সৃষ্টিতত্ত্ব রহস্য ব্রহ্মাণ্ড জগৎ মহাজগত মহাবিশ্ব নদী

মহাবিশ্বের উৎপত্তি : দ্বিতীয় কিস্তি

-মূল: স্টিফেন হকিং

ইতিহাসের এই যোগফলের ভিতরে কোন শ্রেণীর সম্ভাব্য বক্রস্থানগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে সেটা স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করতে হবে। এই শ্রেণীর স্থান নির্বাচনই নির্ধারণ করবে মহাবিশ্ব কোন অবস্থায় আছে, যে শ্রেণীর বক্র স্থান মহাবিশ্বের অবস্থা সংজ্ঞিত করে। অনন্যতা সমন্বিত স্থান যদি তার অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে ঐ ধরনের স্থানের সম্ভাবনা তত্ত্ব দিয়ে নির্ধারিত হবে না।

তার বদলে কোন যাদৃচ্ছিক উপায়ে সম্ভাব্যতাগুলোকে আরোপ করতে হবে। এর অর্থ বিজ্ঞান স্থান-কালের এই ধরনের একক ইতিহাসগুলোর সম্ভাবনা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না। অর্থাৎ মহাবিশ্বের কি আচরণ হবে সে সম্পর্কে বিজ্ঞান ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না।

তবে এ সম্ভাবনা থাকতে পারে যে, মহাবিশ্ব এমন একটা অবস্থায় রয়েছে যে অবস্থা একটা যোগফল দিয়ে সংজ্ঞিত, যার অন্তর্ভুক্ত শুধুমাত্র অনেক (nonsingular) বঙ্কিম স্থানগুলো। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বিধিগুলোই মহাবিশ্বকে সম্পূর্ণভাবে নির্ধারণ করবে।

কি করে মহাবিশ্বের প্রারম্ভ সেটি নির্ধারণ করার জন্য মহাবিশ্ব বহির্ভূত কোন কর্মকের (agency) দ্বারস্থ হতে হবে না। একদিক দিয়ে মহাবিশ্বের অবস্থা শুধুমাত্র অনেক ইতিহাসগুলোর যোগফল দিয়ে নির্ধারিত হয় –এই প্রস্তাব মাতালের ল্যাম্প পোস্টের (আলোক স্তম্ভ) নিচে চাবি খোঁজার মতো।

যেখানে সে চাবিটা হারিয়েছে ওটা সে জায়গা না হতে পারে কিন্তু ওটাই একমাত্র জায়গা যেখানে তার চাবিটা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

একইভাবে বলা যায় মহাবিশ্ব অনেক ইতিহাসগুলোর যোগফল দিয়ে সংজ্ঞিত হতে পারে এরকম অবস্থায় না থাকতে পারে কিন্তু এটাই একমাত্র অবস্থা যেখানে বিজ্ঞান ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে মহাবিশ্বের কি অবস্থায় থাকা উচিত।

এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর সঙ্গে যদি পর্যবেক্ষণফলের অনৈক্য হয় তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি মহাবিশ্ব সীমানাহীন অবস্থায় নেই। সুতরাং দার্শনিক কার্ল পপার (Karl Popper) সংজ্ঞিত অর্থে সীমানাহীনতার প্রস্তাব একটি উত্তম বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। পর্যবেক্ষণের সাহায্যে এ তত্ত্বকে অপ্রাণ করা যায় কিংবা মিথ্যা প্রমাণ করা যায়।

১৯৮৩ সালে আমি এবং জিম হার্টল Jim Hartle) প্রস্তাব করেছিলাম মহাবিশ্বের অবস্থা একটি বিশেষ শ্রেণীর ইতিহাসগুলোর যোগফল দিয়ে প্রকাশ পাওয়া উচিত। এই শ্রেণীতে থাকবে বঙ্কিম স্থান কিন্তু তাতে কোন অনন্যতা থাকবে না। এদের আকার সীমিত থাকবে কিন্তু এদের কোন সীমানা কিংবা কিনারা থাকবে না।

