ভবঘুরে কথা
সাত্তার ফকির

-মূর্শেদূল মেরাজ

মাই ডিভাইন জার্নি : এগার

নরসিংদীর খানাবাড়িতে হুমায়ুন সাধুর আখড়ায় সাধুসঙ্গ শেষ হয়েও পুরো একদিন অতিবাহিত হয়েছে। দূরদূরান্তের সাধুগুরু-ভক্ত-অনুসারিদের বেশিভাগই ইতিমধ্যে ফিরে গেছেন নিজ নিজ ঠিকানায়। তারপরও নাই নাই করে আমরা গোটা পঞ্চাশেক মানুষ তখনো টিকে আছি। গত কয়েকদিনের মতো মানুষের গাদাগাদি চাপাচাপি আর নাই। সকলেই ফুরফুরা মনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আয়েস করে দিন পার করছি।

সারাদিনের বৃষ্টিতে শীতটা বেশ জাকিয়ে বসেছে ইতিমধ্যে। শীত শীত ভাব আর গত কয়েকদিনের নির্ঘুম রাতের হিসেব নিকেষের দরকষাকষি করে বেশ আগে আগেই সকলে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পরেছে। যতই নির্ঘুম রাত কাটাই… যতই ক্লান্ত থাকি… এতো সকাল সকাল কি আর ঘুম আসে? সফরসঙ্গী সুধাম সাধু রীতিমতো নাক ডেকে জানান দিয়ে ঘুমের দেশে পারি জমিয়েছেন। বৃষ্টিটা ধরে আসায় নিরবতাটা বেড়েছে অনেকটা। এরমধ্যে অগণিত নাক ডাকার বিচিত্র সব শব্দ চোখের পাতা এক করতে দিলেও মনের পাতা এক করতে দিচ্ছে না কিছুতেই।

হুমায়ুন সাধুর আখড়া ঘরের চারপাশের টিনের বেড়াগুলো এমনভাবে বানানো হয়েছে যে, অনুষ্ঠানের সময় যাতে সেগুলো খুলে দিয়ে সকল দিকে দিয়ে প্রবেশের জায়গা করে দেয়া যায়। তখন পুরো পরিবেশটাই পাল্টে যায়। সাধুসঙ্গ সমাপ্তি এবং বৃষ্টি শুরু হওয়ায় সেসব বেড়া পুনরায় লাগিয়ে দেয়া হয়েছে; দিন থাকতে থাকতেই। আখড়াটা হুট করে যেন ঘর হয়ে উঠেছে। ঠিক মাঝখানে হুমায়ুন সাধু শুয়ে আছেন। তাঁর চারপাশ ঘিরে আমরা সারি সারি বিছানা পেতে ঘুমের মেলা বসিয়েছি।

হুমায়ুন সাধুর ভক্তদের মাঝে এক গুরুভাই এর সাথে অরেক গুরুভাইদের যে প্রেম দেখেছি; তা আমি অন্য ঘরের গুরুভাইদের মাঝে খুব কমই দেখেছি। হতে পারে এটা আমার কম ঘর দেখবার কারণে। কিন্তু আমি দিব্যি করেই বলছি গুরুভাইদের পরস্পরের মধ্যে যে প্রেম এই ঘরে দেখেছি তা খুব একটা চোখে পরে না। গুরুভাইদের মাঝে পরস্পরের প্রতি প্রেম-বিশ্বাস-বন্ধন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে সেই ঘরের সৌন্দর্য পূর্ণ হয়।

ইব্রাহিম সাধু অল্প কথার মানুষ। তিনি যখন বেড়াগুলো জুড়ে দিচ্ছিলেন তখন আমিও একটু হাত লাগাতে এগিয়ে গেলাম। ইব্রাহিম সাধু গোঁফের ফাঁক দিয়ে হাসি দিয়ে সম্মতি দিলেন। তবে আমাকে তেমন কিছুই করতে দিলেন না। তিনিই করে চললেন সকল কাজ। তবে তার সাথে কথা চালাচালি হল। তিনি বলছিলেন হুমায়ুন সাধু দেহধারী থাকাকালীন কোথায় বসতেন; তখন সাধুসঙ্গ কিভাবে হত-কেমন করে হত। কিসের মায়ায় ইব্রাহিম সাধু এই আখড়ায় এসে আর ফিরে যেতে পারলেন না, কিসের টানে হুমায়ুন সাধুর চরণেই এ জীবন উৎসর্গ করলেন; এসব কিছুর ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। কিন্তু গুরুরূপে যখন আবির্ভূত হয়েছেন হুমায়ুন সাধু তারপর থেকে তিনিই সর্বব্যাপী বিরাজমান।

দিনচর্চার এরূপ নানা ভাবনা যখন দুইচোখে ঘুমকে আসতে দিচ্ছিল না। তখন হঠাৎই আবিস্কার করলাম পাশের তক্তোপশের উপর বিছানা করে নানা-নানি আর সন্তান নিয়ে যে দিদি ঘুমাচ্ছেন। তার মাথার কাছে একটি ছায়ামূর্তি। নি:শব্দে তিনি কখন এসে দাঁড়িয়েছেন টেরই পাই নি। মাথা তুলে তাকাতেই ছায়ামূর্তি দু’ হাত বুকে নিয়ে ভক্তি দিলেন। আলোআধারিতেও চিনতে পারলাম তিনি দিদির স্বামী। আবার চোখ বন্ধ করলাম।

