আচার্য শঙ্করাচার্য

আচার্য শঙ্কর আসন্ন শাস্ত্রবিচার সম্বন্ধে ভাবতে লাগলেন। কামশাস্ত্রের তাত্ত্বিক দিকটি তিনি শাস্ত্রপাঠের মাধ্যমে জেনে নিতে পারেন, কিন্তু তার ব্যবহারিক দিকটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান ছাড়া জানা সম্ভব নয়। একমাত্র উপায় হলো কোন এক বিবাহিত ব্যক্তির মৃতদেহের মধ্যে প্রবেশ করে তার সংসারে গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের মাধ্যমে কামকলা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করা।

ঘটনাক্রমে এক সুযোগ পেয়ে গেলেন তিনি। খবর পেলেন সেই বনের ভিতরে কিছুদূরে শ্মশানে এক মৃতদেহ দাহ করার আয়োজন চলছে। অমরুক নামক স্থানীয় এক তরুণ রাজার মৃত্যু হওয়ায় তাঁরই মৃতদেহ আনা হয়েছে সৎকারের জন্য।

শঙ্কর স্থির করে ফেললেন সেই মৃতদেহের মধ্যে প্রবেশ করবেন তিনি। সেই বনের মধ্যেই ছিল কতকগুলি পাহাড়। আচার্য শঙ্কর গহন বনের মধ্য দিয়ে একটি পাহাড়ের গুহায় উপস্থিত হয়ে শিষ্যদের বললেন, আমি এখন এই দেহ ত্যাগ করে মৃত রাজার দেহে প্রবেশ করব।

এই গুহার ভিতরে আমার পরিত্যক্ত দেহটি খুব সতর্কতার সঙ্গে পাহারা দেবে। কেউ যেন একথা জানতে না পারে, কেউ যেন এখানে আসতে না পারে এবং কেউ যেন এ দেহ স্পর্শ না করে। খুব সাবধান। এদিকে রাজার মৃতদেহ দাহ করার জন্য চিতা সাজানো হয়েছে শ্মশানে। বহু চন্দন কাঠ ও ঘি আনা হয়েছে। রাজার মন্ত্রী ও পুরোহিতরা আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মাদি সম্পন্ন করছেন।

এমন সময় সহসা শবাধারটি নড়ে উঠল। মৃত রাজা চোখ মেলে তাকালেন। সকলে আশ্চর্য হয়ে দেখল প্রাণ সঞ্চার হয়েছে মৃত রাজার দেহে। সব আচ্ছাদন ও ফুলের মালা বোঝাভার সরিয়ে উঠে বসলেন রাজা অমরুক। সকলে ভাবল দৈব কৃপায় বেঁচে উঠেছেন মৃত রাজা। আত্মীয় পরিজন ও অনুচরবৃন্দ আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠল। বাদ্য বাজনা বাজিয়ে মহা উল্লাসে প্রাসাদে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে।

মৃত রাজা প্রাণ ফিরে পেলেন বটে, কিন্তু তাঁর মানসিকতায় কিছু পরিবর্তন দেখা গেল। তিনি রাজকর্মে বিশেষ বিচারবুদ্ধি, জ্ঞান ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে লাগলেন। তবে আগেকার সেই কূটবুদ্ধি নেই। তাঁর ভোগসুখের বাসনাও কেমন যেন শিথিল হয়ে গেছে।

রাণী ছিল বুদ্ধিমতী মহিলা। রাত্রিকালে সহবাসকালে রাণী লক্ষ্য করলেন, কামকেলিতে রাজা যেন আগের মত তৎপর নয়। কামকেলিতে তিনি যেন একেবারে অনভিজ্ঞ। তাঁকে যেন সব শিখিয়ে দিতে হবে। রাণীর সন্দেহ হলো, যোগবিভূতিসম্পন্ন কোন শক্তিমান সাধক হয়তবা রাজার মৃতদেহে প্রবেশ করেছেন।

তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তাঁরা ঠিক করলেন যেই প্রবেশ করুন তাঁকে আর এ দেহ ছেড়ে যেতে দেওয়া হবে না।

প্রবীনমন্ত্রী বললেন, যদি কোন যোগী রাজার কায়ায় প্রবেশ করে থাকেন তাহলে তাঁর পরিত্যক্ত দেহটি নিশ্চয় নিকটে কোন নির্জন ও গোপন স্থানে রাখা আছে। সে দেহটি খুঁজে বার করে বিনষ্ট করে দিতে হবে। তাহলে রাজদেহধারী সেই সাধক আর এ দেহ ছেড়ে যেতে পারবেন না।

