যুগে যুগে মহাপ্রভু

যুগে যুগে মহাপ্রভু

অবসান হল সত্য যুগের। ত্রেতায় স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু এলেন রামচন্দ্ররূপে। ভক্তের সঙ্গে ভগবানের লীলায় আমরা ধন্য হলাম। রামচন্দ্র এবং বীর হনুমান। ভগবান রামের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন পবনপুত্র হনুমান। বন্দিনী জননী সীতাকে রাবণের অশোককানন থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে তিনিই ছিলেন তাঁর প্রভু রামচন্দ্রের প্রধান বল ও ভরসা।

কালের নিয়ম মেনেই একদিন বিদায় ঘটল ত্রেতা যুগের। এবার ধর্ম ও কর্মের মেলবন্ধনে ধরায় সৃষ্টি হবে নতুন এক যুগের। যাকে আমরা দ্বাপর বলে চিহ্নিত করব। আবার ভগবান শ্রীবিষ্ণু পৃথিবীতে আসবেন অবতাররূপে। এবার তিনি দুষ্টের দমন করবেন শ্রীকৃষ্ণ হয়ে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি সত্যের কাণ্ডারী হয়ে অজুর্নের রথের সারথি হবেন। আবার যাদবদের অধঃপতন দেখে তিনিই তাঁদের ঠেলে দেবেন ধ্বংসের পথে। কলির প্রভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যদুবংশ।

স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মায়ার প্রভাবে যাদবরা নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করবেন। তারপর যা হওয়ার তাই হল। যদুবংশ ধ্বংস হল। এই ঘটনার পর বলরাম সমুদ্রের তীরে পরমাত্মার ধ্যানে মগ্ন হয়ে যোগস্থ হলেন এবং আত্মাতে আত্মসংযোগ করে মনুষ্য দেহ ত্যাগ করলেন। দাদা বলরামের পরিণতি দেখে শোকে ভেঙে পড়লেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি আবার মায়া রচনা করলেন। ব্যাধ তাঁর রক্তিমাভ পদযুগলকে হরিণের মুখ ভেবে ভুল করে বসলেন। সেই ব্যাধের তূণীরে ছিল অমোঘ বাণ। শাম্বর প্রসব করা মুষলের যে অবশিষ্টাংশ চূর্ণ করা যায়নি তা সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। জেলেদের জালে মাছটি যখন ধরা পরে তখন সেই স্থানে এই ব্যাধ উপস্থিত ছিল। সেই মুষলখণ্ড ব্যাধ তাঁর তীরের অগ্রভাগে ফলকরূপে জুড়ে রেখেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ একদিন উদ্ধবকে বলেছিলেন, আমি যখন মর্তধাম ত্যাগ করব তখন মানুষরা মঙ্গলহীন হবে এবং কলি পৃথিবীকে আক্রমণ করবে।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ইচ্ছামৃত্যুকে বেছে নিয়ে চলে গেলেন বৈকুন্ঠে। কলির সামনে তখন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। তিনি তাঁর জাল বিস্তার করলেন। শুরু হল অধর্মের জয়যাত্রা। আর ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতে ধর্মকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে জগন্নাথ মিশ্রের ঘরে জন্মগ্রহণ করলেন মহাপ্রভু নিমাই। শুরু হল এক নতুন যুগের। সেই যুগকে আমরা অনায়াসে হরির যুগ বলে চিহ্নিত করতে পারি। বিদেহরাজ নিমির মনে একবার সুন্দর এক প্রশ্ন জেগেছিল। তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য ঋষিদের শরণাপন্ন হলেন। তিনি ঋষি করভাজনের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, মুনিবর! শ্রীভগবান কোন যুগে কীরকম বর্ণ ও কীরূপ আকার ধারণ করেন? ভক্তরাই বা তাঁকে কী নামে পুজো করে থাকেন?

