গন্ধের রাজ্যে

গন্ধের রাজ্যে : অষ্টম পর্ব

-মূর্শেদূল মেরাজ

জ্ঞানেন্দ্রিয়: গন্ধ: গন্ধের রাজ্যে : অষ্টম পর্ব

ঔষধি বৃক্ষের গন্ধ সবাইকে মত্ত করে দেয়, তাই এ পর্বতের নাম গন্ধমাদন। গন্ধের রাজ্যে গন্ধমাদন এক পরিচিত নাম। সেকালের বৈদিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বলা হত হিমালয়। এ রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর যত বিভাগ ছিল, সেগুলোকে বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়েছিল। তারই একটি গন্ধমাদন।”

পৌরাণিক কাহিনী মতে- “রাবণ সীতাকে অপহরণ করলে, সীতার খোঁজে রাম-লক্ষ্মণ কিষ্কিন্ধ্যায় উপস্থিত হন। শুরু হয় রাম-রাবণের যুদ্ধ। যুদ্ধের এক সময় রাবণের নিক্ষিপ্ত শক্তিশেলের আঘাতে লক্ষ্মণ মৃতপ্রায় হলে, সুষেণের পরামর্শে বিশল্যকরণী নামক ঔষধি আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে যান।

বিবিধ গাছপালার মধ্যে পবনপুত্র হনুমান কাঙ্খিত গাছটি খুঁজে না পেয়ে, পুরো পর্বত তুলে আনেন। পরে এখান থেকে সঠিক গাছটি নিয়ে লক্ষ্মণকে জীবিত করা হয়।”

যে গন্ধ মানুষের জীবন বাঁচায় সেই গন্ধই হয় আবার মানুষের মৃত্যুরও কারণ। অনেকে এই গন্ধকে নেশা হিসেবে গ্রহণ করে। বিভিন্ন বিচিত্র সব গন্ধকে নেশা হিসেবে ব্যবহারের বিধিও নতুন কিছু নয়।

পেট্রোল-ডিজেল-অপটেন, বিভিন্ন গাছর কষ সহ বিভিন্ন পশু-পাখির চামড়ার গন্ধ নিয়ে অনেকে নেশা করে থাকেন। খুবই হাল্কা মাত্রার নেশা ও নেশার বিচারে নিম্নমানের হওয়ায় এগুলো বেশি জনপ্রিয় নয়।

তবে নাক দিয়ে গ্রহণ করা নেশার মধ্যে অন্যতম কোকেন, হিরোইন প্রভৃতি।

গন্ধের নেশায় যেমন মানুষ বুদ হয়ে যায় তেমনি আবার আলাদা আলাদা গন্ধ মানুষকে আলাদা আলাদা অনুভূতিতে নিয়ে যায়। নতুন কিছুর গন্ধ যেমন মানুষকে আনন্দে ডুবিয়ে দেয়। তেমনি আবার অনেক দিনের পরিচিত পুরানো হয়ে যাওয়া গন্ধের মাঝেও অনেক আবেগ-অনুভূতি সঞ্চিত থাকে।

নতুন বইয়ের গন্ধ যেমন অনেককে মুগ্ধ করে। তেমনি অনেকে আবার নতুন টাকার গন্ধ নিতে ভালোবাসে। অনেকে চামড়াজাত পণ্যের গন্ধ নিতে ভালোবাসে। মাটির সোঁদা গন্ধও ভালো লাগে অনেকের। আর সেই মাটির সোঁদা গন্ধ নিয়ে রচিত হয়েছে বহু কাব্য-উপন্যাস-গল্প-গাঁথা।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় তার ‘প্রচ্ছন্ন স্বদেশ’ কবিতায় লিখেছেন-

ছেড়ে চলো খুঁটিমারি, মেহগনি-রুদ্রাক্ষের বন
খাট ও পালঙ্ক, কাচ-ক্রকারিজ, চিরুনি চুল
ছেড়ে চলো সুবাতাস, সোঁদা গন্ধ, কাদা মাটিময়
জঙ্গল, যা পাখিহীন, পশুশূন্য, ছেড়ে চলো তাকে
এভাবেই যেতে হয়, যা তোমাকে পরিত্যাগ করে
তাকে ছেড়ে।

বিজ্ঞানের ভাষায় বলে, এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া থেকে একটা যৌগপদার্থ জন্মায় তার ফলেই এই গন্ধ আমাদের নাকে আসে।