এগুলো হবে ভূপৃষ্ঠের মতো সসীম কিন্তু তাদের আরও দুটি মাত্রা থাকবে। ভূপৃষ্ঠের এলাকা সসীম কিন্তু এর কোন অনন্যতা, সীমানা কিংবা কিনারা নেই। এটি আমি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সাহায্যে বিচার করে দেখেছি। আমি পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছি কিন্তু কখনো পড়ে যাইনি।

আমি আর জিম হার্ট যে প্রস্তাব করেছিলাম তাকে এই বাগ্বিধিতে প্রকাশ করা যায়: মহাবিশ্বের সীমান্তের অবস্থা এমন যে তার কোন সীমানা নেই। মহাবিশ্ব যদি শুধুমাত্র এই সীমানাবিহীন অবস্থায় থাকে তাহলেই বিজ্ঞানের বিধিগুলো স্বকীয়ভাবে প্রত্যেকটি সম্ভাব্য ইতিহাসের সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে পারে।

অর্থাৎ শুধুমাত্র এরকম ক্ষেত্রেই জানিত বিধিগুলো নির্ধারণ করবে মহাবিশ্বের আচরণ কি রকম হওয়া উচিত। মহাবিশ্ব যদি অন্য কোন অবস্থায় থাকে তাহলে ইতিহাসগুলোর যোগফলের যে শ্ৰেণীতে বঙ্কিম স্থানগুলো পড়বে তার অন্তর্ভুক্ত হবে।

অনন্যতা সমন্বিত নির্ধারণ করতে হলে বিজ্ঞানের জানিত বিধিতে বাদ দিয়ে অন্য কোন নীতিকে আহ্বান জানাতে হবে। এই নীতি (Principle) হবে আমাদের মহাবিশ্ব বহির্ভুত একটা কিছু। আমাদের মহাবিশ্বের ভিতর থেকে আমরা সে সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত করতে পারি না।

অন্য দিকে মহাবিশ্ব যদি সীমানাহিবীন অবস্থায় থাকে তাহলে মহাবিশ্বের আচরণ আমরা সম্পূর্ণ নির্ধারণ করতে পারি –অবশ্য অনিশ্চয়তা নীতি নির্ধারিত সীমানা পর্যন্ত।

মহাবিশ্ব যদি সীমানাবিহীন অবস্থায় থাকত তাহলে বিজ্ঞানের পক্ষে খুবই ভাল হত। সন্দেহ নেই, কিন্তু মহাবিশ্ব ঐ অবস্থায় আছে কিনা, কি করে আমরা বলব? এর উত্তর হল: সীমানাহীনতার প্রস্তাব মহাবিশ্বের, আচরণ কি রকম হবে সে সম্পর্কে কতকগুলো নির্দিষ্ট নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করে।

এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর সঙ্গে যদি পর্যবেক্ষণফলের অনৈক্য হয় তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি মহাবিশ্ব সীমানাহীন অবস্থায় নেই। সুতরাং দার্শনিক কার্ল পপার (Karl Popper) সংজ্ঞিত অর্থে সীমানাহীনতার প্রস্তাব একটি উত্তম বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। পর্যবেক্ষণের সাহায্যে এ তত্ত্বকে অপ্রাণ করা যায় কিংবা মিথ্যা প্রমাণ করা যায়।

সুতরাং মহাবিশ্বের একটি প্রারম্ভ থাকবে এবং একটি অন্ত থাকবে। বাস্তব কালে প্রারম্ভ হবে বৃহৎ বিস্ফোরণ অনন্যতা। তবে কাল্পনিক কালের প্রারম্ভ একটি অনন্যতা হবে না, তার বদলে এটা হবে অনেকটা পৃথিবীর উত্তর মেরুর মতো।

পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যদি ভবিষ্যদ্বাণীর মতানৈক্য হয় তাহলে আমরা জানব সম্ভাব্য ইতিহাসগুলোর শ্রেণীর ভিতরে অনন্যতা অবশ্যই আছে। তবে ঐটুকুই আমরা জানতে পারব। আমরা একক ইতিহাসগুলোর সম্ভাব্যতা গণনা করতে পারব না সুতরাং মহাবিশ্বের আচরণ কি রকম হবে সে সম্পর্কেও আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারব না।