উত্তরে ঋষি বলেছিলেন, হে মহারাজ! ভগবান শ্রীহরি সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি -এই চার যুগে নানা বর্ণ, নানা নাম এবং নানাভাবে পূজিত হয়েছেন। এরপর তিনি বর্ণনা দিতে শুরু করলেন। বললেন, মহারাজ! সত্যযুগে শ্রীভগবান শুক্লবর্ণ, চতুর্বাহু মূর্তিতে অবতীর্ণ হয়ে হংস, সুপর্ণ, যোগেশ্বর, পরমাত্মা ইত্যাদি নামে খ্যাত হয়েছেন। শান্ত, নির্বৈর, সমদর্শী হয়ে মানুষরা, দমাদি সাধনের দ্বারা উপাসনা করেছেন।

কলিযুগে শ্রীভগবান কৃষ্ণ এবং ইন্দ্রনীল জ্যোতিবিশিষ্ট। বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা সংকীর্তনরূপ যজ্ঞের দ্বারা তাঁর আরাধনা করেন। কলি-মানবের পক্ষে কৃষ্ণ এবং রামের ধ্যান ও স্তুতি বিশেষ ফলদায়ক। এরপরই মুনিবর রাজা নিমিকে বললেন, হে রাজন! আপনাকে দুটো শ্লোক শোনাব। প্রথমে আমি কৃষ্ণ এবং পরে রামের স্তুতি করব-

ধ্যেয়ং সদা পরিভবঘ্নমভীষ্টদোহং
তীর্থাস্পদং শিবরিঞ্চিনুতং শরণ্যম্।
ভৃত্যার্তিহং প্রণতপাল ভবাব্ধিপোতং
বন্দে মহাপুরুষ তে চরণারবিন্দম্।।

অর্থাৎ হে প্রণতজন-পালক! সর্বদা ধ্যানের যোগ্য এবং ইন্দ্রিয়াদির নির্জিতকারী অভীষ্টপ্রদ, গঙ্গাদি তীর্থের আশ্রয়, শিব এবং ব্রহ্মার দ্বারা স্তুত, শরণাগত ভৃত্যের দুঃখনাশক এবং ভবসমুদ্রের তরণীস্বরূপ হে মহাপুরুষ! আপনার পাদপদ্মের বন্দনা করি। ঋষি করভাজন নিমিকে বললেন, হে নৃপশ্রেষ্ঠ! এইভাবে বিভিন্ন যুগে মানুষরা বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন রূপে শ্রীহরির পুজো করে থাকেন।

ঘোর কলি! চতুর্দিকে অবিচার, অনাচার। যোগ্য ব্যক্তিরা বন্দি হয়ে আছেন কাল কুঠরিতে। অসম্মানিত, লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে তাঁরা গৃহের বাইরে আসতে ভয় পান। অধার্মিক, অযোগ্য ও চাটুকারদের তখন রমরমা। তাঁরা যেহেতু ক্ষমতাবানের স্নেহধন্য ও তাঁদের পদলেহন করেন তাই সেইসব মানুষের দাপাদাপি ও অত্যাচার মুখ বুজে মেনে নিতে হচ্ছে। তাঁরা ধর্ম নিয়ে করছেন ছেলেখেলা। এই পটভূমিতে, ধর্মকে পুনরায় নিজের আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আবার ধরায় আসতে হল। যেহেতু কলিকাল, তাই তিনি এলেন সাধারণ মানুষরূপে, নবদ্বীপের জগন্নাথ মিশ্রের ঘরে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য মহিলারা শঙ্খধ্বনি করে নবজাতককে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। নবদ্বীপের আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছিল সেই শঙ্খনিনাদে। আর কলিরাজ সেই আওয়াজে চমকে উঠেছিলেন। তাঁর রথের চাকা ক্ষণিকের জন্য হয়তো স্তব্ধ হয়েছিল। অধর্মের পাশে আবদ্ধ কলি – অভিশপ্ত মানুষজন সেই শব্দ শুনে শিউরে উঠে দুহাত দিয়ে কান চেপে ধরেছিলেন। কারণ, তাঁরাও বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁদের প্রভু কলিকে একদিন মাথা নত করতে হবে এই সদ্যোজাত শিশুর সামনে। হরিনামে তিনি মাতিয়ে তুলবেন এই ধরাকে। আর কলিকে বশ করার একমাত্র উপায় তো হরিনাম আর সংকীর্তন। অল্পদিনের মধ্যেই নবদ্বীপবাসী বুঝতে পেরেছিলেন, এই শিশু নেহাত কোনও সাধারণ মানব সন্তান নন, তিনি ঈশ্বরের অবতার, স্বয়ং ভগবান।

মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য বা ‘নিমাইচাঁদ’-এর বয়স তখন মাত্র আট বছর। মা শচীদেবী তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁরে, কী ছেলে রে তুই? তোর কি লজ্জা, ঘেন্না বলে কিছু নেই?

বালক নিমাই একগাল হেসে বললেন, মা! আমি কী করেছি যে তুমি আজ আমাকে এ কথা বললে!

উত্তরে শচীদেবী বললেন, রাজ্যের এঁটো-কাঁটা হাঁড়ির ওপর বসেও জিজ্ঞেস করছিস, আমি কী করেছি!

মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য উত্তরে গম্ভীর গলায় বললেন, জগৎ তো বিষ্ণুময়। এই জগতের অণু-পরমাণু, আকাশ-বাতাস, জল-আগুন, তুমি-আমি, আমাদের ঘরে যে ঠাকুর আছেন সব কিছুতেই তো অবস্থান করছেন স্বয়ং হরি। তাহলে হরির আবার শুদ্ধ, অশুদ্ধ কী মা!

অসাধারণ বিচার! সেই তিনিই একদিন তাঁর সংকীর্তনের প্রেমজোয়ারে ভাসিয়ে দেবেন জগাই-মাধাইয়ের মতো দুর্বিনীত, মাতালকে।

কী ঘটেছিল সেদিন! লীলাময় নিমাই নিজের স্বরূপ প্রকাশ করলেন তাঁর ভক্তদের সামনে। তিনি তাঁর দুই ভক্ত নিত্যানন্দ ও হরিদাসকে ডেকে বললেন, শোনো! তোমাদের দুজনকে আমি একটা কাজের ভার দেব। আজ থেকেই তোমরা নবদ্বীপের ঘরে ঘরে ভিক্ষা চাইতে যাবে। শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। কলিকে বশ করার শিক্ষা তিনি তাঁর পার্ষদদের মাধ্যমে আমাদের এইভাবেই দিতে শুরু করলেন।

কিন্তু এই সংকীর্তন নগরকোটাল ভ্রাতা জগাই ও মাধাইকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিল। একদিন তাঁদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এলেন নিত্যানন্দ ও হরিদাস। খবরটা নিমাইয়ের কানেও পৌঁছল। তিনি একদিন সবাইকে নিয়ে নগর-সংকীর্তনে বেরলেন। জগাই-মাধাইয়ের বাড়ির কাছে যাওয়া মাত্র দুই ভাই বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। থামতে বললেন নিত্যানন্দকে। দুই ভাইয়ের বারণ শুনে নিত্যানন্দ দ্বিগুণ উদ্যমে হরিনাম করতে শুরু করলেন। ব্যস! আগুনে ঘি পড়ল। মাধাই রাস্তার একধারে পড়ে থাকা কলসির ভাঙা টুকরো তুলে নিত্যানন্দকে লক্ষ করে ছুড়ে মারলেন। কপালে লাগল সেটি। অঝোরে রক্ত পড়তে শুরু করল। সারা মুখ রক্তে মাখামাখি। তবু কৃষ্ণ নাম করে যান তিনি। ক্ষিপ্ত মাধাই এতে আরও রেগে গেলেন। তিনি আবার একটি ভাঙা টুকরো হাতে তুলে নিলেন। তাঁকে বাধা দিলেন জগাই।

