গন্ধের রাজ্যে

গন্ধের রাজ্যে : তৃতীয় পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: গন্ধ: গন্ধের রাজ্যে : তৃতীয় পর্ব

আবার হাসপাতালের কথা মনে পরলেই আমার মাথায় চলে আসতো ওষুধের গন্ধ মাখা একটা পরিবেশ। মনে মনে প্রবেশ করে যেতাম ওষুধের গন্ধের রাজ্যে। কিন্তু পরবর্তীতে এক পরিচিতকে দেখতে দামী এক হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম সেখানে ডেটল-সেভলন বা কোনো ঔষুধের গন্ধ নেই। সেখানে হালকা নানান বাহারি সব কৃত্রিম ফুলে গন্ধ সৌরভ ছড়িয়ে আছে।

এরকম পূর্ব থেকে যখন আমরা সচেতন থাকি তখন গন্ধ সম্পর্কে, তখন আমাদের চেতনা এরজন্য প্রস্তুত হয়েই থাকে। এতে যে গন্ধটা কম বা বেশি লাগে তা নয়। কিন্তু বড় ধরণের ধাক্কা অর্থাৎ প্রতিকৃয়া থেকে রক্ষা পায় ইন্দ্রিয়। যেমন মাছের বাজারে গেলে আমদের ইন্দ্রিয় আগেই প্রস্তুত থাকে আঁষটে গন্ধের জন্য।

তদ্রূপ গরুর হাটে গেলে গোবরের গন্ধ পাওয়া যাবে এটা মেনে নিয়েই যেতে হয়। চিড়িয়াখানায় গেলে বিচিত্র সব প্রাণীর গায়ের গন্ধ পাওয়া যাবে সেটা আমরা মেনেই যাই। কিন্তু যখন অব্যবস্থাপনা-অপরিচ্ছন্নতায় গন্ধটা চূড়ান্ত আকার নেয় তখন আমরা তা মানতে পারি না।

আবার যা যে যে গন্ধ প্রত্যাশা করি তা না পেলেও আমরা হতাশ হই। যেমন কোনো কোনো বিশেষ ফুলের গন্ধ নেবার জন্য আমরা বার বার শুঁকে দেখি। আধুনিক উপায়ে চাষ করা অনেক ফুলে তার মূল সৌরভ হারিয়েছে। কিন্তু আমরা বার বার শুঁকে স্মৃতির সঞ্চিত সেই সৌরভটা আমরা খুঁজতে থাকি।

গন্ধের অনুভূতিটাও বিচিত্র। কার কাছে যে কোন গন্ধ ভালো লাগবে আর কোন গন্ধ খারাপ লাগবে সেটা বলা বেশ মুশকিল। কেউ মাছের শুটকির গন্ধের মাতোয়ারা হয়ে উঠেন। আহ্ আহ্ করে উঠেন। কারো হয়তো সেই গন্ধ থেকে বাঁচতে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা হয়।

আবার এই গন্ধের ভালো লাগা-মন্দ লাগার বিষয়টিও সবার ক্ষেত্রে স্থায়ী নয়। নানা ঘটনা, পরিবেশ, পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাতে আসে পরিবর্তন। এ ব্যাপারটা অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

এক সময় হয়তো আপনার জুঁই ফুলের গন্ধ অসহ্য লাগতো। কালক্রমে দেখা গেলো সেটা ভালো লাগতে শুরু করলো। আবার এক সময় যে সব গন্ধ মন মাতাতো তা হয়তো আজ তেমন কোনো প্রতিকৃয়া তৈরি করে না মনে।

এ রকমই মানুষের পছন্দের গন্ধের যেমন দীর্ঘ তালিকা থাকতে পারে। তেমনি আবার অনেক গন্ধ সম্পর্কে থাকতে পারে ‘গন্ধভীতি’। আমি একজনকে জানতাম তিনি আনারস আর কাঁঠালের গন্ধ সহ্য করতে পারেন না কিছুতেই।

আমরা সেই দুর্গন্ধকে খুব একটা পাত্তা দিতাম না। প্রায়ই নৌকায় চড়ে ঘুরতে বের হতাম। সেটাই ছিল আমাদের বিনোদন। এটা অনেকটা ধূমপান করার মতো। যে ধূমপান করছে সে হয়তো গন্ধটা পাচ্ছে না। বা তার কাছে গন্ধটা বেশ লাগছে। কিন্তু যিনি ধূমপান করছেন না তার বিষয়টা সহ্য হচ্ছে না।