বুঝতে পারলাম এভাবে মটকা মেরে পরে থাকলে আর ঘুম আসবে নাা। তাই বাইরে থেকে একটু হাঁটাহাঁটি করে আসার সিদ্ধান্তেই মনস্থির করলাম। গরম কম্বল সরিয়ে উঠে বসে দেখি সেই ভদ্রলোক আর আশপাশে নেই। নি:শব্দে কখন চলে গেছেন টের পাইনি। মোবাইলখানা পকেটে গুঁজে একখানা পাতলা কম্বল গায়ে জড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে উল্টোদিকের একমাত্র খোলা দরজার দিকে এগুলাম। সকল দিকের টিনের বেড়া আখড়া ঘরের গায়ে আবার জুড়ে দেয়া হলেও এই দরজাটা জুড়ে দেয়া হয়নি। সেই বিশাল দরজাখানা অর্ধেক কাত হয়ে দরজার অনেকটা ফাঁকা অংশ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। বাকি অংশটা হা করে খোলা।

আখড়ার বেশকিছু জিনিসপত্র এখনো ঘরে ঢোকানো হয়নি তাই সম্ভবত এই দরজাখানা জুড়ে দেয়া হয়নি। এই অংশটায় উঠানের মতো একটা জায়গা থাকায় এখান দিয়ে বৃষ্টি ঢুকছে না। তবে বাইরের শীতল বাতাস হু হু করে ঢুকছে। যদিও একটা বিশাল পিভিসি ব্যানারসহ আরো বেশকিছু জিনিস পর্দার মতো করে ফাঁকা জায়গাটাকে বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাতাসের তীব্রতায় ভারি পিভিসি পর্দার মতো উড়ছে। এই অংশটায় যারা ঘুমিয়েছে তাদের নির্ঘাত বেশ শীত লাগছে। তবে মানুষ কম থাকায় সকলেই আজকে দুই-তিনটা করে লেপ কম্বল নিয়ে শুয়েছে আয়েশ করে। তাই হয়তো টের পাচ্ছে না।

কম্বলটা ভালো করে দেহে মুড়ে বেড়িয়ে আসলাম বাইরে। মেলার অবশিষ্ট যে দুই-একটা দোকান আজও বসেছিল তাও বিকালের আগে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেছে। আখড়া লাগোয়া স্থায়ী দোকানটাও সেই সন্ধ্যার পরপরই বৃষ্টির জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে কাঁদা হয়ে গেছে পুরোটা এলাকা। তবে আখড়া ঘিরে ত্রিপল-শামিয়ানা লাগানো অংশটা এখনো কাঁদা মাখামাখি হয়নি; সেই অংশটা ধরে এগিয়ে যেতেই দেখি চকচকে পূর্ণিমার চাঁদ পূর্ণিব্যাপ্তিতে সমগ্র খানাবাড়িকে গিলে খাওয়ার পায়তারা করছে। বৃষ্টি নেই তবে তীব্র বাতাস, ঠাণ্ডায় জমিয়ে দিচ্ছে। ত্রিপলের এককোণে অল্প পাওয়ারের একটা বাতি জ্বলছে তার নিচে দেখা যাচ্ছে সেই নি:শব্দে চলাচলকারী ভদ্রলোক মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে কি যেন খুঁজে চলছেন। সেদিক থেকে মাথা ঘুরিয়ে চাঁদের আলোতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলাম।

কিন্তু মাথার ভেতরে সেই ভদ্রলোকই জায়গা করে আছে। এই কয়েকদিনে আমাদের পাশের আসনের দিদির কাছে এই ভদ্রলোক সম্পর্কে মহাভারত-রামায়ণ-ঔপনিষদ-পুরাণ সব শুনেছি। দিদি কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনিয়েছেন, যে গানে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল সেই গানই তিনি আর গাইতে পারলেন না এই লোকের জন্য। স্বামী-সন্তান-শ্বশুরবাড়ি দেখতে দেখতেই তার জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্বামী হিসেবে ভদ্রলোক কতটা খারাপ-পিতা হিসেবে কতটা খারাপ তার ফিরিস্তি যে শুধু আমরা শুনেছি তাই নয়; আখড়ায় আগত প্রায় সকলেই শুনেছে।

তবে তাদের অসম্ভব ময়াময় শিশু সন্তানটিকে কেউ অবজ্ঞা করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। ছোট্ট শিশুটি সকলের সাথে মিশে যেতে পারে কয়েক মুর্হূতের মাঝেই। তবে শিশুটির মা অর্থাৎ সেই দিদি এই কয়দিনে পিতার কর্তব্য নিয়ে আমাকে আর সুধাম সাধুকে যে জ্ঞান দিয়েছে তাতে এই অন্ধকারে টর্চের আলোতে খুঁজতে থাকা ভদ্রলোককে সহ্য করা কি কষ্টকর হয়ে পরছে? তাই কি চাঁদের আলোতে নিজেকে ডুবাতে চাচ্ছি? এমন খারাপ কোনো মানুষকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে না। চুলায় যাক ভদ্রলোক। তারচেয়ে চাঁদের আলোয় জেগে ওঠা প্রকৃতি ঝিঝির ডাকে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ।

