সৃষ্টিতত্ত্ব রহস্য ব্রহ্মাণ্ড জগৎ মহাজগত মহাবিশ্ব

মহাবিশ্বের উৎপত্তি : প্রথম কিস্তি

-মূল: স্টিফেন হকিং

[*১৯৮৭ সালে নিউটনের প্রিন্সিপিয়া প্রকাশিত হওয়ার ত্রিশতমবার্ষিকীতে কেমব্রিজে অনুষ্ঠিত ‘মহাকর্ষের তিন শতাব্দী’ সভায় দেওয়া বক্তৃতা।]

মহাবিশ্বের উৎপত্তির সমস্যা অনেকটা সেই প্রাচীন প্রশ্নের মতো : প্রথম কি হয়েছিল? ডিম না বাচ্চা? অন্য কথায় কোন্ কর্মক (agency) মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছিল এবং সেই কর্মক কে । সৃষ্টি করেছিল? কিংবা হয়ত মহাবিশ্ব কিংবা যে কর্মক মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছিল তার অস্তিত্ব চিরদিনই ছিল –তাদের সৃষ্টি করার দরকার হয়নি।

আধুনিক কাল পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকদের প্রবণতা ছিল এ ধরনের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার। তারা ভাবতেন এগুলো বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন নয়। এ প্রশ্নগুলো অধিবিদ্যা (metaphysics) কিংবা ধর্মের অধিকারে। গত কয়েক বছরে কিন্তু এ মতের উদ্ভব হয়েছে যে বিজ্ঞানের বিধিগুলো হয়ত মহাবিশ্বের আরম্ভতেও সত্য।

সেক্ষেত্রে মহাবিশ্ব হয়ত নিজেই নিজেকে ধারণ করেছিল (self-contained) এবং বৈজ্ঞানিক বিধিগুলো সম্পূর্ণভাবে তার নিয়ামক।

মহাবিশ্বের কোন আরম্ভ ছিল কি না এবং থাকলে সে আরম্ভটা কিভাবে হয়েছে এ বিতর্ক চলেছে লিখিত ইতিহাসের শুরু থেকে। মূলত চিন্তাধারা ছিল দুটি। বহু প্রাচীন ঐতিহ্য এবং ইহুদি, ক্রীশ্চান আর ইসলামিক ধর্মের মতে মহাবিশ্ব সষ্টি হয়েছিল বেশ নিকট অতীতে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে বিশপ উসার (Bishop Ussher) হিসাব করে বলেছিলেন মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল ৪০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। ওল্ড টেস্টামেন্টের লোকদের বয়স যোগ করে তিনি এই হিসাব পেয়েছিলেন। মহাবিশ্বের জন্ম অদূর অতীতে– একটি তথ্য ও কল্পন সমর্থন করে।

প্রকৃতপক্ষে দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant) একটি উল্লেখযোগ্য এবং অত্যন্ত দুর্বোধ্য বই লিখেছিলেন, ‘The Critique of Pure Reason’। সে বইয়ে তার সিদ্ধান্ত ছিল, মহাবিশ্বের কেন একটা আরম্ভ ছিল এবং কেন আরম্ভ ছিল না –এই দুটি মতেরই সপক্ষে এবং বিপক্ষে সমান অকাট্য যুক্তি আছে।

সেটা হল মানবজাতি যে সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিবিদ্যায় অগ্রসরমান, স্পষ্ট প্রতীয়মান এই তথ্য–তার স্বীকৃতি। আমরা স্মরণ করি কোন কাজ কে প্রথমে করেছে কিংবা কোন্ প্রযুক্তি কে বিকশিত করেছে। যুক্তিটা হল : সেজন্য আমাদের অস্তিত্ব বেশি দিনের নয়, তা না হলে আমাদের যা অগ্রগতি হয়েছে তার চাইতেও বেশি অগ্রগতি হত।

