ফকির জাফর মস্তান

ফকির জাফর মস্তান

-মুনির মীর

মানবতাবাদী শ্রেষ্ঠ সাধক ফকির লালন সাঁইজি ও আল-চিশতী তরিকার অনুসারী ফকির জাফর মস্তান মানুষের কল্যাণে সাঁইজি লালন ফকিরের বাণী বুকে-মুখে ধারণ করে কুষ্টিয়া জেলাসহ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন ও তীর্থে তীর্থে মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন।

ফকির জাফর মস্তান কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্র আড়ুয়াপাড়ায় প্রায় ৭২ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা নূর আহম্মদ একজন ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। পিতা-মাতার চার পুত্রের মাঝে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তিনি গত ৪ মাঘ ১৪১১ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৭ জানুয়ারি ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে মানব দৃষ্টির আড়ালে চলে যান।

মস্তান বৈবাহিক জীবনে তিন কন্যার জনক। কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউশনে সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি গাছের পরিচর্যার কাজে অর্থাৎ মালী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তার দীর্ঘ কর্মজীবনে।

শিক্ষাগুরু অনেক মতহী হলেও তিনি সরিষাবাড়ি থানার জামালপুর জেলার আজিত মাওলানা সাহেবের পুত্র ফকির আব্দুল করিম শাহের কাছে বায়াত গ্রহণ করেন এবং তার প্রদত্ত শিক্ষাদীক্ষা অনুযায়ী জীবনযাপন করতে থাকেন। ফকির আব্দুল করিম শাহ্ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ওফাত হন। তিনি প্রায় ১১০ বছর ইহজগতে নিজের মধ্যে স্রষ্টাকে খুঁজে ফেরেন। তিনিও লালন ফকির ও আল-চিশতী তরিকার অনুসারী ছিলেন।

ফকির জাফর মস্তান ১৯৮৫ সালের দিকে তাঁর দীক্ষাগুরু ফকির আব্দুল করিম শাহের কাছ থেকে খিলাফত প্রাপ্ত হন। ফকির আব্দুল করিম শাহের গুরু ছিলেন বিল্লাল ফকির। তিনি ভারতের নদীয়া জেলার মানুষ ছিলেন; সেখানেই তার ওফাত হয়।

ফকির লালন সাঁইজির আখড়াবাড়ি ছেঁউড়িয়া, কুমারখালী, কুষ্টিয়ায় অর্থাৎ লালন সাঁইজির ধামে মাজার প্রাঙ্গনে বহু পূর্ব থেকে ‘লালন ধ্যানযজ্ঞ’ নামে একটি আসনে ফকির জাফর মস্তান বসে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তাঁর অনুসারীরা সেখানে মহতীর সাথে অবস্থান করতেন।

সেখানে ত্রিশুল, পাঁচ পাঞ্জাতন, ধুপ, মাটির তৈরি গম্বুজ ইত্যাদি দ্বারা আসন তৈরি করতেন। তিনিও তাঁর অনুসারীরা লাল কাপড় পরিধান করেন। এখনও তাঁর সেই ধ্যানযজ্ঞ আসন পরিচালিত করে আসছে তারই ভক্তছেলে বাউল ফকির রবিউল ইসলাম।

রবিউল ইসলাম জাফর মস্তানের উত্তরসুরী হিসেবে আজও সাঁইজির ধামে সেই ধ্যানযজ্ঞ আসন পরিচালনা করে আসছেন। ফকির রবিউল জামালপুর জেলার মানুষ। সৃষ্টির কল্যাণে স্রষ্টার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে যেয়ে বাউল ফকির জাফর মস্তান বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যাদি করেছেন।

তারমধ্যে বটগাছ, ফুলের গাছ, বনজ গাছ ইত্যাদি লালন সাঁইজির মাজার প্রাঙ্গনসহ বিভিন্ন তীর্থ স্থানে রোপন করেন। তিনি তাঁর জীবনের অনেক সময় কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়া বাবা নফর সাঁইজির মাজারে কাটিয়েছেন।

মস্তানের উল্লেখযোগ্য কিছু কাজের মধ্যে সিন্দুক ও লোহার গ্রাফি তথা মোটা ছিকল নিয়ে অবস্থান। লালন সাঁইজির মাজারে এবং বাবা নফর সাঁইজির মাজারে সিন্দুক প্রদান, বাবা একদিল শাহে গ্রাফি ও সিন্দুক প্রদানসহ বিভিন্ন পবিত্র স্থানে তিনি লোহার সিন্দুক প্রদান করেন। সিন্দুকগুলো জাফর মস্তান ওনার গুরুর কাছ থেকে সংগ্রহ করেন বলে জানা যায়।

ফকির জাফর মস্তান নিজের মধ্যে স্রষ্টাকে খুঁজতে যেয়ে নিজ জন্মভূমি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের কলকাতা, আসাম, বিহার, দিল্লি, নিজামউদ্দিন, আজমীর শরিফ ১৩ বার গমন সহ বিভিন্ন তীর্থ স্থানে গমন করেন বলে তার ভক্তকুলের কাছ থেকে জানা যায়।

লালন সাঁইজির বাণী- ‘হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান জাতিগোত্র নাহি রবে। এমন মানব সমাজ করে গো সৃজন হবে।’ এই বাণীকে সামনে রেখে জাফর মস্তানের ওফাত দিবস ৪ মাঘ তারিখে ফকির লালন সাঁইজির ধামে সাধুসঙ্গের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আয়োজন করা হয়। তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠান চলে। ২য়দিন পূর্ণ সেবা দেয়া হয়। ভক্ত আশেকানরা সেখানে অবস্থান করে আধ্যাত্মিক আলোচনায় মগ্ন থাকেন।

ফকির জাফর মস্তান লাল পোশাক পরিধান করতেন। যাকে শহিদি পোশাকও বলা হয়। আসলা ঝোলা খেলকা নিয়ে ছিলেন। তিনি ‘ধ্যানযজ্ঞ’ আসনে ২৫টি মাটির গম্বুজ তৈরি করতেন। শাঁহের বাণী প্রচার করতেন। তিনি বাক্যসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তাকে জাগ্রত দিনদান বলা হতো। ওফাতের পর কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে তার ইচ্ছা অনুযায়ী সমাহিত করা হয়।

……………………………………………..
স্থিরচিত্র : ভবঘুরে : রবিউল বাউল ফকির জাফর সাঁইজির আস্তানায়

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!