গণেশ পাগল

গণেশ পাগল

-মূর্শেদূল মেরাজ

বাংলা ১২৫৫ সনে কোটালী পাড়া উপজেলাধীন পোলসাইর গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন গণেশ পাগল। গণেশ পাগলের পিতামহ পরম বৈষ্ণব কেনাই বৈরাগীর তিন পুত্রের কনিষ্ঠ পুত্র শিরোমনি। এই শিরোমনি ছিল নি:সন্তান।

একরাতে শিরোমনির পত্নী নারায়ণী দেবীকে ভগবান নারায়ণ স্বপ্নে দর্শন দিয়ে বললেন, “আমি তোমার সেবায় সন্তুষ্ট। শীঘ্রই এক মহাপুরুষ পুত্র রূপে তোমার ঘরে জন্ম নিবে।” এ কথা জানাজানি হলে কেনাই বৈরাগীর বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।

শ্রী পঞ্চমীর আগের দিন বরদা চতুর্থী শুক্রবার ব্রহ্ম মুহুর্তে জগৎ আলো করে ধারিত্রীতে আসে সেই শিশু। গণেশ পুজার দিন জন্মগ্রহণ করায় পিতামহ কেনাই বৈরাগী নাম রাখেন ‘গণেশ’। পরিবারের আদরের ধন গণেশের বয়স এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও মুখে বুলি না ফোটায় পরিবারের সকলে চিন্তিত হয়ে পরলো।

এতো সাধনার পর যে পুত্র জন্ম নিয়েছে সে কি তবে বোবা-কালা হয়ে থাকবে? মা নারায়ণী দেবী আবার ভগবানের কাছে হাত তোলেন। কান্নাকাটি করতে থাকেন। জনশ্রুতি আছে, এ ঘটনার পর নারায়ণী দেবী স্বপ্নে জানতে পারেন। তার গর্ভে জন্ম নেয়া শিশু বাকসিদ্ধ মহাপুরুষ। সময় হলেই সে কথা বলবে। সেই স্বপ্ন সত্য প্রমাণিত করে কিছুদিন পরই গণেশ ‘মা’ ডাকে তার কথা বলা শুরু করে।

গণেশের বয়স যখন দেড় বছর তখন তার পিতা শিরোমনি ধরাধাম ত্যাগ করে চলে যান। এরপর থেকেই তার ও তার মায়ের উপর পারিবারিক বৈশ্বম্য চরমে পৌঁছায়। এসব সহ্য করতে না পেরে নারায়ণী দেবী শিশু পুত্রকে সাথে নিয়ে স্বামীর ভিটা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। আশ্রয় নেন কোটালীপাড়ার ডৌয়াতলী বাপের বাড়িতে।

নারায়ণী দেবীর পিতা গোলক বাগচী বড় কন্যা ও নাতিকে পরম যত্নে গ্রহণ করলেন। কিন্তু গণেশের কপালে সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। কৈশোরে পা রাখতে না রাখতেই অল্পদিনের ব্যবধানে মাতামহ ও মাতামহী দুজনই দেহত্যাগ করে।

অন্যদিকে আশ্রমে চলতে থাকে গণেশের সাধন-ভজন গুরু সেবা। বড় হতে থাকে সে। গুরু কন্যা ফুলি সাথে গড়ে উঠে গণেশের প্রেমের সম্পর্ক। দুজনে যুক্ত হয় সাধনায়। ফুলির সাথে গণেশের প্রেমের সম্পর্ক স্থানীয় যুবকরা ভালো চোখে দেখে না। তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু বিন্দু দাসের কারণে আশ্রমে প্রবেশের সাহস করতে পারে না।

আবার নারায়ণী দেবী সংকটে পরেন। পিতার রেখে যাওয়া সম্পদ-সম্পত্তিতে সংসার চালানো তার পক্ষে কঠিন হয়ে পরে। এ সময় তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় নারায়ণী দেবীর কাকা গণেশ ও চরণ বাগচী। তারপরও সংসার চালাতে নারায়ণী দেবীকে হিমশিম খেতে হয়।

পরিবারকে সহায়তা করার জন্য গণেশকে কেউ কেউ কাজে নেয়। কিন্তু গণেশ ছিল উদাসীন মানুষ। কাজ করলেও তার বিনিময়ে কোনো অর্থ সে স্পর্শ করতো না। অনেকে সে অর্থ মা নারায়ণী দেবীর কাছে তা পৌঁছে দিতো।