আসলে বাইবেলের সৃষ্টির তারিখ এবং শেষ তুষার যুগ শেষ হওয়ার তারিখের ভিতরে খুব বেশি দূরত্ব নেই। মনে হয় সেই সময়ই আধুনিক মানবজাতি দেখা গেছে।

অন্যদিকে গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতো কিছু লোক মহাবিশ্বের যে একটা আরম্ভ ছিল এ চিন্তন পছন্দ করেননি। তাঁদের মনে হয়েছিল এর নিহিতার্থ হবে ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ। মহাকালের অস্তিত্ব চিরকাল রয়েছে এবং থাকবে এই বিশ্বাসই তাদের পছন্দ ছিল।

যা সৃষ্টি করা হয়েছে তার চাইতে যা চিরন্তন সেটা অনেক বেশি নিখুঁত। উপরে উল্লিখিত মানব প্রগতির যুক্তির একটা প্রত্যুত্তর তাদের ছিল : মাঝে মাঝে বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা মনুষ্যজাতিকে পিছনে ঠেলে দিয়ে একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে।

দুটি চিন্তাধারাতেই বিশ্বাস ছিল মহাবিশ্ব মূলত কালের সঙ্গে অপরিবর্তনশীল। হয় মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় এইরূপই ছিল কিংবা আজ যেমন আছে চিরকালই সেরকম ছিল।

এটা ছিল একটা স্বাভাবিক বিশ্বাস, তার কারণ মানবজীবন, এমন কি লিখিত ইতিহাসের সম্পূর্ণটাই এত সংক্ষিপ্ত যে, মানুষের জীবনকালে মহাবিশ্বের কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

একটা সুস্থিত অপরিবর্তনশীল মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে এর অস্তিত্ব চিরন্তন, না অতীতে কোন সীমিত কালে এর সৃষ্টি হয়েছিল সে প্রশ্ন অধিবিদ্যা কিংবা ধর্মের ব্যাপার। যে কোন তত্ত্বই ঐরকম মহাবিশ্বের কারণ দেখাতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant) একটি উল্লেখযোগ্য এবং অত্যন্ত দুর্বোধ্য বই লিখেছিলেন, ‘The Critique of Pure Reason’। সে বইয়ে তার সিদ্ধান্ত ছিল, মহাবিশ্বের কেন একটা আরম্ভ ছিল এবং কেন আরম্ভ ছিল না –এই দুটি মতেরই সপক্ষে এবং বিপক্ষে সমান অকাট্য যুক্তি আছে।

শিরোনাম থেকে বোঝা যায়, তার সিদ্ধান্তের ভিত্তি ছিল শুধুমাত্র যুক্তি। অন্য কথায় বলা যায় তারা মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের উপর কোন গুরুত্ব দেননি। আসলে একটি অপরিবর্তনশীল মহাবিশ্বে পর্যবেক্ষণ করার আছেটা কি?

তবে তার যুক্তি ছিল অসীম সংখ্যক তারকাসমূহ একসঙ্গে পতিত হবে না। তার কারণ, পতিত হওয়ার মতো কোন কেন্দ্রবিন্দু তাদের থাকবে না। অসীম তন্ত্র (infinite system) নিয়ে কেউ আলোচনা করতে গেলে তিনি কিরকম চোরাবালিতে আটকে যেতে পারেন এই যুক্তি তারই একটি উদাহরণ।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে কিন্তু পৃথিবী এবং বাকি মহাবিশ্ব যে কালের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে এ বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ জমতে লাগল। ভূতত্ত্ববিদরা বুঝতে পারলেন প্রস্তর এবং সেগুলোর ভিতরকার জীবাশ্ম সৃষ্টি হতে বহু কোটি কিংবা অবুদ বছর লেগেছে।

এই কাল, সৃষ্টকদিগের (creations) গণনা করা পৃথিবীর বয়সের চাইতে অনেক বেশি। আরও সাক্ষ্য পাওয়া গেল তথাকথিত তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় বিধি থেকে। এই বিধিটি গঠন করেছিলেন জার্মান পদার্থবিদ লুডভিক বোজম্যান (Ludwing Boltzmann)।

