-দীপঙ্কর মজুমদার
একদিন বালক স্বপ্নে শিব দর্শন করল এবং স্বপ্নাদেশরূপে বরও পেল। এ ঘটনা কালোক্রমে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ল বহু মানুষ, পণ্ডিত-আচার্যরা শিব দর্শনে আসতে থাকেন।
একবার তো আটলা গ্রামের বামাক্ষ্যাপার বংশধর আচার্য শ্রীগঙ্গাধর ভট্টাচার্য এসে বলেছিলেন, ‘এই শিবলিঙ্গ যোগীদের কাছে আসলে সেই যোগী মহাযোগীরূপে সিদ্ধি লাভ করে। এ লিঙ্গ যে পেয়েছে সে কিন্তু সাধারণ মানুষ নয়… মানবরূপী অবতার।’
শিব পুরাণে বর্ণিত-
শিব উবাচ, হে রাম তম্ মম প্রভু
রাম প্রতুবাচ, হে শিব ন তম্ মম প্রভু
ইতি রাম-শিব পরস্পর অকথয়ন্ত।।
ভাব-বিশ্লেষণ এই শব রামকে বলেছিল তুমি আমার প্রভু আর রাম শিবকে বলেছিল ‘না তুমি আমার প্রভু।’ পাঞ্জাবী সাধুজী রামের মাকে বলেছিলেন, ‘তোর গর্ভে রাম আসছে।’
এরপর রামের জন্মের পাঁচ বছর পর শিবলিঙ্গ হাতে বালকের এক মহাযোগের দীক্ষা ঘটল। অনাবীল আনন্দে বালকের মন যেন বলে উঠল-
নম: শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং ত্বং গতি: পরমেশ্বর।।
বালক রাম নবম বর্ষীয়। সে সময় ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। গ্রামের বাড়িতে মাধ্যাহ্নে বৈশাখের তপ্তদাবদহে বালক বাইরে চিৎকার করছে- ‘সাপ সাপ’। বাড়ির সকলে ছুটে যেতেই দেখল প্রায় ছ-হাত লম্বা এক দুধে খরিস সাপ। ওকে নিশ্চয় ছোবল বসিয়েছে। আর দরজার মাথায় সাপ তখনও ফোঁস ফোঁস শব্দ করে চলেছে।
দরজার মাথায় সাপ তখনো ফোঁস ফোঁস শব্দ করে চলেছে। মা জিজ্ঞাসা করাতে জবাব দিল মাথায় তথা ব্রাহ্মতালুতে। মা দেখল মাথা ভর্তি সাপের লালা। বাবা সহ্য করতে না পেরে মুর্ছা গেলেন। কিন্তু মা ফুল্লোনলিনী দেবী শক্ত-পাষাণ হয়ে বলে উঠলেন, ‘ওর কিছু হবে না। মা মনসা ওকে আর্শীবাদ দিয়েছেন।’
এই ঘটনা নিমিষেই ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে । নিয়ে আসা হল বড়ো ওঝাকে। ওঝা গণনা ও বিচার করে বলল, ‘বাবু সুস্থ আছে, কিছু হয়নি।’ সেদিন বালক রামকে বহু মানুষ দেখতে এসেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছিলেন, ‘এ বালক সাক্ষাৎ কোনো অবতার, ভগবানের আর্শীবাদ প্রাপ্ত।’
বালক শান্ত, ধ্যান-মগ্ন। যেন হৃদয় থেকে বেড়িয়ে আসছে একটিই শব্দ ‘ওঁ… ওঁ’। কী এর অর্থ?