গণেশের মন পরে থাকতো সাধুসঙ্গ ও সাধুসেবায়। কোথাও বৈষ্ণব সেবা হলে গণেশ সেদিকে চলে যেত। নিজ হাতে সাধুগুরুতে সেবা দিয়ে আনন্দ পেত। তার মধ্যে একটা ক্ষ্যাপামি ছিল। যা একবার বলতো তা করেই ছাড়তো। ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে কোনো জান করতে বলা হলো ক্ষেপে যেত বলে লোকে তাকে ‘কেষ্ট ক্ষ্যাপা’ বলে ডাকতো।

পুত্রের সংসারের প্রতি ঔদাসিনত্য দেখে মা স্থানীয় সাধক গোঁসাই বিন্দু দাসের কাছে ছেলের আচরণের কথা খুলে বললেন। বিন্দু দাস ছিল গেরুয়া খিলকাধারী ভেকাশ্রিত বৈষ্ণব। ডৌয়াতলী গ্রাম থেকে কিছুটা পশ্চিমে ছিল তার আশ্রম। জানা যায়, বিন্দু দাস দুই বিয়ে করেছিলেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী দুলির পিতার কোনো সন্তান না থাকায় বিন্দু দাসকে নিজ বাড়িতেই রেখেছিলেন।

শ্বশুর বাড়িতেই আশ্রম বানিয়ে বিন্দু দাস স্ত্রী ও কন্যা ফুলিকে নিয়ে বসবাস করতেন। বিন্দু দাস কপালে সিঁদুর, হাতে ত্রিশূল-কুমন্ডল নিয়ে চলাফেরা করতেন। নারায়ণী দেবী তার হতেই পুত্রকে তুলে দিলেন। এভাবেই বিন্দু দাসের আশ্রমে গণেশের নতুন জীবন শুরু হলো। কয়েক বছর গুরু গোঁসাই বিন্দু দাসের সেবা করার পর গণেশের ভক্তি দেখে তাকে দীক্ষা দেন।

এর কিছুদিন পরই গণেশের পিতামহ কেনাই বৈরাগী দেহত্যাগ করে। কেনাই বৈরাগী গণেশের মায়ের নামে কোনো জমিজমা না দিয়ে গেলেও। সংসার চালানোর জন্য কেনাই বৈরাগীর কিছু জমি নারায়ণী দেবীকে আমরণ সত্ত্ব দেয় গণেশের কাকারা। সেই জমির ফসল দিয়েই নারায়ণী দেবীর দিন কাটতে থাকে।

অন্যদিকে আশ্রমে চলতে থাকে গণেশের সাধন-ভজন গুরু সেবা। বড় হতে থাকে সে। গুরু কন্যা ফুলি সাথে গড়ে উঠে গণেশের প্রেমের সম্পর্ক। দুজনে যুক্ত হয় সাধনায়। ফুলির সাথে গণেশের প্রেমের সম্পর্ক স্থানীয় যুবকরা ভালো চোখে দেখে না। তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু বিন্দু দাসের কারণে আশ্রমে প্রবেশের সাহস করতে পারে না।

একদিন গুরুর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে স্থানীয় যুবকরা আশ্রমে ঢুকে পরে। ফুলি আর গণেশকে একসাথে পেয়ে তাদের মারধর করে গণেশকে মারতে মারতে জঙ্গলে নিয়ে যায়। মৃত ভেবে একসময় তারা গণেশকে জঙ্গলে ফেলে চলে আসে। যাতে বাঘ-শিয়ালে খেয়ে নেয়।

সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গল দিয়ে রাতের অন্ধকারে গণেশ রওনা দিলো। লৌকিক-অলৌকিক সব ভয়কে মাথায় নিয়ে গুরুর নাম স্মরণ করে পথ চলতে লাগলো। কিন্তু পথ ক্রমশ ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতম হতে থাকলে গণেশ সশব্দে গুরুর নাম ডাকতে ডাকতে চলতে লাগলো।

এই ঘটনায় ফুলিও আহত হয়। গুরু বিন্দু দাস গোঁসাই আশ্রমে ফিরে এসে এ ঘটনা দেখে স্ত্রী ও কন্যাকে অন্যত্র রেখে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্য দিকে গণেশ জ্ঞান ফিরে পেয়ে নিজেকে গভীর জঙ্গলে আবিস্কার করে। ফুলির কি হয়ে এই কথা ভাবতে ভাবতে রাগে-অভিমানে জঙ্গলে দুই দিন পরে থাকে।