অনেকটা সময় কাটিয়ে যখন একটু ঘুম ঘুম ভাব আসতে লাগলো তখন আখড়া ঘরের দিকে হাঁটা দিলাম। ঢুকতে যাবো এমন সময় দেখি সেই ভদ্রলোক মোবাইলে টর্চ জ্বেলে যে অংশটা দিয়ে বাতাস ঢুকেছে সেটাকে আরো কিছু পিভিসি ব্যানার দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মোবাইলের টর্চ, ব্যানার, দঁড়ি সবকিছু একসাথে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না।

মানবিক কারণে সাথে থাকা মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে এগিয়ে গেলাম ভদ্রলোককে সাহায্য করতে। আমাকে পেয়ে তিনি যেন কিছুটা স্বস্তি পেলেন। বুঝলাম এতোসময় ধরে তিনি এইসব খুঁজে খুঁজে এনেছেন। বাতাসের গতি এতোটাই তীব্র হয়েছে যে ভদ্রলোক চেষ্টা করেও ফাঁকা অংশটাকে বন্ধ করতে পারছেন না। পর্যাপ্ত দড়ি না থাকায় সমস্যা আরো বেড়েছে।

সবাই ঘুমিয়ে পরেছে তাই শব্দ করে বাতি জ্বালানো যাচ্ছে না। নিরবে কাজ করতে হচ্ছে। ঘরের ভেতরে দড়ি খুঁজতে গেলে হয়তো ঘুম ভেঙ্গে যেতে। এই কয়দিন সকলে অনেক পরিশ্রম করেছে। আজকের ঘুমটা তাই সকলের খুব প্রয়োজন। পাছে কারো ঘুম ভেঙ্গে যায় তাই আর খোঁজ করা যাচ্ছে না। যতটা দড়ি আছে তা দিয়েই ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। একসময় ফিসফিস করে বলেই ফেললাম, দাদা এভাবেই চাপা দিয়ে রেখে দেন। কি আর করা। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললো, ছেলেটা দুইদিন ধরে খুকখুক করে কাশতেছে মাঝে মধ্যে। এই বাতাসটা ঘরে ঢুকলে বুকে কফ জমে যাইতে পারে। এইটারে বন্ধ করতেই হইবো। আপনি শুয়ে পরেন। আমি বন্ধ করে আসতেছি।

মনটা ভারি হয়ে গেলো। বললাম, আমি চর্ট ধরে আছি আপনি বন্ধ করেন । ভদ্রলোক সেই ছোট্ট দড়ি দিয়ে তীব্র বাতাসকে রুখে দেয়ার যুদ্ধ করতে লাগলেন। আর আমি দেখতে থাকলাম একজন পিতাকে; যার সন্তান ঘরের অন্যপাশে ঘুমিয়েছে। এই বাতাস সে অবধি যাবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তারপরও একজন পিতা এই রাতে সন্তানের উষ্ণতার জন্য তার কর্তব্য পালন করে যাচ্ছেন।

সন্তান যে বার দুয়েক খুকখুক করে কেশেছেন তাও তার নজরে এড়ায়নি। দিদির কথা শুনে এই তিন/চার দিন ধরে এই ভদ্রলোক সম্পর্কে মনে মনে দায়িত্বজ্ঞানহীন এক বাবার ছবিই এঁকেছিলাম চিত্রপটে। কিন্তু এই গভীর রাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রে তিনি ধরা দিয়েছেন আমার ফ্রেমে। দৃশ্যপট পাল্টে গেলেই কি মানুষ পাল্টে যায়? নাকি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে প্রকাশ করে? এইসব ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমের ঘোরে চলে গিয়েছিলাম। শেষ রাতে শীতটা যখন আরো তীব্র হয়ে হানা দিচ্ছিল তখন খেয়াল করলাম কে জানি ঘুম থেকে উঠে নিচু স্বরে খালি গলায় গাইতে শুরু করেছে-

অবোধ মন তোরে
আর কী বলি,
পেয়ে ধন সে ধন
সব হারালি।।

মহাজনের ধন এনে,
ছিটালি রে উলুবনে,
কী হবে নিকাশের দিনে
সে ভাবনা কই ভাবলি।।

সই করিয়ে পুঁজি তখন
আনলি রে তিন রতি এক মণ,
ব্যাপার করা যেমন তেমন
আসলে খাদ মিশালি।।

করলি ভালো বেচাকেনা
চিনলি না মন রাং কি সোনা,
লালন বলে মন রসনা
কেন সাধুর হাটে এলি।।

গান শুনতে শুনতেই ভাবছিলাম এই যে আমরা এক পক্ষের কথা শুনে যে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে চলে আসি। ভাবতে শুরু করে দেই কতকিছু। তর্কে জুড়ে যাই কতজনের সাথে। আমাদের মধ্যে কয়জন আর পক্ষে-বিপক্ষের অর্থাৎ উভয়পক্ষের কথা শুনে-জেনে-বুঝে আমাদের সিদ্ধান্তগুলোকে সাজাই? একটা যুক্তির ঠিক বিপরীতে যে আরেকটা যুক্তি থাকতে পারে। একটা কথা পিঠে যে আরেকটা কথা থাকে। একটা মতের পাশেই যে আরেকটা মত থাকে। সেটাকেও যে সম্মান প্রদর্শন করা প্রয়োজন তা আমাদের মাঝে কয়জনই বা ঠিকঠাক স্মরণে রাখতে পারি?

