সৃষ্টিতত্ত্ব রহস্য ব্রহ্মাণ্ড জগৎ মহাজগত মহাবিশ্ব

-আরজ আলী মাতুব্বর

ধর্মীয় মতে, বিশ্বে বিশালতায় মাতা বসুন্ধরার সমকক্ষ আর কেহ নাই এবং তাহাররকোনো দোসর নাই। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, বিশাল বিশ্বে আমাদের বসুমাতা একটি বালুকণা সদৃশও নহেন এবং বসুমাতা তাঁহার পিতার একমাত্র কন্যাও নহেন। হঁহারা সহোদর ভাই-ভগিনীতে বর্তমানে এগারো জন, অর্থাৎ এগারো গ্রহ।

বহুদিন পূর্ব হইতেই মানুষ কয়েকটি গ্রহের সন্ধান জানিত। তাহারা নক্ষত্র হইতে গ্রহদের পার্থক্য করিত শুধু উহাদের আলোতে ও গতিতে। তাহারা দেখিত যে, নক্ষত্রদের আলো মিটমিট করে আর গ্রহদের আলো স্থির এবং নক্ষত্ররা আকাশের বিশেষ স্থানে স্থায়ীভাবে বাস করে, কিন্তু গ্রহরা চলাফেরা করে।

ইহা ভিন্ন গ্রহদের সম্বন্ধে তাহাদের আর বেশি কিছু জানা ছিল না।

বিজ্ঞানী জিনস ও জেফরিজ-এর মতে-প্রায় তিন শত কোটি বৎসর আগে (কোনো কোনো মতে পাঁচ শত কোটি বৎসর) কোনো একটি নক্ষত্র সূর্যের খুব নিকট দিয়া চলিয়া যাওয়ায় তাহার আকর্ষণে (কোনো মতে কেন্দ্রপসারণী শক্তির প্রভাবে) সূর্যের দেহের খানিকটা অংশ বিচ্ছিন্ন হইয়া যায় এবং তাহা হইতে পৃথিবীসহ এগারোটি গ্রহের সৃষ্টি হয়।

পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, সূর্য একটি অগ্নিপিণ্ড, উহার কেন্দ্রীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা চারি কোটি ডিগ্রী সে. এবং বাহিরের অংশের তাপমাত্রা ছয় হাজার ডিগ্রী সে.। তাই গ্রহগণের জন্ম হইবার সময়ে তাহাদের কাহারও দেহের তাপ ছয় হাজার ডিগ্রীর কম ছিল না।

আয়তন ও সূর্য হইতে দূরত্বের তারতম্যানুসারে দেহের তাপ ত্যাগ করিয়া কালক্রমে গ্রহরা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় পৌঁছিয়াছে। সে যাহা হউক, আকাশ বিজ্ঞানীগণ গ্রহদের বর্তমান অবস্থার যে বিবরণ দিতেছেন, তাহার কিছু আলোচনা করিতেছি।

সচরাচর দেখা যায় যে, একই পিতার ঔরসজাত সন্তানদের মধ্যে আকৃতি ও প্রকৃতিগত কিছু না কিছু সাদৃশ্য থাকেই। বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রহরা একই পিতার ঔরসজাত সন্তান। তাই যদি হইয়া থাকে, তবে উহাদের আকৃতি ও প্রকৃতিতে কিছু না কিছু সাদৃশ্য থাকা উচিত। এখন দেখা যাক যে, উহা কতদূর আছে।

বুধ

গ্রহ মাত্রই গোলাকার। কিন্তু সম্পূর্ণ গোল কেহই নহে। প্রত্যেক গ্রহেরই মেরুপ্রদেশ চাপা এবং এক গোলাকার কক্ষপথে নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু কোনো গ্রহের ঐ পথটি সম্পূর্ণ গোল নহে, দুইদিকে কিঞ্চিৎ চাপা, অর্থাৎ ডিম্বাকার; সূর্য আছে উহার কেন্দ্রবিন্দু হইতে একদিকে সামান্য সরিয়া।

ইহাতে গ্রহগণ চলিবার সময়ে সূর্য হইতে উহাদের দূরত্ব সমান থাকে না, বাড়ে ও কমে। বুধ সূর্যের নিকটতম গ্রহ। সূর্য হইতে বুধ গ্রহের মোটামুটি দূরত্ব ৩ কোটি ৬০ লক্ষ মাইল। কিন্তু এই দূরত্ব বৃদ্ধি পাইয়া কোনো সময়ে হয় ৪ কোটি ৩৫ লক্ষ মাইল, আবার কমিয়া হয় ২ কোটি ৮৫ লক্ষ মাইল।

বুধ গ্রহের ব্যাস ৩,০০৮ মাইল। ইহা পৃথিবীর ব্যাসের অর্ধেকেরও কম। আয়তনে বুধ পৃথিবীর তুলনায় ০.০৬; অর্থাৎ প্রায় ১৭টি বুধ একত্র করিলে তবে পৃথিবীর সমান হইতে পারে। আয়তনে বুধ সকল গ্রহের মধ্যে ছোট, এমনকি বৃহস্পতির দুইটি চাঁদের চেয়েও ছোট। বুধ গ্রহের আহ্নিক।

গতি অতি ধীর, দিন ও বৎসর সমান। উহার এক অংশে চিরকাল দিন ও অপর অংশে চিরকাল রাত্রি। আমাদের চন্দ্র যেমন তাহার এক অংশ পৃথিবীর দিকে রাখিয়া পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করিতেছে, বুধও তেমনি তাহার এক অংশ সূর্যের দিকে রাখিয়া গড়ে প্রতি সেকেণ্ডে ২৯.৭ মাইল বেগে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতেছে।

এই বেগ সব সময়ে সমান থাকে না। বুধ যখন সূর্যের কাছে থাকে, তখন তাহার চক্রবেগ হয় প্রতি সেকেণ্ডে ৩৬ মাইল এবং যখন দূরে থাকে, তখন হয় ২৪ মাইল। এইভাবে চলিয়া সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করিতে বুধের সময় লাগে পৃথিবীর হিসাবে ৮৮ দিন।

যে গ্রহ সূর্যের যত নিকটে, তাহার কক্ষভ্রমণের গতিবেগ তত বেশি এবং যে গ্রহ যত দূরে, তাহার গতিবেগ তত কম। যেমন সূর্য হইতে বুধের দূরত্ব ৩ কোটি ৬০ লক্ষ মাইল এবং তাহার কক্ষভ্রমণের গতিবেগ সেকেণ্ডে প্রায় ৩০ মাইল। আর প্লুটোর দূরত্ব ৩৬৭ কোটি মাইল এবং তাহার কক্ষভ্রমণের গতিবেগৃ সেকেণ্ডে প্রায় ৩ মাইল মাত্র।

বুধ গ্রহ খুব ছোট বলিয়া তাহার কোনো উপগ্রহ নাই। বুধ সূর্যের খুব নিকটের গ্রহ বলিয়া উহার তাপমাত্রা অত্যধিক, এমনকি ফুটন্ত জলের চেয়েও বেশি। বুধের দেহ যে, সকল মাল মশলায় তৈয়ারী, তাহার গড় ওজন অর্থাৎ বস্তুগুরুত্ব (জলের অনুপাতে) ৩.৭৩।

পৃথিবীর চেয়ে বুধ হাল্কা পদার্থের তৈয়ারী। স্মরণ রাখা দরকার যে, পৃথিবীর বস্তুগুরুত্ব ৫.৫২।

বিশ্বের যে কোনো পদার্থ অপর কোনো পদার্থকে তাহার নিজের কেন্দ্রের দিকে টানে। এই টানকে বলা হয় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি। যে পদার্থের ভর যত বেশি, তাহার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তত বেশি। ঐ শক্তির বলেই পৃথিবী আমাদিগকে টানিয়া রাখিতেছে।

বিজ্ঞানীগণ বলেন যে, বুধ ঠিক ঔরসজাত না হইলেও সূর্যের পুত্রস্থানীয়। কেননা সূর্যের দেহ হইতেই বুধ জন্মলাভ করিয়াছে। কিন্তু হিন্দুদের পুরাণে বলে অন্য কথা। পুরাণে বলে- চন্দ্রের ঔরসে ও তারার গর্ভে বুধের জন্ম হয় এবং বুধ ইলা নাম্নী এক রমণীকে বিবাহ করে।

উপর দিকে বন্দুক বা কামান হুঁড়িলে তাহার গুলি বা গোলা যতই উপরে উঠুক না কেন, পৃথিবী তাহাকে টানিয়া ভূপাতিত করেই। যেহেতু কোনো গুলি বা গোলার বেগ সাধারণত সেকেণ্ডে ২-৩ মাইলের বেশি নহে, তাই উহারা পৃথিবীর আকর্ষণকে অতিক্রম করিয়া যাইতে পারে না।

কিন্তু কোনো গোলা বা গুলি বেগ যদি প্রতি সেকেণ্ডে ৭ মাইল হয়, তবে উহাকে পৃথিবী টানিয়া ফিরাইতে পারে না। তখন উহা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সীমা ছাড়াইয়া মহাকাশে চলিয়া যায়। এই রকম বেগকে বলা হয় নিষ্ক্রমণ বেগ। বুধের নিষ্ক্রমণ বেগ মাত্র ২.৪ মাইল।

সাধারণত দেখা যায় যে, কোনো পদার্থ উত্তপ্ত হইলে তাহা আয়তনে বাড়ে। উহার কারণ এই যে, উত্তপ্ত পদার্থের অণুগুলির চঞ্চলতা বাড়ে। অর্থাৎ অণুগুলির কম্পনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পরস্পর ধাক্কাধাক্কির ফলে অণুগুলি দূরে দূরে সরিয়া যায়, ইহাতে মূল বস্তুটি আয়তনে বাড়ে।

কোনো বায়বীয় পদার্থ উত্তপ্ত হইয়া উহার অণুর গতিবেগ যদি ঐ গ্রহের নিষ্ক্রমণ বেগের সমান হয়, তবে ঐ বায়বীয় পদার্থকে সেই গ্রহ টানিয়া রাখিতে পারে না। উহা মহাকাশে উধাও হইয়া যায়।

বুধ গ্রহের নিষ্ক্রমণ বেগ মাত্র ২.৪ মাইল। অত্যধিক তাপপ্রযুক্ত বুধের জল ও বায়ুর অণুগুলির গতিবেগ বুধ গ্রহের নিষ্ক্রমণ বেগের সমান বা তাহারও বেশি হইয়াছিল বলিয়া উহারা সমুদয়ই মহাকাশে উড়িয়া গিয়াছে। বুধ গ্রহে জল ও বায়ুর কোনো অস্তিত্ব নাই। কাজেই সেখানে কোনো জীব বা জীবনের অস্তিত্ব নাই।

পৃথিবীর ভ্রমণপথের ভিতরে বুধের ভ্রমণপথ। তাই মাত্র কয়েক দিনের জন্য বুধকে দেখা যায়। পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্তের পরে এবং মাত্র কয়েক দিন পূর্বের আকাশে সূর্যোদয়ের পূর্বে। তাহাও খালি চোখে নহে, দূরবীন যোগে।

বিজ্ঞানীগণ বলেন যে, বুধ ঠিক ঔরসজাত না হইলেও সূর্যের পুত্রস্থানীয়। কেননা সূর্যের দেহ হইতেই বুধ জন্মলাভ করিয়াছে। কিন্তু হিন্দুদের পুরাণে বলে অন্য কথা। পুরাণে বলে- চন্দ্রের ঔরসে ও তারার গর্ভে বুধের জন্ম হয় এবং বুধ ইলা নাম্নী এক রমণীকে বিবাহ করে।

এই ঘরে বুধের এক পুত্রও জন্মে, তাহার নাম পুরুরবা। বুধ নাকি চন্দ্রবংশের আদিপুরুষ। বেশ মনোজ্ঞ কাহিনী। মৃত কি জীবিত যেভাবেই থাকুক, বুধ এখনও আকাশে আছে। কিন্তু তাহার স্ত্রী-পুত্র কোথায় গেল, তাহার কোনো হদিস নাই।

শুক্র

বুধের ভ্রমণপথের বাহিরে শুক্রের ভ্রমণপথ। সুতরাং শুক্র বুধের প্রতিবেশী এবং পৃথিবীরও। সূর্য হইতে শুক্রের দূরত্ব বুধের দূরত্বের প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ মোটামুটি ৬ কোটি ৭০ লক্ষ মাইল। কক্ষপথের বক্রতার দরুন এই দূরত্ব বৃদ্ধি পাইয়া কোনো সময়ে হয় ৬ কোটি ৭৫ লক্ষ মাইল, আবার কমিয়া হয় ৬ কোটি ৬৫ লক্ষ মাইল।