কাঁঠালের মৌসুমে তিনি বিশেষ সচেতন থাকতেন। যাতে এমন কোনো পরিস্থিতিতে পরতে না হয়। কাঁঠাল খাওয়া হচ্ছে বা কাঁঠালের গন্ধ ছড়াচ্ছে এমন কোনো স্থানে তাকে উপস্থিত হয়ে গেলে নিজে তো বিব্রত হতেনই; পাশাপাশি উপস্থিত অন্যদেরও অপ্রস্তুত করে তুলতেন।

আবার আমার নিজেরও কিছু গন্ধভীতি আছে। সেই সব গন্ধের কাছাকাছি যাওয়ার আগেই কেমন গা রি রি করে উঠে। দক্ষিণ ভারত থেকে আমার এক বন্ধু একবার বেড়াতে এসেছিল ঢাকা শহরে। কিন্তু ঢাকায় আসার পর থেকে তার মাঝে সারাক্ষণ একটা অস্বস্তি লক্ষ্য করলাম।

কারণ জানতে চাইলে বললো, সে নাকি এই শহরে সারাক্ষণ মাছ মাছ গন্ধ পাচ্ছে। সে কিছুতেই মাছের গন্ধ নিতে পারছিল না। তাই পুরো বেড়ানোর আগেই ফিরে গেলেন। অথচ ঢাকা শহরে যে মাছ মাছ গন্ধ বলে একটা বিষয় আছে সেটা কবে কার জানা ছিল!

আবার আমার পরিচিত রোমানিয়া থেকে আসা এক পর্যটক বাংলাদেশের গ্রামের গন্ধে প্রেমে পরে নব্বইয়ের দশকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। খুব চেয়েছিল বাকি জীবনটা বাংলার গ্রামেই থেকে যাবে। কিন্তু ভিসার জটিলতার জন্য তাকে ফিরে যেতে হয়েছিল।

অনেকে গন্ধ সম্পর্কে মাত্রাতিরিক্ত সংবেদনশীল। আবার অনেকে গন্ধকে তেমন একটা পাত্তা দেন না।

আমরা বন্ধুরা এক সময় বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। যদিও বুড়িগঙ্গার পানি ততদিন দুর্ষনে তীব্র গন্ধ ছড়াচ্ছিল দেদাসে। অনেকে পারাপারের সময় নাকে-মুখে কাপড় চাপা দিয়ে চলতো। আমাদের সেসবের বালাই ছিল না।

আমরা সেই দুর্গন্ধকে খুব একটা পাত্তা দিতাম না। প্রায়ই নৌকায় চড়ে ঘুরতে বের হতাম। সেটাই ছিল আমাদের বিনোদন। এটা অনেকটা ধূমপান করার মতো। যে ধূমপান করছে সে হয়তো গন্ধটা পাচ্ছে না। বা তার কাছে গন্ধটা বেশ লাগছে। কিন্তু যিনি ধূমপান করছেন না তার বিষয়টা সহ্য হচ্ছে না।

আবার যিনি কোনো দিনই ধূমপান করেন নি। আপনি ধূমপান করে ভালো করে মুখ হাত ধুয়ে চুইংগাম চিবুতে চিবুতে আসলেও ঠিক ঠিক তিনি ধরে ফেলবেন। আবার আপনি যে ব্র্যান্ডের সিগারেট বা বিড়ি খান সেটা আপনার সহ্য হলেও তারচেয়ে তীব্র তামাকের গন্ধ আপনারও সহ্য হবে না।

আসলে গন্ধের নতুন অভিজ্ঞতা আমাদেরকে যতটা ধাক্কা দেয়। বা গন্ধের তীব্রতা আমাদের অনুভূতিকে যেমন অস্বস্থির মুখোমুখি করে। তেমনটা বারবার বা পুনরাবৃত্তি হলে তা করে না। বা অতোটা তীব্র প্রতিকৃয়া সৃষ্টি করে না। কারণ সে তার সঞ্চিত সংস্কারের সাথে মিল খোঁজ পেলে সেই স্মৃতিতে নিয়ে যায়।