ভাবা যেতে পারে এই ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতার অভাব যদি শুধুমাত্র বৃহৎ বিস্ফোরণের সময় হয় তাহলে খুব বেশি কিছু আসবে যাবে না। কারণ ঘটনাটা তো এক হাজার কিংবা দুই হাজার কোটি বছর আগেকার ব্যাপার।

কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা যদি বৃহৎ বিস্ফোরণের অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে ভেঙে পড়ে তাহলে যখনই একটি তারকা চুপসে যায় তখনও এটা ভেঙে পড়তে পারে। শুধু আমাদের ছায়াপথেই এ ঘটনা ঘটতে পারে সপ্তাহে কয়েকবার।

অবশ্য, বলা যেতে পারে একটা দূরস্থিত তারকায় যদি ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা। ভেঙ্গে পড়ে তাহলে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। তবে কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে –যা সত্যই নিষিদ্ধ নয় তা ঘটতে পারে এবং ঘটবে। উদাহরণ :

অনন্যতা সম্পর্কিত স্থান যদি সম্ভাব্য ইতিহাসগুলোর শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে অনন্যতা যে কোন জায়গাতেই ঘটতে বেপারে –শুধুমাত্র বৃহৎ বিস্ফোরণে এবং চুপসে যাওয়া তারকাতেই নয়। এর অর্থ হবে : আমরা কোন ভবিষ্যদ্বাণীই করতে পারতাম না।

বিপরীতে (conversely) আমরা ঘটনা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি এই তথ্যই অনন্যতাগুলোর বিপক্ষে এবং সীমানাহীনতার প্রস্তাবের সপক্ষে পরীক্ষাভিত্তিক সাক্ষ্য।

তাহলে সীমানাহীনতার প্রস্তাব মহাবিশ্ব সম্পর্কে কি ভবিষ্যদ্বাণী করে–এ বিষয়ে প্রথম বক্তব্য : যেহেতু মহাবিশ্বের সমস্ত ইতিহাসগুলোই বিস্তারের দিক দিয়ে সসীম (finite in extent), সেজন্য কালের মাপনের জন্য যে রাশিই ব্যবহার করা হোক না কেন সে রাশির একটি বৃহত্তম, একটি ন্যূনতম মূল্যাঙ্ক থাকবে।

সুতরাং মহাবিশ্বের একটি প্রারম্ভ থাকবে এবং একটি অন্ত থাকবে। বাস্তব কালে প্রারম্ভ হবে বৃহৎ বিস্ফোরণ অনন্যতা। তবে কাল্পনিক কালের প্রারম্ভ একটি অনন্যতা হবে না, তার বদলে এটা হবে অনেকটা পৃথিবীর উত্তর মেরুর মতো।

অর্থনৈতিক মুদ্রাস্ফীতির বিশ্বরেকড বোধহয় ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির। সে দেশে একটা পাউরুটির দাম কয়েক মার্ক থেকে বেড়ে কয়েক মাসে কয়েক মিলিয়ন মার্কে পৌঁছায়, কিন্তু মনে হয় আদিম মহাবিশ্বে যে অতিস্ফীতি হয়েছিল (inflation) তার তুলনায় এই মুদ্রাস্ফীতি কিছুই নয় :

যদি অক্ষাংশের ডিগ্রীকে (degree of latitude) কালের পৃষ্ঠে (surface of time) কালের সমরাশি (analogue) রূপে গ্রহণ করা হয় তাহলে বলা যেতে পারে ভূপৃষ্ঠ শুরু হয় উত্তর মেরুতে। তবুও উত্তর মেরু পৃথিবীর একটি নিখুঁত সাধারণ বিন্দু।

উত্তর মেরুর বিশেষত্ব কিছু নেই। পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যে বিধি সত্য উত্তর মেরুতেও সে বিধিগুলো সত্য। একইভাবে বলা যায়, যে ঘটনাকে কাল্পনিক কালে মহাবিশ্বের আরম্ভ’ বলে নির্বাচন করে চিহ্নিত করতে পারি সেটা হবে স্থান-কালের একটা সাধারণ বিন্দু– যে কোন অন্য বিন্দুর মতোই।