শুক্রের ব্যাস পৃথিবীর ব্যাসের চেয়ে সামান্য কম। পৃথিবীর বিষুব অঞ্চলের ব্যাস ৭,৯২৬ মাইল, কিন্তু শুক্রের ৭,৫৭৬ মাইল। অর্থাৎ পৃথিবীর ব্যাসের চেয়ে ৩৫০ মাইল কম। আয়তনে শুক্র পৃথিকর আয়তনের প্রায় দশ ভাগের নয় ভাগের সমান। শুক্রের দেহ সব সময়ে গাঢ় ধূলির মেঘে আবৃত থাকায় উহার আহ্নিক গতি আছে কি না, তাহা এখনও জানা যায় নাই।

প্রতি সেকেণ্ডে ২১.৭ মাইল, অর্থাৎ প্রায় পৌনে বাইশ মাইল পথ চলিয়া প্রায় সাড়ে সাত মাসে শুক্র একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। সুতরাং আমাদের সাড়ে সাত মাসের সমান শুক্রের এক বৎসর। শুক্র গ্রহকে সঁঝের তারা বা পোয়াতে তারাও বলা হয়। কিন্তু প্রচলিত নাম শুকতারা। শুকতারাকে সকল সময়ে দেখা যায় না।

শুকতারার ভ্রমণপথ পৃথিবীর ভ্রমণপথের ভিতরে অবস্থিত। তাই সূর্য প্রদক্ষিণের সময়ে দেখা যায় যেন শুকতারা কখনও সূর্যের আগে আগে চলে এবং কখনও চলে পিছনে। যখন আগে আগে চলে, তখন প্রায় সাড়ে তিন মাস উহাকে দেখা যায় পূর্ব আকাশে সূর্য উদয়ের পূর্বে এবং যখন পিছনে চলে।

তখন দেখা যায় পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্তের পরে। শুক্র পূর্ব আকাশে থাকিলে তখন তাহার নাম হয় পোয়াতে তারা এবং পশ্চিম আকাশে থাকিলে বলা হয় সাঁঝের তারা।

রাত্রের আকাশে শুক্রের মতো উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক দ্বিতীয়টি নাই। কিন্তু উহার উজ্জ্বলতা সব সময়ে সমান থাকে না। তাহার কারণ এই যে, পৃথিবীর ভ্রমণপথের ভিতরে শুক্রের ভ্রমণপথ থাকায় চন্দ্রকলার ন্যায় শুক্রকলারও হ্রাস-বৃদ্ধি এবং অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হয়।

তবে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা ও তাহার কাছাকাছি সময়ে উহাকে দেখাই যায় না। যেহেতু ঐ সময়ে শুক্র সূর্যের প্রায় সাথে সাথেই উদিত হয় ও অস্ত যায়। কাজেই ঐ দুই সময়ে শুক্র থাকে সূর্যের আলোকসমুদ্রে ডুবিয়া। আর একটি কথা এইখানে জানিয়া রাখা ভালো যে,

কেহ যদি বৃহস্পতি, শনি ইত্যাদি পৃথিবীর ভ্রমণপথের বাহিরে অবস্থিত কোনো গ্রহে বসিয়া পৃথিবীর গতিবিধি লক্ষ্য করিতে থাকেন, তবে তিনি পৃথিবীকে শুকতারার মতোই দেখিবেন এবং দেখিবেন চন্দ্রকলার মতোই তাহার কলার হ্রাস বৃদ্ধি, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা।

ইহার পিতার নাম ভৃগু, তাই ইহার অপর নাম ভার্গব। আবার মতান্তরে-মহেশ্বরের উপস্থ (শিবের লিঙ্গ) দ্বার হইতে বহির্গত হইয়াছে বলিয়া ইহার নাম হইয়াছে শুক্র। ইহার ছেলেমেয়ে তিনটি। ছেলের নাম ষণ্ড ও অমর্ক এবং মেয়ের নাম দেবযানী। বলি রাজার দানে ব্যাঘাত করায় ইহার একটি চক্ষু নষ্ট হয়।

তবে সময়ের ব্যবধান হইবে। আমাদের চন্দ্রের অমাবস্যা ও পূর্ণিমার ব্যবধান প্রায় ১৪ দিন, শুক্রের প্রায় ৩ ১/২ মাস; কিন্তু পৃথিবীর অমাবস্যা ও পূর্ণিমার ব্যবধান হইবে প্রায় ৬ মাস।

শুক্রের দেহের বস্তুসমূহের আপেক্ষিক গুরুত্ব পৃথিবীর চেয়ে সামান্য কম। পৃথিবীর আপেক্ষিক গুরুত্ব ৫.৫২ এবং শুক্রের ৫.২১। ওজনে শুক্র পৃথিবীর ওজনের ১০০ ভাগের ৮১ ভাগের সমান। পৃথিবী ও শুক্রের নিষ্ক্রমণ বেগের ব্যবধান অল্পই।

পৃথিবীর ৭ ও শুক্রের ৬ ১/২ মাইল। শুক্রের তাপ পৃথিবীর তাপের চেয়ে অনেক বেশি। যেহেতু শুক্র আছে পৃথিবীর চেয়ে সূর্যের ২ কোটি ৫৭ লক্ষ মাইল নিকটে। অধিকন্তু শুক্রে জলের নামগন্ধও নাই। যেহেতু সেখানে এখনও জলের সৃষ্টি হয় নাই। শুক্রে বাতাস আছে।

কেননা শুক্রের নিষ্ক্রমণ বেগ অতিক্রম করিয়া এক কণা বাতাসও মহাকাশে পালাইতে পারে নাই। কিন্তু উহার সবই কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সেই বাতাসে আঁটি অক্সিজেন মোটেই নাই। ইহার কারণ এই যে, শুক্রে গাছপালা নাই।

উদ্ভিদেরাই কার্বন-ডাই অক্সাইড হইতে অক্সিজেন প্রস্তুত করে। আর যেখানে অক্সিজেন নাই, সেখানে কোনো জীবের অবস্থানও অসম্ভব।

বিজ্ঞানীগণ বলেন যে, দূর ভবিষ্যতে শুক্রের দেহের তাপ কমিয়া পৃথিবীর তাপের কাছাকাছি হইলে সেখানে জলের অণুর সৃষ্টি হইবে এবং উদ্ভিদাদির জন্ম হইবে। তৎপর শুক্রের বাতাসে অক্সিজেনের সৃষ্টি হইলে জীবোৎপত্তির সম্ভাবনাও আছে।

তবে তাহা কয়েক শত কোটি বৎসর পরের কথা। শুক্র আছে বর্তমান পৃথিবীর প্রায় আড়াই শত কোটি বৎসর আগের অবস্থায়।

পৃথিবীর তুলনায় শুক্র গ্রহের বর্তমান অবস্থা খুবই নিকৃষ্ট। কিন্তু ধর্মজগতে উহার কদর যথেষ্ট। শুক্রবারের আরাধনায় নাকি পুণ্য বেশি হয় এবং ঐদিন নাকি স্বর্গের দ্বার খোলা এবং নরকের দ্বার বন্ধ থাকে। পৌরাণিক মতে, শুক্র নাকি দৈত্যগণের গুরু।

ইহার পিতার নাম ভৃগু, তাই ইহার অপর নাম ভার্গব। আবার মতান্তরে-মহেশ্বরের উপস্থ (শিবের লিঙ্গ) দ্বার হইতে বহির্গত হইয়াছে বলিয়া ইহার নাম হইয়াছে শুক্র। ইহার ছেলেমেয়ে তিনটি। ছেলের নাম ষণ্ড ও অমর্ক এবং মেয়ের নাম দেবযানী। বলি রাজার দানে ব্যাঘাত করায় ইহার একটি চক্ষু নষ্ট হয়।

এই জন্য ইহার সাধারণ নাম কাণা শুক্র। সে যাহা হউক, এই সকল বাক্যালকার চটকদার বটে, কিন্তু ইহা এখন বিজ্ঞানের বাজারে বিকায় না।

পৃথিবী

ধর্মীয় মতে, পৃথিবী ঈশ্বরের এরূপ একটি বিশেষ সৃষ্টি, যাহার সমতুল্য সৃষ্টিরাজ্যে আর কিছুই নাই। কিন্তু বিজ্ঞানীগণ তাহা বলেন না। তাহারা বলেন যে, পৃথিবী নবগ্রহের একটি গ্রহ মাত্র। পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহদের মধ্যে আকৃতি ও প্রকৃতিতে বিশেষ কোনো পার্থক্য নাই।

এই বিষয়ে বিজ্ঞানীগণ যাহা বলেন, তাহার কিছু আলোচনা করিতেছি।

মেরু-পৃথিবী গোল, অথচ উত্তর ও দক্ষিণ দিকে কিঞ্চিৎ চাপা। দেখা যায় যে, অন্যান্য গ্রহের আকৃতিও ঐরূপ। যথা- পৃথিবীর ব্যাস বিষুবীয় অঞ্চলে ৭,৯২৬ মাইল ও মেরু অঞ্চলে ৭,৯০০ মাইল। ঐরূপ বৃহস্পতির ব্যাস বিষুবীয় অঞ্চলে ৮৮,৭০০ মাইল ও মেরু অঞ্চলে ৮২,৭৮০ মাইল, শনির ব্যাস বিষুবীয় অঞ্চলে ৭৫,০৬০ মাইল ও মেরু অঞ্চলে ৬৭,১৬০ মাইল ইত্যাদি।

কক্ষপথে গতি-পূর্বে আলোচনা করিয়াছি যে, যে গ্রহের ভ্রমণপথ বা কক্ষ সূর্য হইতে যত দূরে, সেই গ্রহের চলন তত ধীর এবং যে গ্রহের কক্ষপথ সূর্যের যত নিকটে, সেই গ্রহের গতি তত দ্রুত। এই বেগকে বলা হয় চক্ৰবেগ। পৃথিবীর ভ্রমণপথ শুক্র ও মঙ্গলের কক্ষপথের মধ্যে অবস্থিত।

আয়তন-গ্রহদের আয়তনে ব্যবধান যথেষ্ট আছে। কিন্তু তাহা অতুলনীয় নহে। বুধ গ্রহের আয়তন পৃথিবীর আয়তনের প্রায় ১৭ ভাগের এক ভাগের সমান। কিন্তু বৃহস্পতি পৃথিবী হইতে প্রায় ১৩ শত গুণ বড়। পক্ষান্তরে শুক্র ও পৃথিবীর আয়তন প্রায় সমান।

অর্থাৎ ৯ ও ১০-এ পার্থক্য যতখানি, শুক্র ও পৃথিবীর আয়তনে পার্থক্য তাহার চাইতে বেশি নহে।

আহ্নিক গতি-একমাত্র বুধ গ্রহ ব্যতীত অপর সকল গ্রহেরই লক্ষ্যনীয় আহ্নিক গতি আছে। তবে শুক্র, পসিডন ও ভালকান গ্রহের আছে কি না, তাহা এখনও সঠিক জানা যায় নাই। আহ্নিক গতির ফলেই গ্রহরাজ্যে দিন ও রাত্রি হইয়া থাকে। কিন্তু সকল গ্রহের দিন-রাত্রির পরিমাণ সমান নহে।

পৃথিবী আপন মেরুদণ্ডের চারিপাশে একবার ঘুরিয়া আসে ২৪ ঘণ্টায়, তাই পৃথিবীর দিন রাত্রির পরিমাণ ২৪ ঘণ্টা। এইরূপ মঙ্গল গ্রহের দিন-রাত্রির পরিমাণ ২৪ ঘন্টা ৩৭ মিনিট, বৃহস্পতির ১০ ঘণ্টা, শনির ১০ ঘণ্টা ১৬ মিনিট, ইউরেনাসের ১০ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট, নেপচুনের ১৫ ঘন্টা ৪০ মিনিট ইত্যাদি।

বার্ষিক গতি-বার্ষিক গতি গ্রহদের সকলেরই আছে। তবে তাহার সময় বিভিন্ন। যে গ্রহ সূর্যের যত নিকটে, কক্ষপথে চলিয়া সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে সেই গ্রহের সময় লাগে তত কম এবং দূরের গ্রহের সময় লাগে বেশি। এই বিষয়ে পৃথিবী তাহার প্রতিবাসী গ্রহদের সহিত তাল মিলাইয়া চলিতেছে।

যথা- সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করিতে শুক্রের সময় লাগে ২২৫ দিন, পৃথিবীর লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন এবং মঙ্গলের এক পাক শেষ করিতে সময় লাগে ৬৮৭ দিন।

কক্ষপথে গতি-পূর্বে আলোচনা করিয়াছি যে, যে গ্রহের ভ্রমণপথ বা কক্ষ সূর্য হইতে যত দূরে, সেই গ্রহের চলন তত ধীর এবং যে গ্রহের কক্ষপথ সূর্যের যত নিকটে, সেই গ্রহের গতি তত দ্রুত। এই বেগকে বলা হয় চক্ৰবেগ। পৃথিবীর ভ্রমণপথ শুক্র ও মঙ্গলের কক্ষপথের মধ্যে অবস্থিত।