নিমাই তখন একটু দূরে তাঁর অন্য পার্ষদদের নিয়ে নৃত্য করছিলেন। তিনি খবর পেলেন নিত্যানন্দকে আঘাত করেছে জগাই ও মাধাই। তিনি ছুটে এলেন সেইস্থানে এবং নিত্যানন্দের অবস্থা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, চক্র-চক্র।

তাঁকে শান্ত করার জন্য রক্তাক্ত নিত্যানন্দ বললেন, প্রভু! তুমি না বলেছিলে এই কালে আর অস্ত্রধারণ করবে না। প্রেম, দয়া, ভালোবাসা দিয়ে উদ্ধার করবে মানুষকে! সেই তুমি আজ অস্ত্রধারণ করতে চাইছ! তুমি যে চক্রকে আহ্বান করছ তাতে তো নিরপরাধেরও প্রাণ যাবে। আজ যদি মাধাইকে না আটকাত জগাই, তাহলে তো তোমার নিতাইয়ের প্রাণ যেত।

নিত্যানন্দের কথা শুনে ধীরে ধীরে শান্ত হলেন মহাপ্রভু। তারপর বললেন, জগাই আমার নিত্যানন্দকে বাঁচিয়েছে? ওরে জগাই, তুই এত ভালো। আয়, আমার বুকে আয়। নিত্যানন্দকে বাঁচিয়ে তুই আমায় কিনে নিয়েছিস। তোর যা ইচ্ছে সেই বর চেয়ে নে, আজ আমি তোর অভীষ্ট পূরণ করব। আজ থেকে তোর প্রেমভক্তি হোক।

শ্রীগৌরাঙ্গের সেই করুণা দেখে ‌‌জয়ধ্বনি করে উঠলেন উপস্থিত বৈষ্ণবের দল। জগাই তখন কাঁদছেন। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে তাঁর বুক। তিনি নিমাইয়ের পায়ে মূর্ছিত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। মহাপ্রভু তখন তাঁকে ডেকে বললেন, ওরে জগাই, আমার দিকে তাকা, ভালো করে আমার দিকে তাকিয়ে দেখ। ধীরে ধীরে তিনি মুখ তুলে তাকালেন প্রভুর দিকে। কিন্তু তিনি কী দেখলেন? দেখলেন তাঁর সামনে নিমাই নয়, দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং ভগবান শ্রীবিষ্ণু। শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী নারায়ণ তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটি-মিটি হাসছেন। আবার মূর্ছা গেলেন জগাই।

নামসংকীর্তনং যস্য সর্বপাপপ্রণাশনম্‌।
প্রণামো দুঃখ-শমনস্তং নমামি হরিং পরম্‌।।

যাঁর নাম-কীর্তনে সর্বপাপ দূর হয়, যাঁকে প্রণাম করলে সর্ব দুঃখের নিবৃত্তি হয়। আর সেই কাজটা করেই উদ্ধার পেয়ে গেলেন জগাই ও মাধাই। ঈশ্বরের বৈঠকখানায় প্রবেশের ছাড়পত্রটি তাঁদের হাতে তুলে দিলেন সর্বদয়াময় মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গ।

………………………………..
ঋণস্বীকার: ‘শ্রীচৈতন্যকথামৃত’: ডঃ নন্দলাল ভট্টাচার্য, ‘ শ্রীশ্রী চৈতন্যদেব’:স্বামী সারদেশানন্দ,‘ভাগবত-কথা’: স্বামী গীতানন্দ, দেবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অপূর্ব চট্টোপাধ্যায় : বর্তমান পত্রিকা।
পুণঃপ্রচারে বিনীত, প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!