মহাসম্ভূতি তারকব্রহ্ম শিব

মহাসম্ভূতি তারকব্রহ্ম শিব

-নূর মোহাম্মদ মিলু

আজ থেকে প্রায় সাত হাজার বছর আগে হিমালয়ের পাদদেশে এক অবিশ্মরণীয় মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছিল, তিনি আর কেউ নন স্বয়ং শিব। সেই সময়টা ছিল ভারতের একটা দ্বন্দ্বাত্মক সময়। বাইরে থেকে আর্যরা আসছে। পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠছে সর্বত্র। আর্য ও অনার্যদের মধ্যে চারিদিকে চলছে সংঘর্ষ। সেই সংঘাতময় পরিবেশে শিবের আবির্ভাব। সেই যুগে মানুষ মনীষার ক্ষেত্রে বেশীদূর এগোয়নি। মানুষের অবস্থা ছিল না-পশু, না-মানুষ এই প্রকার।

সেই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মানবজাতিকে তথা ব্যাষ্টিস্বার্থ কেন্দ্রিক মানব সমাজকে একটা ছন্দবদ্ধ, বিধিবদ্ধ রূপ দিতেই শিবের আবির্ভাব। মানব সভ্যতা তখন এই উপমহাদেশে পার্বত্যস্তরের প্রাথমিক সরল সভ্যতা রূপে বিকশিত হবার অপেক্ষায়। সেই যুগে সমাজে বিবাহ পদ্ধতি প্রচলিত ছিল না। মানুষ স্বৈরী-স্বৈরীনির জীবন যাপন করতো। শিব প্রথম বিবাহ পদ্ধতি প্রচলন করে নারী পুরুষকে পারিবারিক জীবনে নিয়ে আসেন। এতে করে মানব সমাজের কাঠামোভিত্তিক ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়।  মানুষকে তিনি শেখালেন ছন্দ, তাল, লয়যুক্ত ধ্রুপদী নৃত্য।

প্রচলন করেন তাণ্ডব নৃত্য– যা মানুষের চিন্তাশীলতা আর স্মরণ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এই তাণ্ডব নৃত্য মানব দেহের গ্রন্থিগুলি থেকে গ্রন্থিরস যথোপযুক্ত ভাবে, প্রয়োজনীয় ভাবে নিঃসরণ করে দেয় যা মানুষকে শুধু শরীরেই নয়, মনে ও আত্মাতেও পুষ্ট করে তোলে। মানুষের ভয়ভীতি দূরীভূত হয়, কোষ্ঠকাঠিন্য সারে। তাই তিনি পরিচিত হলেন নটরাজ নামে। বর্তমান পৃথিবীর সঙ্গীত জগত সম্পূর্ণভাবে সুর সপ্তকের অর্থাৎ সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি-এর উপর আধারিত। এই সুরসপ্তক আবিষ্কার করে বিভিন্ন রাগ-রাগিনী তৈরী করেন শিব, যা মানুষের ছন্দময় জীবনকে আরও মাধুর্যময় করে তোলে। তাই তাঁকে বলা হয় নাদতনু। 

শুধু গান বা সঙ্গীতকে শিব নিয়মবদ্ধ করেছিলেন তাই নয়। যে ধ্বনিবিজ্ঞান, স্বরবিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। তারই ভিত্তিতে শিব ছন্দময় জগৎকে মুদ্রাময় করে তুললেন। ছন্দের সঙ্গে নৃত্যের সঙ্গতি আনলেন- আর তার সঙ্গে যোগ করে দিলেন মুদ্রা। 

কেবল ঢাকে কাঠি পড়লেই তা বাদ্য হয় না, তাতেও ছন্দ ও সুরসপ্তকের সংযোজন চাই। আর সেও বাজবে নৃত্যের তালে তালে শুধু নয়, ছন্দের সঙ্গে মুদ্রার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। বাদ্যে এ জিনিসটা সংযোজনও শিবই করেন। 

