শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সতেরো

প্রাণের বিনিময়েও নামের সেবা

স্নানান্তে শ্রীশ্রীবাবামণি দীক্ষা দিতে বসিলেন। দীক্ষান্তে শ্রীশ্রীবাবামণি উপদেশ দিলেন,-

প্রাণকে সবাই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক ভালবাসে এবং প্রাণাত্যয়কে সর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ক্ষতি ব’লে মনে করে। কিন্তু এই প্রাণের চেয়েও যেন প্রিয় হয় তোমাদের নিকটে তোমাদের দীক্ষাপ্রাপ্ত নাম। দীক্ষাকে শুধু একটা লোক-দেখান আড়ম্বর ব’লেই মনে ক’রো না।

প্রাণের অধিক প্রিয় জ্ঞান ক’রেও যে নামেরই সেবা তুমি কর্ বে, সেই সঙ্কল্পকে সর্ব্বস্বের বিনিময়ে গ্রহণের নামই দীক্ষা। তোমার প্রাণকে তুমি নামের সেবায় অনুক্ষণ নিয়োজিত রাখ। তোমার প্রানধারণের এইটীই সব চেয়ে বড় সার্থকতা।

শান্তির বারতা দ্বিতীয় খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৩৭ -৩৮)

কি কাজ করি

প্রশ্ন হইল,-কি কাজ আপনি করেন?

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

যে কাজটী তোমাদের শহরে শুরু করেছি। যে তরুণকে দেখি, যে কিশোরকে দেখি, আদর ক’রে কাছে টেনে নিয়ে বলি পবিত্র হও, কারণ পবিত্রতাই পূর্ণতা; নির্লোভ হও, কারণ, নির্লোভতাই ঋষিত্ব; স্বাবলম্বী হও, কারণ স্বাবলম্বনই শক্তিমানের পরিচয়-পত্র ; ঈশ্বর-বিশ্বাসী হও, কারণ ঈশ্বর-বিশ্বাসই দান করে পবিত্রতা, নির্লোভতা ও আত্মপ্রত্যয়।

আমি বলি, যতটুকু পার ঈশ্বর-সাধন কর, যতটুকু পার ব্রহ্মচর্য্য পালন কর, কারণ ঈশ্বর-সাধন দেয় ব্রহ্মচর্য্যের পটুতা, ব্রহ্মচর্য্য দেয় স্মৃতি, ধৃতি, শক্তি ও ঋদ্ধি।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োবিংশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৪৮ – ২৪৯)

ইষ্টমন্ত্রই গুরু

জিজ্ঞাসু প্রশ্ন করিলেন,-

আপনিও ত’ আমাদের অনেককে দীক্ষা দিয়েছেন।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

কিন্তু আমি কি তোদের গুরু? আমি যে তোদের মন্ত্র দিয়েছি, সেই মন্ত্রই তোদের গুরু। অর্থাৎ আমারও যিনি গুরু, তোদেরও তিনিই গুরু। মন্ত্রগুরুকে প্রতিষ্ঠার জন্যই আমি তোদের গুরু।

ধারাবাহিক গুরুবাদের অবসান

প্রশ্নকর্তা বলিলেন,-

আপনার হয়ত এই ভাব থাকতে পারে। কিন্তু আপনার পাঞ্চভৌতিক দেহ যখন থাকবে না, তখন আপনার শিষ্যেরা কি কেউ কেউ সাধনপ্রার্থী লোককে দীক্ষা দেবেন না এবং তারা কি তাদের গুরু হবেন না?

শ্রীশ্রী বাবামণি বলিলেন,-

আমার পরবর্ত্তীরা নূতন নূতন লোককে দীক্ষা দিয়ে সাধনের পথে টেনে আনবেন বৈকি! কিন্তু মন্ত্র দান ক’রেও তাঁরা কারো গুরু হবেন না। মন্ত্রদানকে একটা গুপ্ত ব্যাপার ক’রে রাখাতেই ব্যক্তিগত গুরুবাদ এমন শক্ত হ’য়ে শিকড় গেড়েছে।

মন্ত্রদান একটা প্রকাশ্য ব্যাপার হবে এবং এক সঙ্গে ধর্ম্মর্নিষ্ঠ তিনজন সমসাধক আচার্য্য দীক্ষার্থীকে দীক্ষা দিয়ে মন্ত্ররূপী ব্রহ্মগুরুর শিষ্য ক’রে দেবেন। ধারাবাহিক গুরুবাদ চলবার আর প্রয়োজন নেই, যিনি যাকে দীক্ষা দেবেন, তিনি তাকে ওঙ্কাররূপী সদগুরুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন মাত্র,-

নিজে গুরু হবেন না। এই নিষ্ঠাকে, এই সত্যকে সাধক-জীবনে ব্যাপক দৃঢ়তা দেবার জন্যই আমার গুরুবেশ ধারণ।

অখণ্ড-সংহিতা সপ্তম খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৯১-৯২)

ভগবানকে কি দেখা যায়?