এই ওঁ শব্দ থেকেই যাবতীয় শব্দের উৎপত্তি। শব্দ বিশ্লেষণে পাওয়া যায়, অ (ব্রহ্মা = সৃষ্টিকর্তা) + উ (বিষ্ণু = পালনকর্তা) = ম (মহেশ্বর = সংহারকর্তা)। আসলে ওঁ শব্দটি উচাচারণকালে নাভিদেশ হতে ওষ্ঠাগ্র অব্দি সমগ্র অব্দি সমগ্র শব্দোচ্চারণের স্থানকে স্পর্শ করে থাকে।
এই ওঁ-কার থেকেই বেদমাতা গায়ত্রীদেবী এবং তার থেকে বেদের উৎপত্তি।
এই ঘটনার দু-বছর পূর্বের এক অলৌকিক ঘটনার রেখাপাত করি। রাত তখন সপ্তমবর্ষী, অর্থাৎ সাত বছরের। ভয়ঙ্কর রক্ত আমাশয়ের শিকার হল। সারা পেটে ঘা হয়ে গেছে দেখে ডাক্তাররা অনিশ্চয়তার জবাব দিয়ে দেন। পুত্রের জীবন ফেরাতে বাবা-মা বিহারের মোলপাহাড়ি ক্রিশ্চান হাসপাতালে শেষ চেষ্টার উদ্দেশ্যে নিয়ে যান।
সেখানে ভর্তির দিনই এক মুসলিম ফকির এসে উপস্থিত। মায়ের মুখে পুত্র রামের চরম পরিণতির কথা শুনে ফকির বাবা এক গ্লাস জল চান। এরপর মনে মনে বিরবির করে ওই জলের গ্লাসে ফুঁ দিয়ে রামের মায়ের হাতে ফিরিয়ে দেন আর যাবার সময় বলে যান, ‘মাইজী এই জলটা তোমার ছেলেকে খাইয়ে দাও।’
ডাক্তারের চোখের অন্তরালে ফকির বাবার কথা মতো জলটা রামকে অল্প অল্প করে খাওয়াতে শুরু করলেন মা। কয়েকদিনের মধ্যে রামের অসুস্থতার ঘোর কেটে গেল। বালক রাম এখন বেশ সুস্থ। এদিকে ডাক্তাররা তো অবাক কী সম্ভব! যাক সে কথা।
রাম যেদিন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল সেইদিনই রাড়ির পোষা ছোট্ট কালো কুকুরটা প্রাণ ত্যাগ করল। ঘটনাটা সংক্ষেপে বলি, হাসপাতাল থেকে রাম বাড়িতে পা দিতেই ওই পোষ্য অবলাটি ছুটে এসে রামের পা-দুটো জড়িয়ে এমনি আদর করতে লাগল যেন কত অভিমান আর অভিযোগ রয়েছে রামের প্রতি।
তারপর হঠাৎই নিথর হয়ে গেল মূক প্রাণীটা। রামের চোখে জল। হৃদয়ের মণিকোঠায় বিচারের বাণী নীরবে নির্ভৃতে কাঁদে। ধরা গলায় রাম বলে উঠল, ‘আমার প্রাণ রক্ষা করতে ও নিজেকে আত্মবলিদান করল।’
রামের জীবনে এসেছে একের পর এক ঘটনার ঘনঘটা। একবার আপার ইন্ডিয়া ট্রেনে রাম বোলপুর যাচ্ছিল। সে তখন শান্তি নিকেতনের সংগীত ভবনের ছাত্র। ট্রেনটা সাঁইথিয়া ঢোকার কিছু আগে ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর ব্রিজে লাইন চ্যুত হয়ে যায়।
কী অদ্ভুত ব্যাপার ট্রেনের পেছন থেকে লাইন চ্যুত হতে হতে রাম যে কামরাতে ছিল সেখানেই ঘটনাটি স্তব্ধ হয়ে যায়। বহু মানুষ আহত হন। তবে কারোর প্রাণহানি ঘটে নি। এই খবর শুনে রামের বাবা-মা অস্থির ও বিচলিত হয়ে ওঠেন।