এ বিধি বলে : মহাবিশ্বে বিশৃঙ্খলার মোট পরিমাণ কালের সঙ্গে সবসময়ই বর্ধমান [এটাকে একটি রাশি দিয়ে মাপা হয় তাকে বলা হয় এনট্রপি’ (entropy)]। মানবিক অগ্রগতির যুক্তির মতো এই যুক্তিও বলে মহাবিশ্বের শুধুমাত্র সসীম কালে অস্তিত্ব থাকারই সম্ভাবনা, তাছাড়া মহাবিশ্ব এতদিনে অপজাত হয়ে (degenerated) সম্পূর্ণ বিশৃঙখল অবস্থায় পৌঁছাত এবং সবটাই একই তাপাঙ্গে পৌঁছাত ।

সুস্থিত মহাবিশ্বের কল্পন সম্পর্কে আরেকটি অসুবিধা : নিউটনের (Newton) মহাকর্ষ বিধি অনুসারে মহাবিশ্বের প্রতিটি তারকাই অন্য প্রতিটি তারকাকে স্বাভিমুখে আকর্ষণ করছে। তাই যদি হয় তাহলে তারা পরস্পর থেকে স্থির দূরত্বে থেকে কি করে গতিহীন হতে পারে? তাদের কি একসঙ্গে পতন হবে না?

নিউটন এ সমস্যা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। রিচার্ড বেন্টলি (Richard Bentley) নামে তখনকার একজন অগ্রগণ্য দার্শনিককে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে এ বিষয়ে তিনি একমত : সীমিত সংখ্যক তারকাসমূহ গতিহীন হয়ে থাকতে পারে না, তারা কোন কেন্দ্রবিন্দুতে এসে পড়বে।

তবে তার যুক্তি ছিল অসীম সংখ্যক তারকাসমূহ একসঙ্গে পতিত হবে না। তার কারণ, পতিত হওয়ার মতো কোন কেন্দ্রবিন্দু তাদের থাকবে না। অসীম তন্ত্র (infinite system) নিয়ে কেউ আলোচনা করতে গেলে তিনি কিরকম চোরাবালিতে আটকে যেতে পারেন এই যুক্তি তারই একটি উদাহরণ।

১৯১৫ সালে তিনি যে ব্যাপক অপেক্ষবাদ গঠন করেছিলেন তার ভবিষ্যদ্বাণী ছিল–মহাবিশ্ব প্রসারমাণ। কিন্তু সুস্থির মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর এতই বিশ্বাস ছিল যে তিনি নিউটনের তত্ত্ব এবং মহাকর্ষকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তার তত্ত্বে একটি উপাদান যোগ করেন।

মহাবিশ্বের অসীম সংখ্যক অন্য তারকাগুলো থেকে আগত প্রতিটি তারকার উপর বল বিভিন্ন পদ্ধতিতে যোগ করে তারকাগুলো পরস্পর থেকে স্থির দূরত্বে থাকতে পারে কিনা –এ প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তর পাওয়া সম্ভব।

এখন আমরা জানি সঠিক পদ্ধতিটি হল তারকাগুলোর সীমিত অঞ্চল নিয়ে বিচার করা এবং তারপর তার সঙ্গে আরও তারকা যোগ করা। সেই তারকাগুলো অঞ্চলের বাইরে মোটামুটি সমভাবে বন্টিত।

তারকাগুলোর একটি সীমিত সংগ্রহ একত্রে পতিত হবে এবং নিউটনীয় বিধি অনুসারে অঞ্চলের বাইরে অধিকতর সংখ্যক তারকা যোগ করলে চুপসে যাওয়া বন্ধ হবে না। সুতরাং অসীম সংখ্যক তারকা সংগ্রহ গতিহীন অবস্থায় থাকতে পারে না।

