন, পশু মধ্যেকার চেতনার থেকে একেবারেই আলাদা। যতটুকু মানুষের প্রাণ শক্তির জন্য প্রয়োজন তা আমরা শাকসবজি, ফল, ডালের মধ্যে পেয়ে যাই। আমরা যদি দীর্ঘ জীবন লাভ করতে চাই এবং নিজেদেরকে পরিশ্রমী ও সৈনিক করতে চাই তাহলে প্রকৃতির কাছে আমাদের অনেক কিছু শিখতে হবে।

প্রাণশক্তির মৈলিক তত্ত্ব- বায়ু, প্রাণ, সূর্যপ্রাণ, জলপ্রাণ ও ভূমিপ্রাণ এইসব তত্ত্বের ভারসাম্য নষ্ট হলেই আমাদের শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এইসব প্রাণশক্তি গাছপালা, উদ্ভিদদের মধ্য সম্পূর্ণভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে। এই শক্তিকে প্রত্যক্ষরূপে আহার হিসাবে নিলে মঙ্গল হয়।

গাছ-গাছড়া, ফলমূল, সবজি হলো প্রাণশক্তির স্বাভাবিক ভাণ্ডার যা দীর্ঘ সময় ধরে মজুত থাকে। যা কিনা ছেঁড়া বা কাটাকুটির পরেও ঐ প্রাণশক্তি নিহিত থাকে। এই কারণে এগুলোই হল সজিব বা সাত্মিক আহার।

অন্যদিকে জীব যখন তার প্রাণ শরীর ত্যাগ করে, প্রাণশক্তি তখন খুব দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায় এবং মৃত শরীর তখন প্রতিকূল শক্তিপ্রবাহকে আকর্ষিত করে, ফলত; শরীরে পচনের কাজ শুরু হয়ে যায়।

এছাড়া আমরা যখন ভয়, চিন্তা, ক্লেশ, দ্বেষ, উদ্বেগ-যন্ত্রণা বা মৃত্যুভয়ে ছটফট করি বা এই সব দ্বারা আচ্ছন্ন থাকি। তখন আমাদের শরিরে জৈবীয়-রাসায়নিক (bio-chemical) পরিবর্তন হয়ে বিষের মত আমাদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীরে নানা প্রকার রোগ এসে হাজির হয়।

ঠিক তেমনি মানুষ যখন তার আহারের জন্য জ্যান্ত-জানোয়ার হত্যা বা জবাহ করে তখন ঐ জ্যান্ত পশু ভয়ে আক্রান্ত থাকে এবং খুব দ্রুত তার পুরো শরীরে জৈবীয়-রাসায়নিক পরিবর্তন হয় আর ঐ রসায়ন রূপি বিষ দ্রুত পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

এই বিষ- ভয়, শোক এবং ব্যাথার জন্য অতি অত্যধিক মাত্রায় উৎপন্ন হয়। যে মানুষ ঐ জীবের মাংস খায়। তা যে কোন পশু পাখি যারই হোক না কেন। একই সঙ্গে ঐ বিষ খায় ও সেই সঙ্গে শক্তিকেও পরোক্ষভাবে গ্রহণ করে ফেলে।

এই নঞর্থক শক্তিই পরে আস্তে আস্তে শরীরের মধ্যে প্রভাব ফেলতে থাকে, পরিণামে মানুষ নানাবিধ রোগে আক্রন্ত হতে শুরু করে ও পশুবৃত্তিসম কর্ম করে।

উদ্ভিদদের মধ্যে বিদ্যমান চেতন, পশু মধ্যেকার চেতনার থেকে একেবারেই আলাদা। যতটুকু মানুষের প্রাণ শক্তির জন্য প্রয়োজন তা আমরা শাকসবজি, ফল, ডালের মধ্যে পেয়ে যাই। আমরা যদি দীর্ঘ জীবন লাভ করতে চাই এবং নিজেদেরকে পরিশ্রমী ও সৈনিক করতে চাই তাহলে প্রকৃতির কাছে আমাদের অনেক কিছু শিখতে হবে।

এই চক্র পুরোপুরি নষ্ট করে দেই। সেই সঙ্গে কলব লতিফা- অনাহত চক্র (heart) আস্তে আস্তে সঙ্কুচিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এই ব্যাপারটা ভীষণ ভয়াবহ। মাদক যাই হোক তার পরিণাম ফল মন্দ। আবার এই চক্রের প্রভাব সব চক্রে গিয়ে পড়ে।

একটা উদাহরণ দেখা যাক- মাংসাশী পশুর জীবন হয় স্বল্প দীর্ঘ, হিংস্র ও কম পরিশ্রমী। অন্যদিকে নিরামিষভোজী পশুর জীবন হয় অনেক দীর্ঘ, শান্ত ও বেশী পরিশ্রমী। একটা বাঘের গড় আয়ু হয় ১৫ বছর। সে ২৪ ঘণ্টায় ১৮-২০ ঘণ্টা ঘুমায়। স্বভাবে হয় হিংস্র।

