মা মনসা পূজা

মনসা পূজা

-নীহাররঞ্জন রায়

বাঙলা, আসাম ওড়িষ্যায় মনসাদেবীর পূজা সুপ্রচলিত। এই পূজা এখন যে-ভাবে সাধারণত অনুষ্ঠিত হয় তাহা ঠিক প্রতিমাপূজা নয়, ঘাট-মনসা বা পাট-মনসার পূজা এবং মধ্যযুগীয় বাঙলার মনসামঙ্গলের সঙ্গে এই ঘাট-মনসা ও পাট-মনসার সম্বন্ধই ঘনিষ্ঠ।

ধান্যপূর্ণ মাটির ঘটের উপর সর্পধারিণী বা সর্পােলংকারা মনসার ছবি আঁকিয়া তাঁহার পূজা অথবা শোলা বা কাপড়ের পটের উপর সর্পময়ী বা সর্পধারিণী বা সর্পালংকারা মনসার কাহিনী আঁকিয়া টাঙানো পটের সম্মুখে পূজাই সাধারণ রীতি।

বাঙলাদেশে যে-সব মনসাদেবীর প্রতিমা পাওয়া গিয়াছে তাহার প্রায় প্রত্যেকটিতেই মনসাদেবীর সঙ্গে একাধিক সর্পের, ক্রোড়াসীন একটি মানবশিশুর, একটি ফলের এবং কোথাও কোথাও একটি পূর্ণঘাটের প্রতিকৃতি বিদ্যমান। ইহাদের প্রত্যেকটিই প্ৰজনন শক্তির প্রতীক। একটি মূর্তির পাদপীঠে “ভট্টিনী মট্টুবা” লিপি উৎকীর্ণ।

কিন্তু একাদশ-দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতক-পূর্বে বাঙলাদেশে মনসার প্রতিমাপূজা হইত; তাহার কয়েকটি মূর্তি-প্রমাণও বিদ্যমান। মনসাদেবী যে কি করিয়া উচ্চতর সামাজিক স্তরে উন্নীত হইলেন তাহার বিস্তৃত পুরাণ-কাহিনী বাঙলাদেশে সুবিদিত।

সাপ প্রজনন শক্তির প্রতীক এবং মূলত কৌম সমাজের প্রজনন শক্তির পূজা হইতেই মনসা-পূজার উদ্ভব, এ-তথ্য নিঃসন্দেহ। পৃথিবী জুড়িয়া আদিবাসী সমাজে কোনও না কোনও রূপে সর্পপূজার প্রচলন ছিলই।

বাঙলাদেশে যে-সব মনসাদেবীর প্রতিমা পাওয়া গিয়াছে তাহার প্রায় প্রত্যেকটিতেই মনসাদেবীর সঙ্গে একাধিক সর্পের, ক্রোড়াসীন একটি মানবশিশুর, একটি ফলের এবং কোথাও কোথাও একটি পূর্ণঘাটের প্রতিকৃতি বিদ্যমান। ইহাদের প্রত্যেকটিই প্ৰজনন শক্তির প্রতীক। একটি মূর্তির পাদপীঠে “ভট্টিনী মট্টুবা” লিপি উৎকীর্ণ।

অসম্ভব নয় যে, দক্ষিণী মঞ্চাম্মাই আমাদের মনসা এবং অম্বাবারুর কাহিনীই আমাদের মনসাকে আশ্রয় করিয়াছে। ঐতিহাসিক প্রমাণের উপর নির্ভর করিলে বলিতে হয়, বাঙলাদেশে মনসা-পূজার বহুল প্রচলন হয়। দক্ষিণী সেনা-বর্মণ রাজাদের আমলেই।

এই লিপির অর্থ কি রাজমহিষী মট্টুবা না আর কিছু বলা কঠিন। মট্টুবা কি তদ্ভব, না দেশজ অস্ট্রিক বা দ্রাবিড় ভাষার শব্দ, তাহাও নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। তবে, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে এ-তথ্য নিঃসংশয় যে, পাল-আমলের প্রথম পর্বেই মনসাদেবী ব্রাহ্মণ্যধর্মে পূজিতা ও স্বীকৃত হইতে আরম্ভ করিয়াছেন।

মহাভারত ও ব্রহ্মবৈবর্ত-পুরাণের কাহিনী হইতেই প্রমাণ হয়, মনসাদেবীর প্রাচীন বৈদিক বা পৌরাণিক কোনও ঐতিহাই ছিল না; ব্রাহ্মণ্য ধর্মে স্বীকৃত হওয়ার পরও বহুদিন পর্যন্ত তাঁহার রূপ সুনির্দিষ্ট হয় নাই। কোনও কোনও ধ্যানে তাঁহার বাহন হইতেছেন হংস এবং তিনি পুস্তক ও অমৃতকুম্ভধারিণী।

বলা বাহুল্য, এই সব উপকরণ সরস্বতীর এবং আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ব্ৰহ্মবৈবর্ত-পুরাণের একটি ধ্যানে মনসাকে সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্ন বলিয়া কল্পনা করা হইয়াছে।

তেলেগু ও কানাড়ী-ভাষাভাষী লোকদের মধ্যে “মঞ্চাম্মা’ নামে এক সর্পদেবীর পূজা আজও প্রচলিত এবং আমাদের দেশে মধ্যযুগে মনসাদেবীর যে ধরনের কাহিনী প্রচারিত হইয়াছে, সেখানেও অম্বাবরু নামীয় এক সর্পদেবী সম্বন্ধে অনুরূপ কাহিনী সুপ্রচলিত।

অসম্ভব নয় যে, দক্ষিণী মঞ্চাম্মাই আমাদের মনসা এবং অম্বাবারুর কাহিনীই আমাদের মনসাকে আশ্রয় করিয়াছে। ঐতিহাসিক প্রমাণের উপর নির্ভর করিলে বলিতে হয়, বাঙলাদেশে মনসা-পূজার বহুল প্রচলন হয়। দক্ষিণী সেনা-বর্মণ রাজাদের আমলেই।

……………..
বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব) : নীহাররঞ্জন রায়।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!