রাণীও এ বিষয়ে একমত হলেন। দিকে দিকে অনুচরদের পাঠিয়ে আদেশ দেওয়া হলো, কোথাও কোন যোগী বা সন্ন্যাসীর মৃতদেহ দেখলেই তা যেন তারা পুড়িয়ে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে। রাজার লোকরা চারিদিকে বন পাহাড় তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল।

শিষ্যরা ভয় পেয়ে গেল। কোনরকমে তারা যদি গুরুদেবের পরিত্যক্ত দেহটির সন্ধান পায় তাহলে তা পুড়িয়ে ফেলবে। আচার্য শঙ্করের প্রধান শিষ্য পদ্মপাদ ভাবলেন আর বিলম্ব না করে গুরুদেবকে সব কথা বলে সতর্ক করে দেওয়া উচিত।

এই ভেবে তিনি কয়েকজন গুরুভাইকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্ষুকের বেশে রাজপ্রাসাদে চলে গেলেন। রাজদেহধারী শঙ্করকে একান্তে বললেন, প্রভু আর দেরী না করে আপনি নিজের দেহে ফিরে যান। রাজার লোকরা সর্বত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে। একবার আপনার দেহটি সন্ধান পেলে তারা পুড়িয়ে ফেলবে সঙ্গে সঙ্গে।

শঙ্কর দেখলেন, তাঁর কাজ শেষ হয়ে গেছে। মৃত ভোগী রাজার দেহে প্রবেশ করে তিনি এরই মধ্যে কামশাস্ত্রের সকল তত্ত্ব ও তথ্য জেনে ফেলেছেন। তাই তিনি শিষ্যদের গোপনে বললেন, ভয় নেই। তোমরা গুহায় ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করো। আজই আমি এ দেহ ত্যাগ করে ফিরে যাচ্ছি আমার দেহে।

এদিকে একদল রাজার সৈন্য খুঁজতে খুঁজতে সেই বনের মধ্যে সন্ন্যাসীদের আস্তানা দেখে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ল। তারা সন্ন্যাসীদের সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। একসময় তারা সন্ন্যাসীদের গতিবিধি লক্ষ্য করে গুহায় এসে দাঁড়ালো। শঙ্করের শিষ্যরা দল বেঁধে গুহাদ্বারে দাঁড়িয়ে বলল, এখানে কোন মৃতদেহ নেই, তারা সৈন্যদের ভিতরে ঢুকতে দেবে না।

কিন্তু সৈন্যরাও ছাড়বে না। তারা গুহার ভিতরে ঢুকে তল্লাসী করতে চায়। এমন সময় গুহার মধ্যে শঙ্করের পরিত্যক্ত দেহটি নড়ে উঠল। বিছানার উপর উঠে বসলেন আচার্য শঙ্কর। রাজসৈন্যরা নিজের চোখে এই দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।

শঙ্করের অসামান্য যোগবিভূতির পরিচয় পেয়ে তারা তখন ভাবল এ সাধক সাধারণ সন্ন্যাসী নয়। তাই তারা কোন কথা বলতে সাহস পেল না। নীরবে প্রাসাদে ফিরে গেল। সব ব্যাপারটা বুঝতে পারল তারা। আচার্য শঙ্কর তখন সেখান থেকে আস্তানা গুটিয়ে সোজা চলে গেলেন মাহিষ্মতী নগরে। তিনি মণ্ডন মিশ্রের বাড়িতে গিয়ে মণ্ডন পত্নী উভয়ভারতীকে জানালেন তিনি তর্কবিচারের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত এসেছেন।

উভয়ভারতী এবার ভয় পেয়ে গেলেন। তর্কযুদ্ধের সব উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন তিনি। তিনি ভাবলেন শঙ্করের মত প্রতিভাধর জ্ঞানী পুরুষ যখন কামশাস্ত্রের সব তত্ত্ব ও তথ্য জেনে এসেছেন তখন আর তাঁকে পরাস্ত করা সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বুঝতে পারলেন অলৌকিক শক্তির অধিকারী এই তরুণ এক ঈশ্বরপ্রেরিত পুরুষ এবং যুগাচার্যরূপে আবির্ভূত। তাই তিনি সর্বত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যেখানেই যান সেখানেই প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে জয়লাভ করেন। তাই বিনা যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করলেন উভয়ভারতী। ফলে মণ্ডন মিশ্র এবার নির্বিবাদে শঙ্করের কাছে সন্ন্যাস দীক্ষা গ্রহণ করলেন। শঙ্কর তার নূতন নামকরণ করলেন সুরেশ্বরাচার্য।