অন্যান্য স্থান-কালের (elsewhere) মতোই প্রারম্ভে বিজ্ঞানের বিধি সত্য হবে।

ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে উপমা থেকে আশা করা যায় মহাবিশ্বের অন্ত প্রারম্ভের মতোই হবে, ঠিক যেমন উত্তর মেরু অনেকটা দক্ষিণ মেরুর মতো। তবে উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু মহাবিশ্বের ইতিহাসে প্রারম্ভ এবং অন্তের অনুরূপ। শুধু কাল্পনিক কালে, যে বাস্তব কাল আমরা অনুভব করি সেই বাস্তব কালে নয়।

আমরা যদি ইতিহাসের যোগফলটি কাল্পনিক কাল থেকে বাস্তব কালে বহির্বেশন করি (extrapolation) তাহলে দেখা যাবে বাস্তব কালে মহাবিশ্বের প্রারম্ভ তার অন্ত থেকে খুবই পৃথক হতে পারে।

জোনাথন হ্যাঁলিওয়েল (Jonathan Halliwell) এবং আমি সীমানাবিহীন অবস্থার নিহিতার্থ কি হবে সে সম্পর্কে একটা আসন্ন গণনা (approximate calculation) করেছিলাম। আমরা মহাবিশ্বকে বিচার করেছিলাম একটি নিখুঁত মসৃণ এবং সমরূপ পশ্চাৎপটরূপে। তার ভিতরে ঘনত্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচরণ (perturbations) ছিল।

বাস্তব কালে মনে হয় মহাবিশ্ব তার সম্প্রসারণ শুরু করবে অতি ক্ষুদ্র ব্যাসার্ধ থেকে। প্রথমে সম্প্রসারণ হবে যাকে বলা হয় অতিস্ফীতি, সেরকম : মহাবিশ্ব এক সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের আকারে দ্বিগুণ হবে, ঠিক যেমন অনেক দেশে মূল্যমান প্রতিবছরে দ্বিগুণ হয়।

অর্থনৈতিক মুদ্রাস্ফীতির বিশ্বরেকড বোধহয় ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির। সে দেশে একটা পাউরুটির দাম কয়েক মার্ক থেকে বেড়ে কয়েক মাসে কয়েক মিলিয়ন মার্কে পৌঁছায়, কিন্তু মনে হয় আদিম মহাবিশ্বে যে অতিস্ফীতি হয়েছিল (inflation) তার তুলনায় এই মুদ্রাস্ফীতি কিছুই নয় :

এক সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের ভিতরে আকার বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল এক মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন গুণ। অবশ্য সেটা হয়েছিল বর্তমান সরকারের আগে।

অবশ্য অনিশ্চয়তার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। অতিস্ফীতিরূপ সম্প্রসারণের সময় কিন্তু পার্থক্যের বিবর্ধন (amplification) হবে। অতিস্ফীতিরূপ সম্প্রসারণের যুগ শেষ হওয়ার পর এমন একটা মহাবিশ্ব রইল যেটা কোন কোন জায়গায় অন্য জায়গার তুলনায় দ্রুততর সম্প্রসারিত হচ্ছিল।

অতিস্ফীতি ব্যাপারটা ভালই হয়েছিল কারণ এর ফলে এমন একটা মহাবিশ্ব সৃষ্টি হল যেটা বৃহৎ মানে ছিল মসৃণ এবং সমরূপ, আবার চুপসে যাওয়া এড়ানোর জন্য সম্প্রসারণ হচ্ছিল ঠিক ক্রান্তিক হারে। এই অতিস্ফীতি অন্যদিক দিয়েও ভাল জিনিসই ছিল।

তার কারণ এর ফলে উৎপন্ন হয়েছিল মহাবিশ্বের সমস্ত আধেয় (content– অন্তর্বন্তু)। এ সৃষ্টি হয়েছিল আক্ষরিক অর্থে শূন্যতা থেকে। মহাবিশ্ব যখন উত্তর মেরুর মতো একক বিন্দু ছিল তখন এর কোন অন্তর্বস্তু ছিল না, কিন্তু এখন মহাবিশ্বের যে অংশ আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাতে রয়েছে অন্তত ১০৮০ কণিকা।