কাজেই পৃথিবীর চক্রবেগ হওয়া উচিত শুক্র ও মঙ্গলের চক্রবেগের মাঝামাঝি। বস্তুত হইয়াছেও তাহাই। যথা-শুক্রের চক্রবেগ সেকেণ্ডে ২১.৭ মাইল এবং মঙ্গলের ১৫ মাইল; উভয়ের মাঝামাঝি পৃথিবীর ১৮.৫ মাইল।

কৌণিক অবস্থান-সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিবার সময় গ্রহগণ তাহাদের কক্ষপথ বা নিরক্ষবৃত্তের উপর সমান্তরালভাবে থাকে না, ঈষৎ হেলিয়া থাকে। পৃথিবীর বেলায়ও ইহার ব্যতিক্রম দেখা যায় না। যথা-পৃথিবী ২৩, মঙ্গল ২৫, বৃহস্পতি ৩, শনি ২৭ ও ইউরেনাস ৬০ ডিগ্রী কোণ করিয়া হেলিয়া আছে।[১৫]

ভূপৃষ্ঠের তাপ পরিমিত ও সহনীয়। কাজেই এইখানে জলবায়ুর সৃষ্টি হইতে পারিয়াছে এবং পৃথিবীর নিষ্ক্রমণ বেগ বেশি বলিয়া উহার সমস্তই সে ধরিয়া রাখিতে পারিয়াছে, তাই এইখানে জীবনের সৃষ্টি ও জীবের বসবাস সম্ভব হইয়াছে।

উপগ্রহ-বুধ ও শুক্র গ্রহের কোনো উপগ্রহ নাই এবং লুটো, পসিডন ও ভালকানের আছে কি না, তাহা এখনও জানা যায় নাই। অপর সমস্ত গ্রহেরই উপগ্রহ বা চন্দ্র আছে। যথা- পৃথিবীর ১টি, মঙ্গলের ২টি, বৃহস্পতির ১২টি, শনির ৯টি, ইউরেনাসের ৫টি এবং নেপচুনের চন্দ্র আছে ২টি।

স্তর-পূর্বে আলোচিত হইয়াছে যে, সৃষ্টির প্রাক্কালে পৃথিবীর ভারি পদার্থগুলি নিচের দিকে ও হাল্কা পদার্থগুলি উপরে থাকিয়া ভিন্ন ভিন্ন তিনটি প্রধান স্তরে সজ্জিত হইয়া আছে। সুতরাং ভূগর্ভে প্রধান স্তর তিনটি। যথা-কেন্দ্র হইতে গলিত ধাতু স্তর ২,২০০ মাইল, ব্যাসল্ট স্তর ১,৮০০ মাইল এবং উপরে গ্রানাইট স্তর ৩০ মাইল।

অনুরূপভাবে অন্যান্য গ্রহেরও স্তরভেদ আছে। যথা-বৃহস্পতির কেন্দ্র হইতে ২২ হাজার মাইল পাথর স্তর, ১৬ হাজার মাইল বরফ স্তর ও ৬ হাজার মাইল বায়ু স্তর; ইউরেনাসের কেন্দ্র হইতে ৭ হাজার মাইল পাথর স্তর, ৬ হাজার মাইল বরফ স্তর এবং প্রায় ৩ হাজার মাইল বায়ু স্তর ইত্যাদি।[১৬]

নিষ্ক্রমণ বেগ-পৃথিবীর নিষ্ক্রমণ বেগ ৭ মাইল। এইখানে যদি কোনো পদার্থ প্রতি সেকেণ্ডে ৭ মাইল অর্থাৎ ঘণ্টায় ২৫,২০০ মাইল গতিবেগ অর্জন করিতে পারে, তবে উহাকে পৃথিবী তাহার মাধ্যাকর্ষণী শক্তির দ্বারা টানিয়া রাখিতে পারে না, উহা মহাকাশে চলিয়া যায় বা চাঁদের মতো এক কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকে।

এই নিয়মের ভিত্তিতেই বিজ্ঞানীগণ আজকাল পরিচালনা করিতেছেন রকেটের সাহায্যে কৃত্রিম উপগ্রহ। অনুরূপ অন্যান্য গ্রহেরও ভিন্ন ভিন্ন রকম নিষ্ক্রমণ বেগ আছে। যথা-বুধের ২.৪, শুক্রের ৬.৫, মঙ্গলের ৩.২ ও বৃহস্পতির ৩৮.০ মাইল ইত্যাদি।[১৭]

ভূপৃষ্ঠের তাপ পরিমিত ও সহনীয়। কাজেই এইখানে জলবায়ুর সৃষ্টি হইতে পারিয়াছে এবং পৃথিবীর নিষ্ক্রমণ বেগ বেশি বলিয়া উহার সমস্তই সে ধরিয়া রাখিতে পারিয়াছে, তাই এইখানে জীবনের সৃষ্টি ও জীবের বসবাস সম্ভব হইয়াছে।

পৃথিবীর চাঁদ

আকাশের জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর মধ্যে সূর্য ভিন্ন দৃশ্যত চন্দ্ৰই সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও উজ্জ্বল। বস্তুত চন্দ্র একটি অনুজ্জ্বল পদার্থ এবং আয়তনেও বেশি বড় নহে। চন্দ্রের ব্যাস মাত্র ২,১৬০ মাইল। অর্থাৎ পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। তথাপি চন্দ্রকে এতোধিক বড় দেখাইবার কারণ এই যে,

অন্যান্য জ্যোতিষ্কের তুলনায় চন্দ্র পৃথিবীর অতি নিকটে অবস্থিত। চন্দ্রের নিজের কোনো আলো নাই। সূর্যালোক পতিত হইবার ফলেই উহাকে উজ্জ্বল দেখায় এবং আমরা যে চন্দ্রালোক পাইয়া থাকি, আসলে উহা চন্দ্রের আলো নহে; উহা প্রতিফলিত সূর্যালোক। অর্থাৎ চন্দ্রপৃষ্ঠে ঠিকরানো সূর্যালোক।

সেকালের লোকে চন্দ্রকে লইয়া কতরকম কাহিনীই না রচনা করিয়াছেন। চন্দ্রের কলককে কেহ বলিয়াছেন হরিণশিশু, কেহ বলিয়াছেন, ‘চাঁদের মা সুতা কাটিতেছে’ ইত্যাদি। কোনো কোনো মতে, চন্দ্রের সংখ্যা বারোটি। অর্থাৎ বারো মাসে বারো চাঁদ।

হিন্দুদের পুরাণ-শাস্ত্রমতে চন্দ্র অত্রি ঋষির পুত্র (মতান্তরে সমুদ্রমন্থনে ইহার জন্ম)। ইনি দশটি কুন্দধবল অশ্ব বাহিত রথে আকাশভ্রমণ করেন। ইনি দক্ষরাজের ২৭টি কন্যাকে বিবাহ করেন।

স্ত্রীদের প্রতি অবিচার করায় তাহারা দক্ষরাজের নিকট নালিশ করিলে তিনি যে আদেশ দেন, তাহা অমান্য করায় দক্ষরাজের অভিশাপে চন্দ্র যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন এবং প্রভাসতীর্থে গিয়া শ্বশুরের আদেশ পালন করিয়া রোগমুক্ত হন।

বিজ্ঞানীদের চন্দ্রাভিযান প্রচেষ্টা সবেমাত্র সফল হইয়াছে। চন্দ্রের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের এখনও অনেক বাকি। চন্দ্রাভিযানের এই যুগসন্ধিক্ষণে চাঁদের দেশের পুরাতন তথ্যের বেশি আলোচনা না করিয়া প্রত্যক্ষদর্শী বিজ্ঞানীদের বিবরণের প্রতীক্ষায় রহিলাম।

প্রবাদ আছে যে, চন্দ্র বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে হরণ করেন এবং তাহার গর্ভে বুধ জন্মলাভ করেন (এই মতে বুধ তারার গর্ভজাত সন্তান, তবে জারজ)।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ বলেন যে, নীহারিকা, নক্ষত্র বা গ্রহ-উপগ্রহরা সকলেই যেন ব্যোমসমুদ্রের মাঝে এক একটি দ্বীপ। সে হিসাবে আমাদের চন্দ্রও ব্যোমসাগরের একটি দ্বীপ। ইহাকে বলা যাইতে পারে চন্দ্রদ্বীপ। তবে বঙ্গদেশের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ‘বাকলা চন্দ্রদ্বীপ’ নহে, ইহা আসল চন্দ্রদ্বীপ।

কেননা বাকলার ‘চন্দ্রদ্বীপ’ নামটির সৃষ্টি হইয়াছিল উহার আবিষ্কর্তা চন্দ্ৰকান্তের নামানুসারে, মতান্তরে ঐ দ্বীপটির আকৃতি চন্দ্রের ন্যায় ছিল বলিয়া, অর্থাৎ চন্দ্ৰকান্তের দ্বীপ বা চন্দ্রের ন্যায় দ্বীপ। আর বিজ্ঞানীদের মতে চন্দ্র প্রকৃতই একটি দ্বীপ।

চন্দ্র যে রজত-কাঞ্চন বা হীরা-মুক্তার তৈয়ারী অথবা স্বর্গীয় মাহাত্মপূর্ণ আজগুবি কিছু নহে, উহা আমাদের পৃথিবীর মতোই একটি দেশ মাত্র, বিজ্ঞানীগণ ইহা বহু আগে হইতেই জানিতেন। এবং গাণিতিক ও যান্ত্রিক উপায়ে উহার বহু তথ্যও সংগ্রহ করিয়াছেন।

সম্প্রতি বিজ্ঞানীগণ সফল হইয়াছেন চন্দ্র অভিযানে। নিরাপদে ও নিয়মিতভাবে চন্দ্রে যাতায়াত আরম্ভ হইলে পর, উহার ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বহু নূতন তথ্য জানা যাইবে। হয়তোবা কোনো কোনো বিষয়ে পুরাতন তথ্যেরও কিছু কিছু সংশোধন আবশ্যক হইতে পারে।

যেমন, পূর্বে বলা হইয়াছে পৃথিবী হইতে চন্দ্রের দূরত্ব ২ লক্ষ ৩৯ হাজার মাইল, আর অধুনা জানা যাইতেছে যে, পৃথিবীর কেন্দ্র হইতে চন্দ্রের কেন্দ্রের দূরতম দূরত্ব ২,৫২,৭১০. মাইল এবং নিকটতম দূরত্ব ২,২১,৪৬৩ মাইল, অর্থাৎ গড় দূরত্ব ২,৩৭,০৮৬২ মাইল ইত্যাদি।

বিজ্ঞানীদের চন্দ্রাভিযান প্রচেষ্টা সবেমাত্র সফল হইয়াছে। চন্দ্রের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের এখনও অনেক বাকি। চন্দ্রাভিযানের এই যুগসন্ধিক্ষণে চাঁদের দেশের পুরাতন তথ্যের বেশি আলোচনা না করিয়া প্রত্যক্ষদর্শী বিজ্ঞানীদের বিবরণের প্রতীক্ষায় রহিলাম।

চাঁদে অবতরণ

বহুদিন হইতে বিজ্ঞানীগণ চাঁদে যাইবার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। চন্দ্রাভিযানের প্রথম পর্বের অগ্রদূত ছিলেন রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা। কিন্তু কেন যেন অবতরণ পর্বে তাহারা পিছাইয়া পড়িলেন, অগ্রগামী হইলেন আমেরিকান বিজ্ঞানীগণ। ১৯৬৯ সাল হইতে এই পর্যন্ত তাহারা চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করিয়াছেন ছয়বার।

সেই অবতরণসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে প্রদান করা হইল।

মানুষের চন্দ্রাভিযান সফল করিবার প্রথম গৌরব অর্জন করেন নভোশ্চর-বিজ্ঞানী আর্মস্ট্রং, আলড্রিন ও কলিনস্। উঁহারা ভূপৃষ্ঠ হইতে চন্দ্রাভিমুখে যাত্রা করিয়া ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চন্দ্রে অবতরণ ও ভ্রমণ শেষে পৃথিবীতে ফিরিয়া আসেন ২৪ জুলাই।

উঁহারা চন্দ্রপৃষ্ঠ হইতে নানা স্থানের ফটো ও কিছু মাটি-পাথর লইয়া আসেন এবং সেখানে রাখিয়া আসেন আমেরিকান ফ্ল্যাগ, বাইবেল ও বিয়ারের খালি বোতল। আর ভুলবশত ফেলিয়া আসেন একটি ক্যামেরা।

২য় বার-এইবারের অভিযাত্রী ছিলেন কনার্ড, গর্ডন ও বীন। উঁহারা ভূপৃষ্ঠ হইতে যাত্রা করেন ১৯৬৯ সালের ১৪ নভেম্বর, অবতরণ করেন ১৯ এবং পৃথিবীতে ফিরিয়া আসেন ২৪ নভেম্বর। উঁহারা রকেট বা চন্দ্রযানে একখানা গাড়ি লইয়া যান এবং উহাতে আরোহণ করিয়া চন্দ্রপৃষ্ঠে ভ্রমণ করেন ও গাড়িখানা সেখানে রাখিয়া আসেন।