মণ্ডন মিশ্রের পরাজয়ের ফলে সারা দক্ষিণাত্যে শঙ্করের আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না। সর্বত্র অদ্বৈত বেদান্তের প্রভাব অবাধে বিস্তৃত হলো। এদিকে শঙ্কর নিজের দেহে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজা অমরুকের আবার মৃত্যু ঘটে অকস্মাৎ।

এমন সময় রাজসৈন্যরাও স্বচক্ষে শঙ্করের নিজের দেহে ফিরে আসার ঘটনাটির কথা প্রাসাদে ফিরে এসে বলে সকলকে। ফলে আচার্য শঙ্করের যোগবিভূতির কথা মাহিষ্মতী নগরী ও তার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে লোকমুখে।

শঙ্কর এবার নাসিক পলমারপুর অঞ্চল পরিভ্রমণ করার পর শ্রীশৈলে এসে উপনীত হন। কৃষ্ণা ও তুঙ্গভদ্রা নদীর সঙ্গমস্থলে পাহাড়ের চূড়ায় এক জাগ্রত শিবলিঙ্গ আছে একথা শুনেছিলেন তিনি। এই শিবলিঙ্গকে কেন্দ্র করে বহু শাক্ত, শৈব, ও কাপালিক এই পার্বত্য অঞ্চলে তপস্যা করছেন দীর্ঘকাল ধরে।

কিন্তু আচার্য শঙ্কর তাদের সামনে গিয়ে উপস্থিত হতে তাঁর পরিচয় পেয়ে তাঁদের অনেকেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন। উগ্রভৈরব নামে এক কাপালিক এই সময় এখানে তপস্যা করতেন। তাঁর অনেক শিষ্য ছিল সে অঞ্চলে। শঙ্করের প্রচারিত অদ্বৈত বেদান্তের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি, তাঁর সামনে এই তরুণ আচার্যের প্রভাব বেড়ে যাচ্ছে দেখে অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন তিনি।

ক্রচক নামে এক স্থানীয় রাজা উগ্রভৈরবের অনুরাগী ভক্ত ছিলেন। উগ্রভৈরব এই রাজার সঙ্গে মিলিত হয়ে শঙ্করকে হত্যা করে সে অঞ্চল হতে তাঁর বেদান্তপাঠের মূলোচ্ছেদ করার এক চক্রান্ত করেন।

একদিন সন্ধ্যার সময় নির্জন পাহাড়ের চূড়ার উপর একা বসে শঙ্কর যখন সায়ং কৃত্যাদি সম্পন্ন করছিলেন তখন অকস্মাৎ উগ্রভৈরবের পাঠানো একদল আততিয়ী শঙ্করকে বেঁধে একটি গুহায় নিয়ে যায়। সেই গুহায় ছিল মহাভৈরব বিগ্রহ। কাপালিক উগ্রভৈরবের সামনে তার অনুচরেরা মশাল হাতে শঙ্করকে ঘিরে দাঁড়াল। তাদের হাতে ছিল বর্শা।

এই গুহামন্দিরে আচার্য শঙ্করকে বলি দিয়ে তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবে উগ্রভৈরব। আচার্য শঙ্কর কিন্তু মোটেই ভয় পেলেন না। তিনি নির্বিকারভাবে বসে ধ্যান করতে লাগলেন। এদিকে রাত গভীর হলেও আচার্য ফিরে না আসায় চিন্তিত হয়ে পড়ল শিষ্যরা।

প্রধান শিষ্য পদ্মপাদ তখন ধ্যান সমাহিত ছিলেন। সহসা তাঁর ধ্যান ভেঙ্গে গেল। ধ্যানযোগে আসল ব্যাপারটি জানতে পারলেন তিনি। জানতে পারলেন অচিরে তারা বলি দেবে গুরুদেবকে। সঙ্গে সঙ্গে ভাবাবিষ্ট অবস্থায় প্রবল বিক্রমে গুরুভাইদের সঙ্গে নিয়ে ছুটে গেলেন সেই কাপালিকের গুহায়।

কাপালিকের অনুচরদের আক্রমণ করে গুরুদেবকে মুক্ত করলেন। তারপর কাপালিকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন পদ্মপাদ। সিঁদুরমাখা যে খাঁড়াটি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল সেই খাঁড়া তুলে নিয়ে সেটি কাপালিক উগ্রভৈরবের গলায় বসিয়ে দিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে কাপালিকের দুষ্ট অনুচরেরা ভয়ে পালিয়ে যায়। পদ্মপাদের সেই উন্মাদ অবস্থা দেখে আচার্য শঙ্কর ও তাঁর শিষ্যরা আশ্চর্য হয়ে যান। পরে পদ্মপাদ এর কারণের কথাটি বলেন।