এই যেমন একখানা গ্রন্থ পড়েই অনেকে পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছে বলে ধরে নিয়ে যুক্তি তর্ক শুরু করে দেয়। এর বাইরেও যে একটা মত থাকতে পারে। এর বাইরেও যে সৌন্দর্য থাকতে পারে। এর বাইরেও যে সত্য থাকতে পারে। এর বাইরেও যে এই গ্রন্থখানারই আরো সুন্দর ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তা কি আমরা ভেবে দেখবার অবকাশ পাই?

এই যেমন আমি সেই দিদির কথা শুনে মনে মনে আঁকতে শুরু করেছিলাম এমন এক পিতার চিত্র যে তার সন্তানের-পরিবারের দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে ডুবে থাকে আপন খেয়ালে? যদি সেই রাতে বা পরে সেই ভদ্রলোকের সাথে আলাপের সুযোগ না পেতাম তাহলে হয়তো সেইরকম একটা ভাবনা নিয়েই ফিরতাম। তাই না? তার যে নিজস্ব একটা যন্ত্রণা আছে, আবেগ আছে, যে যন্ত্রণাটা প্রকাশ করতে না পারার কষ্ট আছে। তা জানা হতো না কখনো। তবে সাধুর বাড়িতে গেলে ঐ এক মজা। মাথার ভেতর যন্ত্রণা নিয়ে ফিরতে হয় না। সহজে থাকলে। সাধু ঠিকঠাক উত্তর দিয়েই নিবাসে পাঠান।

যদিও সাধুগুরুর কাজই মাথার ভেতর প্রশ্নের পোকা ঢুকিয়ে দেয়া। তবে তা যন্ত্রণা নয় বরং তা আত্মানুসন্ধানের বার্তারূপেই দেন। যাতে মন আরো গভীরে প্রবেশের স্পর্ধা দেখাতে পারে। ভাববার নতুন প্রেরণা পায়। দেশভাগের যন্ত্রণাকে শক্তিতে রূপান্তর করে যে শিল্পী নিজেকে ঋত্বিক ঘটক বানিয়েছিলেন। তিনি খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’ তার সাথে সাধুগুরুরা আরেকটু জুড়ে দিয়ে বলেন, কি ভাবতে হবে তা আগে জানতে হবে বাপু। উল্টা-পাল্টা ভাবলেই মুশকিল। মহা মুশকিল।

আমরা তখনো গেণ্ডারিয়ার কাঠেরপুলের সেই ভাড়া বাড়িতেই থাকি। ধুপখোলা মাঠের পাশের একটা কিন্ডারগার্ডেনে পড়ি। একই ক্লাসই পড়ত বন্ধু মুনির। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়াদের সাথে ওদের কি যেন একটা আত্মীয়তা ছিল। সেই সূত্রে প্রায়ই সেই বাড়িতে বেড়াতে আসত। সেকারণে তার সাথে স্কুলের বাইরেও দেখাসাক্ষাৎ হত। গল্পগুজব হত। খেলাধুলা হত। যদিও মুনিররা অন্য পাড়ায় থাকত।

প্রত্যেকদিনই মুনিরের সাথে স্কুল থেকে ফেরার পথে কিছুটা পথ একসাথে আসতাম। তারপর মুনির তাদের বিশাল সাইজের দামী গাড়িতে করে সাধনার গলি ধরে চলে যেত তার মায়ের সাথে। আর আমি মায়ের হাত ধরে ফিরতাম বাড়ির পথে। একদিন হঠাৎ করেই মুনির স্কুলে আসা বন্ধ করে দিলো। সবাই কি জানি সব কানাঘুষা করে, আমরা ছোটরা কিছুই বুঝি না। আমরা অপেক্ষা করি কিন্তু মুনির আর ক্লাসে আসে না।

দিন কয়েক পর আমরা অনেক কিছুই জানলাম। তবে বুঝলাম কতটা তা জানি না। মুনির অনেকদিন পরে স্কুলে এসেছিল। কিন্তু আর কথা হয়নি। মাথা নিচু করে প্রিন্সিপাল ম্যাডামের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার বাবা তাকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল টিসির পেপার নেয়ার জন্য। মুনির অন্য স্কুলে ভর্তি হবে। স্কুলের সব টিচাররা ছুটে গিয়েছিল মুনিরের বাবাকে দেখতে। পরে টিচারদের কাছেই শুনেছিলাম মুনিরের মা তার এক জোড়া জমজ পুত্র-কন্যাসহ পাঁচ সন্তান রেখে গৃহশিক্ষকের হাত ধরে পালিয়ে গেছে। সকলে ছি: ছি: করতে লাগলো।

