ভবঘুরেকথা
ফকির লালন শাহ্

ফকির লালনের বাণী : প্রবর্তদেশ

৯০১.
শতকোটি গোপী সঙ্গে
কৃষ্ণপ্রেম রসরঙ্গে
সে যে টলের কার্য নয়;
অটল না বলয়
সে আর কেমন।

৯০২.
রাধাতে যে ভাব কৃষ্ণ
জানে না তা গোপীগণ
সে ভাব না জেনে।

৯০৩.
শম্ভুরসের উপাসনা
না জানিলে রসিক হয় না।

৯০৪.
লালন বলে সে যে;
নিগূঢ় করণ ব্রজে
অকৈতব ধন।

৯০৫.
জগৎ মুক্তিতে ভোলালেন সাঁই,
ভক্তি দাও হে যাতে চরণ পাই।

৯০৬.
ভক্তিপদ বঞ্চিত করে
মুক্তিপদ দিচ্ছো সবারে,
যাতে জীব ব্রহ্মাণ্ডে ঘোরে
কাণ্ড তোমার দেখি তাই।

৯০৭.
রাঙ্গা চরণ দেখবো বলে
বাঞ্ছা সদাই হৃৎকমলে।

৯০৮.
তোমার নামের মিঠায় মন মজেছে
রূপ কেমন তাই দেখতে চাই।

৯০৯.
চরণের যোগ্য মন নয়
তথাপি মন ঐ চরণ চায়।

৯১০.
ফকির লালন বলে হে দয়াময়
দয়া করো আজ আমায়।

৯১১.
আগে গুরুরতি কর সাধনা।
ভববন্ধন কেটে যাবে আসা-যাওয়া রবে না।

৯১২.
প্রবর্তের গুরু চেন পঞ্চতত্ত্বের খবর জান
নামে রুচি হলে জীবনে কেন দয়া হবে না।

৯১৩.
প্রবর্তের কাজ না সারিতে চাও যদি মন সাধু হতে
ঠেকবি যেয়ে মেয়র হাতে লম্ফতে আর সারবে না।

৯১৪.
প্রবর্তের কাজ আগে সার মেয়ে হয়ে মেয়ে ধর
সাধনদেশে নিশান গাড় রবে ষোলআনা।

৯১৫.
রেখ শ্রীগুরুতে নিষ্ঠারতি ভজনপথে রেখ মতি
আঁধার ঘরে জ্বলবে বাতি অন্ধকার রবে না।

৯১৬.
মেয়ে হয়ে মেয়ের বেশে ভক্তিসাধন কর বসে
আদি চন্দ্র রাখ কষে কখনো তারে ছেড় না।

৯১৭.
ডোব গিয়ে প্রেমানন্দে সুধা পাবে দণ্ডে দণ্ডে
লালন কয় জীবের পাপ খন্ডে আমার মুক্তি হলো না।

৯১৮.
অবোধ মনরে তোর হলো না দিশে।
এবার মানুষের করণ হবে কিসে।

৯১৯.
কোনদিন আসবে যমের চেলা
ভেঙে যাবে ভবের খেলা,
সেদিন হিসাব দিতে বিষম জ্বালা
ঘটবে শেষে।

৯২০.
উজান-ভেটেন দুটি পথ
ভক্তিমুক্তির করণ সেতো,
ওরে তাতে যায় না জরামৃত্যু
যমের ঘর সে।

৯২১.
যে পরশে পরশ হবি
সে করণ আর কবে করবি,
দরবেশ সিরাজ সাঁই কয় লালন র’লি
ফাঁকে বসে।

৯২২.
মন তুমি গুরুর চরণ ভুলো না।
গুরু বিনে এ ভুবনে
পারে যাওয়া যাবে না।

৯২৩.
পারে লয়ে যাবে যাহা
ঠিক রাখো ষোলআনা,
সে পারের সম্বল না থাকিলে
পাটনী পার করবে না।

৯২৪.
হক্কের উপরে থাকবে যখন
লাহুত মোকাম চিনবে তখন,
এই সত্য জেনেও মন
মন মানুষ তুমি ধরলে না।

৯২৫.
পরের সম্বল লাগবে না
এমন পাগল আর দেখি না,
ফকির লালন বলে মন রসনা
করো গুরুর বন্দনা।

৯২৬.
গুরুপদে নিষ্ঠা মন যার হবে।
যাবে তার সব অসুসার
অমূল্য ধন হাতে সেই পাবে।

৯২৭.
গুরু যার হয় কাণ্ডারী
চলে তার অচল তরী,
ভবে তুফান বলে ভয় কি তারি
নেচে গেয়ে ভবপারে যাবে।

৯২৮.
আগমে নিগমে এই কয়
গুরুরূপ দ্বীন দয়াময়,
অসময়ে সখা সে হয়
অধীন হয়ে যে তারে ভজিবে।