আবার মানুষ একই জিনিসের মাঝে তার নিজের অভিজ্ঞতার গন্ধটার অনুসন্ধান করে সর্বক্ষণ। বিরিয়ানী খেতে খেতে ঢাকার আদি বাসিন্দারা বলবেই বলবে, নাহ্! এখন আর হাজির বিরিয়ানীতে আগের গন্ধটা নেই। আগে এর মৌ মৌ গন্ধে আমরা ঐ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় না খেয়ে যেতেই পারতাম না।

অন্যদিকে আপনার কাছে যে গন্ধ বা সৌরভটা চিত্তে প্রশান্তি দেয়। অন্যের কাছে সেটা অসহ্যও ঠেকতে পারে। উদাহরণ দিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়- গায়ের গন্ধের কথা।

আপনার কাছে কারো গায়ের গন্ধ অসহ্য-বিরক্তকর এমনিক ঘৃণার উদ্রেকও করতে পারে। কিন্তু তার প্রিয়জনের কাছে সেটাই হয়তো জাগতিক সকল সৌরভের সেরা ও কাঙ্খিত। শিশুর কাছে মায়ের দেহের গন্ধ যেমন সবচেয়ে আপন অনুভূত হয়।

অন্যদিকে হীন বা নিচ ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে লাভের বদলে বদনাম কুড়ানোর বিষয়টিকে বোঝাতে বাঙালী বলে ‘ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা’। আর এরই সাথে ছুঁচো নামের আরেকটি গন্ধ জীবের নাম চলে আসে। তবে ইঁদুরপ্রজাতীর এই প্রাণীটি দেহ থেকে সুগন্ধ নয় দুর্গন্ধের জন্য অধিক পরিচিত।

তেমনি প্রেয়সীয় গায়ের গন্ধ প্রেমিকের কাছে জগতের সেরা পারফিউমকেও হার মানায়। তেমনি পাশাপাশি সহবস্থানে অনেকের দেহের গন্ধ আর কটূ মনে হয় না।

আবার অনেকের দেহের গন্ধ থেকে আমরা তাদের চেনার চেষ্টা করি। জড়িয়ে ধরে সেই গন্ধের সন্ধান করি। যদি কোনো কারণে সেই গন্ধ বা সৌরভ অপরিচিত ঠেকে, তখন আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি।

অনেক প্রাণী আবার বিশেষ বিশেষ মুর্হূতে দেহ থেকে এমন সব গন্ধ নিঃসরণ করে, যাতে করে সে শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পারে।

এরকম অনেক প্রাণী থাকলেও আমাদের খুব পরিচিত পৃথিবীর টিকে থাকা আদি পোকামাকড়ের একটি হলো ‘তেলাপোকা’। তেলাপোকা বিপদের আশঙ্কা করলে এক ধরনের বিশ্রী গন্ধ ছেড়ে দ্রুত পালাতে চায়। আবার অনেক প্রাণী তার গন্ধের কারণেই ধরা পরে যায়।

এর সহজ উদাহরণ হলো ‘গন্ধগোকুল’। নিশাচর এই প্রাণীটি তার লেজের নিচের একটি গ্রন্থি থেকে অনেকটা পোলাওয়ের চালের মতো এক প্রকারের গন্ধ ছড়ায়। আর এর শিকারীরা এই গন্ধের পিছু পিছু গিয়ে তাকে পাকড়াও করে ফেলে।

একটা পূর্ণাঙ্গ কস্তুরী গ্রন্থির ওজন প্রায় ৬০-৬৫ গ্রামের মতো। কথিত আছে, এর গন্ধের স্থায়িত্ব কাল এতটাই যে, খুবই সামান্য পরিমাণ কোন স্থানে রাখলে বহু বছর পর্যন্ত সে ঘ্রাণ পাওয়া যায়। এমনটাও বলা হয়- তিন হাজার ভাগ নির্গন্ধ পদার্থের সঙ্গে কস্তুরীর এক ভাগ মেশালে সমস্তটাই কস্তুরীর ঘ্রাণে সুবাসিত হয়ে ওঠে।