এককালে যদি তারা পরস্পর সাপেক্ষ চলমান না হয় তাহলে তাদের পারস্পরিক আকর্ষণের ফলে তারা পরস্পরের উপরে পতিত হতে শুরু করবে। বিকল্পে তারা পরস্পর থেকে দূরে অপসরণ করতে পারে, সেক্ষেত্রে মহাকর্ষ তাদের অপসরণের বেগ শ্লথতর করবে।

সুস্থির এবং অপরিবর্তনীয় মহাবিশ্বের কল্পন সম্পর্কে এই অসুবিধাগুলো থাকলেও সপ্তদশ, অষ্টাদশ, উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এ প্রস্তাব কেউ করেননি যে কালের সঙ্গে মহাবিশ্বেরও বিবর্তন হতে পারে। নিউটন এবং আইনস্টাইন দুজনেই।

মহাবিশ্ব হয় প্রসারিত হচ্ছে না হয় সঙ্কুচিত হচ্ছে এই ভবিষ্যদ্বাণী করার সুযোগ হারিয়েছেন। নিউটনকে এজন্য দোষ দেওয়া যায় না কারণ নিউটন জীবিত ছিলেন প্রসারমাণ মহাবিশ্বের পর্যবেক্ষণভিত্তিক আবিষ্কারের আড়াইশ’ বছর আগে। কিন্তু ব্যাপারটা আইনস্টাইনের বোঝা উচিত ছিল।

১৯১৫ সালে তিনি যে ব্যাপক অপেক্ষবাদ গঠন করেছিলেন তার ভবিষ্যদ্বাণী ছিল–মহাবিশ্ব প্রসারমাণ। কিন্তু সুস্থির মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর এতই বিশ্বাস ছিল যে তিনি নিউটনের তত্ত্ব এবং মহাকর্ষকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তার তত্ত্বে একটি উপাদান যোগ করেন।

সেই তত্ত্বটা কণাবাদী মহাকর্ষ quantum gravity)। সঠিক কণাবাদী মহাকর্ষ তত্ত্ব নির্ভুল কি রূপ নেবে আমরা এখনো জানি না। আপাতত যে তত্ত্ব সবচাইতে ভাল প্রার্থী তার নাম অতিতন্তু তত্ত্ব (theory of superstring)। কিন্তু এখনও এমন কয়েকটা সমস্যা আছে যার সমাধান হয়নি।

১৯২৯ সালে এডুইন হাবল (Edwin Hubble) এর মহাবিশ্বের প্রসারণ আবিষ্কারের ফলে এর উৎপত্তি সম্পর্কীয় আলোচনায় সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়।

আপনি যদি নীহারিকাগুলো সম্পর্কে আধুনিক মত মেনে নেন এবং সেগুলোকে কালে পশ্চাৎগামী করে চালিয়ে দেন তাহলে মনে হয় দশ থেকে কুড়ি হাজার মিলিয়ন বছর আগে কোন এক মুহূর্তে সবগুলো নীহারিকাই (galaxy) একটা মহাবিশ্বের শুরু হওয়ার কথা সেটা বলতে পারে না। সেজন্য দরবার করতে হবে ঈশ্বরের কাছে।

অনন্যতা সম্পর্কে মতামতের আবহাওয়ার পরিবর্তন লক্ষ্য করা বেশ আকর্ষণীয়। আমি যখন গ্র্যাজুয়েট ছাত ছিলাম তখন প্রায় কেউই এগুলোর উপর গুরুত্ব আরোপ করত না। এখন অনন্যতা উপপাদ্যগুলোর ফলে প্রায় সবাই বিশ্বাস করে, মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল অনন্যতা দিয়ে এবং সেসময় পদার্থবিদ্যার বিধিগুলো ভেঙে পড়েছিল।

তবে আমার এখন মনে হয় যদিও অনন্যতা একটি রয়েছে তবুও পদার্থবিদ্যার বিধিগুলো স্থির করতে পারে কি করে মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল।