পাড়া-মহল্লা, স্কুল-ঘর সর্বত্র মুনিরের মাকে নিয়ে আলোচনা। কি করে নিলর্জ্জ্য মহিলা পাঁচ পাঁচটা সন্তান রেখে ছেলের সমান পুরুষের হাত ধরে পালিয়ে গেলো। অবশ্য আমরা ছোটরা কাছাকাছি আসলে সেসব আলোচনা থেমে যেত। তবে আমরাও কম না। পড়ছি বা শুনছি না এমন ভাব করে প্রায় সবই গিলে খেতাম। তারপর ছোটরা একসাথে হয়ে সেইসব ঘটনা জুড়ে বোঝার চেষ্টা করতাম আসল ঘটনা কি। কিন্তু আমাদের মাথায় সেসব খেলতো না। শুধু বুঝতাম এটা একটা লজ্জার খবর। যার জন্য মুনিরের বাবা এলাকা ছেড়ে… পৈত্রিক বাড়ি ছেড়ে তাদের অন্য বাড়িতে-অন্য পাড়ায় চলে গেছেন। ছোটছোট সন্তানগুলোকে তিনি একা পালতে পারবেন না বলে। মুনিরের ভাই বোনরা দাদী-নানী-ফুফু-চাচী-খালাদের কাছে ভাগে ভাগে চলে গেছে।

তবে পাশের ফ্ল্যাটের মুনিরদের সেই আত্মীয় মারফত মুনিরের মায়ের বিভিন্ন খবর দ্রুত পাড়ায় ছড়িয়ে পরতে সময় লাগতো না। কিছুদিন মুনিরের জন্য আমাদের মন খারাপ থাকলেও তা অল্পদিনেই আমরা ভুলে গেলাম। আমরা শুধু জানলাম মুনিরের মা খুবই খারাপ। ভীষণ খারাপ।

এই ঘটনার কয়েক বছর পর এক সন্ধ্যায় পাড়ায় রাষ্ট্র হয়ে গেল মুনিরের মা নাকি একাই ফিরে এসেছে। পাশের পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়েছে। ঐ ঘটনার পর তাকে শুধু তার শ্বশুরবাড়ি নয় মায়ের বাড়ি থেকেও সকল সম্পর্ক ত্যাগ করেছিল। তারপর উনাকে বহুবার দেখেছি পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে। ঐতিহ্যবাহী পরিবারের বৌ এবং সন্তান হওয়ার কারণে উনার যে সাজ-সজ্জা-আভিজাত্য ছিল সেসবের আর বালাই নেই। সেই অপরূপ সুন্দরী মহিলা এই কয়েক বছরেই যেন বেশ বয়স্ক হয়ে গেছেন। মলিন হয়ে যাওয়া বেগুনি রঙের একটা বোরকা পরে পাড়ার বিভিন্ন প্রভাবশালীদের কাছে ধন্যা দিতেন। মুনিরের বাবার কাছে তিনি আবার ফিরে যেতে চান। না হলে নিজের পরিবারে ফিরতে চান।

কিন্তু সেই দুই পরিবার বংশীয় গৌরব রক্ষার্থে কোনোভাবেই তাকে গ্রহণে রাজি না। তিনি তার সন্তানদের এক ঝলক দেখবার জন্য তাদের স্কুলের দরজায় দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকতেন আর কাঁদতেন। কিন্তু তাদের দেখা পেতেন না। পাড়ার বিভিন্ন দোকানের সামনে বাকিতে জিনিসপত্র নেয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন। কিছুদিন পর বাংলা সিনেমার মতো পাশের পাড়ার একটা টেইলার শপে সেলাইয়ের কাজ নিলেন। তবে তিনি চিত্রনাইকা সাবানার মতো কয়েকদিনের ভেতর বড় ইন্ড্রাস্ট্রির মালিক হতে পারেন নি। পারেন নি শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী হয়ে সকল কিছুর প্রতিবাদ করতে-প্রতিশোধ নিতে। পথে দেখা হলে দৌঁড়ে এসে বলতেন তোমার সাথে কি মুনিরের দেখা হয়? আমার কথা বলে? বলেই হাউমাউ করে কাঁদতেন।

বড়দের মতো আমরাও তাকে সহ্য করতে পারতাম না। আমরা সবাই জানতাম তিনি অতি খারাপ। এভাবে বললে ভালো, আমাদের জানানো হয়েছিল তিনি খুবই খারাপ মানুষ। এই মহিলার জন্য মুনির আর আসে না এই পাড়ায়; তারজন্যও একটা খারাপ লাগা ছিল। কিন্তু তারপরও যখন মহিলা হাউমাউ করে কাঁদতেন তখন আমারো কান্না পেত। খুব কান্না পেত। অনেক সময়ই একা একা ভেবেছি আচ্ছা খারাপ মানুষের জন্য কি খারাপ লাগা উচিৎ? কি জানি! আমি সেই সব হিসেব মিলাতে পারিনি সেই বয়সে। মানুষ কি একই সাথে খারাপ এবং ভালো হতে পারে? নাকি খারাপ মানুষ সবসময়ই খারাপ? আর ভালো মানুষ সব সময়ই ভালো?