কথায় বলে না, ‘উপকারী গাছের ছাল থাকে না’। ঠিক তেমনি এই গন্ধগোকুল তার গন্ধের জন্য আজ বিপন্নের পথে। যখনও কৃত্রিম গন্ধ বাজার পুরোপুরি গ্রাস করে নেয়নি। তখন এই গন্ধগোকুলের চাহিদা ছিল ব্যাপক। পারফিউম তৈরিতে গোন্ধগকুলের সুগন্ধি ‘সিভিট’ এর খুবই চাহিদা ছিল।

অন্যদিকে হীন বা নিচ ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে লাভের বদলে বদনাম কুড়ানোর বিষয়টিকে বোঝাতে বাঙালী বলে ‘ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা’। আর এরই সাথে ছুঁচো নামের আরেকটি গন্ধ জীবের নাম চলে আসে। তবে ইঁদুরপ্রজাতীর এই প্রাণীটি দেহ থেকে সুগন্ধ নয় দুর্গন্ধের জন্য অধিক পরিচিত।

ছুঁচো বা গন্ধমূষিক হলো, নলাকৃতি ইঁদুরজাতীয় একপ্রকার স্তন্যপায়ী প্রাণীবিশেষ। তার গা থেকে বের হওয়া একটা বিশ্রী চিমসে গন্ধ এর উপস্থিতি প্রমাণ করে।

প্রাণিজ গন্ধের কথা বলতে গেলে যে গন্ধের কথা না বললেই নয় তা হলো ‘মৃগনাভি’ বা ‘কস্তুরী’। বলা হয়ে থাকে, এই বিশেষ ধরনের মহামূল্যবান প্রাণিজ সুগন্ধিটি আদৌতে হরিণের নাভি থেকে পাওয়া যায়। সাধারণত হরিণের দশ বছর বয়সে নাভির গ্রন্থি পরিপক্ব হয়।

তবে সকল হরিণের নাভিতেই কস্তুরী পূর্ণতা পায় না। এক বিশেষ প্রজাতির পুরুষ হরিণের নাভিতে এই কস্তুরী জন্মায়। জানা যায়, হিমালয়ের বিশেষ অঞ্চলে উৎকৃষ্ট কস্তুরীমৃগ পাওয়া যায়।

একটা পূর্ণাঙ্গ কস্তুরী গ্রন্থির ওজন প্রায় ৬০-৬৫ গ্রামের মতো। কথিত আছে, এর গন্ধের স্থায়িত্ব কাল এতটাই যে, খুবই সামান্য পরিমাণ কোন স্থানে রাখলে বহু বছর পর্যন্ত সে ঘ্রাণ পাওয়া যায়। এমনটাও বলা হয়- তিন হাজার ভাগ নির্গন্ধ পদার্থের সঙ্গে কস্তুরীর এক ভাগ মেশালে সমস্তটাই কস্তুরীর ঘ্রাণে সুবাসিত হয়ে ওঠে।

পুরুষ হরিণের নাভি মুখের গ্রন্থিতে এক বিশেষ ধরনের কোষের জন্মায়। এই কোষ পূর্ণতা পেলে সুগন্ধ ছড়াতে শুরু করে। অনেকে বলেন, কস্তুরীর গন্ধ নাকে আসলে এই সুঘ্রাণের উৎসের সন্ধানে হরিণটি নিজেই দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে শুরু করে। অথচ সে বুঝতে পারে না এই সুঘ্রাণ আসছে তার নিজের দেহ থেকেই।

প্রত্যেক জীব প্রজাতিরই নিজস্ব এক ধরনের গন্ধ আছে। আবার একই প্রজাতির প্রত্যেক জীবেরই একে অন্যের থেকে গন্ধের ভিন্নতা থাকে। হয়তো তা সূক্ষ্মাতীসূক্ষ্ম। আবার এসব গন্ধ স্থান, কাল, পাত্র ভেদেও পার্থক্য হয়। কোন পরিবেশে আছে, কোন আবহাওয়ায় আছে সব কিছুর ভিত্তিতেই গন্ধের প্রকার নির্ভর করে।

(চলবে…)

পরবর্তি পর্ব >>

……………………
আরো পড়ুন:
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-১
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-২
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৩
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৪
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৫

গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৬
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৭
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৮
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৯

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!