নিজেকে জানো আত্মদর্শন স্বরূপসাধন ধ্যান চক্র মুক্তি নির্বাণ

-স্বামী সৌমেশ্বরানন্দ

ভবিষ্যতের আশংকায় আমরা যে দুঃখ পাই, তার মূল কারণ নিরাপত্তার চাহিদা থেকে ভয় (fear of insecurity)। আমাদের মানসিক নির্ভরতাই এর জন্যে দায়ী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হওয়া, স্ত্রী-পুত্র-আত্মীয়দের ওপর নির্ভর করা, কোনো মতবাদকে জোর করে আঁকড়ে ধরে থাকার পেছনে আছে এই মানসিক নির্ভরতা, এবং মানুষ আশা করে যে, এভাবে ভরসা করে সে চিরদিন নিরাপদ থাকবে।

কিন্তু স্থায়ী নিরাপদ বা নিরাপত্তা বলে কিছু আছে কি? যার ওপর নির্ভর করছি সে যে-কোনো সময় মরে যেতে পারে, সেই প্রতিষ্ঠান উঠে যেতে পারে, নতুন সত্যের আবিষ্কারে আমার বিশ্বাসের মতবাদ খণ্ডিত বা বাতিল হয়ে যেতে পারে। বাইরের কোন কিছুতে নির্ভর করা একটা আশা মাত্র, একটা কল্পনা। তাহলে উপায়?

উপায় নিজের পায়ে দাঁড়ানো। মনের দিক থেকে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়াই আত্মবিশ্বাসের পথ। এটা এস্‌কেপিজম্‌ (escapism) নয়, বরং বাস্তবের সম্মুখীন হওয়া। এ-জগতে সবকিছুই ঘটতে পারে- এটি মনে রেখে জীবনকে গ্রহণ করতে হয়।

যে কোনো পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত থাকাই মনকে অন্য প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। দৈনন্দিন জীবনযাপন করুন, অফিসে যান, স্ত্রী-সন্তানের যত্ন নিন, কিন্তু মানসিক নির্ভরতার ভাবটি দূর করে দিন বিচার ও অভ্যাসের সাহায্যে।

এটি আপনাকে দেবে মুক্তির স্বাদ, বিশ্বাস-অভ্যাস-বাসনার আবর্ত থেকে স্বাধীনতার পথে যাত্রার আনন্দ। জীবনের ভালো-মন্দ ঘটনাগুলি এতদিন আপনাকে কেবল সুখ-দুঃখ দিত, এখন থেকে দেবে অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন নতুন সত্য।

কাল্পনিক সুখ-দুঃখের বদলে আপনি লাভ করবেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবের মুখোমুখি হতে পারবেন মুক্ত মন নিয়ে। একটি সুন্দর উপমা দিয়ে ঠাকুর বলতেনঃ ‘জলে নৌকা থাকুক ক্ষতি নেই, কিন্তু নৌকাতে যেন জল না থাকে।’

ভবিষ্যতের জন্যে দুশ্চিন্তা করে সত্যিই কি কোনো লাভ আছে? বরং তা বর্তমানকেও নিষ্ক্রিয়তায় আচ্ছন্ন করে রাখে। দুশ্চিন্তা যখনই হবে তখন নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার- আমার এই চিন্তায় সমস্যার সমাধান হবে কি?

ধরুন, আপনার কোনো আপনজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে অপারেশনের জন্যে। আপনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, অপারেশন সাক্‌সেসফুল অর্থাৎ রোগী ভালো হবে কিনা এই ভেবে। এখন, আপনার এই চিন্তা কি অপারেশনের ফলাফল পাল্টাতে পারবে? উত্তর-না।

বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে বলে আপনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। আপনার এই চিন্তায় পণ্যমূল্য কমবে কি? না। রাত হয়ে গেছে, কিন্তু আপনি বাড়ি ফেরার বাস পাচ্ছেন না, এই ভেবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন আপনার এই চিন্তার ফলে বাস আসবে? না।

তাহলে দেখছেন যে আপনার দুশ্চিন্তার কোন দাম নেই, কোনো কার্যকারিতাও নেই। বরং এর ফলে আপনার অ্যাসিডিটি হতে পারে, রক্তচাপ বেড়ে বা কমে যেতে পারে, শরীর ব্যথা হতে পারে, এ-রকম নানান উপসর্গ আপনার শরীরে ও মনে দেখা দিতে পারে।

তাই দুশ্চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে চুপচাপ বসে না থেকে বা অস্থির না হয়ে, বরং আপনার যেটি কর্তব্য সেটি করুন। ভবিষ্যতে যদি সত্যিই কোনো বিপদের আশংকা থাকে, তবে তার জন্যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, বসে-বসে শুধু চিন্তা করলে কোনো লাভ নেই।

তাছাড়া, আপনি যতটা বিপদের ভাবনা করছেন, ততটা বিপদ যে হবেই তাও নয়।

……………
আরো পড়ুন:
ধ্যান ও শান্তি : এক
ধ্যান ও শান্তি : দুই

…………………………………
স্বামী সৌমেশ্বরানন্দের ‘দৈনন্দিন জীবনে ধ্যান ও শান্তি’
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে: ভারতের সকল সাধক ও সাধিকা
পুণঃপ্রচারে বিনীত- প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!