কণিকাগুলোর নির্ভুলভাবে সংজ্ঞিত অবস্থান এবং গতিবেগ থাকে না –কণাবাদী বলবিদ্যার অনিশ্চয়তার নীতি বলে তারা একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে প্রলিপ্ত থাকে (smeared out)। কণাবাদী বলবিদ্যা অবস্থান এবং বেগ যুগপৎ মাপন অনুমোদন করে না।

ব্যাপক অপেক্ষবাদ এই তথ্যগুলোকে ধর্তব্য বলে গ্রহণ করে না। সেজন্য যাকে চিরায়ত তত্ত্ব বলা হয় ব্যাপক অপেক্ষবাদ সেইরকমই একটা তত্ত্ব। এর ফলে স্বাভাবিক অবস্থায় কোন অসুবিধা হয় না, তার কারণ স্থান-কালের বক্তৃতার ব্যাসার্ধ কণিকার অবস্থানের অনিশ্চয়তার তুলনায় খুবই বৃহৎ।

তবে অনন্যতা উপপাদ্যগুলোর নির্দেশ : মহাবিশ্বের বর্তমান সম্প্রসারণ দশার প্রারম্ভে বক্রতার ব্যাসার্ধ থাকবে ক্ষুদ্র এবং স্থান-কাল অত্যন্ত বেশি বিকৃত হবে। এই অবস্থায় অনিশ্চয়তার নীতি হবে অতন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং অনন্যতার ভবিষ্যদ্বাণী করে ব্যাপক অপেক্ষবাদ নিজেই নিজের পতন ঘটিয়েছে।

মহাবিশ্বের প্রারম্ভ নিয়ে আলোচনা করতে হলে আমাদের প্রয়োজন কণাবাদী বলবিদ্যা এবং ব্যাপক অপেক্ষবাদকে সংযুক্ত করে এরকম একটা তত্ত্ব।

সেই তত্ত্বটা কণাবাদী মহাকর্ষ quantum gravity)। সঠিক কণাবাদী মহাকর্ষ তত্ত্ব নির্ভুল কি রূপ নেবে আমরা এখনো জানি না। আপাতত যে তত্ত্ব সবচাইতে ভাল প্রার্থী তার নাম অতিতন্তু তত্ত্ব (theory of superstring)। কিন্তু এখনও এমন কয়েকটা সমস্যা আছে যার সমাধান হয়নি।

এক অর্থে একে কালের একটি অভিমুখরূপে ভাবা যেতে পারে। সে অভিমুখ বাস্তব কালের সমকোণে। বিশেষ কয়েকটি ধর্ম সমন্বিত কণিকার ইতিহাসগুলোর সম্ভাব্যতা যোগ করা হয়। ধর্মটি হতে পারে বিশেষ কয়েকটি কালে বিশেষ কয়েকটি বিন্দুর ভিতর দিয়ে গমন করা।

তার ভিতর একটা হল আইনস্টাইনের কল্পন : মহাকর্ষের ক্রিয়ার প্রতিরূপ হতে পারে, এমন একটা স্থান-কাল যেটা তার ভিতরকার পদার্থ এবং শক্তির দ্বারা বক্র কিংবা বিকৃত হয়েছে অথবা জড়িয়ে গেছে। এই বক্রস্থানে বস্তুপিণ্ডগুলো ঋজুরেখার নিকটতম পথে যেতে চেষ্টা করে।

তবে স্থানটা বঙ্কিম হওয়ার দরুন মনে হয় মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র যেন তাদের বঙ্কিম করে দিয়েছে।

পরম তত্ত্বের (ultimate theory) আর একটি উপাদান অর্থাৎ রিচার্ড ফাইনম্যানের প্রস্তাব আমরা আশা করতে পারি। সে প্রস্তাবে বলা রয়েছে কোয়ান্টাম তত্ত্বকে আমরা বহু ইতিহাসের যোগফল’ (sum over histories) রূপে গঠন করতে পারি।

