মতুয়া সংগীত

প্রভু জগন্নাথ এল

শ্রীমদ্রসিক সরকারের উপাখ্যান
পয়ার

প্রভু জগন্নাথ এল ওঢ়াকাঁদি গ্রাম।
ভকত ভনে সদা ভ্রমণ বিশ্রাম।।
বাল্যাদি পৌগণ্ডলীলা সফলাডাঙ্গায়।
কৈশোরে হইল ভক্ত মিলন তথায়।।
ওঢ়াকাঁদি আমভিটা যখন যুবত্ব।
ভক্তসঙ্গে দিবানিশি হরিনামে মত্ত।।
মত্ত রাউৎখামার আদি মল্লকাঁদি।
হেনকালে প্রভুর বসতি ওঢ়াকাঁদি।।
ওঢ়াকাঁদি যবে হল লীলার প্রচার।
সবে কহে ওঢ়াকাঁদি উড়িয়ানগর।।
ওঢ়াকাঁদি ঘৃতকাঁদি আর মাচকাঁদি।
আড়োকাঁদি তিলছড়া আর আড়ুকাঁদি।।
রামদিয়া ফুকুরা নড়া’ল সাধুহাটি।
নারিকেল বাড়ী পরগণে তেলিহাটি।।
সাধুহাটি মাতিল রসিক সরকার।
অলৌকিক কীর্তি তার অতি চমৎকার।।
কলেজেতে পড়িতেন সেই মহামতি।
বয়স তখন প্রায় হ’বে দ্বাবিংশতি।।
প্রথম মুন্‌সেফ হইল বিচারপতি।
তিন দিন চাকরি করিল মহামতি।।
মানসে বিমর্ষ কার্য পরিত্যাগ করি।
ছুটি নেয়া ছলে চলে আসিলেন বাড়ী।।
কায়স্থ কুলেতে উপাধ্যায় সরকার।
তাহার পিতার নাম হয় গঙ্গাধর।।
পিতা হ’ন অসন্তোষ চাকুরী ছাড়ায়।
মহাদুঃখী তার খুল্লতাত মহাশয়।।
খুড়া শ্রীকৃষ্ণমোহন বলে বার বার।
চাকুরী করনা বাপ এ কোন বিচার।।
তিনি জানা’লেন সেই রসিকের মায়।
রসিকের মাতা গিয়া ঠাকুরে জানায়।।
রসিকের কি হ’য়েছে নাহি শুনে কথা।
চাকরী না করে রহে হেট করি মাথা।।
যদি কিছু বলি কহে না করিও ত্যক্ত।
ওঢ়াকাঁদি হরিচাঁদ আমি তার ভক্ত।।
চল প্রভু সাধুহাটি সরকার বাড়ী।
তব বাক্যে যদি বাছা করেন চাকুরী।।
মহাপ্রভু উত্তরিল সাধুহাটি গ্রাম।
রসিক প্রভুর পদে করিল প্রণাম।।
ঠাকুর বলেন বাছা বলত’ আমায়।
চাকুরী করনা কেন বলে তব মায়।।
রসিক বলেন পদে নিবেদন করি।
আর না করিব আমি পাপের কাছারী।।
আমা হতে হবে না সূক্ষ্ম সুবিচার।
অপরাধী হ’ব ল’য়ে বিচারের ভার।।
কোন অসতের বাক্যে সতেরে মারিব।
নির্দোষীকে দোষী, দোষী নির্দোষী করিব।।
দারোগার বংশ নাই অত্যাচার জন্য।
বিচারে মুন্‌সেফী কার্য সেইরূপ গণ্য।।
তাই বুঝে ছুটি লই আর নাহি যাই।
ধন দিয়া কি করিব তোমা যদি পাই।।
পিতা মাতা খুড়া বলে চাকুরী করিতে।
ধন কি নিধন-কালে যাইবে সঙ্গেতে।।
পড়ে র’বে ধন জন কি দালান কোঠা।
চুল গাছ সঙ্গে নিতে পারে কোন বেটা।।
কেবা মাতা কেবা পিতা কিসের চাকুরী।
কিবা রাজ্য কিবা ভার্যা দিন দুই চারি।।
