বিশ্বাসীদের দেখা শুনা - লালন

বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- প্রথম কিস্তি

-দ্বীনো দাস

এমন মানব সমাজ
কবেগো সৃজন হবে
যে দিন হিন্দু মুসলিম;
বৌদ্ধ খৃষ্টান জাতি গোত্র
ভেদ নাহি রবে।।
-ফকির লালন সাঁইজি

সাঁইজির এই যে উক্তি উনি করে গেছেন তা থেকে মনে হয় এরকম একটা দিন বা সময় অবশ্যই সামনে আসবে।

আজ আমি সেই আলোর দিন, সত্যের দিনের কথার কিছু আলোচনা করবো -এই বাসনা নিয়ে লিখছি। জাতি গোত্র ভেদ তাদের কাছে নাই যাহারা জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান সম্পন্ন ব্যক্তি বা সম্প্রদায় তো সেই দিন আসবে যেদিন অধিকাংশ মানুষ সৃষ্টিকর্তার অসীম কৃপায় জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে দিব্যজীবন লাভ করবে।

তাহলে আসা যাক মূল কথায়- এই ‘আলোর’ সত্য দিনের বা দিব্য জীবনের সন্ধানে যেতে গেলে আগে আমাদের সৃষ্টির গোড়ায়, সৃষ্টির ধাপে ও প্রক্রিয়ার -তার জটিলতা, দু:খ, কষ্টে যেতে হবে। তবে আমরা যাই দু:খ কষ্টের মূলে।

সৃষ্টির সৃজন প্রক্রিয়ার শুরুতে- মহাজ্ঞানী অবতার পুরুষগণ বলে গেছেন- সৃষ্টির কলাকৌশল নিপুন এক নাট্যমঞ্চ। এর প্রথম ধাপে সব ছিল জড়পিণ্ডবত অবস্থা। এভাবে চললো কিছুকাল। তখন শুরুতে কোন গণ্ডগোল, বিশৃঙ্খলা বা দু:খ নাই।

দ্বিতীয় ধাপে বা স্তরে মহাশক্তি স্রষ্টা সৃষ্টি করলেন উদ্ভিদকুল। তাতে প্রাণের সঞ্চার হলো। তখনো কোন গণ্ডগোল, বিশৃঙ্খলা বা দু:খ নাই।

তৃতীয় ধাপে স্রষ্টা সৃষ্টি করলেন কিছু প্রাণীজকুল- স্থল, জলজ, খেচর, উভচর প্রভৃতি। তখন থেকে শুরু হলো দুঃখে পালা। শুরু হল গণ্ডগোল। দলে দলে আক্রমণ একে অপরকে মেরে হত্যা করে আহার করে জীবন ধারণ করা শুরু করলো। শুরু হল হিংসা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও হত্যা করে আহার সংগ্রহ করা।

যুগে যুগে মহাপুরুষগণ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দুঃখকে অত্যাচারকে বরণ করে নিয়েছেন। তাদের প্রস্তরের আঘতে রক্ত ঝরেছে। তাদের বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মুণ্ডু কর্তন করা হয়েছে। শূলে চড়ানো হয়েছে। আগুনে পুড়ানো হয়েছে।

তারপর চতুর্থ ধাপে স্রষ্টা সৃষ্টি করলেন মানবকুল। এবার জমে উঠলো নাট্যমঞ্চ। প্রত্যেকের চরিত্র আলাদা আলাদা হয়ে উঠলো। জীব বৈচিত্র্য ফুটানোর জন্য স্রষ্টা কাউকে বানালো সাধু, কাউকে ভণ্ড অসাধু, কাউকে কঠিন নিষ্ঠুর, কাউকে কমল হৃদয়, কেউ সোজা, কেউ বাঁকা।

এভাবে স্রষ্টা সৃষ্টি করে একটা নির্দিষ্ট পরমায়ু দিয়ে অবাদে ছেড়ে দিলেন জগতে। হুকুম হল যার যা চরিত্র সেই অনুযায়ী অভিনয় কলা দেখাতে। আর বলা হল যার যার নিজ স্বরূপ ব্যক্ত কর।

তখনই বেঁধে গেল একে অপরের সাথে সংঘাত ঘরতরো দ্বন্দ্ব। যেখানেই চরিত্র আর স্বার্থের সংঘাত, সেখানেই দুঃখের সৃষ্টি। ক্রমেই গত্রে, বর্ণে, জাতিতে সংঘাত যত বেড়ে চলেছে দুঃখ তত বেশী করে বেড়েছে। আর এটি অপরিহার্য কারণ এটি যে নাটকের অংশ এই জটিলতা গণ্ডগোল দুঃখ না থাকলে নাটকের কোন প্রাণই থাকে না।