অন্যদিকে একটা হাতি ১০০ বছরের ও বেশী বাঁচে এবং অনেক বেশী পরিশ্রমী। আহার করে নিরামিষ। স্বভাবে হয় শান্ত। অতএব বিষয়টা পরিষ্কার আমিষ আহার করে দীর্ঘ জীবন ও বেশী পরিশ্রমী হওয়া কনোদিনই সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদের সকলকে সুস্থ থাকতে হলে অবশ্যই নিরামিষ ভোজন বা আহার করা উচিত।

মানব শরীরের ও আধ্যাত্মিক চেতনার আর এক মহামারী বিষ হচ্ছে ‘নেশা’। এই নেশা প্রধানত মস্তিষ্কোকে প্রভাবিত করে এবং মানুষের অবচেতন মনের চাপা ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসে বা আনার জন্য প্রেরিত করে। এই চাপা ভাবনা প্রেমেরও হতে পারে আবার অপ্রেমেরও হতে পারে (ঘৃণা)।

এ সময় মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করে কারণ তখন তার নিজের মস্তিষ্কের উপর নিজেরই নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মানুষ এই সময় খুব হিংস্র হয়ে উঠতে পারে পরিনামে এর ফল ভয়াবহ/গুরুতর খারাপ হতে পারে।

নেশার কারণ সর্বদাই মানসিক অবসাদ হয়। নেশার প্রভাবে শরীরের সব সময় প্রতিকূল হয়। আস্তে আস্তে শরীরে অবসন্ন হতে থাকে। যাহা (রুহ লতিফা বা মনিপুর চক্র, Solar plexus) চক্রের প্রধান তত্ত্ব হলো নূর বা অগ্নিতত্ত্ব, নেশার দ্রব্য হলো অগ্নিতত্ত্ব।

এই চক্র পুরোপুরি নষ্ট করে দেই। সেই সঙ্গে কলব লতিফা- অনাহত চক্র (heart) আস্তে আস্তে সঙ্কুচিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এই ব্যাপারটা ভীষণ ভয়াবহ। মাদক যাই হোক তার পরিণাম ফল মন্দ। আবার এই চক্রের প্রভাব সব চক্রে গিয়ে পড়ে।

তদ্রূপ জীব মাংস আহার এই চক্রগুলি সঙ্কুচিত করে, বিশেষ করে নষ্ট হয় গো-মাংসে।

আপন গুরুর নির্দেশ মত আহার, বিহার, সাধন কর্ম ও নিজ প্রত্যাহিক কর্ম করাকে সাত্মিক কর্ম বলে।

কর্মফল ৩ প্রকার-

১. স্থূল।
২. সূক্ষ্ম।
৩. কারণ।

স্থূলদেহের কর্ম স্থূল তা সূক্ষ্ম শরীর ভোগ করে। স্থূলদেহের মানসদ্ভোব আশাগুলো সূক্ষ্ম ও কারণ শরীর ভোগ করে। কারণ শরীরই বীজ ভাণ্ডার। শরীরে সমস্ত বীজ জমা থাকে। এই নিয়েই মানবের জন্ম-মৃত্যু চক্র চলতে থাকে।

কর্মফল ও ভোগ

দেহটার মৃত্যুঘটে। তারপর দেহ থেকে আত্মা বা সূক্ষ্ম শরীর বের হয়ে যায়। আর সেই সাথে মন ও বুদ্ধি চলে যায়। সমস্ত দুঃখ সুখ সব ভোগ করে ঐ মন। মানুষের মৃত্যুর সময় মন বুদ্ধি সহকারে একটা বায়বীয় সূক্ষ্ম শরীর হয়ে দেহ হতে বের হয়ে যায়।

ঐ মন বুদ্ধি সহকারে কিছুদিন বায়ুভূত নিরাশ্রয় ভাব ভূমিতে অবশ অবস্থায় অবস্থান করে। এরপর বিকট শব্দ দ্বারা কম্পন সৃষ্টি হয়। মন তখন বুদ্ধি সহকারে বাহ্যকরণ ইন্দ্রিয়সহ সূক্ষ্ম শরীরে গঠন হয়। আর অন্তঃকরণ জ্ঞানেন্দ্রিয় বুদ্ধি, চিত্ত, মন, অহং এই সব মিলিয়ে পঞ্চ কর্মইন্দ্রিয় পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় সবমিলিয়ে জেগে উঠলেই আত্মার ভোগ হয়।

ব্রহ্মা জীব দেহ ধারণ করল তারও ভুল হয়ে যায়। কারণ অনেকবার আবর্তনের ঘূর্ণিপাকে বা চক্রে এসে স্বরূপ চাপা পড়ে যায় আর তখন ভোক্তা দেহানুগত হয়ে পড়ে। এই ভোক্তারূপী স্বরূপকে চিনতে পারলেই তার পূর্বজন্মের জ্ঞান ফিরে আসে।

অজ্ঞানী মূর্খ দেহাত্মবাদীর দেহ ধারণ করতে অনেক সময় লাগে, আর উন্নত জীবের সময় লাগে কম।