প্রাচীনকালে বেদোক্ত আয়ুর্বেদে মুষ্টিযোগ ছিল, কিন্তু তার কোন বিধিবদ্ধ রূপ ছিল না। তাই রোগব্যাধি দূর করতে গাছ-লতা, শিকড়-বাকল-ধাতু ইত্যাদি কি ভাবে ব্যবহার করতে হয় তাও বিধিবদ্ধভাবে বৈদ্যক শাস্ত্রের মাধ্যমে শেখালেন। তাই আজও মানুষ তাঁকে বৈদ্যনাথ নামে স্মরণ করে।

আর্য-অনার্যের সেই সংঘাতময় যুগে অপেক্ষাকৃত সংঘটিত, উন্নত যুদ্ধ কৌশলের অধিকারী, ক্ষমতাগর্বী, বিজয়ী আর্যরা এ দেশে অনার্য জাতিগুলোকে ধ্বংস করে ফেলার পরিকল্পনা করছিল। তখন শিব এই নির্যাতিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত মানুষদের পাশে দাঁড়ালেন। তাদের সংঘটিত করলেন, উন্নত রণকৌশল শেখালেন। তাই তিনি হলেন রণপতি। 

কোমলতা ও কঠোরতার প্রতভূ শিব মানুষকে সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা দিয়ে গেছেন তা হ’ল ধর্মবোধ। শিবের সময়ে বেশ কিছু আর্যরা ভারতে এসে গিয়েছিলেন, আসছিলেন এবং আসবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে তারা নানা গোত্রে বিভক্ত ছিল বলে গোত্রে গোত্রে সংঘর্ষ লেগেই থাকতো। তাদের মধ্যে বিধিবদ্ধ কোন ধর্মবোধ, কোন ধর্ম চেতনা, কোন ধর্ম এষণা ছিল না।

এক একজন ঋষি এক এক রকম কথা বলে গিয়েছিল। ঋষিরা যা বলে দিতেন, বাকিরা তা মেনে চলতো। ভারতের বাসিন্দা অনার্যদের আর্যকরণ করা হতো না; বরঞ্চ তাদের আর্যের দাস করা হতো। আর আর্যের বেদের নিয়ন্ত্রক মন্ত্র ওঁম্‌ অনার্যদের পাঠও করতে দেওয়া হতো না। অনার্য ও নারী উভয়েরাই ওঁম্‌ এর বদলে নমঃ শব্দ উচ্চারণ করতো। এই ভেদবুদ্ধির উপরে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন আর্যমত বা আর্যধর্ম। শিব দেখলেন এটা ধর্ম নয়। শিব মানুষের মনের মধ্যে ঢুকলেন, দেখলেন মানুষ আপাতঃ সুখ চায় না, মানুষ চায় শান্তি। মানুষ যজ্ঞ করে পশু হত্যা করে শান্তি পায় না, সুখ পেতে পারে। মাংস খেয়ে রসনা তৃপ্তি করতে পারে, কিন্তু শান্তি পায় না। 

শিব তাই মানুষের অন্তরে পরমপুরুষকে পাবার পথ দেখালেন। বহির্মুখী মনকে অন্তর্মুখী করার, জড়মুখী মনকে হরিমুখী করার পথ দেখালেন। জড়মুখী মনকে হরিমুখী করেই মানুষ শান্তি পেতে পারে। তাই তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন মানুষের ধর্ম হলো, “আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ”। ব্যষ্টিগত জীবনে আত্ম মোক্ষ লাভ আর সামূহিক জীবনে জগতের কল্যাণ করা। আত্মমোক্ষের জন্যে তিনি অন্তর্মুখী মানস-আধ্যাত্মিক সাধনা বিজ্ঞান তন্ত্র ও যোগ সাধনার কৌশল আবিষ্কার করে প্রথম মানুষকে শেখালেন। শিবের এই পথটাকেই বলা হয় শৈবমত বা শৈবধর্ম। এই শৈবধর্মই সনাতন ধর্ম, ভাগবত ধর্ম বা মানব ধর্ম। 