এই সমস্ত কণিকা এল কোথা থেকে? উত্তরটা হল : অপেক্ষবাদ এবং কণাবাদী বলবিদ্যা শক্তি থেকে বস্তু সৃষ্টি অনুমোদন করে। বস্তুটি সৃষ্টি হয় কণিকা, বিপরীত কণিকা জোড়রূপে। তাহলে এই পদার্থ সৃষ্টির জন্য শক্তি কোথা থেকে এল? উত্তরটা হল শক্তিটা ধার করা হয়েছিল মহাকর্ষীয় বলের কাছ থেকে।

অপরা (negative) মহাকর্ষীয় শক্তির কাছে মহাবিশ্বের একটা বিরাট ঋণ রয়েছে। তার সঙ্গে পদার্থের পরা শক্তির কাছে মহাবিশ্বের একটা বিরাট ঋণ রয়েছে –তার সঙ্গে পদার্থের পরাশক্তির ভারসাম্য নিখুঁত (exactly balances)।

অতিস্ফীতির যুগে আরও পদার্থ সৃষ্টি করার অর্থ যোগান দেওয়ার জন্য মহাবিশ্ব মহাকর্ষীয় শক্তির কাছ থেকে বিরাট ঋণ গ্রহণ করেছিল। এর ফলে হয়েছিল কী এর অর্থনীতির জয় : একটা বীর্যবান এবং সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্ব আর সেটা ছিল নানা পদার্থে পরিপূর্ণ।

মহাবিশ্বের অন্তিম কালের আগে পর্যন্ত এই মহাকর্ষীয় ঋণ শোধ করতে হবে।

আদিম মহাবিশ্ব সম্পূর্ণরূপে সমসত্ব এবং সমরূপ হওয়া সম্ভব ছিল না, কারণ তাহলে কণাবাদী বলবিদ্যার অনিশ্চয়তার নীতি ভেঙে যেত। তার বদলে সমরূপ ঘনত্ব থেকে নিশ্চয়ই কিছু বিচ্যুতি হয়েছে। সীমানাহীনতার প্রস্তাবের নিহিতার্থ হল ঘনত্বের এই পার্থক্য শুরু হবে একদম নিচুতলা থেকে অর্থাৎ তারা হবে যত ক্ষুদ্র সম্ভব।

অবশ্য অনিশ্চয়তার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। অতিস্ফীতিরূপ সম্প্রসারণের সময় কিন্তু পার্থক্যের বিবর্ধন (amplification) হবে। অতিস্ফীতিরূপ সম্প্রসারণের যুগ শেষ হওয়ার পর এমন একটা মহাবিশ্ব রইল যেটা কোন কোন জায়গায় অন্য জায়গার তুলনায় দ্রুততর সম্প্রসারিত হচ্ছিল।

যেসব অঞ্চলে সম্প্রসারণ শ্লথতর ছিল সেই সমস্ত অঞ্চলে পদার্থের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ সম্প্রসারণকে আরও শ্লথ করে দেবে। শেষে ওই অঞ্চলে সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে যাবে এবং অঞ্চলটা নীহারিকা এবং তারকা গঠন করার জন্য সঙ্কুচিত হতে থাকবে।

যদি অদ্বিতীয় এক কেতা বিধিই থাকে, সেটা শুধুমাত্র এক কেতা সমীকরণ। সেই সমীকরণগুলোতে প্রাণসঞ্চার করে কে? কে তা থেকে একটা মহাবিশ্ব সৃষ্টি করে, যে মহাবিশ্ব তারা পরিচালনা করতে পারে? পরম ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব কি এমনই শক্তিশালী যে সে নিজেই নিজের অস্তিত্ব সৃষ্টি করে?