৩য় বার-এইবারের অভিযাত্রী ছিলেন লভেল, হেইজ ও সুগার্ড। উঁহারা গিয়াছেন ১৯৭০ সালের ১৮ এপ্রিল এবং আনিয়াছেন চন্দ্রপৃষ্ঠের নানা স্থানের ফটো।

৪র্থ বার-এইবারের অভিযাত্রী শেফার্ড, রূসা ও মিচেল। উঁহারা গিয়াছিলেন ১৯৭১ সালের ৩০ জানুয়ারি।

৫ম বার-এইবারের অভিযাত্রী শেরম্যান, ইভা ও স্মিথ। উঁহারা গিয়াছিলেন ১৯৭২ সালের ৮ ডিসেম্বর।

৬ষ্ঠ বার-এইবারে যান স্ট্যাফোর্ড, স্লেটন ও ব্ৰাণ্ড। উঁহারা গিয়াছিলেন ১৯৭৫ সালের ২৬ জুলাই তারিখে।

[ পিয়ার্স সাইক্লোপিডিয়া, ৮০তম এডিশন; পৃ. এ ৩৩-এ ৩৬ ]

অভিযাত্রীগণ চন্দ্রপৃষ্ঠ হইতে যে মাটি, পাথর, ফটো ইত্যাদি সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছেন, সেই। সবের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলিতেছে, ফলাফল এখনও সাধারণ মানুষের অজ্ঞাত। তবে চাঁদের মাটি পরীক্ষা করিয়া বিজ্ঞানীগণ জানিতে পারিয়াছেন যে, চাঁদের বয়স পৃথিবীর বয়সের সমান।

অর্থাৎ প্রায় ৫০০ কোটি বৎসর। চাঁদে জল, বায়ু ও কোনোরূপ জীবের অস্তিত্ব নাই এবং অতীতে কোনোরূপ জীব থাকারও কোনো নিদর্শন নাই।

আগামীতে যদি জানা যায় যে, চাঁদের রাজ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে, যাহা মানব জাতির পক্ষে কল্যাণকর, তবে সেইটিই হইবে চাঁদের বাস্তব ফজিলত। ধর্মীয় তথাকথিত চাঁদের ফজিলত এখন অচল।

মঙ্গল

মঙ্গল সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ। পৃথিবীর ভ্রমণপথের বাহিরেই মঙ্গলের ভ্রমণপথ। কাজেই মঙ্গল পৃথিবীর প্রতিবেশী। সূর্য হইতে ইহার মোটামুটি দূরত্ব ১৪ কোটি ১৭ লক্ষ মাইল। কক্ষভ্রমণের সময়ে সূর্য হইতে মলের দূরত্ব কোনো সময় হয় ১২ কোটি ৮০ লক্ষ মাইল ও কোনো সময়ে হয়। ১৫ কোটি ৫০ লক্ষ মাইল।

মঙ্গলের ব্যাস ৪,২১৬ মাইল এবং আয়তনে মঙ্গল পৃথিবীর বিশ ভাগের তিন ভাগের সমান। মঙ্গলের ভ্রমণপথ পৃথিবীর ভ্রমণপথ হইতে কিছু বড় এবং মঙ্গলের চলনও কিছু ধীরগতি। স্বীয় কক্ষে পৃথিবী চলে সেকেণ্ডে ১৮ ১/২ মাইল। কিন্তু মঙ্গল চলে মাত্র ১৫ মাইল।

তাই একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে মঙ্গলের সময় লাগে ৬৮৭ দিন। অর্থাৎ মঙ্গলের এক বৎসর আমাদের পৃথিবীর প্রায় দুই বৎসরের সমান। মেরুদণ্ডের চারিদিকে একবার পাক দিতে মঙ্গলের সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা ৩৭ ১/২ মিনিট। সুতরাং মঙ্গলের দিন-রাত পৃথিবীর দিন-রাতের চেয়ে ৩৭ ১/২ মিনিট বড়।[১৮]

ফোবো ও ডাইমো নামে মঙ্গলের দুইটি উপগ্রহ বা চন্দ্র আছে। ফোবো মঙ্গলের ৫,৮২৮ মাইল দুরে থাকিয়া ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট ৪৮ সেকেণ্ডে একবার মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করিয়া আসে। অর্থাৎ মঙ্গলের আকাশে ফোবোর অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হয় দৈনিক তিনবার।

ডাইমো আছে মঙ্গল হইতে ১৫ হাজার মাইল দূরে এবং মঙ্গলকে একবার প্রদক্ষিণ করিতে তাহার সময় লাগে ৩০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট ২৪ সেকেণ্ড। পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করিতে আমাদের চাঁদের যেখানে সময় লাগে ২৯ দিন ১২ ঘন্টা ৪৪.০৫ মিনিট, অর্থাৎ প্রায় ৩০ দিন, সেখানে ডাইমোর সময় লাগে মাত্র ৩০ ঘণ্টা।

আমাদের চাঁদের অমাবস্যা ও পূর্ণিমার মাঝখানের অন্তর প্রায় ১৫ দিন, কিন্তু ডাইমোর অমাবস্যা ও পূর্ণিমার অন্তর মাত্র ১৫ ঘণ্টা। কাজেই মঙ্গলের আকাশে প্রতিরাত্রে পূর্ণিমা তো আছেই, কোনো কোনো রাত্রে ডবল পূর্ণিমাও হইয়া থাকে।

মঙ্গলের রাজ্যে যদি মানুষ থাকে, তবে তাহারা খোরাক পোশাক কি পরিমাণ পায় তাহা জানি না, কিন্তু চন্দ্রালোক আমাদের চেয়ে বেশিই পায়।

মঙ্গলের নিষ্ক্রমণ বেগ ৩.২ মাইল। এত অল্প নিষ্ক্রমণ বেগ সত্ত্বেও মঙ্গলে জলবায়ুর খবর পাওয়া যাইতেছে। জলবায়ু থাকিবার কারণ এই যে, মগলে তাপ কম। ভূপৃষ্ঠের গড় উত্তাপ প্রায় ৬৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট।

হয়তোবা তখন মঙ্গলের সাগরে মাছ, আকাশে পাখি ও স্থলে নানারূপ জীব বিচরণ করিত এবং অনুকূল অবস্থাপ্রাপ্ত হইলে শুক্রগ্রহেও জীবের আবির্ভাব হইয়া গ্রহটি জীবে পূর্ণ হইতে পারে। পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা শুক্রের রাজ্যে ভবিষ্যত কিন্তু মঙ্গলের রাজ্যে অতীত।

কিন্তু মঙ্গলের উত্তাপ বিষুবাঞ্চলে দিনের বেলা ৫০ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তাহারও কিছু বেশি; আবার মধ্যরাত্রে নামিয়া যায় হিমাঙ্কেরও ১৩০ ডিগ্রী ফারেনহাইট নিচে। মঙ্গলের উত্তাপে দিনে ও রাত্রে এত পার্থক্য হইবার কারণ এই যে, মঙ্গলের বায়ুতে জলীয় অংশ নিতান্ত কম।

পৃথিবীতে যেমন উপকূলীয় অঞ্চলের বায়ু সিক্ত বলিয়া সেখানে দিন ও রাত্রের উত্তাপে বিশেষ পার্থক্য হয় না, পক্ষান্তরে মরু অঞ্চলের বায়ু শুষ্ক বলিয়া সেখানে দিন ও রাত্রের উত্তাপে দারুণ পার্থক্য-ইহাও তেমনই।

মঙ্গলের আকাশে বায়ু খুব কম। তাহার মধ্যে আবার অক্সিজেন আছে নামমাত্র। মঙ্গলকে সহজ দৃষ্টিতে একটি উজ্জ্বল লাল রং-এর জ্যোতিষ্ক বলিয়া মনে হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন যে, মঙ্গলের গায়ের লাল রংটি উহার পৃষ্ঠদেশের মরিচা ধরা পাথর বা বালিরই রং।

শীতকালে মঙ্গলের মেরু অঞ্চল বরফে ঢাকা থাকে। তাই তখন মেরু অঞ্চলের রং হয় শাদা। গ্রীষ্মকালে মেরু অঞ্চলের শাদা রং থাকে না এবং বিষুবীয় অঞ্চলের রং হয় সবুজ। মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশে অনেক কালো কালো রেখা দেখা যায়, কোনো কোনো বিজ্ঞানী ঐগুলিকে বলেন মঙ্গলের নদী বা খাল।

গ্রীষ্মকালে মেরু অঞ্চলের বরফ গলা জল ঐ সকল খাল বা নদীপথে আসিয়া বিষুবীয় অঞ্চল সিক্ত করিলে মওশুমী উদ্ভিদ জন্মে এবং তখন মঙ্গলের গাত্রে সবুজ আভা ফুটিয়া উঠে।

সৃষ্টির আদিতে মঙ্গলের দেহের তাপ সূর্যের বহিরাবরণের তাপের সমান ছিল, অর্থাৎ ৬ হাজার ডিগ্রী সে.। কোটি কোটি বৎসরে ঐ বিপুল তাপের সম্বল হারাইয়া বর্তমানে মঙ্গলের তাপ দাঁড়াইয়াছে মাত্র ৫০° ফারেনহাইটে। সুতরাং মঙ্গল এখন মরণপথের যাত্রী।

মঙ্গল গ্রহে উচ্চ শ্রেণীর কোনো জীব আছে কি না, তাহার কোনো সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। মঙ্গল গ্রহে জল আছে, অল্প হইলেও বাতাস আছে এবং খুব সামান্য থাকিলেও তাহাতে অক্সিজেন আছে; কাজেই সেখানে জীব থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভবও নহে।

অধিকন্তু বিজ্ঞানীগণ মনে করেন যে, মঙ্গলের তাপ যখন পৃথিবীর বর্তমান তাপের সমান ছিল, তখন কোনো না কোনোরূপ জীব ও উদ্ভিদাদিতে মঙ্গল সুশোভিত ছিল।

হয়তোবা তখন মঙ্গলের সাগরে মাছ, আকাশে পাখি ও স্থলে নানারূপ জীব বিচরণ করিত এবং অনুকূল অবস্থাপ্রাপ্ত হইলে শুক্রগ্রহেও জীবের আবির্ভাব হইয়া গ্রহটি জীবে পূর্ণ হইতে পারে। পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা শুক্রের রাজ্যে ভবিষ্যত কিন্তু মঙ্গলের রাজ্যে অতীত।

বৃহস্পতি

সূর্য হইতে বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গলের মোটামুটি দূরত্ব যথাক্রমে ৩, ৬, ৯ ও ১৪ কোটি মাইল। ইহাতে দেখা যায় যে, যে কোনো দুইটি গ্রহের ব্যবধান ৫ কোটি মাইলের বেশি নহে। সুতরাং সূর্য হইতে বিশ, পঁচিশ কিংবা ত্রিশ কোটি মাইলের মধ্যে আর একটি গ্রহ থাকা উচিত।

কিন্তু জ্যোতির্বিদগণ দেখিলেন যে, একদম ৪৮ কোটি ৩৯ লক্ষ মাইল দূরে যাইয়া আছে বৃহস্পতি গ্রহ। বিজ্ঞানীগণ ভাবিলেন যে, মঙ্গল ও বৃহস্পতির ভ্রমণপথের মাঝখানে এত বড় একটি ফাঁকা জায়গা থাকিবার কোনো কারণ নাই। সুতরাং সেখানে নিশ্চয়ই একটা কিছু আছে।

বৃহস্পতি আপন কক্ষপথে চলে সেকেণ্ডে ৮.১ মাইল বেগে। এইরূপ বেগে চলিয়া একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে তাহার সময় লাগে ১১.৮৬২ বৎসর। অর্থাৎ বৃহস্পতির এক বৎসর আমাদের প্রায় ১২ বৎসরের সমান।

পর্যবেক্ষণে প্রথম ধরা পড়িল দুই একটি বস্তুপিণ্ড, যাহা আমাদের চাঁদের চেয়ে বড় নহে। জ্যোতির্বিদগণ ভাবিলেন যে, উহারা উপগ্রহ। পর্যবেক্ষণ চলিতে লাগিল এবং ক্রমে ধরা পড়িতে লাগিল ঐ দলের ছোট হইতে ছোটরা।

আকারে উহারা কোনোটি হিমালয় পর্বতের মতো বড়, কোনোটি আবার ত্রিতলা দালানের মতো। কিন্তু আকৃতি উহার কোনোটিরই সম্পূর্ণ গোল নহে। আকৃতিতে উহারা যেন ভাঙ্গা মার্বেলের এক একটি টুকরা।