এর সরলতম রূপে কল্পনটি হল : স্থানকালে প্রতিটি কণিকারই সম্ভাব্য সবরকম পথ কিংবা ইতিহাস রয়েছে। প্রতিটি পথ কিংবা ইতিহাসেরই একটা সম্ভাব্যতা আছে। সেটা নির্ভর করে তার আকারের (shape) উপর।

এই কল্পনকে কার্যকর করতে হলে, যে বাস্তব কালে আমরা বেঁচে আছি বলে অনুভব করি সে কালে বিচার না করে আমাদের কাল্পনিক কালে যে ইতিহাস ঘটে সেগুলো বিচার করতে হবে। কাল্পনিক কালকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর অংশের মতো শোনাতে পারে কিন্তু এটি একটি সুসংজ্ঞিত গাণিতিক ধারণা (a well-defined mathematical concept)।

এক অর্থে একে কালের একটি অভিমুখরূপে ভাবা যেতে পারে। সে অভিমুখ বাস্তব কালের সমকোণে। বিশেষ কয়েকটি ধর্ম সমন্বিত কণিকার ইতিহাসগুলোর সম্ভাব্যতা যোগ করা হয়। ধর্মটি হতে পারে বিশেষ কয়েকটি কালে বিশেষ কয়েকটি বিন্দুর ভিতর দিয়ে গমন করা।

তারপর আমরা যে স্থান-কালে বাস করি যোগফলটিকে সেই স্থান-কালে বহির্বেশন (extrapolate) করতে হয়। কণাবাদী বলবিদ্যায় সবচাইতে পরিচিত অভিগমন (approach) এটা নয় তবে এ পদ্ধতিতে অন্য পদ্ধতির মতো একই ফল পাওয়া যায় ।

কণাবাদী মহাকর্ষের ক্ষেত্রে ফাইনম্যানের ইতিহাসগুলোর যোগফলের কল্পনের সঙ্গে জড়িত থাকবে মহাবিশ্বের অর্থাৎ বিভিন্ন বক্র স্থান-কালের সম্ভাব্য ইতিহাসগুলোর যোগফল। এগুলো হবে মহাবিশ্ব এবং তার অন্তর্গত সমস্ত জিনিসের প্রতিনিধি।

(চলবে…)

…………………………..
কৃষ্ণগহ্বর, শিশু মহাবিশ্ব ও অন্যান্য রচনা : স্টিফেন ডব্লু হকিং
অনুবাদ প্রফেসর আলতাফ হোসেন

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………..
আরও পড়ুন-
মহাবিশ্বের উৎপত্তি : প্রথম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি : দ্বিতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : প্রথম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : দ্বিতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : তৃতীয় কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : চতুর্থ কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : পঞ্চম কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : ষষ্ঠ কিস্তি
মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও পরিণতি : সপ্তম কিস্তি
সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে প্লাতনের মতবাদ
মহাবিশ্বের সৃষ্টি কাহিনী
পবিত্র কোরানে সৃষ্টিতত্ত্ব
আরশ ও কুরসী সৃষ্টির বিবরণ
সাত যমীন প্রসঙ্গ
সাগর ও নদ-নদী
পরিচ্ছেদ : আকাশমণ্ডলী
ফেরেশতা সৃষ্টি ও তাঁদের গুণাবলীর আলোচনা
পরিচ্ছেদ : ফেরেশতাগণ
জিন সৃষ্টি ও শয়তানের কাহিনী
সীরাত বিশ্বকোষে বিশ্ব সৃষ্টির বিবরণ
আদম (আ) পৃথিবীর আদি মানব
আদম সৃষ্টির উদ্দেশ্য
আদম (আ)-এর সালাম
আদম (আ)-এর অধস্তন বংশধরগণ
হাদীসে আদম (আ)-এর সৃষ্টি প্রসঙ্গ
আদম (আ)-এর সৃষ্টি

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!