দুই দিন পর গণেশ যখন হামাগুড়ি দিতে দিতে ফুলি ফুলি চিৎকার করতে করতে আশ্রমে ফিরলো; তখন আশ্রম শুনশান। রক্তাক্ত গণেশকে দেখে গ্রামবাসী ভয় পেয়ে গেলো। মৃত মানুষ কি করে ফিরে আসলো এই নিয়ে হৈচৈ পরে গেলো। সেসময় গুরু বিন্দু দাস স্ত্রী ও কন্যাকে অন্যত্র রেখে আশ্রমে ফিরে এসে গণেশকে দেখতে পেলেন।

এতো মারের পরেও গণেশ বেঁচে আছে দেখে গ্রামের মানুষ গণেশ-ফুলির প্রেমের পবিত্রতাকে বুঝতে পারলো। কিন্তু ততক্ষণে ফুলি অনেক দূরে আর গণেশের মরো মরো অবস্থা। নারী-পুরুষের যুগল সাধনার যে ঊর্ধ্বরতির সাধন তা সাধারণে কি আর বুঝতে পারে? কাম আর প্রেম আলাদা করতে পারে এমন মানুষ কয়জনা।

ফুলিকে হারিয়ে গণেশ পাগল প্রায়। শেষে গুরুর আদেশে মনোনিবেশ করলেন ভগবানের স্মরণে। প্রেমকে হারিয়ে বিরহ বেদনা ভগবানের চরণে নৈবেদ্য রূপে নিবেদন করলেন গণেশ। একাকী আশ্রমে গুরু-শিষ্য মিলে কঠিন সাধনায় মত্ত হলেন। দিবারাত্রি আসনে বসে ইষ্ট নাম জপ করতেন তারা।

এসময় তারা সারাক্ষণই থাকতেন সাধন-ভজনে। খাবারের প্রতিও কোনো টান ছিল না। ভক্তরা কিছু এনে দিলে খেতেন; না দিলে নাই। চলতে লাগলো সাধনা। এভাবে দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর ঘুরতে লাগলো। যত দিন যায় গণেশের মন তত আনন্দিত হয়ে উঠে। শিষ্য তৈরি হচ্ছে দেখে গুরু বিন্দু দাস তৃপ্ত হয়ে উঠেন।

ভট্টের বাগান দ্বাদশ দেবতার পীঠস্থানে গণেশ যেন সিদ্ধ লাভ করেন এই বাসনা জাগে গুরু বিন্দু দাসের। সেই মোতাবেক গুরু গণেশকে একদিন ডেকে বলে, “ওরে ক্ষ্যাপা! তুমি উনশিয়া কামারবাড়ি গিয়ে একখানা দাও গড়িয়ে নিয়ে এসো।”

গুরুর আদেশ মাথায় নিয়ে গণেশ শ্রবণের অমাবস্যার অন্ধকার রাতেই কামারবাড়িতে রওনা দিলো। দাও বানাতে বানাতে অনেক রাত হয়ে গেলো কামারের। কামার তাকে রাতটা সেখানেই কাটিয়ে যেতে বললো। কিন্তু গুরুর আদেশ যত রাতই হোক ফিরতে হবে। গুরু বাক্য শিরোধার্য।

সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গল দিয়ে রাতের অন্ধকারে গণেশ রওনা দিলো। লৌকিক-অলৌকিক সব ভয়কে মাথায় নিয়ে গুরুর নাম স্মরণ করে পথ চলতে লাগলো। কিন্তু পথ ক্রমশ ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতম হতে থাকলে গণেশ সশব্দে গুরুর নাম ডাকতে ডাকতে চলতে লাগলো।

এই রূপে সিদ্ধি প্রাপ্তের পর থেকেই গণেশ পরিচিত হয়ে উঠতে লাগলো ‘গণেশ পাগল’ নামে। সিদ্ধি লাভের পর এক যুগ ধরে গণেশ সেই ভট্টের বাগানে যাতায়াত করে যান নিয়মিত। দিনের বেলা আশ্রমে থাকলেও রাতটা কাটাতেই সেই বাগানে। এ সময় তিনি কারো বাড়ি যেতেন না; কারো হাতের খাবারও খেতেন না।