বিজ্ঞানীগণ স্থির করিলেন যে, মঙ্গল ও বৃহস্পতির ভ্রমণপথের মধ্যে এককালে একটি মাঝারি ধরণের গ্রহ ছিল। হয়তো বৃহস্পতির টানে গ্রহটি ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা হইয়া গিয়াছে। উহাদের মধ্যে যেগুলি আকারে বড়, সেগুলি দূরবীনে প্রথমেই ধরা পড়িয়াছে ও অপেক্ষাকৃত ছোটগুলি ক্রমে ধরা পড়িতেছে।

কিন্তু অতি ছোট টুকরাগুলি হয়তো কোনোকালেই দৃষ্টিগোচর হইবে না। এই দৃশ্যাদৃশ্য টুকরাগুলির একযোগে নাম রাখা হইয়াছে গ্রহাণুপুঞ্জ বা গ্রহকণিকা। মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে নির্দিষ্ট কক্ষে থাকিয়া গ্রহকণিকারা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতেছে।

গ্রহকণিকাদের বাদ দিলে সৌররাজ্যে বৃহস্পতি পঞ্চম গ্রহ। সূর্য হইতে ইহার মোটামুটি দূরত্ব ৪৮ কোটি ৩৯ লক্ষ মাইল। বৃহস্পতির ব্যাস বিষুব অঞ্চলে ৮৮,৭০০ ও মেরু অঞ্চলে ৮২,৭৮০ মাইল। আয়তনে বৃহস্পতি পৃথিবী অপেক্ষা ১,৩১২ গুণ বড়।[১৯]

বৃহস্পতি আপন কক্ষপথে চলে সেকেণ্ডে ৮.১ মাইল বেগে। এইরূপ বেগে চলিয়া একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে তাহার সময় লাগে ১১.৮৬২ বৎসর। অর্থাৎ বৃহস্পতির এক বৎসর আমাদের প্রায় ১২ বৎসরের সমান।

অবস্থা গুরুতর দেখিয়া ব্রহ্মা চন্দ্রের নিকট হইতে তারাকে আনিয়া ইহাকে অর্পণ করিলে যুদ্ধ স্থগিত হয়। অতঃপর বৃহস্পতির ঔরসে কচ ও ভরদ্বাজ নামে দুইটি পুত্রেরও জন্ম হয়। সে যাহা হউক, বর্তমান যুগে এই সমস্ত কাহিনী কীটদষ্ট পুরাণের পাতায় চাপা পড়িয়াই আছে।

আমাদের পৃথিবীর চন্দ্র আছে একটি এবং মঙ্গলের আছে দুইটি। কিন্তু বৃহস্পতির চন্দ্র আছে। বারোটি। নিকটের চন্দ্রটির নাম আইও। এইটি বৃহস্পতি হইতে ২ লক্ষ ৬১ হাজার মাইল দূরে থাকিয়া ১.৭৭ দিনে একবার বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করিয়া আসে।

অর্থাৎ প্রায় ৪২ ঘণ্টায় আইওর একবার অমাবস্যা ও একবার পূর্ণিমা হইয়া থাকে। বৃহস্পতির দ্বিতীয় চন্দ্রটির নাম ইওরোপা। এইটি বৃহস্পতির ৪ লক্ষ ১৫ হাজার মাইল দূরে থাকিয়া ৩.৫৫ দিনে একবার বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করিয়া থাকে।

অর্থাৎ ইওরোপা একবার অমাবস্যা ও একবার পূর্ণিমা দেখায় প্রায় ৩ ১/২ দিনে। বৃহস্পতির বারোটি চাঁদের মধ্যে এগারোটির দূরত্ব জানা গিয়াছে। ইহার শেষ চাঁদটি আছে বৃহস্পতি হইতে ১,৪০,২৪,৮০০ মাইল দূরে এবং ৬৯২.৫ দিনে একবার বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করে।

অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় দুই বৎসরের সমান ঐটির এক চান্দ্রমাস।[২০]

দেখা যায় যে, খুব মোটা মানুষের গায়ের ওজন তত বেশি হয় না। বৃহস্পতিরও সেই দশা। আয়তনের বিশালতায় বৃহস্পতি গ্রহকুলের রাজা বটে। কিন্তু তাহার ওজন তত বেশি নহে। পৃথিবীর বস্তুগুরুত্ব ৫.৫২। কিন্তু বৃহস্পতির বস্তুগুরুত্ব মাত্র ১.৩৪।

অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় এক চতুর্থাংশের সমান। তাই আয়তনে বৃহস্পতি ১,৩১২টি পৃথিবীর সমান হইলেও, ওজন মাত্র ৩১৭ গুণ।

বৃহস্পতির তাপ হিমাঙ্কেরও নিচে, জল আছে বরফের আকারে ও বাতাস আঁটি অক্সিজেনের পরিবর্তে নানাবিধ বিষাক্ত বাষ্পে পরিপূর্ণ। সুতরাং সেখানে কোনোরূপ জীব বা জীবনের অস্তিত্ব থাকিতে পারে না।

হিন্দুদের পুরাণমতে-বৃহস্পতি দেবগণের গুরু ও মন্ত্রী। ইনি অঙ্গিরা ঋষির পুত্র। ইঁহার স্ত্রীর নাম তারা। চন্দ্র তারাকে হরণ করিলে ইনি দেবগণের সহায়তায় চন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করেন। আবার চন্দ্রও দৈত্যগণের সহায়তায় যুদ্ধে প্রস্তুত হয়।

অবস্থা গুরুতর দেখিয়া ব্রহ্মা চন্দ্রের নিকট হইতে তারাকে আনিয়া ইহাকে অর্পণ করিলে যুদ্ধ স্থগিত হয়। অতঃপর বৃহস্পতির ঔরসে কচ ও ভরদ্বাজ নামে দুইটি পুত্রেরও জন্ম হয়। সে যাহা হউক, বর্তমান যুগে এই সমস্ত কাহিনী কীটদষ্ট পুরাণের পাতায় চাপা পড়িয়াই আছে।

শনি

বৃহস্পতির ভ্রমণপথের বাহিরে শনির ভ্রমণপথ। সূর্য হইতে ইহার দূরত্ব ৮৮ কোটি ৭১ লক্ষ মাইল। শনি গ্রহের ব্যাস বিষুব অঞ্চলে ৭৫,০৬০ মাইল ও মেরু অঞ্চলে ৬৭,১৬০ মাইল। পৃথিবীর মতোই ইহার মেরুদেশ চাপা। বৃহস্পতিকে বাদ দিলে এত বড় গ্রহ সৌরাকাশে আর নাই। আয়তনে শনি ৭৩৪টি পৃথিবীর সমান।

বৃহস্পতির ভ্রমণপথের চেয়ে শনির ভ্রমণপথ বড় এবং শনি চলে সেকেণ্ডে মাত্র ছয় মাইল গতিতে। এইরূপ বেগে চলিয়া একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে শনির সময় লাগে ২৯.৪৫৮ বৎসর। অর্থাৎ শনির এক বৎসর আমাদের প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ বৎসরের সমান।

শনি নিজ মেরুদণ্ডের চারিদিকে একবার পাক দিতে পারে ১০ ঘণ্টা ১৬ মিনিটে। সুতরাং দিন-রাতের পরিমাণ প্রায় সোয়া দশ ঘণ্টা মাত্র। শনি ও বৃহস্পতির দিন-রাতের পার্থক্য বেশি নহে, মাত্র ১৬ মিনিট। কিন্তু পৃথিবীর এক দিন শনির প্রায় আড়াই দিনের সমান।

শনির চাঁদ আছে নয়টি। উহারা ভিন্ন ভিন্ন দূরত্বে থাকিয়া বিভিন্ন সময়ে শনিকে প্রদক্ষিণ করে। খুব কাছের চাঁদটির নাম মিমাস, এইটি শনির ১ লক্ষ ১৭ হাজার মাইল দূরে থাকিয়া ০.৯৪ দিনে একবার শনিকে প্রদক্ষিণ করে। সুতরাং একদিনের মধ্যেই উহার অমাবস্যা ও পূর্ণিমা হইয়া যায়।

অতঃপর মহাদেবের পুত্র গণেশের জন্ম হইলে অন্যান্য দেবতার সহিত শনি গণেশকে দেখিতে যায় এবং দৃষ্টিপাত করিতেই গণেশের মুণ্ড উড়িয়া যায়। তৎক্ষণাৎ একটি হাতির মুণ্ড আনিয়া গণেশের স্কন্ধে লাগাইলে গণেশ বাঁচিয়া যায় এবং তাহাতে গণেশ ‘গজানন’ অর্থাৎ ‘হস্তিমুণ্ড’ হয়।

সর্বশেষ চাঁদটির নাম ফিবি (Phoebe)। এইটি শনির ৮,০৫৪ হাজার মাইল দূরে থাকিয়া ৫৫০.৪৫ দিনে একবার শনিকে প্রদক্ষিণ করে। সুতরাং পৃথিবীর প্রায় দেড় বৎসরের সমান ফিবি’র এক চান্দ্রমাস।

নয়টি চাঁদ শনিকে ঘিরিয়া পাক খাইতেছে। ইহা ভিন্ন আর একটি পদার্থ শনিকে ঘিরিয়া আছে, উহাকে বলা হয় শনির বলয়। শনির দেহ হইতে কিছু দূরে গাড়ির চাকার মত একটি উজ্জ্বল পদার্থ সব সময়ই শনিকে ঘিরিয়া রাখিয়াছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ বলেন যে, শনির একটি উপগ্রহ এককালে শনির খুব কাছাকাছি হইয়াছিল। তাই তাহার প্রবল আকর্ষণে ঐটি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যায় এবং বিচূর্ণ কণাগুলি উহার ভ্রমণপথে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ে।

ভগ্ন উপগ্রহটির ন্যায় কণাগুলিরও গতিবেগ থাকায় উহারা শনির টানে তাহার পৃষ্ঠদেশে পতিত না হইয়া নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকিয়া শনিকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকে। কোটি কোটি কণা। ঘেঁষাঘেঁষি করিয়া চলিতে থাকায় দূর হইতে আমরা উহাদিগকে বলয়ের আকারে দেখি।

শনির নিষ্ক্রণ বেগ সেকেণ্ডে ২৩ মাইল এবং তাপ হিমাঙ্কেরও ১৫৫° সে. নিচে। এই তাপে এতোধিক নিষ্ক্রমণ বেগ অর্জন করিয়া শনির কোনো বায়বীয় পদার্থই মহাশূন্যে ছুটিয়া পলাইতে পারে নাই।

সুতরাং হাইড্রোজেনাদির সংমিশ্রণে শনির বায়ুমণ্ডল নিশ্চয়ই বিষাক্ত এবং জলের নাম পর্যন্ত নাই, আছে শুধু বরফ, সুতরাং সেখানে জীব বা জীবনের অস্তিত্ব নাই। শনি একটি নির্জীব গ্রহ।

হিন্দুশাস্ত্র মতে-সুর্যের ঔরসে তৎপত্নী ছায়ার গর্ভে শনির জন্ম হয়। যমের হিসাবলেখক কর্মচারী চিত্রগুপ্তের কন্যার সহিত শনির বিবাহ হয়। একদা তাহার স্ত্রীর সহিত ঝগড়া হইলে স্ত্রী তাহাকে এই বলিয়া অভিশাপ দেয় যে, সে যাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে, তাহাই বিনষ্ট হইবে।

অতঃপর মহাদেবের পুত্র গণেশের জন্ম হইলে অন্যান্য দেবতার সহিত শনি গণেশকে দেখিতে যায় এবং দৃষ্টিপাত করিতেই গণেশের মুণ্ড উড়িয়া যায়। তৎক্ষণাৎ একটি হাতির মুণ্ড আনিয়া গণেশের স্কন্ধে লাগাইলে গণেশ বাঁচিয়া যায় এবং তাহাতে গণেশ ‘গজানন’ অর্থাৎ ‘হস্তিমুণ্ড’ হয়।

ঐ সকল কাহিনী গাঁজার পর্যায়ে পড়িলেও শাস্ত্রকারের কল্পনার মূল্য আছে এবং সেজন্য শাস্ত্রকার ধন্যবাদের পাত্র।

ইউরেনাস

পূর্বে আলোচিত ছয়টি গ্রহ এবং পৃথিবীর একটি উপগ্রহ সম্বন্ধে আগেকার জ্যোতিষীদের কিছু কিছু তত্ত্ব জানা ছিল। বাকি গ্রহ-উপগ্রহগুলি দূরবীন তৈয়ারীর পরের আবিষ্কার। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দূরবীন আবিষ্কারের সাথে সাথে গ্রহ-উপগ্রহদের সংখ্যা বাড়িয়াছে, হয়তো ভবিষ্যতে আরও বাড়িতে পারে।

শনির ভ্রমণপথের বাহিরে ইউরেনাসের ভ্রমণপথ। ইহার ব্যাস ৩২,৮৮০ মাইল, পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় চারিগুণ। সূর্য হইতে ইহার দূরত্ব ১৭৮ কোটি মাইল এবং প্রতি সেকেণ্ডে ৪.২ মাইল বেগে চলিয়া ৮৪.০১ বৎসরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।