সাধন জীবনের প্রথমে একবার পদ্মপাদ নৃসিংহদেবের সাধনা করেন। সে সাধনায় সিদ্ধিলাভও করেন। নৃসিংহদেব তাঁর সাধনায় তুষ্ট হয়ে তাঁকে বরদান করেন, ভবিষ্যতে তিনি যে কোন সত্যিকারের বিপদে পড়লে নৃসিংহদেব আবির্ভূত হবেন তাঁর মধ্যে। সে বিপদ হতে তিনি পরিত্রাণ করবেন তাঁকে।

এরপর শিষ্যদের নিয়ে গোকর্ণে এলেন এলেন আচার্য শঙ্কর। গোকর্ণ পর্বতে তখন প্রসিদ্ধ শৈব পণ্ডিত নীলকণ্ঠ সাধনা করতেন। এই পণ্ডিতকে স্বমতে আনার জন্য সেখানে উপনীত হন আচার্য। নীলকণ্ঠ পণ্ডিতকে স্বমতে আনার পর শক্তিপীঠ মৌনান্তিকা মন্দিরে গিয়ে দেবী দর্শন করেন আচার্য শঙ্কর।

মন্দির হতে বেরিয়ে আসতেই তিনি দেখলেন, এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ ও তাঁর স্ত্রী আকুলভাবে কাঁদছেন। তাঁদের একমাত্র পুত্রের বালক বয়সে হঠাৎ মৃত্যু হয়েছে। পুত্রশোকে পাগলের মত হয়ে উঠেছেন তাঁরা।

আচার্য শঙ্কর যেখানেই যেতেন সেখানেই তাঁর অলৌকিক শক্তির কথা ছড়িয়ে পড়ত নিমেষের মধ্যে। তিনি মৌনান্তিকা মন্দির দর্শন করতে আসবেন শুনেই ব্রাহ্মণ ও তাঁর স্ত্রী তাঁদের পুত্রকে কোলে করে এসেছেন এখানে। পুত্রশোকে তাঁরা পাগলের মত হয়ে পড়েছেন।

শঙ্কর মন্দির হতে বেরিয়ে আসতেই তাঁরা তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। আকুলভাবে কাঁদতে লাগলেন। তাঁদের শোকাকুল কান্না দেখে কেঁদে উঠল শঙ্করের প্রাণ। তিনি তখন দেবীর যে মালাটি তাঁর হাতে ছিল সেটি মৃত বালকের মাথায় চাপিয়ে দিলেন। এদিকে মন্দির প্রাঙ্গণে বহু লোকের ভিড় জমে গেছে মৃত বালকের চারিদিকে।

জনতা দেখল আচার্য শঙ্কর মালাসহ হাতটি মৃত বালকের মাথায় রাখতেই মৃতের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারিত হলো। সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকিয়ে উঠে বসল‌। বিস্ময়াভিভূত জনতা আনন্দে উল্লসিত হয়ে শঙ্করের জয়ধ্বনি করতে লাগল। বালকের বাবা মা শঙ্করের চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেন। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর যোগবিভূতির খ্যাতি।

শঙ্কর কিন্তু সেখানে আর দাঁড়ালেন না। সেখান থেকে শিষ্যদের নিয়ে বেরিয়ে এলেন। সেখান থেকে শঙ্কর সোজা চলে গেলেন শ্রীবলীতে। শঙ্কর সেখানে শিষ্যসহ উপস্থিত হবার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণের ও সাধক সমাজের মধ্যে আলোড়ন পরে যায়।

শ্রীবলী অঞ্চলে তখন পণ্ডিত প্রভাকর নামে এক খ্যাতিমান আচার্য ছিলেন। তাঁর নাম যশ ও প্রতিপত্তির কোন অভাব ছিল না। তবে তাঁর এক মাত্র দুঃখ, তাঁর একটি মাত্র পুত্র বোবা ও জড় ভাবাপন্ন। মুখ দিয়ে তার কথা বার হয় না এবং জ্ঞানবুদ্ধি বলে কিছু নেই। মানুষ নয়, যেন এক জড়পিণ্ড। ছেলের দুঃখে পণ্ডিত ও তাঁর স্ত্রীর দুঃখের সীমা ছিল না।

শঙ্করের অলৌকিক যোগশক্তির কথা আগেই শুনেছিলেন প্রভাকর। তাই তিনি তাঁর ছেলেকে এনে অশ্রুভরা চোখে শঙ্করের পদতলে রেখে বললেন, প্রভু! একবার চেয়ে দেখুন এই দুর্ভাগার কি অবস্থা। একে নিয়ে আমরা বেঁচেও মরে আছি। আপনি একবার কৃপা করুন। শুনেছি আপনার কৃপায় কত মৃত ব্যক্তি প্রাণ ফিরে পেয়েছে, আর আমার ছেলের মুখ থেকে কথা বার হবে না?