“ত্বং জাড্যাৎ তারয়েৎ যঃ সঃ তন্ত্র পরিকীর্তিতঃ”

‘ত’ রূপী জড়তার বন্ধন থেকে যা মানুষকে মুক্ত করে তাই হলো তন্ত্র। তন্ত্রের সূক্ষ্মতর শাখাই হলো যোগ। মানুষের প্রসুপ্ত জীবভাবকে শিবভাবে সমাহিত করে দেওয়া, ‘ক্ষুদ্র আমি’কে ‘বৃহৎ আমি’র সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়াই হ’ল যোগ। অধ্যাত্ম বিজ্ঞান মতে মানুষের শরীরের মেরুদণ্ডের নিম্ন থেকে তিনটি নাড়ী বেরিয়েছে। এর মধ্যে সুষুম্না নাড়ী সুষুম্না কাণ্ডের মধ্য দিয়ে সোজা চলে গিয়েছে সহস্রার চক্র পর্যন্ত। আর বাঁ দিক থেকে ইড়া নাড়ী ও ডান দিক থেকে পিঙ্গলা নাড়ী বেরিয়ে ডানে বাঁয়ে ঘুরে ঘুরে পরস্পর মিলিত হতে হতে শেষে বাম নাসা দিয়ে ইড়া নাড়ী ও ডান নাসা দিয়ে পিঙ্গলা নাড়ী বেরিয়ে গেছে।

এই তিনটি নাড়ী যেখানে যেখানে মিলিত হয়েছে তাকে বলে চক্র। এই ভাবে মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত ও বিশুদ্ধ চক্রে মিলিত হবার পর আজ্ঞাচক্রে গিয়ে তারা আলাদা হয়েছে। মানুষের জীব ভাব প্রসুপ্ত অবস্থায় এই মূলাধার চক্রে থাকে। তন্ত্রে এই জীবভাবকে বলে কুলকুণ্ডলিনী শক্তি আর বৈষ্ণব শাস্ত্রে বলে রাধা বা হ্লাদিনী শক্তি। আর সহস্রার চক্রে রয়েছেন কৃষ্ণ/শিব। 

আর যোগ হচ্ছে এই প্রসুপ্ত জীবভাবকে জাগ্রত করে সহস্রার চক্রে শিব ভাবে সমাহিত করা, ক্ষুদ্র আমিকে বৃহৎ আমির সাথে মিলিয়ে দেওয়া বা রাধা কৃষ্ণের মিলন। এখানেই মানব জীবনের সার্থকতা, পরমা প্রশান্তি। শিব মানুষকে এই প্রশান্তি লাভের পথ অন্তর্মুখী যোগ সাধনা শেখালেন। তাই তাঁকে বলা হয় আদিগুরু। 

সেই সময়ে মানুষরা অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রে বিভক্ত ছিল। আর গোত্রগুলির মধ্যে লড়াই-ঝগড়া প্রায় সব সময়ই লেগে থাকত। শিবের শিক্ষা ও আদর্শে অনুপ্রাণীত হয়ে নিজেদের লড়াই ঝগড়া বন্ধ করে তারা পরস্পরকে আপন ভাবতে শিখল। তাই তো তারা বলতো “হরমে পিতা, গৌরী মাতা, স্বদেশ ভূবণত্রয়ম্‌”। পরমপুরুষ আমাদের পিতা, পরমা প্রকৃতি আমাদের মাতা, আমরা সবাই ভাইবোন, সবাই বিশ্ব নাগরিক। এই ভাবে শিব মানব সমাজের প্রাথমিক স্তরের শিলান্যাস স্ব-হস্তে করে গেছেন। তাই তিনি মানব সভ্যতার আদি পিতা, সব দেবতার দেবতা দেবাদিদেব মহাদেব