মা দূর্গার প্রতিমা দেখে তার হাত গুণতে গুণতে এক পুজারীকে প্রশ্ন করেছিলাম, আচ্ছা এইরকম ভয়ঙ্কর রক্তহিম করা একটা হত্যাযজ্ঞের মাঝে মা সন্তাদের নিয়ে আসেন কেনো? বাপের বাড়ি সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে আসবেন খুশিতে গদগদ হয়ে; এইরকম অস্ত্রপাতি নিয়ে আসেন কেনো? পূজারী ভদ্রলোক আমাকে চেনেন তাই হয়তো রেগে না গিয়ে হেসে দিয়েছিলেন। হাতের বইখানা ভাঁজ করে রেখে বলেছিলেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময় থেকে মায়ের মণ্ডপে তাঁর পরিবার যুক্ত হয়েছে। আগে এভাবে মায়ের পূজা হতো না। আর মায়ের অসুর বধের দৃশ্যের কথা বলছ? সেতো মন্দকে দমন। মন্দকে দমন করতে হয়, নইলে তো মন্দ পুরো সংসারকে গ্রাস করে নেবে।

তাছাড়া মায়ের তো অনেক রূপ। যখন জগৎ-সংসারে যা প্রয়োজন মা সেই রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। তখন অসুরকে বদ করার প্রয়োজন হয়েছিল তাই মা এই রূপ ধারণ করেছিল। দুর্গার আরেক নাম দশভুজা। অবশ্য এই সব রূপকের মাঝে আরো অন্তনির্হিত অর্থ আছে। এই যেমন দশ হাত হলো পাঁচ-পাঁচ দশ ইন্দ্রিয়, প্রতি হাতে যে অস্ত্র আছে, প্রত্যেকের যে বাহন আছে আসলে সকল খুঁটিনাটিরই গভীর অর্থ আছে। এসব বুঝবার বয়স হয়নি তোমার।

কথা সত্য। আমি সেসব তখন কিছুই বুঝিনি। শুধু এটুকু বুঝেছিলাম মায়ের অনেকরূপ। যখন যা প্রয়োজন তখন তিনি সেই রূপে আবির্ভুত হন। মা সর্বরূপেই পুজার যোগ্য। ভগবান প্রতিগৃহে যেতে পারেন না বলে প্রতি ঘরে মা পাঠিয়েছেন; যেন ভগবানের কমতি কখনো কেউ অনুভব না করে।

মুনিরের মাকে দেখে আমি এই কথাগুলো জ্যামিতির উপপাদ্যের মতো মিলিয়ে দেখবার চেষ্টা করতাম; যখন আমি আরো বড় হয়ে উঠছিলাম। তখন মুনিরের মা অন্য মানুষ। তিনি শক্ত পাথরের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। রাস্তার পাশের দোকানটায় সারাদিন বসে সেলাই মেশিন চালাতেন। ছোটবেলায় যে মহিলাকে দেখতাম পুত্রের স্কুলে আনা-নেওয়ার জন্য যে পরিমাণ সাজগোজ করে আসতেন। সেই মহিলায় কিছু বছরের ব্যবধানে পান খেয়ে রাস্তার উপর পিক ফেলছেন। কাছা বেঁধে রাস্তার মানুষের সাথে ঝগড়া কারছেন। গালাগালি করছেন।

এক মানুষের ভেতরের এই পাল্টে পাল্টে যাওয়া মানুষগুলোকে দূর থেকে দেখতে বেশ লাগে। এক মানুষের ভেতরে কত মানুষ বাস করে; তাই না? আচ্ছা আমরা কি নিজের পাল্টে যাওয়াগুলো টের পাই? এই যে সময়ের ব্যবধানে আমরা পাল্টাই। পরিবেশ-প্রতিবেশ-মানুষের সাথে মিশবার জন্য এই যে আমরা প্রতিনিয়ত পাল্টাই। তার পেছনে প্রকৃতির যে একটা খেলা আছে… একটা লীলা আছে… তা কি সকলে টের পাই? নাকি টের পেয়েও না পাওয়ার অভিনয় করি? আসলে এই ভাঁজে ভাঁজে নিজেকে খুলে দেখতে পারার নামই ‘সাধন’। আর নিজেকে পাল্টে পাল্টে গুরু-মুর্শিদের রূপে নিজেকে মিলিয়ে নেয়ার তপস্যাই ‘ভজন’। সাঁইজি বলছেন-

সামান্যে কি তার মর্ম জানা যায়।
হৃদকমলে ভাব দাঁড়ালে
অজান খবর আপনি হয়।।

দুগ্ধে জলে মিশাইলে
বেছে খায় রাজহংস হলে,
কারো সাধ যদি হয় সাধন বলে
হয় সে রাজহংসের ন্যায়।।

মানুষে মানুষের বিহার
মানুষ ভজলে দৃষ্ট হয় তার,
সে কি বেড়ায় দেশ দেশান্তর
পীড়েই পেড়োর খবর পায়।।

পাথরেতে অগ্নি থাকে
বের করতে হয় ঠুকনি ঠুকে,
দরবেশ সিরাজ সাঁই দেয় তেমনি শিক্ষে
লালন ভেঁড়ো সং নাচায়।।

লালন মতে বলে, গুরু হচ্ছে সেই সত্য। যার সামনে দাঁড়ালে আর আয়নার প্রয়োজন হয় না। নিজেকে দেখবার চোখ খুলে যায়। তবে একটা শর্ত আছে, তা হলো শুদ্ধ মন চাই। শুদ্ধ মন না হলে সেই আয়নায় দেখা মিলবে না নিজকে। এই শুদ্ধ মন তো একদিনে হয় না। মন শুদ্ধ করতেই তো এতো আয়োজন। এতো সাধনা।