জানা যায়, ১৯৬৫ সালে বিজ্ঞানীরা জিওস্মিন নামে একটি রাসায়নিক যৌগপদার্থের সন্ধান পান। গবেষণায় বলে, এই যৌগপদার্থটি বাতাসে একশ কোটি ভাগের এক ভাগ থাকলেও এর গন্ধ পাওয়া যায়।

যে ব্যাক্টিরিয়ায় জিওস্মিন তৈরি হয় সেগুলো মাটিতে থাকে। বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেলে বা বৃষ্টির পানি মাটিতে পরলে মৃত কোষগুলো থেকে জিওস্মিন বেরিয়ে আসে। তখন সে গন্ধটা পাওয়া যায়।

অনেকে আবার এই সোঁদা গন্ধের মাটিকে বাষ্প-পাতন করে চন্দন তেলে সাথে মিশিয়ে বানায় এক বিশেষ তেল। যা ‘মাটির তেল’ বা ‘মিট্টির তলে বা আতর’ নামে পরিচিত।

ক্ষুদার্থের কাছে সবচেয়ে পছন্দের ‘গরম ভাতের গন্ধ’। এক থালা গরম ভাতের উপর একটু গাওয়া ঘি বাঙালীকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সব দিয়ে। যে দিনগুলোতে বাঙালী বাঙালীই ছিল। বিদেশী হয়ে যায় নি। এমনকি ব্রিটিশরাজের সময়ও না। অথচ। যাক সে কথা।

গন্ধ যে মানুষ কেবল বস্তু-ব্যক্তিতে খোঁজে তাও না। অনেকে আবার গন্ধের সূত্র ধরে পরিচয় অন্বেষণের চেষ্টায় রত হন। ভাষার ভেতর খুঁজে পান আঞ্চলিকতার গন্ধ। এই গন্ধ এমনি গন্ধ যে গন্ধ যে মানুষ মানুষের শিকড়ে প্রবেশ করতে চায়। আবার এই স্বভাব থেকে মুক্ত হতে ভক্ত গুরুর কাছে বলে-

মনে বাবলা পাতার কষ লেগেছে
উঠবে কী আর সাবানে
গুরু আমার মনের ময়লা যাবে কেমনে?

স্বভাব যায় না রে ধুলে
খাইসলত যায় না রে মলে।
ছুঁচোর গায়ের গন্ধ যায় কী
গোলাপ জল দিলে (বাবা গো)
ও আমার মনপাখিটা বেজায় খেপা (মন রে)
ধর্মকথা কই শোনে?

অন্য কালি সে তো ধুলে যায়
আর মনের কালি বিষম কালি
গুরু গো সে তো ধুবার নয়।
ও আমার কালো রং কী গৌড় হবে
কাঁচা হলুদ গায় মাখিলে?

অন্যদিকে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতায় গন্ধের ভেতর দিয়ে তরতাজা স্মৃতির যে রোমন্থন করেছেন তা সেই ঘটনার সাথে যে সম্পর্কিত নয় সেও সেই নির্মমতার গন্ধ ঠিকই টের পায়। রুদ্র লিখছেন-

“আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে-
এ-দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?”

আবার ক্ষুদার্থের কাছে জগতের সকল গন্ধের চেয়ে প্রিয় গন্ধ হলো গরম ভাতের ধোয়া উঠা গন্ধ। কারো বা আবার পুরানো বই, পুরানো পোশাকের গন্ধ ভালো লাগে।

দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিসের গন্ধের মাঝেও অনেকে নিজস্বতা খুঁজে পায়। অনেক দিনের বন্ধ বাক্স-পেটরা খুলে সেই সব পুরানো গন্ধ মানুষকে নিয়ে যায় স্মৃতির ভেলায়।

আবেগের চূড়ান্ত হয়ে মানুষজন সেসব জিনিস যতই তুচ্ছ হোক না কেনো তা ফেলে দিতে পারে না। সংরক্ষণ করে রাখে সেই পরিচিত গন্ধটাকে সংরক্ষণ করবার জন্য। এভাবে একই সাথে গন্ধের স্মৃতি সংস্কারে ভাণ্ডারে যেমন সঞ্চিত রাখে তেমনি তার স্থূলরূপটাও সংরক্ষণ করে রাখতে চায় নিজের কাছে।