আপনি বলেন যদি চাকুরী করিতে।
পাপ পুণ্য নাহি জানি যাই চাকুরীতে।।
ঠাকুরের সঙ্গে ছিল মহেশ ব্যাপারী।
বলিলেন রসিকেরে দণ্ডবৎ করি।।
রসিক বলিল মোরে প্রণমিলে কেনে।
প্রণামের স্থান আছে দেখনা নয়নে।।
যশোমন্ত সুত হরিচাঁদ জগন্নাথ।
বর্তমানে সে চরণ কর প্রণিপাত।।
মহেশ বলিল হেন স্থান যে দেখায়।
তার পদে দণ্ডবৎ আগে হ’তে হয়।।
ঠাকুর বলেন শুন রসিকের মাতা।
তোমার এ ছেলে না শুনিবে কারু কথা।।
তোমার গর্ভেতে জন্ম এ মহাপুরুষ।
অনুমানে বুঝি হবে ত্রেতার মানুষ।।
রসিক গেলেন জয়পুর রাজধানী।
ভেটিতে গেলেন জয়পুর নরমণি।।
ধর্ম শাস্ত্র আলাপ রাজার সঙ্গে করে।
রাজা করে সবিনয় রসিকের তরে।।
পড়েছি বিপদে বড় গৌরাঙ্গ লইয়া।
পণ্ডিতেরা নাহি মানে স্বয়ং বলিয়া।।
রসিক বলেন আমি বিচার করিব।
গৌরাঙ্গকে স্বয়ং বলিয়া মানাইব।।
সভা হ’ল নবদ্বীপ পণ্ডিতের দলে।
শাক্ত শৈব বৈষ্ণবেরা এল দলে দলে।।
শান্তিপুর উলাকাশী নদীয়া দ্রাবিড়।
যেখানে যেখানে ছিল পণ্ডিত সুধীর।।
সপ্তাহ পর্যন্ত সভা হয় প্রতি মাস।
এইরূপে বিচার হইল ছয় মাস।।
বনবাসী পরমহংস এসেছিল যারা।
সুবিচারে পরাজয় হইলেন তারা।।
ছয় মাস পরে সভা শেষ সুবিচার।
স্বয়ং বলিয়া তারা করিল স্বীকার।।
পরমহংসরা বলে কাল্‌কে আসিব।
গৌরাঙ্গে স্বয়ং বলে স্বীকার করিব।।
আর যত প্রতিপক্ষ স্বীকার করিল।
স্বীকার করিয়া তারা ভকত হইল।।
পরমহংসরা আর না আসিল ফিরে।
এ দিকেতে জয়ডঙ্কা বাজে জয়পুরে।।
বৈষ্ণবেরা সবে জয় জয় ধ্বনি করে।
জয় গৌর স্বয়ং গৌর বলে উচ্চৈঃস্বরে।।
সবে মিলে বলেন গৌরাঙ্গ জয় জয়।
জয় শ্রীগৌরাঙ্গ জয় রসিকের জয়।।
জয়পুরে রাজা করে জয় জয় ধ্বনি।
রামাগণে বামাস্বরে করে হুলুধ্বনি।।
জয়পুর জয় পূর্ণ জয় জয় জয়।
পুষ্প ফেলে মারে কেহ রসিকের গায়।।
বৈষ্ণবেরা রসিকের করিছে কল্যাণ।
রসিকের কণ্ঠে করে পুষ্পমাল্য দান।।
কোন কোন বৃদ্ধা নারী মনের পুলকে।
ধান্য দূর্বা দিতেছেন রসিক মস্তকে।।
রসিক বলেন মম সাধ্য কিছু নয়।
যার কার্য সেই করে তাঁর জয় জয়।।
সেই শ্রীগৌরাঙ্গ মোর এল ওঢ়াকাঁদি।
নমঃশূদ্র কুলে অবতার গুণনিধি।।
যশোমন্ত রূপে জীবে ভক্তি শিখাইল।
জয় হরিচাঁদ জয় সবে মিলে বল।।
গৌরাঙ্গ স্বয়ং বলি মীমাংসা হইল।
রসিকের সভাজয় তারক রচিল।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!