জনশ্রুতি আছে, গুরুর প্রতি এই নিষ্ঠা দেখে স্বয়ং ভট্ট বাগানের দেবতা নিশানাথ গুরু বিন্দু দাসের মূর্তি ধারণ করে গণেশের সম্মুখে আবির্ভূত হন। আবেগে আভিভূত গণেশ গুরুর পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো। গুরুকে দেখতে পেয়ে গণেশের মনের সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব-ভয় কেটে যায়।

গুরুর পেছন পেছন পথ চলে কালী মায়ের মন্দিরে এসে দাঁড়ায়। সে সময় ঘটে গেল এক আশ্চর্য ঘটনা। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কালীমাতা নিজমূর্তি ধারণ করে গণেশকে দর্শন দিলো। কালীমাকে দর্শন করে গণেশ আবেগে অভিভূত হয়ে মাতৃ চরণে স্তব করতে করতে লুটিয়ে পরলো।

অল্প সময়েই গণেশ মুর্চ্ছা গেল। মুর্চ্ছিত গণেশকে মা কোলে তুলে নিলো। জ্ঞান ফিরে পেয়ে গণেশ তাকিয়ে দেখলো নিশানাথসহ দ্বাদশ দেবতা তার সামনে দণ্ডায়মান। এই দ্বাদশ দেবতার সামনে কালী মাতা গণেশকে “দুলিতে ফুলিতে বিন্দুতে সই”-এ বীজ মন্ত্র দিলেন।

কালী মাতা গণেশের মাথায় হাত দিয়ে বললেন- “হে বৎস! এই মন্ত্র জপ করলে তোমার সর্ব সিদ্ধি হবে। তোমার দ্বারা জগৎ জীবের অনেক কল্যাণ সাধিত হবে।” মায়ের আর্শীবাদ শেষে দ্বাদশ দেবতা তাদের স্বীয় শক্তি গণেশকে প্রদান করে অন্তর্হিত হলেন। নিশানাথ আবার গুরু বিন্দু দাসের রূপ ধারণ করে গণেশকে বাগানের বাইরে এগিয়ে যেতে লাগলেন।

রাতের অন্ধকার ততক্ষণে কাটতে শুরু করেছে। হঠাৎ গণেশ খেয়াল করলো সম্মুখ থেকে গুরু অদৃশ্য। গুরুকে দেখতে না পেয়ে সে দ্রুত আশ্রমের দিকে হাঁটতে লাগলো। আশ্রমে এসে গুরুকে ঘুমাতে দেখে গণেশ তো হতবাক। গুরুকে জাগিয়ে প্রশ্ন করলো, আপনি এতো অল্প সময়ে এসে ঘুমিয়ে পরলেন কিভাবে?

গুরু সব বুঝতে পেরে হেসে উঠলেন। ততক্ষণে গণেশের কাছেও সব পরিষ্কার। গণেশ গুরুর চরণে লুটিয়ে পরে বললো, “গুরুদেব! আমি আপনার কৃপায় সব পেয়েছি।”

এই রূপে সিদ্ধি প্রাপ্তের পর থেকেই গণেশ পরিচিত হয়ে উঠতে লাগলো ‘গণেশ পাগল’ নামে। সিদ্ধি লাভের পর এক যুগ ধরে গণেশ সেই ভট্টের বাগানে যাতায়াত করে যান নিয়মিত। দিনের বেলা আশ্রমে থাকলেও রাতটা কাটাতেই সেই বাগানে। এ সময় তিনি কারো বাড়ি যেতেন না; কারো হাতের খাবারও খেতেন না।

একদিন গুরু বিন্দু দাস গণেশকে ডেকে বললেন, “বাবা গণেশ! তোমার সাধনসিদ্ধি হয়েছে, আমি দায়মুক্ত হয়েছি। এখন স্বাধীনভাবে যথেচ্ছা ভ্রমণ করো।”

অল্প দিনেই গণেশ পাগলের লীলার কথা ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। পাগল এমন সব আশ্চার্যলীলা ঘটাতে লাগলেন যে মানুষ তার প্রেমে পাগল হতে লাগলো। কদমবাড়িতে পাগলের অনেক লোক ভক্ত হয়ে গেলো। আশ্বিন ১৩২৬ সনে কয়েকজন ভক্ত কদমবাড়ি থেকে গিয়ে পাগলকে কদমবাড়ি নিয়ে আসলো।

তারপর পাগলের নির্দেশ মত কমদবাড়িতে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করে পূজার আয়োজন করা হলো। পৌষ সংক্রান্তিতে তিন দিনের কবিগান দেওয়া হত। সেই সাথে কদমবাড়িতে শুরু হলো পৌষ সংক্রান্তির ১৫ দিনব্যাপী মেলা। পাগল দেহত্যাগের আগে বলেছিল, “যতদিন এই মেলায় কবিগান হবে আমি ঈশান কোনে অবস্থান করে কবিগান শ্রবণ করবো।”