শিবের শিক্ষা:
১. “ক্রোধ এব মহান্‌ শত্রু”।
ভাবার্থ: ক্রোধের মত শত্রু নেই। তাই ক্রোধের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।

২. “লোভঃ পাপস্য হেতুভুত”।
ভাবার্থ: লোভই অধিকাংশ পাপের মূল কারণ। তাই লোভ বৃত্তিকে অবশ্যই বশে রাখতে হবে।

৩. “অহংকার পতনস্য মূলম্‌”।
ভাবার্থ: অহংকার হলেই তার পতন হবে। তাই কখনও অহংকার করবে না।

৪. “পরিশ্রমেণ বিনা কার্যসিদ্ধির্ভবতি দুর্লভা”।
ভাবার্থ: পরিশ্রম ছাড়া কোন কাজেই সফলতা সম্ভব নয়।

৫. “ধর্মঃ সঃ ন যত্র ন সত্যমস্তি”।
ভাবার্থ: ধর্ম সত্যের ওপর আধারিত। যেখানে সত্য নেই সেখানে ধর্মও থাকতে পারে না।

৬. “মিথ্যাবাদী সদা দুঃখী”।
ভাবার্থ: যারা মিথ্যা কথা বলে আপাত তারা কিছু সময়ের জন্য কিছুটা সুখ পেলেও পরিণামে তাদের কষ্টই ভোগ করতে হয়।

৭. “পাপস্য কুটিলা গতিঃ”।
ভাবার্থ: যে মানুষ পাপের পথে সমাজ-সংসারকে বিষময় করে তোলে, সেই পাপই একদিন বক্রপথে সেই পাপীকে শেষ করে দেয়।

৮. “ধর্মস্য সুক্ষ্মা গতিঃ”।
ভাবার্থ: ধর্মের চলমানতা বা গতিশীলতা মুখ্যতঃ সূক্ষ্ম স্তরে ঘটে থাকে। যারা ধর্মের পথে চলে তারা অনুভব করে যে সূক্ষ্মভাবে ধর্ম সব সময় তার সঙ্গে রয়েছে- তারা তখন অনুভব করে, তার ধর্ম ও পরমপুরুষ অভিন্ন।

৯. “আত্মমোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ”।
ভাবার্থ: মানব জীবনের লক্ষ্য হ’ল- ব্যষ্টিগত জীবনে আত্মমোক্ষ লাভ করা ও সামূহিক জীবনে জগতের কল্যাণ করা।

১০. “বর্তমানেষু বর্ত্তেত”।
ভাবার্থ: শিব বলছেন, “তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছ বর্ত্তমানের ভিত্তিতে। অতীতকে তোমার বর্ত্তমানের সংবৃদ্ধির কাজে লাগাও। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এমন ভাবে করো যাতে মানবিক ঐশ্বর্য দৃঢ়ভিত্তিক, বজ্রনিস্যন্দ হয়ে ওঠে”।

………………………………………………..
ব্যবহৃত ছবি প্রসঙ্গ
অবতার, দেব-দেবতাদের সে অর্থে কোনো ছবি যে নেই সেটা তো সকলের কাছেই স্বীকৃত। তবে ভক্তকুল তার রূপ দেখার জন্য আকুল। সাধককুল তার ছবি দেখবার চেষ্টা করে আত্মপোলব্ধির ভেতরে অনুভবের মাধ্যমে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো আর থেমে থাকে না। তারা শাস্ত্রে উল্লেখিত ইশারা, বৈশিষ্ট্য ও কাল্পনিকতাকে ঘিরে গড়ে তোলে বিভিন্ন দেব-দেবতা-অবতারের অবয়ব। এ ছবি শিল্পীর কল্পনা মাত্র।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!