আর ভাববাদী দর্শনে এই সাধনার শুরু হয় গুরুর হাত ধরে। গুরুর কাছে আত্মসমপর্ণের মধ্য দিয়েই এই যাত্রার সূচনা। সাধারণভাবে ‘গুরু’ শব্দটা শুনলেই মনের মাঝে যেমন একটা ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ বা রাশভারী চরিত্রের কথা স্মরণ হয়। লালন ঘরের গুরু দর্শন করলে তেমন ধারণা পাল্টে যাবে নিমিষেই। তাদের সহজাত প্রবৃত্তি মুর্হূতেই আকৃষ্ট করে নেয়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে হয় তাদের সারল্য। সহজ মানুষের যে প্রতিচ্ছবি তাদের মাঝে দৃশ্যমান হয় তাতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। তেমনি একজন সাধুগুরুর নাম সাত্তার ফকির।

সাত্তার ফকিরের কথা একদিনে বলে শেষ করবার পথ নেই। তাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাতেই প্রেম না হয়ে উপায় নেই। ছোটখাটো মানুষটার সর্ব অঙ্গে প্রেম। এক গাল হাসি দিয়েই শুরু করে দেন গান। সেবার কুষ্টিয়াতেই ছিলাম তাই সাত্তার ফকির ছাড়বার পাত্র নন। তাঁর বাড়িতে সাধুসঙ্গে যেতেই হবে।

অগত্যা ঢাকায় ফিরে আসার পরিকল্পনা বাতিল করে আরেক প্রস্থ ঘুমিয়ে নেয়াই শ্রেয় মনে হলো। পরদিন বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছি। সুমন দাস বাউল তখনো ঘুমে। সুধাম সাধু প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে যাবে বলে। কি আর করা সুমন দাসকে রেখেই দুপুরের সেবা নিয়ে আমি আর সুধাম সাধু রওনা হয়ে গেলাম সাত্তার ফকিরের বাড়ি।

সাত্তার ফকির নি:স্ব মানুষ। যা কিছু ছিল সবই ভক্তদের নামে দিয়ে ফকির হয়েছেন। বাড়ির আঙ্গিনায় শামিয়ানা টানিয়ে আয়োজন করেছেন সাধুসঙ্গের। আর্থিক টানাটানি থাকলেও সাত্তার ফকিরের প্রেমে ঘাটতি নেই। বাড়িশুদ্ধ মানুষ থৈ থৈ করছে। অনেক পরিচিত মুখেরও দেখা পাওয়া গেলো। সত্যি সত্যি চলে এসেছি দেখে সাত্তার ফকির মহা খুশিতে আলিঙ্গন করে বরণ করে নিলো। এ ভালোবাসা এক জনমের না। জন্মজন্মান্তরের ভালোবাসা।

সাধুগুরুভক্তঅনুসারীরা আসতে শুরু করেছে। তবে তখনো হাতে অনেকটা সময় আছে সাধুসঙ্গ শুরুর। সাত্তার ফকির বললো, যাও বাপু! একটু ঘুরেফিরে দেখো। এই পথে একটা মাজার আছে সেখান থেকে ঘুরে আসো। বাড়ির পেছনের গ্রামীণ পথটা দেখিয়ে যখন সাত্তার ফকির চলে গেলো। তখন ভাবছি একা একা এই অন্ধকারে কি চিনে সেখানে যেতে পারব? তখন কে যেন পাশ থেকে অভয় দিয়ে বললো, যান যান সোজা চইল্যা যান। এই পথেই মাজার।

আমিও অন্ধকার পথ ধরে বাড়ি-ঘর পেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। ঝোপঝাড় পেরিয়ে যখন একটা সমতল জায়গায় পৌঁছালাম তখন খেয়াল করলাম সেটা একটা আম বাগান। আম বাগানের ঠিক মাঝে ছোট্ট একটা আধা পাকা ইমারত। আর তার সামনে একটা মোমবাতি জ্বলছে। সারাদিনের যে উত্তেজনা, যে দৌঁড়ঝাপ, জীবনের টাপপোড়ান, পাওয়া-না পাওয়া, কত হিসেব-কিতাব সব জানি কোথায় হারিয়ে গেল।

ছোট্ট এই যৌলুসহীন মাজারটা আমাকে এমন একটা বাস্তবতার মাঝে এনে দাঁড় করিয়েছে যা ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল। মাজারটার কাছে হঠাৎ করেই যেন সমস্ত কোলাহল থেমে গেছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে দিকব্দিক ছোটাছুটি সবই যেন নিষ্ফল এখানে। আমি এই মাজারটার কাছে এসে দাঁড়িয়েছি নাকি মাজারটাই আমাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে সেটা আমি তক্ষুণি বুঝতে পারি নি। তবে মাজারের ভেতরের টিমটিমে আলোতে গিলাপে ঢাকা সমাধিটা দেখে কেনো যেন মনটা ভালো হয়ে গেল। জন্মজন্মান্তরের সৌভাগ্য না হলে এমন একটা শান্তিময় জায়গায় কয়জনে এমন নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকতে পারে?