জড়পিণ্ডের মত ছেলেটি বোবা-কালার মত শঙ্করের পায়ের কাছে ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁর মুখপানে তাকিয়ে রইল উদাসভাবে। প্রবীন পণ্ডিত প্রভাকরের কাতর অনুনয় বিনয়ে বিগলিত হয়ে উঠল শঙ্করের প্রাণ। তিনি ছেলেটিকে প্রশ্ন করলেন, বল দেখি, তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ? আবার কোথায় চলে যাবে? এ জগতে তোমার আকাঙ্ক্ষার বস্তুই বা কি আছে?

এ প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে এক অভূতপূর্ব অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেল। চকিতে জড়পিণ্ডবৎ ছেলেটির মধ্যে যেন এক দিব্যচৈতন্যের বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল। তার চোখ মুখ এক অসাধারণ প্রভা ও ধীরশক্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তার কণ্ঠ হতে অনর্গল ধারায় সংস্কৃত শ্লোকরাজি বেরিয়ে আসতে লাগল।

সেই সব শ্লোকগুলো ভাবের গভীরতায়, ভাষার ব্যঞ্জনায় ও উচ্চারণ ভঙ্গির স্পষ্টতায় ও কণ্ঠের মাধুর্যে অপূর্ব শোনাতে লাগল। উপস্থিত সকলে আশ্চর্য হয়ে গেল। শঙ্কর সেই সব শ্লোক শুনে শিষ্যদের বললেন, এ হচ্ছে হস্তামলক স্তোত্র। এর অর্থ বুঝতে পারলে আত্মজ্ঞান আমলকী ফলের মত সহজে হাতে এসে পড়ে। তোমরা সবাই এই স্তোত্র প্রতিদিন অভ্যাস করবে।

অকর্মন্য অপদার্থ জড়ভরত পুত্রের এই আশ্চর্য রূপান্তর একমাত্র আচার্য শঙ্করের অলৌকিক যোগবিভূতি বলেই সম্ভব হয়েছে একথা বুঝতে পারলেন পণ্ডিত প্রভাকর‌। আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগল তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর চোখে।

কিন্তু শঙ্কর প্রভাকরকে বললেন, দেখুন পণ্ডিত! আপনার পুত্র কিন্তু সামান্য নয়; এর মধ্যে আছে অসামান্য প্রতিভা। এর মধ্যে আছে আত্মজ্ঞানের অমিত আলো, এ হচ্ছে বিশুদ্ধ চৈতন্যের এক সারভূত সত্তা। কিন্তু এই পুত্র সংসারে আবদ্ধ হয়ে থাকার জন্য আসেনি। ও আপনার কোন কাজে আসবে না। ওকে আমার হাতে সঁপে দিন। আজ হতে আমিই ওর ভার গ্রহণ করলাম।

একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে আলোড়িত হতে লাগল প্রভাকর পণ্ডিতের মন। পুত্রের আসন্ন বিচ্ছেদ-বেদনায় কাতর হয়ে উঠলেন তিনি। পুত্রকে ফিরে পেয়েও পেলেন না। তবু মহাযোগী মহাজ্ঞান আচার্য শঙ্করের মুখের উপর কোন কথা বলতে পারলেন না।

প্রভাকরের বালক পুত্রকে সন্ন্যাস দীক্ষা দান করে তার নূতন নামকরণ করলেন, হস্তামলকাচর্য। পদ্মপাদ ও সুরেশ্বরাচার্যের মতই এই মহাজ্ঞানী বালকশিষ্য এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন আচার্য শঙ্করের কাছে।

(চলবে…)

…………………………………
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে : ভারতের সাধক-সাধিকা
পুণঃপ্রচারে বিনীত -প্রণয় সেন

…………………………………
আরো পড়ুন:
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: এক
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: দুই
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: তিন
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: চার
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: পাঁচ
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: ছয়

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!