এই যে আমরা যা পাই তাই আমাদের সংস্কারে সঞ্চয় করে রাখি সে প্রসঙ্গে সাহিত্যের পাতায় বিচক্ষণ চরিত্র বলে খ্যাত স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের জগৎ বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের একটা সংলাপের অংশ উল্লেখ করলে বুঝতে সুবিধা হবে।

যখনই এই শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া স্বাভাবিকতা হারায় তখন মানুষ অসুস্থ হয়ে পরে। আর এর থেমে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে স্থূলদেহ থেকে চলে যায় বা ফিরে যায় জীবনরত্ন ‘প্রাণবায়ু’। আর এই শ্বাস-প্রশ্বাসেই মনুষকে প্রতিনিয়ত জুড়ে রাখে প্রকৃতির সাথে। আরেকটু বিশাল করে বলতে গেলে বলতে হয়, ‘ব্রহ্মাণ্ডের সাথে’।

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল জগৎ বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস বন্ধু ওয়াটসনকে ‘রক্ত সমীক্ষা’ গল্পের এক জায়গায় বলছেন- “দেখ, আমি মনে করি মানুষের মস্তিষ্ক গোড়ায় একটা ছোট শূন্য চিলেকোঠার মত। সেখানে পছন্দসই আসবাব জমানোই উচিত। একমাত্র বোকা লোকই যা কিছু পায় তাই সেখানে জমা করে।

ফলে যে জ্ঞান তার পক্ষে দরকারী সেইটেই হয়ে ভীড়ে হারিয়ে যায়, না হয় অন্য সব জিনিসের সঙ্গে এমনভাবে তালগোল পাকিয়ে যায় যে দরকারের সময় তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মস্তিষ্কের কুঠুরিতে কি রাখবে না রাখবে সেবিষয়ে দক্ষ কারিগর কিন্তু ভারী সতর্ক।

কাজের জন্য দরকারী যন্ত্রপাতি ছাড়া আর কিছু সে সেখানে রাখে না। আর সে যন্ত্রপাতিও সংখ্যায় অনেক বলে সেগুলিকে সে বেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখে। ঐ ছোট কুঠুরিটার বর্ধনশীল দেওয়ালে আছে এবং সেটাকে যতদূর খুশি বাড়ানো যায় এ ধারণা কিন্তু ভুল।

ঠিক জানবে, এমন একসময় আসে যখন নতুন কোন জ্ঞান পেতে হলেই পুরনো জ্ঞান কিছুটা ছাড়তে হবেই। কাজেই অদরকারী ঘটনা যাতে দরকারী ঘটনাকে মন থেকে ঠেলে সরিয়ে না দেয় সেদিকে দৃষ্টি রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

মানুষ নাক দিয়ে যে কেবল ঘ্রাণই নেয় তা তো নয়। জীবন ধারণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রাণবায়ু তা সে নাক দিয়েই শ্বাস-প্রশ্বাসের ভেতর দিয়ে নিয়ে থাকে। আর কথায় তো আছেই, ‘যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ’। তাই একটা জীবনের শেষ নি:শ্বাস নেয়ার আগে পর্যন্ত তা চলতেই থাকে।

যখনই এই শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া স্বাভাবিকতা হারায় তখন মানুষ অসুস্থ হয়ে পরে। আর এর থেমে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে স্থূলদেহ থেকে চলে যায় বা ফিরে যায় জীবনরত্ন ‘প্রাণবায়ু’। আর এই শ্বাস-প্রশ্বাসেই মনুষকে প্রতিনিয়ত জুড়ে রাখে প্রকৃতির সাথে। আরেকটু বিশাল করে বলতে গেলে বলতে হয়, ‘ব্রহ্মাণ্ডের সাথে’।

সাধককুল বলেন, তুমি যে শ্বাসের মধ্য যে বায়ু দেহের মধ্যে নিচ্ছো। আবার দেহের বায়ু বাইরে ফেলে দিচ্ছো বা ছুড়ে দিচ্ছো প্রকৃতিতে। তুমি যদি ভেবে থাকো এর মাধ্যমে তুমি প্রকৃতির প্রতি দয়া করছো। তাহলে বিষয়টা তুমি ভুল ভাবছো।

(চলবে…)

পরবর্তি পর্ব >>

……………………
আরো পড়ুন:
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-১
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-২
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৩
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৪
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৫

গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৬
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৭
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৮
গন্ধের রাজ্যে: পর্ব-৯

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!