আম বাগানের সুনশান নিরবতায় এই সমাধিতে কে ঘুমিয়ে আছেন? কি তার নাম? কত প্রশ্নই তো মাথায় আসার কথা। কিন্তু আমার মাথায় কেবলই ঘুরছিল মানুষটার জন্মজন্মান্তরের কীর্তি নিয়ে। কি এমন করেছিলেন এই মানুষটা? কিসের ফলস্বরূপ এমন প্রাপ্তি ঘটল? ঘুরে ঘুরে চারপাশটা দেখলাম। মাজার ইমারতটা নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। হয়তো মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে। সাধকের নাম-ধাম লেখা নেই কোথাও। লোকালয় থেকেও অনেকটা দূরে। কিন্তু সন্ধ্যাবাতি জ্বলছে ঠিকই। মোমবাতিটার দিকে দ্বিতীয়বার তাকাতেই তরিৎ গতিতে রশিদ সরকারের গানের লাইন কয়েকটা মনে পরে গেলো-

“পাগল মরলে বাত্তি জ্বলে
মুন্সী মরলে জ্বলেনা,
এই মানুষে আল্লাহ থাকে
কানার দলে দেখে না।”

জন্মজন্মান্তরের কীর্তি না থাকলে দেহত্যাগের পর এই সম্মান কয়জনে পায়। কয়জনের সমাধিতে বাতি জ্বলে? কয়জন এমন নাম-ধাম-গোত্র ধুয়ে ফেললেও মানুষের মমতাতেই বাঁচে জন্মজন্মান্তরে? আযানের শব্দটা মিলিয়ে যাওয়ার পর চারপাশটা আবারো নিরবতায় ডুবে গেল। সাথে আমিও। তারপরই কানে আসতে লাগলো। কাছাকাছি কোথাও কারা দোতারা-জুড়ি-খোল বাজিয়ে গান করছে। গানের সুর ধরে এগিয়ে যেতেই ছোট্ট বারান্দা যুক্ত ঘরখানা চোখে পরল। টিমটিমে আলোতে গুটিকয়েক মানুষ বসে গান করছেন-

প্রেম পাথারে যে সাঁতারে
তার মরণের ভয় কি আছে,
স্বরূপ মরণে সদা
মত্ত যারা ঐ কাজে।।

শুদ্ধ প্রেম রসিকের ধর্ম
মানে না বেদ বিধির কর্ম,
রসরাজ রসিকের মর্ম
রসিক বৈ আর কে জেনেছে।।

শব্দ স্পর্শ রূপ রস গন্ধ
এই পঞ্চে হয় নিত্যানন্দ,
যার অন্তরে সদানন্দ
নিরানন্দ জানে না সে।।

পাগল পায় পাগলের পারা
দুই নয়নে বহে ধারা,
যেন সুর ধ্বনির ধারা
লালন কয় ধারায় ধারা মিশে আছে।।

আসলে কে যে কখন কার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। তার হিসেব মেলা ভার। শানসওকতের মাঝেও অনেকেই একা। আবার নি:স্ব কতজনই তো সর্বদা ঘিরে থাকে ভক্তকুলের ভক্তিতে। সেই মানুষটা নাম-যশ-বিষয়-প্রতিপত্তি কিছুই দিতে পারবে না জেনেও ভক্তকুল নতজানু হয় তার কাছে। যে সহজ মানুষ হয় সেই এই সম্মান পায়। দিন-রাত্রির মিলনকালে ভক্তিভরে কেউ জ্বেলে দিয়ে যায় আলো। কেউ বাদ্য বাজিয়ে গান শোনায়।

আসলে পাগলে পাগলের সন্ধান ঠিকই করে নেয়। আর যে প্রেমে পাগল হয় তার জন্য দেশ-কাল-পাত্র-সীমানা কোনো কিছুই বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তাই তো সাধুগুরু বলে- ‘প্রেমিক হও। বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের জ্ঞানকে ধারণ করার অনেক উপায় থাকলেও তুমি প্রেমকেই বেছে নাও। আর যদি তুমি তা করতে পারো তাহলেই বিশ্বভ্রহ্মাণ্ড তোমার কাছে ধরা দেবে। কারণ সে আর কিছুই চায় না প্রেম ছাড়া।’

সে স্বভাবে সৎচিত্তানন্দ। তাই তাকে ধরতে গেলে হতে হয় সৎচিত্তানন্দ অর্থাৎ শুদ্ধ প্রেমের রসিক; সদা আনন্দচিত্ত-প্রফুল্লচিত্ত। আর এই প্রেমের টানেই কেউ ফিরে আসে নীড়ে আবার কেউ হারায় অজানায়। এই প্রেম পাথারে যে ডুবে তার মরণের ভয় থাকে না। আর যে ডুবতে পারে সেই পায় গুরুর চরণ। আর গুরুর অমূল্য চরণ যে পায় তারেই গুরু উদ্ধার করে নিজগুণে। তাই পরিশেষে গুরুর কাছেই প্রার্থনা-

অযতনে ডুবলো ভাড়া
ত্বরাও গুরু নিজগুণে।
আর আমার কেউ নাই
গুরু তুমি বিনে।।

সাধের একখান তরী ছিল
অযতনে বিনাসিল
বান সকল ছাড়িয়া গেল
জল চুয়ায় নিশি দিনে।।

সময়ে গাব দিতাম যদি
বাইতাম ত্বরী জন্মাবধী
আমার এ দেহ ত্বরী
আদরিত মহাজনে।।

ষোলাআনা বোঝাই করে
পাঠাইলেন সাই ঠক বাজারে
ব্যাপার সব চোরে চোরে
সিরাজ সাই কয় অবোধ লালন
রংপুরের দোকান খুললি কেনে।।

(চলবে…)

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

১ Comment

  • উজ্জল , রবিবার নভেম্বর ৩, ২০১৯ @ ৭:১৯ অপরাহ্ন

    জয় গুরু

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!