অর্থাৎ ইউরেনাসের এক বৎসর পৃথিবীর প্রায় ৮৪ বৎসরের সমান। ইউরেনাস নিজ মেরুদণ্ডের উপরে একবার আবর্তিত হয় ১০ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে। সুতরাং ইউরেনাসের দিন-রাত শনির দিন-রাতের চেয়ে ২৯ মিনিট বড়।

এই পর্যন্ত ইউরেনাসের পাঁচটি চাঁদের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। নিকটবর্তী চাঁদটির নাম আরিয়েল। এই চাঁদটি ১ লক্ষ ২০ হাজার মাইল দূরে থাকিয়া প্রায় আড়াই (২.৫২) দিনে ইউরেনাসকে একবার প্রদক্ষিণ করে। দূরতম চাঁদটির নাম মিরাণ্ডা।

এই চাঁদটির দূরত্ব কত, তাহা এখনও নিণীত হয় নাই। তবে ইউরেনাসকে একবার প্রদক্ষিণ করিতে ইহার সময় লাগে প্রায় দেড় (১.৪০) দিন।

ইউরেনাসের দেহের বস্তুপুঞ্জের গড় গুরুত্ব ১.২৭ এবং আয়তন ৬৪টি পৃথিবীর সমান। কিন্তু ওজনে ইউরেনাস ১৫টি পৃথিবীর সমানও নহে, পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ১৪.৭ গুণ।

ইউরেনাসের নিষ্ক্রমণ বেগ ১৪.০০ মাইল। ইহা পৃথিবীর নিষ্ক্রমণ বেগের দ্বিগুণ। সুতরাং ইউরেনাসের আকাশের কোনো বায়বীয় পদার্থের একটি অণুও ইউরেনাসকে ছাড়িয়া পলাইতে পারে নাই। ইহার তাপ হিমাঙ্কের ১৮০° সে. নিচে। কাজেই সেখানে একবিন্দু জলও নাই, সমস্তই বরফ হইয়া আছে।

ইউরেনাসের জলবায়ু মোটামুটি শনিগ্রহের জলবায়ুর অনুরূপ। সুতরাং সেখানে কোনোরূপ জীব থাকিতে পারে না।

নেপচুন

ইউরেনাসের পরেই নেপচুনের ভ্রমণপথ। দূরত্ব সূর্য হইতে ২৭৯ কোটি ৭০ লক্ষ মাইল। আয়তনে নেপচুন ৬০টি পৃথিবীর সমান। আপেক্ষিক গুরুত্ব ১.৫৮ মাত্র। কাজেই আয়তনের তুলনায় নেপচুনের ওজন কম, প্রায় ১৭টি পৃথিবীর সমান (১৭.২)।

প্রতি সেকেণ্ডে ৩.৪ মাইল পথ চলিয়া প্রায় ১৬৫ (১৬৫.৭৮৮) বৎসরে নেপচুন একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। সুতরাং পৃথিবীর ১৬৫ বৎসরের সমান নেপচুনের এক বৎসর। বৎসরটি এত বড় হইলেও নেপচুনের দিন-রাত পৃথিবীর দিন-রাতের চেয়ে ছোট, মাত্র ১৫ ঘণ্টা ৪০ মিনিট।[২১]

ট্রাইটান ও নেরেইড নামে নেপচুনের দুইটি চাঁদ আছে। প্রথমটি ২,২১,৫০০ মাইল দূরে থাকিয়া প্রায় পৌনে ছয় (৫.৮৮) দিনে নেপচুনকে একবার প্রদক্ষিণ করে। দ্বিতীয়টির কক্ষ পরিক্রমা ও দূরত্ব সঠিকভাবে এখনও জানা যায় নাই।

নেপচুনের নিষ্ক্রমণ বেগ ১৫.০০ মাইল; ইহা পৃথিবীর নিষ্ক্রমণ বেগের দ্বিগুণেরও বেশি। নেপচুনের তাপ ইউরেনাসের তাপের চেয়ে অনেক কম। কাজেই নেপচুনের জলবায়ুর প্রকৃতি ইউরেনাস বা শনি গ্রহের মতোই। সুতরাং সেখানে জীবের অস্তিত্ব নাই।

প্লুটো

ইহার দূরত্ব সূর্য হইতে ৩৬৭ কোটি মাইল। সেকেণ্ডে প্রায় তিন (২.৯) মাইল গতিতে চলিয়া প্রায় ২৪৮ (২৪৭.৬৯৭) বৎসরে লুটো একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। নেপচুনের রাস্তার চেয়ে লুটোর রাস্তা বড় এবং চলন ধীর। তাই আমাদের পৃথিবীর প্রায় ২৪৮ বৎসরের সমান পুটোর এক বৎসর।

পৃথিবীতে যাহার বয়স ২০ বৎসর, প্লুটোর রাজ্যে তাহার বয়স এক মাসেরও কিছু কম।

প্লুটো গ্রহটি আছে সৌরজগতের দূর প্রান্তে এবং আকারও তাহার বেশি বড় নহে। এই দুই কারণে পুটো সম্বন্ধে বেশি কিছু বিজ্ঞানীরা এখনও জানিতে পারেন নাই। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দূরবীনের আবিষ্কার হইলে প্লুটো সম্বন্ধে অনেক অজানা বিষয় জানা যাইবে। বিশেষত বিজ্ঞানীদের শুক্র ও মঙ্গলাভিযান সফল হইলে মহাবিশ্বের অনেক নূতন তথ্য অবগত হওয়া যাইবে।

ভালকান ও ১১. পসিডন

বিগত কয়েক বৎসর যাবত প্লুটো গ্রহটিকেই সৌররাজ্যের সীমান্তের গ্রহ বলিয়া মনে করা হইত। ইদানিং তাহারও বাহিরে ভালকান ও পসিডন নামে আরও দুইটি গ্রহ আবিষ্কৃত হইয়াছে। সূর্য হইতে পসিডন গ্রহটির দূরত্ব প্রায় ৭১৭ কোটি ৯০ লক্ষ মাইল।

সদ্য আবিষ্কৃত বলিয়া উহাদের সম্বন্ধে অন্যান্য কোনো তথ্য এখনও জানা যায় নাই। হয়তো অতিশয় দূরে অবস্থিত বলিয়া অন্যান্য গ্রহদের ন্যায় উহাদের সম্বন্ধে তত বেশি তথ্য কখনও জানা যাইবে না।

অন্যান্য

ধূমকেতু ধূমকেতু মানে ধুয়ার নিশান। সাধারণ্যে উহা লেজওয়ালা তারা নামে পরিচিত। সৌরাকাশে উহার আবির্ভাব খুব বিরল। তাই উহা বার বার দেখা যায় না। পশু-পাখির জন্য কি না তাহা জানি না, আকাশে ধূমকেতুর উদয় মানুষের জন্য নাকি অমঙ্গলজনক।

এতদ্বিষয়ে হিন্দুশাস্ত্রে জানা যায়- যে ধূমকেতুর আকার ইন্দ্রধনুর ন্যায়, অথবা যাহার মস্তকে দুইটি বা তিনটি চূড়া থাকে, উহা সাতিশয় অনিষ্টদায়ক। যাহাদিগের দেহ হ্রস্ব ও প্রসন্ন, তাহারা তত অনিষ্টদায়ক নহে। আবার দক্ষিণদিকে ধূমকেতুর উদয় হইলে ঘোরতর অনিষ্ট হয়; অন্যদিকে উদিত হইলে তাদৃশ অনিষ্টকর হয় না।

বলা বাহুল্য যে, এই সকল পৌরাণিক কাহিনীর এখন আর কোনো মূল্য নাই। ধূমকেতু সম্বন্ধে জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ যাহা বলেন, তাহার সামান্য আলোচনা করিতেছি।

খুব দক্ষ শিল্পীরও ইমারত গঠনান্তে দেখা যায় যে, ইট, সুরকি ইত্যাদি সংগৃহীত মাল-মশলার কিয়দংশ ইতস্তত ছিটকাইয়া-ছড়াইয়া পড়িয়া থাকে। দ্রুপ অখণ্ড নীহারিকাপুঞ্জ হইতে নক্ষত্ররাজি সৃষ্টির প্রাক্কালে উহার কিছু মাল-মশলা মহাকাশে ইতস্তত ছিটকাইয়া-ছড়াইয়া পড়িয়াছিল এবং উহা এখনও মহাকাশে বিরাজ করিতেছে।

ঐ সকল ছুটকো পদার্থগুলি-অণু, কণা বা পিণ্ডাকারে ঝক বাধিয়া মহাকাশে ইতস্তত ভ্রমণ করিতেছে। উপগ্রহদের গতির উদ্দেশ্য হইল গ্রহকে প্রদক্ষিণ করা, গ্রহদের গতির উদ্দেশ্য হইল সূর্যকে প্রদক্ষিণ করা এবং সূর্য বা নক্ষত্রদের গতির উদ্দেশ্য হইল নক্ষত্র জগতের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করা ইত্যাদি।

সৌররাজ্যে ভ্রমণ করিবার সময় যদি কোনো ধূমকেতু শনি, বৃহস্পতি বা অন্য কোনো বড় গ্রহের নিকট দিয়া যাইতে থাকে, তাহা হইলে সূর্য ও গ্রহের টানে ধূমকেতুটি আর আস্ত থাকে না, ছিন্নবিচ্ছিন্ন হইয়া ধূমকেতু নামটিই হারাইয়া ফেলে।

কিন্তু ঐ সকল ছুটকো পদার্থগুলির গতির তেমন কোনো উদ্দেশ্য নাই। উহারা উদ্দেশ্যহীনভাবে মহাকাশে অন্ধের মতো ভ্রমণ করে। এইভাবে চলিতে চলিতে উহাদের কোনো কোনো ঝক কোনো কোনো সময়ে সৌরাকাশে প্রবেশ করে।

তখন সূর্যের তাপের প্রভাবে ঋকের অণু-কণাগুলির মধ্যে চঞ্চলতা দেখা দেয় এবং চঞ্চলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে ঠোকাঠুকির ফলে কতক অণু-কণা ভাঙ্গিয়া বাষ্পীয় আকার ধারণ করে। আঁকের বস্তুপিণ্ডগুলি চলিবার সময় বাষ্পীয় পদার্থটিকে সঙ্গে লইয়া যাইতে পারে না, উহা পিছনে পড়িয়া থাকে।

সূর্যালোকে আমরা ঐ অণু, কণা বা বস্তুপিণ্ডের সমষ্টিকে দেখি ধূমকেতুর মুণ্ডরূপে এবং বাষ্পীয় অংশকে বলি লেজ। কোনো বিশেষ কারণে ধূমকেতুর লেজটি সব সময়ই সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে।

সৌররাজ্য প্রবেশ করিলে সূর্যের আকর্ষণের ফলে ধূমকেতুর সরল গতি থাকে না, উহা বাকিয়া যায়। সূর্য হইতে উহার দূরত্বের কম-বেশি অনুসারে আকর্ষণের জোর কম বা বেশি হয়।

আকর্ষণের জোর কম হইলে সূর্যকে অর্ধপ্রদক্ষিণ করিয়া, যেদিক হইতে আসিয়াছিল, চিরদিনের জন্য ধূমকেতুটি সেই দিকে চলিয়া যায় এবং আকর্ষণের জোর বেশি হইলে সূর্যের আকর্ষণের নাগপাশ ছিন্ন করিয়া যাইতে পারে না, এক পটলাকৃতি কক্ষপথে নির্দিষ্ট সময়ে সে বার বার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকে।

ইহাতে দেখা যাইতেছে যে, ধূমকেতুরা দুই ভাগে বিভক্ত; যাহারা একাধিক বার সৌরাকাশে প্রবেশ করে না, তাহারা হইল ‘পলাতক’ এবং যাহারা বার বার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, তাহারা হইল ‘বন্দী’।

সৌররাজ্যে বেড়াইতে আসিয়া কোনো কোনো ধূমকেতু ভালোয় ভালোয় ফিরিয়া যায়, আবার কেহবা চিরকালের মতো সূর্যের হাতে বন্দী হইয়া পড়ে। কিন্তু কোনো কোনো ধূমকেতুর বড়ই দুর্ভাগ্য।

সৌররাজ্যে ভ্রমণ করিবার সময় যদি কোনো ধূমকেতু শনি, বৃহস্পতি বা অন্য কোনো বড় গ্রহের নিকট দিয়া যাইতে থাকে, তাহা হইলে সূর্য ও গ্রহের টানে ধূমকেতুটি আর আস্ত থাকে না, ছিন্নবিচ্ছিন্ন হইয়া ধূমকেতু নামটিই হারাইয়া ফেলে।

