ভবঘুরে কথা
মাই ডিভাইন জার্নি

তখন পুরান ঢাকার যে বাসায় আমরা থাকতে শুরু করেছি সেটি মূল সড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে। গলিটার বিভিন্ন অংশ থেকে বেশকিছু সরু পথ জালের  মতো পুরো পাড়ায় ছড়িয়ে ছিল। এই আঁকাবাঁকা গলিগুলো কোথাও কোথাও এতোটাই সুরু ছিল যে রিক্সাও চলতো না। সে কারণে গলিগুলো যেমন তুলনামূলক নিরাপদ ছিল তেমনি কম সময়ে দূরের পথ পাড়ি দেয়ার জন্য ছিল আদর্শ। এই পথগুলোই আমাদের ছোটদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এর মধ্যে যে সরু গলিটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়তো সেটার ঠিক মাঝামাঝিতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে কোমরে গামছা জড়িয়ে এ্যালুমিনিয়ামের থালা হাতে ঝড়-বৃষ্টি-শীত-গ্রীষ্মে দাঁড়িয়ে থাকতো মতি মিয়া। সবাই বলতো মতি পাগলা।

লালন আখড়া, কুষ্টিয়া

ঐ মহল্লায় যাবার কিছুদিন পরে এক মধ্য দুপুরে সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে একা একা যাচ্ছিলাম লাটিম কিনতে। ল্যাম্পপোস্টের পাশ থেকে মতি পাগলা হঠাৎ বেরিয়ে পিলে চমকে দিয়ে বলে উঠলো, ‘কই যাস’? সেদিন এই আকস্মিক দৃশ্যমান হওয়া মতি পাগলা ও তার প্রশ্ন শুনে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে দৌঁড়ে পালিয়েছিলাম ছোট্ট আমি। এই ঘটনার পর থেকে সেই গলি দিয়ে যেতে ভীষণ ভয় করতো। কিন্তু উপায় ছিল না। ঐ গলিটা ব্যবহার করা প্রায় প্রতিদিনই প্রয়োজন হতো। তাই নিরূপায় হয়ে মাঝেমধ্যে যেতেই হতো। তখন খুব সাবধানে দূর থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখতাম মতি পাগলা দাঁড়িয়ে আছে কিনা। যদি তাকে দেখা না যেত তাহলে হাফ ছেড়ে বাঁচতাম; দৌঁড়ে ঐটুকু পথ পাড়ি দিতাম। আর যদি দেখা যেত তিনি দাঁড়িয়ে আছেন তাহলে আর সাহস করতাম না, উল্টো পথ ধরতাম।


তিনি যখন কাছে টেনে নিয়া আসছেন, তিনিই পথ দেখাবেন। আপনি হাজার ঘুরে মরলেও হাজার সাধনা করলেও দেখা কি পাবেন গুরুর? যদি তিনি না চান? তিনিই ঠিক করে দিবেন সবকিছু। সেদিন আপনি নিজেই বুঝবেন। কাউকে বলে দিতে হবে না। কাউকে দেখিয়েও দিতে হবে না। গুরুপ্রাপ্তি নিয়া চিন্তার কিছু নাই। কার সাথে কখন প্রেম হয় তা যেমন বলা যায় না তেমন গুরুর দর্শনও বলে কয়ে হয় না।

রবিউল শাহ্

পরবর্তীতে দেখে-জেনে-শুনে বুঝেছি মতি পাগলা মোটেও ভয়ঙ্কর নন। তিনি ছিলেন নিতান্তই গোবেচারা মানুষ, তার অন্যতম কর্ম হলো সারাক্ষণ ফিক্ ফিক্ হাসা আর সামনে দিয়ে যেই যাবে তাকে জিজ্ঞাসা করা ‘কই যাস’? মাঝারি গড়নের মতি পাগলার থুতনির কাছে একগুচ্ছ দাড়ি, লম্বা লম্বা গোঁফ, বড় বড় দাঁতগুলি একটু সামনের দিকে বের করা, যথারীতি চুল উস্কোখুস্কো আর মাথাটা শরীরের তুলনায় খানিকটা বড়। সিগারেটে সুখ টান দেয়া ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়, সেই দৃশ্য দেখবার মতো, আয়েশ করে দুই চোখ বন্ধ করে সর্বইন্দ্রিয় দিয়ে মতি টান দিত সিগারেটের সর্বশেষ অংশখানা; সেই অংশটুকু পাওয়ার আশায় ধুমপায়ীদের পেছন পেছন ঘুরতো মতি।

বিস্তারিত পড়ুন…

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!