সুতরাং আমরা আমাদের চারপাশে যে সমস্ত গঠন দেখতে পাই সেগুলোর কারণ হতে পারে সীমানাহীনতার প্রস্তাব। তবে এই প্রস্তাব মহাবিশ্ব সম্পর্কে শুধুমাত্র একটা ভবিষ্যদ্বাণীই করে না, তার বদলে এর ভবিষ্যদ্বাণীতে থাকে সম্ভাব্য ইতিহাসগুলোর সম্পূর্ণ একটা গোষ্ঠী।

এর প্রত্যেকটিরই নিজস্ব সম্ভাব্যতা আছে। ইতিহাসের একটি সম্ভাবনা হতে পারে : গত নির্বাচনে লেবার পার্টি জিতেছিল। অবশ্য তার সম্ভাব্যতা খুবই কম।

সীমানাহীনতার প্রস্তাবে মহাবিশ্বের ব্যাপারে ঈশ্বরের ভূমিকা বিষয়ে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এখন সাধারণত মেনে নেওয়া হয় সুসংজ্ঞিত বিধি অনুসারে মহাবিশ্ব বিবর্তিত হয়। এই বিধিগুলো ঈশ্বরের আদেশে হয়েছে –এটা হতে পারে। কিন্তু তিনি এখন আর আইনভঙ্গ করার জন্য মহাবিশ্বে হস্তক্ষেপ করেন না।

তবে আধুনিক কাল পর্যন্ত এই বিধিগুলো মহাবিশ্বের আরম্ভের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ঘুড়ির মতো মহাবিশ্বকে গুটিয়ে নিয়ে তাঁর যেমন খুশি সেইভাবে মহাবিশ্বকে আবার শুরু করা ঈশ্বরের ইচ্ছাধীন। সুতরাং মহাবিশ্বে বর্তমান অবস্থা হবে ঈশ্বরের প্রাথমিক অবস্থা নির্বাচনের ফল।

যদি সীমানাহীনতার প্রস্তাব নির্ভুল হয় তাহলে কিন্তু পরিস্থিতিটা খুবই পৃথক হবে। সেক্ষেত্রে পদার্থবিদ্যার বিধিগুলো মহাবিশ্বের আরম্ভেও প্রযোজ্য হবে। সুতরাং ঈশ্বরের প্রাথমিক অবস্থা নির্বাচনের স্বাধীনতা থাকবে। অবশ্য মহাবিশ্ব যে বিধিগুলো মেনে চলে সে বিধিগুলো নির্বাচন করার স্বাধীনতা তাঁর থাকত।

তবে নির্বাচনের খুব বেশি কিছু হয়ত থাকত না, হয়ত খুব অল্পসংখ্যক বিধি থাকত। সে বিধিগুলো নিজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আমাদের মতো জটিল জীব সৃষ্টির পথিকৃৎ। সেই জীবেরা প্রশ্ন করতে পারে : ঈশ্বরের চরিত্র (nature) কিরকম।

যদি অদ্বিতীয় এক কেতা বিধিই থাকে, সেটা শুধুমাত্র এক কেতা সমীকরণ। সেই সমীকরণগুলোতে প্রাণসঞ্চার করে কে? কে তা থেকে একটা মহাবিশ্ব সৃষ্টি করে, যে মহাবিশ্ব তারা পরিচালনা করতে পারে? পরম ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব কি এমনই শক্তিশালী যে সে নিজেই নিজের অস্তিত্ব সৃষ্টি করে?

যদিও বিজ্ঞান হয়ত মহাবিশ্ব কি করে সৃষ্টি হয়েছে সে সমস্যার সমাধান করতে পারে, কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না : মহাবিশ্ব অস্তিমান হওয়ার ঝামেলা কেন নিয়েছে? আমিও তার উত্তর জানি না।

(সমাপ্ত)

…………………………..
কৃষ্ণগহ্বর, শিশু মহাবিশ্ব ও অন্যান্য রচনা : স্টিফেন ডব্লু হকিং
অনুবাদ প্রফেসর আলতাফ হোসেন

……………………………..
আরও পড়ুন-
মহাবিশ্বের উৎপত্তি : প্রথম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি : দ্বিতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : প্রথম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : দ্বিতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : তৃতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : চতুর্থ কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : পঞ্চম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : ষষ্ঠ কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : সপ্তম কিস্তি

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!