সে সময় তো মুঠোফোন মানে মোবাইলের চল ছিল না। তাই অগত্যা অপেক্ষা ছাড়া উপায় না দেখে পুত্রের প্রাণ ভিক্ষায় আছাড়ে পড়েন একমাত্র ভরসা গৃহ প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গের কাছে। কাতর নিবেদনে রামের মা বলে উঠলেন, ‘ছেলে অক্ষত হয়ে ফিরে আসলে তোমায় সোনার মুকুট দেব।’
ঈশ্বরের পরম কৃপায় রাম নিখুঁত শরীরে মায়ের কোলে ফিরে এল গোধূলি লগ্নে।
১৯৯০ সাল। রাম হেতমপুর কলেজের ছাত্র। একদিন ঝাঁঝড়া প্রজেক্ট কোয়াটারে দিদির বাড়ি যাওয়ার জন্য বাসে চাপে। পকেটে মাত্র পাঁচ টাকা সম্বল। তার মধ্যে তিন টাকা খরচ হয়ে গেছে। পড়ে আছে ওই বাস ভাড়া টুকুই।
কিছুক্ষণ বাদে এক প্রৌঢ় বাসে উঠে কেঁদে বললেন, ‘আমি বাঁকুড়াবাসী ব্রাহ্মণ দু-টো টাকা দিন না ভাত খাব।’
কেউ দিলে না অসহায় ব্রাহ্মণের করুণ আবেদনে দু-টো টাকা। স্বামীজীর চিরন্তন বাণী রামের মনকে ব্যাকুল করে তুলল ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’
হঠাৎই রাম পকেট থেকে শেষ সম্বলটুকু ব্রাহ্মণকে ঈশ্বর প্রেরিত দূত মনে করে দক্ষিণা স্বরূপ হাতে দিয়ে বাস থেকে নেমে চলতে থাকে অজানা এক নিশ্চিন্তপুরের দিকে। সতেরো বছর বয়সী রামের সামনে তখন পড়ে রয়েছে তেরো কিলোমিটার পথ।
ঈশ্বর আবারও রামকে পরীক্ষা নেয় আর্তের সেবায় সে নিজেকে কতটা রিক্ত করতে পারে। সবই তাঁর লীলা প্রেমনাথ…।
২০১৪ সালে ৭৩ বছর বয়সী রামের পিতা মধুসূদন বাবু পরমাত্মায় বিলিন হন, অর্থাৎ রামের পিতৃবিয়োগ ঘটে। গর্ভধারিণী মায়ের ইচ্ছানুসারে রাম একুশজন সাধুসন্তকে নিয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কাশী যায় বিশ্বনাথ দর্শনে। সময় বিকেল পাঁচটা।
পরম মহিমাময় দশাশ্বমেধ ঘাটে রান স্নান সেরে যখন ওপরে উঠতে থাকে, তখনই এক দীর্ঘাঙ্গী গৈরিকবেশী সন্ন্যাসী বললেন, ‘বাবাজী আজকে আপনি গঙ্গা আরতি দর্শন করে যাবেন।’ ঘণ্টাখানেক বাদে আরতি শুরু হবে। চতুর্দিকে হাজার হাজার ভক্ত-সাধু-সেবায়েত সকরের উপচে পড়া ভিড়।
কোথা থেকে সেই গৈরিক বেশী সাধুজী আরতির ডালা রামের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আজ আপনিই সন্ধ্যারতি করবেন- এ বাবা বিশ্বনাথের মহা আদেশ।’ সেদিনই বাবা বিশ্বনাথের সঙ্গে রামের যুগান্তরের সম্পর্ক জনসমক্ষে উন্মোচিত হল।
স্মৃতির সরণি বেঁয়ে কত ঘটনায় তো পরস্পর চিত্রপট হয়ে মননের আঙ্গিনায় বিস্তার করে রয়েছে। বাল্যকালে এক পুরী সম্প্রদায় সাধুর সঙ্গে রামের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। রামের ধার্মিকজ্ঞানে আকৃষ্ট হয়ে সাধুজী তাঁকে দীক্ষা দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন।
(চলবে…)
…………………………
আরো পড়ুন:
রাম নাথ কৃষ্ণমূর্তি: এক
রাম নাথ কৃষ্ণমূর্তি: দুই
রাম নাথ কৃষ্ণমূর্তি: তিন