কদমবাড়ির তারক বাড়ৈ অতি যত্নে পাগলকে তার বাড়িতে নিলেন। পাগল তার বাড়িতে গেলেন কিন্তু ঘরে উঠলেন না। সেই ঘরের বারান্দাতে আশ্রয় নিলেন। সেখানেই থাকতে শুরু করলেন। সে বছেই পূর্ববঙ্গের উপর দিয়ে এক মহা প্রলয়ংকালী ঝড় বয়ে যায়। সেই ঝড়ে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়।

ঝড়ের বেগ বাড়তে লাগলে তারক বাড়ৈ পাগলকে ঘরে নিতে চাইলো। কিন্তু পাগল তা না করে বরঞ্চ তাদের সকলকে বারান্দায় আসতে বললো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই ঝড়ে তারকের ঘর উড়ে গেলো কিন্তু বারান্দার কিছুই হলো না। এই প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যেই পাগল শান্ত মনে ভজনার রত থাকলেন।

ঝড় শেষে গ্রামবাসী যখন দেখলো গ্রামের কোনো বাড়িই অক্ষত নেই তারকের বারান্দা ছাড়া। তখন দলে দলে মানুষ পাগলের ভক্ত হতে লাগলো। তারক বাড়ৈ, বাঘাই সরকার, গোপাল সরকার সহ ভক্তকুল তাকে স্থায়ীভাবে সেখানে থাকার অনুরোধ করতে লাগলো।

সেসময় কদমবাড়ির পাশে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের বিশাল মেলা বসত জলিপাড় গ্রামে। পাগলের ভক্তরা একবার সে মেলায় গিয়ে বেশ দূর্ভোগ সহ্য করে মন খারাপ করে ফিরে আসলো। তাদের পরিস্থিতি দেখে পাগল বললো, “তোদের আর কষ্ট করে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আমিই মেলা মেলাবো।”

তারপর পাগলের নির্দেশ মত কমদবাড়িতে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করে পূজার আয়োজন করা হলো। পৌষ সংক্রান্তিতে তিন দিনের কবিগান দেওয়া হত। সেই সাথে কদমবাড়িতে শুরু হলো পৌষ সংক্রান্তির ১৫ দিনব্যাপী মেলা। পাগল দেহত্যাগের আগে বলেছিল, “যতদিন এই মেলায় কবিগান হবে আমি ঈশান কোনে অবস্থান করে কবিগান শ্রবণ করবো।”

জানা যায়, দেহত্যাগের মাস ছয়েক আগে পাগল তার পাগলামী ছেড়ে দেন। তার ভক্ত কবি মনোহরের বাড়ি থেকে আর বের হতেন না। সামান্য আহার করতেন। কাথাবার্তা বিশেষ বলতেন না। তার এই শান্ত মূর্তি দেখে ভক্তকুল বুঝতে পারলেন পাগল আর বেশি দিন থাকবেন না ধরাধামে।

একদিন মনোহরকে ডেকে পাগল বললেন, “মনোহর! আমার যাওয়ার রথ তাড়াতাড়ি আসবে, আর বেশিদিন থাকব না। আগামী দোল পূর্ণিমা ভালো দিন, ঐ দিন আমি চলে যাব। আমার দেহটা পুড়িয়ে মাটিতে মিশিও দিও।”

বাংলা ১৩৩৫ সনের দোল পূর্ণিমায় সকল ভক্তকুলকে কাঁদিয়ে পাগল দেহত্যাগ করলেন। পাগলের ইচ্ছানুযায়ী ভক্ত মনোহরের বাড়িতে পাগলের মরদেহ সৎকার করে ভক্তরা। সদকারের পর মনোহরের বাড়ি মহোৎসবের আয়োজন করে।

ভক্তকুলের কাছে আজও কদমবাড়িতে আছেন পাগল। পাগলের অস্তিত্ব তারা খুঁজে পায় সর্বত্র। আজো পাগলের লীলা অব্যহত আছে। দূরদূরান্তের মানুষজন মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার অভিলাশে পাগলের আশ্রমে আসে। পাগলকে ভক্তি দেয়।