৯২৯.
গুরুকে মনুষ্য জ্ঞান যার
অধঃপতে গতি হয় তার,
লালন বলে তাই আজ আমার
ঘুটলো বুঝি মনের কু-স্বভাবে ।

৯৩০.
গুরুকে ভজনা করো মন ভ্রান্ত হয়ো না।
সদায় থেকো সচেতননে অচেতনে ঘুমাইও না।

৯৩১.
ব্যাধে যখন পাখি ধরতে যায়, নয়ন তার উর্ধ্ব পানে রয়
এক নিরিখে চেয়ে থাকে পলক না ফিরার,
আঁখি নড়লে পাখি যাবে
নয়নে পলক মেরো না।

৯৩২.
ছিদ্র কুম্ভে জল আনিতে যায়, তাতে জল কি মতে রয়
আসা যাওয়ায় দেরি হলে পিপাসায় প্রাণ যায়,
মন তোর আসা যাওয়ায় দিন ফুরালো
গুরুমতি ঠিক হলো না।

৯৩৩.
নারকেলে জলের সঞ্চার তার কি আচার কি বাহার
ওসে রসে পরিপূর্ণ দেখতে চমৎকার,
গোপনে গোপীকা ভজন যার সেই জানে মর্মসার
লালন কয় মন দেহের খবর নিলে না।

৯৩৪.
খোদা বিনে কেউ নাই সংসারে।
এ মহাপাপের দায় কে উদ্ধার করে।

৯৩৫.
এ জগৎ মাঝে
যতোজন আছে,
তারা সবে দোষী হবে
নিজ পাপ ভরে।

৯৩৬.
পিতামাতা আশা
যতো ভালবাসা,
তারা আমার পাপের ভার
নিতে নাহি পারে।

৯৩৭.
ওরে আমার মন
করো তাঁহার অন্বেষণ,
লালন বলে যিনি তোমার
ভার নেয় শিরোপরে।

৯৩৮.
ভবপারে যাবি কিরে গুরুর চরণ স্মরণ কর আগে।
পিতৃধন তোর নিল চোরে পারে যাবি কোন রাগে।

৯৩৯.
আছে ঘাটে যার রাজা সেই তো তার প্রজা
কর সাব্যস্ত করে আগে সাজাও গে ডিঙ্গে,
নইলে পড়বে ধোকা সারবে দফা
মৃনালের দুইভাগে।

৯৪০.
আগে মৃণালের কোণে ভেবে দেখ নয়নে
ধনীর ভাড়া যাচ্ছে মারা পড়ে সেই ভাগে,
কত নায়ের মাঝি হারায়ে পুজি
কলকলে নদীর ঘোরপাকে।

৯৪১.
সিরাজ সাঁই বলেরে লালন, স্বরূপ রূপে দিলে নয়ন
পার হয়ে যাবি তখন ভেগে পলাবে শমন,
পারবিনে সাধন বিনে সেই ত্রিপিনে
ভূগি মনে ভবের ভোগে।

৯৪২.
নাই সফিনায় নাই খোদা সিনায় দেখ বর্তমান।
রূপ না দেখে সেজদা দিলে দলিলেতে কয় হারাম।

৯৪৩.
বরযখ ব্যতিত সেজদা কবুল করে না খোদা
সকলি হবে বে-ফায়দা বেজার হবে সোবহান
রুপ না দেখে বসে কুপে কারে ডাক মোমিন চাঁদ।

৯৪৪.
আল হামদু কুলহু আল্লাহ এই দেহেতে আছে মিলা
আত্বাহিয়াতু আত্বায় আল্লা? তিনে দেহ বর্তমান
মানব দেহে বিরাজ করে খোদ খোদা সোবহান।

৯৪৫.
লাহুত লাসুত জবরুত মালকুত,তার উপরে আছে হাহুত.
কোরানে রয়েছে সাবুদ,পড়ে করো অভিধান
নয় দরজা তালা মেরে বরযোখের করো ছুরান।

৯৪৬.
স্বরুপ যাবে বলে, মুর্শিদের দয়া হলে
জবরুতের পর্দা খুলে যাবে দেখায় সেরুপ বর্তমান
সিরাজ সাঁই বলেরে লালন, আর কবে তোর হবে জ্ঞান।

৯৪৭.
মনে না দেখলে লেহাজ করে
মুখে পড়লে কী হয়,
মনের ঘোরে কেশের আড়ে
পাহাড় লুকায়।

৯৪৮.
আহামদ নামে দেখি
মিম হরফটি
নফি দেখায়;
ওরে মিম গেলে সে কি হয়
দেখ পড়িয়ে সবাই।

৯৪৯.
আহাদ আহামদ
এক লায়েক সে
মর্ম পায়;
আকার ছেড়ে নিরাকার
সেজদা কে দেয়।

৯৫০.
জানতে ভজন কথা
তাইতে খোদা
ওলিরূপ হয়;
লালন গেলো ধূলায় পড়ে
দাহরিয়ার ন্যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!