ভবঘুরে কথা

ছবির হাটের ঘুড়ি উৎসব সেন্টমার্টিনে অনুমতি না পাওয়ায় সেবার হয়েছিল ইনানী বীচে। ব্যাপক আনন্দ উল্লাসে উৎসব শেষ করে মাঝরাতে আমরা রিসোর্ট ছেড়ে গিয়েছিলাম চাঁদের মাতাল আলোয় সমুদ্রে পা ভেজাতে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে আমরা কয়েকজন সমুদ্র পারে কোরালের উপরে হাঁটছিলাম সর্তক পায়ে। কেউ গান গাইছে, কেউ আনন্দে আত্মহারা হয়ে গগনবিদারী চিৎকার করছে, আবার কেউ একটানা কথা বলেই যাচ্ছে, সবাই উন্মাদ হয়ে উঠেছিলাম। অন্যরা বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। আমার সামনে সাগর ভাই। প্রকৃতির গর্ভে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল এখানেই যদি থেকে যাওয়া যেত। একসময় বলেই ফেল্লাম- যদি এখানেই থাকতে পারতাম তাহলে কি ভালোই না হতো। শহরের যান্ত্রিকতার যন্ত্রণা আর নিতে পারি না। সাগর ভাই হাঁটা বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো- “আমি তো এরমাঝেই থাকি। এখানেই থাকি।” আমি সন্দেহ নিয়ে চোখ ছোট করে ফেল্লাম সাগর ভাই পাগল হয়ে গেছে এই ভেবে। সাগর ভাই সেটা ধরে ফেলে বললো- “আরে শোন অবাক হওয়ার কি আছে, সত্য সত্যই আমি এর মাঝেই থাকি; শহরে আমার শরীর থাকে মন এসবেই থাকে সমুদ্রে-জঙ্গলে-পাহাড়ে। আমি শহরে থাকি কিন্তু শহরের যান্ত্রিকতা নেই না… আমি প্রকৃতিতেই থাকি।”


এখন দিনকাল ভালো না ঐ রাস্তাটা খুবই খারাপ; প্রত্যেকদিন ঐদিক থেকে খারাপ খবর আসে। আপনি যে রাতেরবেলা সুস্থ ফিরা আসছেন এইটাই শুকরিয়া। অনেক সময় ধরে রব ফকির জড়িয়ে ধরে ছিল। মানুষ মানুষের জন্য এতো ভালোবাসা বুকে কি করে জমিয়ে রাখে সাঁইজি, এই ভেদ আমি আজো জানলাম না। 

সাগর ভাই সেদিন কি ভেবে এই কথাগুলো বলেছিল বা কতটা বিশ্বাস থেকে বলেছিল তা আমি জানি না। “আমরা যার মাঝে বসত করি চাইলে তার মধ্যে নাও থাকতে পারি”-এই বিষয়টা আমার মাথায় বড় বড় অক্ষরে জীবনের ডায়রিতে শিরোনাম হিসেবে থেকে গেছে। বহুবার আমি এ কথা ভেবেছি। সাগরের পারে সাগর ভাইয়ের সাথে ঐ মুর্হুতটা আমার ভাবনার জগতে বেশ আলোড়ন হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা যেখানে থাকি সেখানে কি বাস করি? আর যেখানে বাস করি সেখানে কি থাকি? বিষয়টা বেশ গোলমেলে। ভাবতে গেলে হারিয়ে যাই। আমার শহুরে সংস্কার বেশিদূর ভাবতে দেয় না।

ইনানী বিচে ঘুড়ি উৎসব

শহুরে সংস্কার-আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার-পৈত্রিক সংস্কার সব কিছু উলোটপালট করে দেয়। ধরো তুমি হয়তো পায়েস খাও চেটে চেটে কিন্তু আমার শহুরে অহংকার আমাকে শিখিয়েছিল খাওয়ার পর হাত ধুয়ে মুছে পরিষ্কার বাটিতে চামচ দিয়ে ধীরে ধীরে মিষ্টান্ন খেতে হবে। যেন চামচ আর বাটির সংর্ঘষ হয়ে কোনো শব্দ সৃষ্টি না হয়। প্রথম যখন সাধুর বাড়িতে কলাপাতার উপর খাবার শেষের আগেই বারণ করা সত্ত্বেও এক সাধু হাসিমুখে বিনয়ের সুরে আধা খাওয়া খাবারের উপরেই মিষ্টান্ন দিয়ে চলে গেলো। তখন মেজাজ আমার ঊর্ধ্বগামী। একটু খেয়াল করে দেখলাম সকলেই বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে এবং পরম আনন্দে খেয়ে যাচ্ছে। আমি বিরক্তি নিয়ে বসে আছি বা খাওয়ার অভিনয় করছি। আসলে এই যে অভিনয় করা জীবন এই যে ইমিটিশনের জীবন; এই যে নিজের ভেতরের আমিকে পরিবর্তন না করে ঢেকে রেখে অন্য এক মেকি আমির প্রকাশ; সেটাই আমাকে ভাবায়, খুব ভাবায়। কেন অভিনয়? কেন সহজ হতে পারি না। লালন সাঁইজি কোন্ সহজ হতে বলেছেন সেই গভীরতায় যাচ্ছি না তবে উপরি উপরি ভাবলে সেখানেই পৌঁছাই-

সুমন ক্বারী, হুমায়ুন সাধুর আখড়া

বিস্তারিত পড়ুন…

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!