জনশ্রুতি আছে, পাগলকে মন থেকে ডাকলে পাগল আজো সাড়া দেয়। এই তো কিছুদিন আগের কথা। বাংলাদেশ সরকার গুচ্ছগ্রাম করার প্রকল্প গ্রহণ করার পর। স্থানীয় প্রশাসন পাগলের জমির উপর গুচ্ছগ্রাম করার কার্যক্রম চালায়। পাগলের ভক্তরা বাঁধা দিলে মামলা পর্যন্ত হয়।

মামলা যায় আদালতে। চলতে থাকে বিচার কাজ। আসামী করা হয় পাগলের ভক্তদের। মামলা চলতে চলতে সেই মামলা যায় হাইকোর্টে। যেদিন রায় হবে সেদিন পাগলের ভক্তরা আহাজারি করে পাগলকে ডাকতে থাকে। কান্নাকাটি করতে থাকে।

কথিত আছে, রায় দেয়ার আগের দিন পাগল স্বয়ং উপস্থিত হয়ে বিচারককে বলেন- “ওরা আমার ভক্ত, ওরা নির্দোষ, ওদের খালাস করে দিস।” পাগলকে দর্শন করে বিচারকের মনে এক ভাবাবেগের উদয় হয়। বিচারক পাগলের পক্ষে রায় দেয়।

পাগলের লীলার কথা জানার পর যারা পাগলের জমি দখল করার বাসনা করেছিল তারাও আর সেই জমি দখল নিতে যায় নি। পাগলের লীলা স্মরণ করে সকলে পাগলের প্রেমে ধরা দেয়। সেই জমিতে আজো পাগলের মেলা হয়ে আসছে।

গণেশ পাগলের মূল মন্ত্র:

১. দুলিতে ফুলিতে বিন্দুতে ঠিক।
২. ভালো হ তবেই ভালো থাকবি।
৩. গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরু মহেশ্বর, গুরু কৃষ্ণ, গুরু হরি, গুরুই ঈশ্বর।

জনশ্রুতি আছে, পাগলের একনিষ্ঠ ভক্ত ১৩ জন পাগল কদমবাড়িতে ১৩ তারিখে ১৩ সের চাল ১৩টি টাকা দিয়ে একটি সিদ্ধি মেলার উদ্বোধন করে। এই পাগলরা ১৩ পাগল নামে পরিচিত। এই ১৩ পাগল হলেন- প্রশান্ত বিশ্বাস, বিজয় সরকার, সিদ্ধেশ্বর বেপারী, দেবেন্দ্রনাথ সরকার, প্রতাপ গাইন, ব্রজবাসী সরকার, নরেন্দ্রনাথ বাড়ৈ, দেবেন্দ্রনাথ সরকার, শ্রীদাম বাড়ৈ, মনোহর কর্ত্তণীয়া, ক্ষদরাম হালদার, গয়ালী সরকার ও দেবেন্দ্র ফলিয়া প্রমুখ।

প্রতিবছর কদমবাড়ি ১৩ জ্যৈষ্ঠ কুম্ভ মেলা হয়ে আসছে। মেলাটি ২৪ ঘণ্টাব্যাপী চলে। পাগলে অগুণিত ভক্ত দেশ-বিদেশ থেকে কদমবাড়িতে একত্রিত হয়। পাগলের প্রেমে পাগল হয়ে আজো মানুষ পাগলের নাম স্মরণ করতে করতে দলে দলে কদমবাড়িতে জমা হয়। জানা যায় পাগল বলেছিল, “এই কদমবাড়ি সোনার কদমবাড়ি হবে, তোরা মানুষকে যত্ন করিস। আমি কদমবাড়ি আছি ও থাকব।”

বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার, রাজৈর উপজেলার, কদমবাড়ি ইউনিয়নের দিঘীরপাড় গ্রাম মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠিত। এটি অধিক পরিচিত কদমবাড়ি গণেশ পাগলের সেবাশ্রম নামে।

………………………………..
সূত্র: শ্রীশ্রী গণেশ পাগল লীলামৃত : শ্রীসুভাস চন্দ্র বিশ্বাস

…………………………………………..
আরো পড়ুন:
গণেশ পাগল
গণেশ পাগলের কুম্ভ মেলা ২০২০ স্থগিত

প্রাসঙ্গিক লেখা

1 Comment

  • Mrinal kanti Bagchi , বৃহস্পতিবার ৯ এপ্রিল ২০২০ @ ১০:৪৩ অপরাহ্ন

    মহামানব গণেশপাগল তোমায় শতকটি প্রনাম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!