যারা গুরুপদে একনিষ্ঠ মন নিয়ে ডুবে আছে ও পবিত্র জীবনযাপন (ব্রহ্ম চর্চা) করছে গুরু কৃপায়। যাদের সেই দৃষ্টি খুলেছে তারা এই সমস্ত লোকের বিষয়বস্তু দেখতে পায়।

লোক হল সাতটা। আর প্রত্যেক লোকে সাতটা করে স্তর আছে। একেই সাঁইজি বা সাধুগুরুরা বলেছেন ৪৯ বায়ু। জীব প্রাণের মৃত্যুর পর তার স্বস্ব কর্মফল অনুযায়ী পরলোকগত আত্মার স্থিতি এক এক স্তরে ভোগ করতে হয়। পরে সেই স্তরে ভোগ শেষ হলে পরে অন্য স্তরে নতুন করে আবার নতুন দেহে জন্ম নিতে হয়। এই ভাবে মানুষ যে কত বার জন্ম-মৃত্যু হয় তার কোন কিনারা নাই।

সৃষ্টিকর্তা আবর্ত হতে হতেই জীবও সাকারে সৃজন হয়েছেন। জীব বা মানুষ হল সৃষ্টকর্ত্তার সত্তায় সত্যশালী কিন্তু বহু আবর্তের জীব তার সত্তা বেমালুম ভুলে যায়। এই আবারণ, উপাধি নাশ হলে জীবের তখন কামালিত্ত বা ব্রহ্মত্ব লাভ ঘটে।

ব্রহ্মা জীব দেহ ধারণ করল তারও ভুল হয়ে যায়। কারণ অনেকবার আবর্তনের ঘূর্ণিপাকে বা চক্রে এসে স্বরূপ চাপা পড়ে যায় আর তখন ভোক্তা দেহানুগত হয়ে পড়ে। এই ভোক্তারূপী স্বরূপকে চিনতে পারলেই তার পূর্বজন্মের জ্ঞান ফিরে আসে।

আত্মার কোন ভোগ নাই সব ভোগ মন-বুদ্ধির।।

মায়া

ভ্রান্তি, অজ্ঞানতা, মরিচীকা, সম্মোহিত অবস্থার সৃষ্টি করে এই মায়া। সৃষ্টিকুলের সমগ্র জীব মায়া কতৃক সম্মোহিত হয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। সাধারণ জীব (মানুষ) এরা এই সৃষ্টিরূপি মায়াকে চিনতে পারে না। তাই তাদের নানারূপ কষ্ট ক্লেশদায়ক জীবনযাপন ও প্রকৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত জন্ম-মৃত্যুর চক্র চলতে থাকে।

সৃষ্টিকুল সৃষ্টি এই মায়া দ্বারা। যে আপন গুরু প্রদত্ত পথে সঠিকভাবে চলে এই সৃষ্টি রহস্য জেনেছে সেই কেবল ঐ মায়াকে চিনেছে।

সৃষ্টির শুরুতেই স্রষ্টার ইচ্ছা হল লীলা করার। আর লীলা একা হয় না। তাই তার ইচ্ছা ও হুকুমে প্রথমে (নির্গুণ ব্রহ্মই স্রষ্টা) ইচ্ছা হওয়া মাত্রই তার নূর হতে মা এর সৃষ্টি হল। তখন এই মা হল স্বগুণ ব্রহ্ম মা, ঐ মা হতে তার পর সৃষ্টি হল একজন নারী একজন পুরুষ। এই নিয়ে শুরু হল সৃষ্টির লীলা।

নির্গুণ-স্বগুণের (জাত-সেফাত) সন্ধিস্থলে অপ্রকৃত ভূমিতে এই সেফাত রূপি মায়ের সংসার আর এটাই হল ভাবলোক বা নিত্যলোক।

যিনি নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্ম (জাত) তিনিই সাকারে স্বগুণে এসে লীলা করছেন। আমার সাঁইজি লালন ফকিরের ভাষায়-

অখণ্ডমণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচর।
অখণ্ডমণ্ডলাকারে যিনি ব্যাপ্ত তিনিই সর্ব্বশক্তিমান স্রষ্টা।।

…………………….
প্রচ্ছদ ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: জিয়াউল হক রোমেল।

…………….
আরো পড়ুন:
অবশ জ্ঞান চৈতন্য বা লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া
ঈশ্বর প্রেমিক ও ধৈর্যশীল ভিখারী
সুখ দুঃখের ভব সংসার
কর্ম, কর্মফল তার ভোগ ও মায়া
প্রলয়-পূনঃউত্থান-দ্বীনের বিচার

ভক্তি-সংসার-কর্ম

………..
বি.দ্র.
আমার এই লেখা কিছু ইতিহাস থেকে নেওয়া কিছু সংগৃহীত, কিছু সৎসঙ্গ করে সাধুগুরুদের কাছ থেকে নেওয়া ও আমার মুর্শিদ কেবলা ফকির দুর্লভ সাঁইজি হতে জ্ঞান প্রাপ্ত। কিছু নিজের ছোট ছোট ভাব থেকে লেখা। লেখায় অনেক ভুল ত্রুটি থাকতে পারে তাই ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।। আলেক সাঁই। জয়গুরু।।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!