একবার একটি ধূমকেতুর লেজের ভিতর পৃথিবী ঢুকিয়া বেশ কিছুদিন কাটাইয়াছিল। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ তখন জানিতেই পারে নাই যে, তাহারা ধূমকেতুর লেজের ভিতর বাস করিতেছে। ইহাতে বুঝা যাইতেছে যে, ধূমকেতুরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না বা করিতে পারে না। পৌরাণিক কাহিনীগুলি শাস্ত্রকারদের অলীক কল্পনা মাত্র।

এইভাবে যে-সব ধূমকেতু ধংস হইয়া যায়, তাহাদের দেহের ভগ্নাবশেষ তাহাদের চলতি পথে ইতস্তত ছড়াইয়া থাকে।

ধূমকেতু যখন দূরাকাশে থাকে তখন দূরবীনযোগে দেখিলে উহাকে এক টুকরা মেঘের মতো দেখায় এবং যতই সূর্যের নিকটবর্তী হইতে থাকে, ততই উহার উজ্জ্বলতা বাড়ে ও লেজ গজায়। সূর্যের নৈকট্যবৃদ্ধির সাথে সাথে ধূমকেতুর লেজও বৃদ্ধি পায়।

সূর্য হইতে যতই দূরে যাইতে থাকে, ধূমকেতুর লেজ ততই ছোট হইতে থাকে ও শেষে অদৃশ্য হইয়া যায়। কোনো কোনো ধূমকেতুর লেজ লম্বায় ১০ কোটি মাইলেরও বেশি হইয়া থাকে। আবার কোনো কোনো ধূমকেতুর একাধিক লেজ দেখা যায়।

সূর্যের হাতে যে সকল ধূমকেতু বন্দী হইয়াছে, অন্য অন্য সময়ে সেইগুলি সৌররাজ্য হইতে এতই দূরে চলিয়া যায় যে, পুনঃ ফিরিয়া আসিতে একশত, দুইশত বা কোনো কোনো ধূমকেতুর সাত-আটশত বৎসর লাগিয়া যায়। অথচ ধূমকেতুর গতিবেগও নেহায়েত কম নহে, প্রতি সেকেণ্ডে প্রায় ৮০০ মাইল।

১৬৮২ খ্রীস্টাব্দে হ্যাঁলি সাহেব একটি ধূমকেতুর গতিবিধি নির্ণয় করেন, তাই ঐটি ‘হ্যালির ধূমকেতু’ নামে পরিচিত। উক্ত ধূমকেতুটি প্রায় ৭৫ ১/২ বৎসর অন্তর একবার সৌরাকাশে উদিত হয়।

ঐটি ১৯১০ খ্রীস্টাব্দে শেষবারের মতো আমাদের আকাশে উদিত হইয়াছিল এবং প্রোক্ত হিসাবমতে আগামী ১৯৮৫ বা ৮৬ খ্রীস্টাব্দে আবার উদিত হইবার কথা।[২২]

আকৃতি দেখিয়া মনে হয় যে, ধুমকেতুর লেজ একটি বিরাট কিছু। বস্তুত তাহা নহে। উহা নিতান্ত হাল্কা বাষ্প মাত্র। বিজ্ঞানী জগদানন্দ রায় বলিয়াছেন, “সুবিধা হইলে গোটা ধূমকেতুর লেজ পকেটে পোরা যায় এবং উহা নিক্তিতে মাপিলে ওজন আধসের তিনপোয়ার বেশি হইবে না।”

একবার একটি ধূমকেতুর লেজের ভিতর পৃথিবী ঢুকিয়া বেশ কিছুদিন কাটাইয়াছিল। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ তখন জানিতেই পারে নাই যে, তাহারা ধূমকেতুর লেজের ভিতর বাস করিতেছে। ইহাতে বুঝা যাইতেছে যে, ধূমকেতুরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না বা করিতে পারে না। পৌরাণিক কাহিনীগুলি শাস্ত্রকারদের অলীক কল্পনা মাত্র।

উল্কা

মেঘমুক্ত রাত্রির আকাশে দেখা যায় যে, হঠাৎ হাউই বাজির মতো একটি আলোর রেখা কিছুদূর যাইয়া মিলাইয়া গেল। সাধারণত ঐগুলিকে লোকে তারাখসা বলে। ছোটবেলায় মা-দিদিমার কাছে ঐসম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিতেন, “এক জায়গায় থাকিয়া থাকিয়া যখন কোনো তারা অস্বস্তি বোধ করে, তখন সে ঘর বদল করে।

চলিবার সময় উহার নাম বলিতে নাই, বলিলে সে যথাসময়ে স্থান পায় না এবং সত্বর স্থান লইতে না পারিয়া হঠাৎ ভূপতিত হইলে মানুষের অমঙ্গল ঘটিতে পারে।”

মা-দিদিমা অথবা ঠাকুরদাদারা যাহাই বলুন, আসলে ঐগুলি তারা নহে। উহারা হইল ছোট বড় নানা রকম বস্তুপিণ্ড। প্রশ্ন হইতে পারে যে, মহাকাশে ঐগুলির সৃষ্টি হইল কিরূপে? এই প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীগণ যাহা বলেন, তাহার কিছু আলোচনা করিব।

যে সকল উল্কাপিণ্ড আকারে ছোট, তাহারা জ্বলিয়া মধ্যপথে নিঃশেষ হইয়া ভস্মে পরিণত হয় এবং যেগুলি আকারে বড়, তাহারা নিঃশেষ হইতে পারে না, উহারা আধপোড়া অবস্থায় সশব্দে ভূপতিত হয়। দহনের ফলে সাধারণত উহাদের রং কালো হইয়া থাকে।

বিজ্ঞানীগণ বলেন যে, সুদূর অতীতকালে কোনো নক্ষত্রের আকর্ষণের ফলে সূর্যের জ্বলন্ত বাষ্পীয় দেহের খানিকটা ছিন্ন হইয়া দূরান্তে গিয়া কুণ্ডলী পাকাইতে পাকাইতে পৃথিবীর জন্ম হয়। প্রথমত পৃথিবীও জ্বলন্ত বাম্পাকারে ছিল। ক্রমে শীতল হইয়া তরল অবস্থাপ্রাপ্ত হয়।

কালক্রমে আরও শীতল হইয়া পৃথিবীর বহির্ভাগ কঠিন হইতে থাকে। কিন্তু তাহার অভ্যন্তরভাগ তরল অবস্থায়ই থাকে। পৃথিবীর বহিভাগ শীতল ও কঠিন হইয়া সঙ্কুচিত হইবার ফলে ভূগর্ভস্থ তরল পদার্থের উপর প্রবল চাপ পড়িতে থাকে।

পৃথিবীর বহির্ভাগ দ্রুত শীতল হইয়া দ্রুত সকোচনের ফলে ভূগর্ভের তরল পদার্থের উপর যে পরিমাণ চাপ পড়িতে থাকে, অভ্যন্তরভাগের তরল পদার্থ দ্রুত তাপ ত্যাগ করিয়া ঐ পরিমাণ সঙ্কুচিত হইতে না পরিয়া সময় সময় পৃথিবীর বহিরাবরণ ভেদ করিয়া ফোয়ারার আকারে ছিটকাইয়া উর্ধে উঠিতে থাকে (এরূপ অত্যুষ্ণ তরল পদার্থের উদগীরণকে অগ্ন্যুৎপাত বলে এবং তাহার উৎসমুখে সৃষ্ট হয় আগ্নেয়গিরি)।

সেকালে এইরূপ তরল পদার্থের উদগীরণ এত অধিক শক্তিসম্পন্ন হইত যে, উহা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ সীমার বাহিরে চলিয়া যাইত এবং মহাকাশের শীতল স্পর্শে শীতল হইয়া কঠিন পাথরের আকারপ্রাপ্ত হইত ও মহাকাশে ইতস্তত ভাসিয়া বেড়াইত।

কালক্রমে পৃথিবী আরও শীতল ও কঠিন হইয়া প্রাণীবাসের যোগ্য হইয়াছে এবং মহাকাশে ঐ ভাসমান পাথরগুলি আজও ভাসিয়া বেড়াইতেছে। ঐসকল পাথরকে বলা হয় উল্কাপিণ্ড। উল্কাপিণ্ডগুলি ওজনে দুই-তিন ছটাক হইতে বিশ-পঁচিশ মণ বা ততোধিক ভারি হইয়া থাকে।

উহারা মহাকাশে ভাসিয়া বেড়াইতে বেড়াইতে কোনো কোনো সময় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সীমার ভিতরে আসিয়া পড়ে এবং পৃথিবীর আকর্ষণের ফলে ভূপতিত হইতে থাকে। ভূপতিত হইবার সময় বায়ুর সংঘর্ষে উহারা প্রথমত উত্তপ্ত হয়, পরে জ্বলিয়া উঠে।

যে সকল উল্কাপিণ্ড আকারে ছোট, তাহারা জ্বলিয়া মধ্যপথে নিঃশেষ হইয়া ভস্মে পরিণত হয় এবং যেগুলি আকারে বড়, তাহারা নিঃশেষ হইতে পারে না, উহারা আধপোড়া অবস্থায় সশব্দে ভূপতিত হয়। দহনের ফলে সাধারণত উহাদের রং কালো হইয়া থাকে।

একজন বিজ্ঞানী হিসাব করিয়া বলিয়াছেন যে, পৃথিবীর আকাশে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪২ লক্ষ উল্কা প্রবেশ করে। আবার কোনোও বিজ্ঞানী হিসাব দেখাইয়াছেন যে, মহাশূন্য হইতে যে উল্কা পোড়া ছাই প্রতিদিন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তাহার পরিমাণ প্রায় এক হাজার টন।[

পৃথিবীর গঠনোপাদান বা মৌলিক পদার্থের সংখ্যা ১০২টি। বিজ্ঞানীগণ উল্কার দেহ পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন যে, উল্কার দেহের মৌলিক উপাদান উহারই মধ্যে ৫০টি। পৃথিবীতে নাই, এমন উপাদান উহাতে একটিও পাওয়া যায় নাই। বিশেষত বয়সেও উল্কারা পৃথিবীর সমবয়সী।

সুতরাং বুঝা যাইতেছে যে, এই জাতীয় উল্কারা পৃথিবীরই অংশবিশেষ এবং এককালে ইহারা পৃথিবীতেই ছিল।

এই রকম কোনো উল্কাপিণ্ড লোকালয়ে পতিত হইলে লোকে উহা সংগ্রহ করিয়া সযত্নে রক্ষা করে। ঐরূপ সংগৃহীত আধপোড়া উল্কাপিণ্ড পাশ্চাত্যের প্রায় সকল যাদুঘরেই দেখিতে পাওয়া যায় এবং ভারতের কলিকাতা মিউজিয়মেও আছে বেশ কয়েকটি।

মক্কা শহরে পবিত্র কাবাগৃহে হেজরল আসোয়াদ নামে কালো রঙের একখানা পাথর রক্ষিত আছে। ঐ পাথরখানা নাকি আকাশ (স্বর্গ) হইতে পতিত হইয়াছিল। হাজীগণ উহাকে সসম্মানে চুম্বন করিয়া থাকেন। বোধ হয় যে, ঐ পাথরখানাও একখানা মাঝারি ধরণের উল্কা।

মহাকাশে বস্তুপিণ্ডের অভাব নাই। পূর্বোল্লিখিত কারণ ব্যতীত অন্যান্য কারণেও মহাকাশে বস্তুপিণ্ড জমিতে পারে এবং তাহা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আওতাধীনে আসিলে, তাহাতে উল্কাপাত হইতে পারে।

পূর্বে বলা হইয়াছে যে, সৌররাজ্যে আসিয়া যে সকল ধূমকেতুর অপমৃত্যু ঘটে, উহাদের দেহের বস্তুপিণ্ডগুলি উহাদের চলার পথে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকিয়া যায়। পৃথিবী তাহার স্বীয় কক্ষে চলিতে চলিতে বৎসরের কোনো কোনো দিন ঐরূপ মৃত ধূমকেতুর পথে হাজির হয় এবং ঐ বস্তুপিণ্ডগুলিকে কাছে পাইয়া টানিয়া ভূপাতিত করে।

এইরূপ পতনোন্মুখ পিণ্ডগুলি জ্বলিয়া-পুড়িয়া উল্কার সৃষ্টি হয়। এই কারণেই বৎসরের বিশেষ কয়েকটি দিনে উল্কাপাত খুব বেশি হয়।

দিনে-রাতে পৃথিবীর আকাশে কতগুলি উল্কা প্রবেশ করিতেছে, তাহা নির্ণয় করা দুরূহ। দিবালোকে যে সকল উল্কাপাত হয়, তাহা প্রায়ই দেখা যায় না এবং রাত্রির উল্কাও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রগুলি থাকে দৃষ্টিসীমার বাহিরে। আমরা স্বচ্ছন্দে দেখিয়া থাকি মাত্র বড় বড় উল্কার পতন।