এই চতুর্থ ধাপেই যত দুঃখ কষ্টের ছড়াছড়ি। আর বর্তমান দুনিয়া চলছে এই চতুর্থ ধাপ বা অধ্যায়।

এই ধাপেই ভয়াবহ দুঃখ কষ্টের সময় চলছে ঘোরতর সংঘাতের ভেতর দিয়েই আমাদের এই জটিল ভব পাড়ি দিতে হবে। নাটকের এই পর্যন্ত আনতে গিয়ে অনেক প্রজাতিকে বিলিন করতে হয়েছে অনেক বিবর্তন, পরিবর্তন, পরবর্ধন্ প্রলয় করতে হয়েছে। এরপর আসবে এক নতুন ধাপ বা অধ্যায় রাতের পর যেমন দিন উদয় হয় তেমনি দুঃখের পর সুখ।

যুগে যুগে মহাপুরুষগণ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দুঃখকে অত্যাচারকে বরণ করে নিয়েছেন। তাদের প্রস্তরের আঘতে রক্ত ঝরেছে। তাদের বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মুণ্ডু কর্তন করা হয়েছে। শূলে চড়ানো হয়েছে। আগুনে পুড়ানো হয়েছে।

অনেক অপমান-লাঞ্ছনা করা হয়েছে। সব দুঃখ কষ্ট তাঁরা হাসি মুখে বরণ করে নিয়েছে। কারণ আগামী প্রজন্মের সুখের জন্য, সত্য সুন্দর স্বর্ণ দিনের জন্য। এত কিছুর পরও তারা সত্য প্রচার করে গেছেন। প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন হাসিমুখে। বিনিময়ে তারা সৃষ্টির মঙ্গল কামনা করে গেছেন।

সাঁইজি ফকির লালন বললেন-

তারে জলেতে ডুবালো
অগ্নিতে পোড়াল
তবু না ছাড়িল সে শ্রীরূপ সাধনা।।

যত কষ্ট আসুক যত বিপদই আসুক। সত্য প্রচার আর সাধনা এই রূপ করে যেতে হবে। দু:খ ছাড়া সুখের পরিণতি হয় না। উন্মেষ ঘটেনা।

‘দু:খ বিনা সুখ নাই সংসারে’ বর্তমান বিশ্বে ক্রমেই সংঘাত আর দু:খের বোঝা বেড়েই চলেছে। কতশত বছর পার হয়ে গেল মহাপুরুষরা দু:খ বরণ করে আমাদের মুক্তির পথ করে গেছেন হাজার হাজার বছর হয়ে গেল তারপরও কেন শেষ হচ্ছে না এই সংঘাত আর দু:খের দিন? কারণ এই নাটকটা স্রষ্টা খুবই মন্থর গতিতে করাচ্ছেন।

তবে আশার আলো এতটুকু যে বেশীদিন বাকী নাই, সেই আলোর দিন, সোনালী দিনের সেই লালন সাঁইজির বাক্যর যে দিন হিন্দু মুসলিম জাতি গোত্র ভেদাভেদ নাহি রবে।

বর্তমান বিশ্বে মানুষের ইতিহাসে এমন নিষ্ঠুর হানাহানি সংঘাত ও এত দু:খের দিন আগে দেখা যায় নি। এ যেন চরম ও চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। অনাচার, অবিচার, হানাহানি এটা কিন্তু প্রত্যাশিত, স্বাভাবিক। প্রদীপের তেল শেষ হয়ে গেলে প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে অনেক বেশী করে আলো দিয়ে নিভে যায়।

রাত শেষ হয়ে এলে ভোরের আলো ফোটার আগে অন্ধকার বেশী ঘনীভূত হয়। ঠিক যেন সে রকম একটা ব্যাপার। এতে বুঝা যায় দু:খের দিন ফুরিয়ে এলো, আসছে নতুন প্রেমের স্বর্গীয় আলোর দিন, মিলনের দিন, আনন্দের দিন, দিব্য জীবন লাভের দিন।

(চলবে…)

………..
বি.দ্র.
আমার এই লেখা কিছু ইতিহাস থেকে নেওয়া কিছু সংগৃহীত, কিছু সৎসঙ্গ করে সাধুগুরুদের কাছ থেকে নেওয়া ও আমার মুর্শিদ কেবলা ফকির দুর্লভ সাঁইজি হতে জ্ঞান প্রাপ্ত। কিছু নিজের ছোট ছোট ভাব থেকে লেখা। লেখায় অনেক ভুল ত্রুটি থাকতে পারে তাই ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।। আলেক সাঁই। জয়গুরু।।

………….
কাভার ছবি:
কাভার ছবির স্কেচটি সংগ্রহ করা। শিল্পীর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………….
আরো পড়ুন:
বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ১
বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ২
বিশ্বাসীদের দেখা শুনা- ৩

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!