একজন বিজ্ঞানী হিসাব করিয়া বলিয়াছেন যে, পৃথিবীর আকাশে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪২ লক্ষ উল্কা প্রবেশ করে। আবার কোনোও বিজ্ঞানী হিসাব দেখাইয়াছেন যে, মহাশূন্য হইতে যে উল্কা পোড়া ছাই প্রতিদিন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তাহার পরিমাণ প্রায় এক হাজার টন।[২৩]

সচরাচর ৬০ মাইল হইতে ৮০ মাইল উপরে উল্কা দেখা যায় এবং ৪০ মাইলের নিচে উল্কা দেখা যায় না। যেগুলি আকারে ছোট, সেগুলি ৪০ মাইলের উপরেই জ্বলিয়া ভস্ম হইয়া যায়, ভূপতিত উদ্ধার সংখ্যা খুবই অল্প।

কৃত্রিম গ্রহ ও উপগ্রহ

প্রকৃতি বা ঈশ্বরের সৃষ্ট গ্রহ-উপগ্রহাদির বিষয় আলোচনা করা হইল। অধুনা আকাশে আরও কতিপয় গ্রহ ও উপগ্রহ বিরাজ করিতেছে, যাহার সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর নহেন, মানুষ। তবে উহারা আকারে নেহায়েত ছোট।

কিন্তু উহাদের উভয়ের প্রকৃতি একই। যেমন হস্তী ও পিপীলিকার আকারগত পার্থক্য থাকিলেও উহাদের প্রকৃতি বা জৈবধর্মে কোনো পার্থক্য নাই-ইহা তেমনই।

পূর্বে বলা হইয়াছে যে, পৃথিবীর নিষ্ক্রমণ বেগ ৭ মাইল। অর্থাৎ কোনো পদার্থ যদি প্রতি সেকেণ্ডে সাত মাইল গতিতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীত দিকে ছুটিতে পারে, তবে পৃথিবী তাহাকে টানিয়া ফিরাইতে পারে না। অর্থাৎ সে আর কখনও মাটিতে পড়ে না।

অতঃপর? বিজ্ঞানীগণ কল্পনা করিলেন যে, ঐ পদার্থটি মহাকাশে চলিয়া যাইবে এবং সে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকিবে। অর্থাৎ সে হইবে সূর্যের একটি নূতন বা কৃত্রিম গ্রহ। কিন্তু ঐ পদার্থটির গতি যদি সেকেণ্ডে ৭ মাইল না হইয়া ৫ মাইল হয়, তবে কি হইবে?

বিজ্ঞানীরা স্থির করিলেন যে, ঐটি তখন পৃথিবীকে আবর্তন করিতে থাকিবে। অর্থাৎ সে হইবে পৃথিবীর একটি নূতন বা কৃত্রিম উপগ্রহ। এই বিষয়ে গবেষণা চালানো হইলে, উহাতে প্রথমে সাফল্য লাভ করিলেন রাশিয়ান ও পরে আমেরিকান বিজ্ঞানীরা।

কৃত্রিম উপগ্রহ

স্পুটনিক ১

১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর তারিখে স্পুটনিক ১ নামক একটি উপগ্রহ আকাশে প্রথম নিক্ষেপ করেন রাশিয়ার বিজ্ঞানীগণ। এলুমিনিয়ামের সঙ্গে অন্য ধাতুর সংমিশ্রণে ঐটি তৈয়ার হইয়াছিল। আকৃতি গোল, ব্যাস ২৩ ইঞ্চি, ওজন ছিল ১৮৪ পাউণ্ড।

প্রতি সেকেণ্ডে ৫ মাইল অর্থাৎ ঘণ্টায় ১৮,০০০ মাইল বেগে চলিয়া ৯৬.২ মিনিটে একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করিত শুটনিক ১। কিন্তু উহার এই পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। কেননা, স্পুটনিক ১ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাহিরে উহার কক্ষপথ রচনা করিতে পারে নাই।

ভূপৃষ্ঠ হইতে প্রায় এক হাজার মাইল পর্যন্ত বায়ুর অস্তিত্ব আছে। কোনো উপগ্রহ ঐ এক হাজার মাইলের উর্ধে স্বীয় কক্ষপথ রচনা করিতে না পারিলে, বায়ুর সংঘর্ষে উহার গতি হ্রাস পাইতে থাকে এবং ক্রমে নিম্নগামী হইয়া বায়ুমণ্ডলের ঘন, স্তরে প্রবেশ করিলে বায়ুর সংঘাতে উহা ভাঙ্গিয়া বা উল্কার ন্যায় জ্বলিয়া-পুড়িয়া ভস্ম হইয়া যায়।

বায়ুমণ্ডলের ভিতরে কক্ষপথ থাকায় প্রথম স্পুটনিকের ঐ দশাই হইয়াছিল। বায়ুর সংঘর্ষহেতু ক্রমশ উহার গতিবেগ হ্রাস পাইবার ফলে নিম্নগামী হইয়া ঘন বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করিয়া এক সময় উহা ধংস হইয়া গিয়াছে। প্রথম স্পুটনিক আকাশে ছিল মাত্র ৯৬ দিন।

এক্সপ্লোরার

১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি তারিখে আমেরিকার বিজ্ঞানীরা এই উপগ্রহটি আকাশে নিক্ষেপ করেন। পরিবহন রকেট সহ ইহার ওজন ছিল ৩০.৮ পাউণ্ড। রকেট বাদে এই উপগ্রহটির ওজন ১৮.১৩ পাউণ্ড, ব্যাস ৬ ইঞ্চি এবং রকেট লম্বায় ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি।

ইস্পাতে নির্মিত খোলের ভিতর রক্ষিত বিবিধ যন্ত্রপাতি। এক্সপ্লোরার একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করিতে সময় লয় ১১৪ মিনিট। অর্থাৎ দৈনিক পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে প্রায় বারো বার।

কৃত্রিম গ্রহ-উপগ্রহদের কাহারও কক্ষপথ সম্পূর্ণ গোল নহে। ইহা সৌরাকাশের অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহদের মতোই ডিম্বাকার। তাই পৃথিবী প্রদক্ষিণের সময় এক্সপ্লোরার কোনো কোনো সময় ভূপৃষ্ঠের ২২০ মাইলের মধ্যে আসিয়া পড়ে, আবার কোনো কোনো সময় চলিয়া যায় ১,৭০০ মাইল দূরে।

আগেই বলা হইয়াছে যে, বায়ুমণ্ডলের গভীরতা প্রায় ১,০০০ মাইল। কাজেই এক্সপ্লোরার কোনো সময় বায়ুমণ্ডলের ভিতরে আসিয়া পড়ে এবং কোনো সময় চলিয়া যায় বাহিরে। সুতরাং উহাকে অনেক সময়ই বায়ুর বাধা ভোগ করিতে হয়।

তাই এক্সপ্লোরারও পৃথিবীর আকাশে বেশিদিন থাকিতে পারিবে না। বিজ্ঞানীগণ অনুমান করেন যে, এক্সপ্লোরার উপগ্রহটি আকাশে থাকিয়া পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকিবে ১০ বৎসর। অতঃপর সেও একদিন সম্পূর্ণ বায়ুমণ্ডলে ঢুকিয়া ধংস হইয়া যাইবে।

ভ্যানগার্ড

এই উপগ্রহটিকে আকাশে নিক্ষেপ করা হয় ১৯৫৮ সালের ১৭ মার্চ তারিখে। রকেট বাদে ইহার ওজন মাত্র ৩.৫ পাউণ্ড, আকৃতি বাতাবিলেবুর মতো গোল। কক্ষভ্রমণের সময় ভূপৃষ্ঠ হইতে ইহার দূরত্ব হয় কোনো সময় ৪০০ মাইল এবং কোনো সময় ২৫০০ মাইল।

এক্সপ্লোরার উপগ্রহটি যতখানি বায়ুমণ্ডলের ভিতরে আসে, ভ্যানগার্ড ততখানি আসে না, বরং বাহিরেই থাকে বেশি। তাই ইহার গতিবেগ কমিতে এক্সপ্লোরারের চেয়ে সময়ও লাগিবে বেশি। অতঃপর ইহাও ধ্বংস হইবে।

তবে আশার কথা এই যে, ভূপৃষ্ঠ হইতে হাজার মাইল উর্ধে কক্ষপথ রচনা করিয়া চিরস্থায়ী উপগ্রহ স্থাপনের চেষ্টা চলিতেছে; হয়তো অচিরেই চেষ্টা সফল হইবে।

কৃত্রিম গ্রহ

লুনিক ১

এই কৃত্রিম গ্রহটি ১৯৫৯ সালের ২ জানুয়ারি তারিখে রাশিয়ার বিজ্ঞানীগণ আকাশে ক্ষেপণ করেন। ইহার ওজন ৩,২৪৫ পাউণ্ড। সূর্য হইতে ইহার গড় দূরত্ব ১০ কোটি ৭৮ লক্ষ মাইল। কিন্তু এই দূরত্ব সব সময় সমান থাকে না।

কক্ষপথের বক্রতার দরুন দূরত্ববৃদ্ধি হইয়া কোনো সময় হয় ১২ কোটি ৪৫ লক্ষ মাইল, আবার কমিয়া হয় ৯ কোটি ১১ লক্ষ মাইল। লুনিক সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে ৪৫০ দিনে অর্থাৎ ১৫ মাসে। আমাদের পৃথিবীর বৎসর হইতে লুনিকের বৎসর কিছু বড়।

বিজ্ঞানীগণ মনে করেন যে, লুনিক আকাশে থাকিয়া সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকিবে অনন্তকাল। কেননা সে কখনও বায়ুমণ্ডলের আওতায় পড়ে না।

পাইওনিয়ার ৪

১৯৫৯ সালের ৩ মার্চ তারিখে আমেরিকার বিজ্ঞানীগণ এই গ্রহটিকে আকাশে নিক্ষেপ করেন। ইহার ওজন মাত্র ১৩.৪ পাউণ্ড। এই ক্ষুদ্র গ্রহটি ৩৯২ দিনে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিয়া আসে। সূর্য হইতে ইহার গড় দূরত্ব ৯ কোটি ৬৬ লক্ষ ৫০ হাজার মাইল।

কিন্তু ইহা কমিয়া কোনো সময় হয় ৯ কোটি ২২ লক্ষ মাইল, আবার বৃদ্ধি পাইয়া হয় ১০ কোটি ৬১ লক্ষ মাইল।

লুনিক ১ এবং পাইওনিয়ার ৪-এই উভয় গ্রহের কক্ষপথ পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের মাঝখানে অবস্থিত। তবে উহার কোনোও অংশ পৃথিবীর কক্ষপথকে ছেদ করিয়াছে, কিন্তু মঙ্গলের কক্ষপথকে কোথায়ও ছেদ করে নাই। বিজ্ঞানীদের মতে, পাইওনিয়ার ৪ আকাশে থাকিয়া অনন্তকাল সূর্যকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকিবে।

আলোচ্য গ্রহ ও উপগ্রহদের কাহাকেও দূরবীন ব্যতীত খালি চোখে দেখা সম্ভব নহে।

……………………..
১৫. প্রকৃতি, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, পৃ. ৮।
১৬. মহাকাশের ঠিকানা, অমল দাসগুপ্ত, পৃ. ৫৭-৫৯।
১৭. পৃথিবীর ঠিকানা, অমল দাসগুপ্ত, পৃ. ৮৩-৮৪।
১৮. মহাকাশের ঠিকানা, অমল দাসগুপ্ত, পৃ. ২৯।
১৯. মহাকাশের ঠিকানা, অমল দাসগুপ্ত, পৃ. ৫৫-৫৭।
২০. মহাকাশের ঠিকানা, অমল দাসগুপ্ত, পৃ. ১৮৩।
২১. মহাকাশের ঠিকানা, অমল দাসগুপ্ত, পৃ. ১৮১।
২২. সরল বাঙ্গালা অভিধান, সুবলচন্দ্র মিত্র, পৃ. ৪৩২।
২৩. মহাশূন্য থেকে দেখা পৃথিবী, মীর ফখরুল কাইয়ূম (অনুবাদক), পৃ. ৭২।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………
আরও পড়ুন-
আদিম মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব
ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব
দার্শনিক মতে সৃষ্টিতত্ত্ব
সৃষ্টিবাদ ও বিবর্তনবাদ
বিজ্ঞান মতে সৃষ্টিতত্ত্ব
সৃষ্টির ধারা
সূর্য
গ্রহমণ্ডলী
বিজ্ঞান মতে সৃষ্টিতত্ত্ব

আদিম মানবের সাক্ষ্য
বংশগতি
সভ্যতার বিকাশ
সভ্যতা বিকাশের কতিপয় ধাপ
সংস্কার ও কুসংস্কার সৃষ্টি
কতিপয় ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টি
প্লাবন ও পুনঃ সৃষ্টি
প্রলয়
প্রলয়ের পর পুনঃ সৃষ্টি
উপসংহার

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!