একজন প্রশ্ন করিলেন, ভগবানকে কি দেখা যায়?

শ্রীশ্রী বাবামণি বলিলেন,- নিশ্চয় যায়। এই আমি তোমাকে যেমন দেখ্ ছি, ঠিক্ তেমনি পরিষ্কার এবং সুস্পষ্ট দেখা যায়।

প্রশ্ন।- ভগবান্ দেখ্ তে কিরূপ?

শ্রীশ্রী বাবামণি।-

ভগবানের ত’ নির্দ্দিষ্ট কোনও রূপ নেই! তিনি অনন্ত রূপ, তিনি অপরূপ। তাই, এক এক জন তাঁকে এক এক রকমের দেখে। তিনি বিশ্বরূপ, অর্থাৎ বিশ্ব হয়েছে অনুরূপ যাঁর। মূল রূপটী হচ্ছে তাঁর আর বিশ্বের কোটি কোটি সৃষ্টি বৈচিত্র্য সব হচ্ছে তাঁর ‘অনু’- রূপ, পশ্চাতের রূপ, রূপের বিভামাত্র,রূপের আভাস মাত্র,রূপের কল্পনা মাত্র,রূপের ছায়া মাত্র,রূপের অংশাণুর অংশ মাত্র।

বিশ্বকে দেখে, বিশ্ব-বৈচিত্র্যের মাঝে তাঁর রূপের আভা মাত্র দেখে ভাবুক, প্রেমিক, কবি প্রথমে তাঁর রূপ সম্পর্কে একটা অনুমান ক’রে নিয়েছেন এবং সেই অনুমানকেই নিরপেক্ষ প্রমাণের আসনে বসিয়ে অবিরাম সাধন ক’রে ক’রে তাঁর অত্যাশ্চর্য‌্য আসল রূপটী দর্শন করেছেন।

সেই দর্শনটী এতই আশ্চর্য‌্য,-আশ্চর্য‌্যবৎ পশ‍্যতি কশ্চিদেনং-যে, পরমাত্ম-ধ‍্যান থেকে ব‍্যুণ্থান লাভ ক’রে সংজ্ঞায়-নিম্নভূমিতে নেমে এসে কেউ তার সঠিক বর্ণনা কত্তে পারেন না। মানুষের ভাষা এতই অসম্পূর্ণ যে, বর্ণনার যাঁর ক্ষমতা আছে, তিনিও ভাষার অভাবে চুপ মেরে যান।

এই জন্যই এক এক জনের অনুভূতি এক এক ভাবে জগতে প্রচারিত হয়। তারই জন্যে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে লড়াই লাগে যে, আমরাই একমাত্র সত্যের ধ্বজাধারী, অপরেরা লোক-প্রতারক ও আত্ম-প্রবঞ্চক, ইত্যাদি।

অখণ্ড-সংহিতা চতুর্দ্দশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা ৪৭ – ৪৮)

ভগবৎ-প্রেম ও ভগবৎ-প্রাপ্তির পার্থক্য

একজন প্রশ্ন করিলেন,-

ভগবৎ-প্রেম ও ভগবৎ-প্রাপ্তি জিনিষ দুটীর পার্থক্য কি?

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

প্রেমই প্রাপ্তি, যোগই মিলন। ভগবানকে ভালবাসাই ভগবানকে পাওয়া, ভগবানকে পাওয়াই ভগবানকে ভালবাসা। যাকে না পাওয়া যায়, তাকে ভালবাসা যায় না ; যাকে ভাল না বাসা যায়, তাকে পাওয়া যায় না। যাকে পরিপূর্ণ রূপে ভালবাসা যায়, তাকে পরিপূর্ণরূপে পাওয়া হ’ল ; যাকে পরিপূর্ণরূপে পাওয়া যায়, তাকে পরিপূর্ণরূপে ভালবাসা হ’ল।

তাঁর আর আমার পৃথক্ অস্তিত্বকে কল্পনা ক’রে সুখময় ভাবের আদান-প্রদান-ঘটিত যে দিব্য-অনুভূতি, তার নাম প্রেম ; আর, তাঁর আর আমার পৃথক্ অস্তিত্বকে কল্পনার বাইরে রেখে যে নিত্যসান্নিধ্য ও অভিন্ন-ভাবের যে অনুভূতি, তার নাম প্রাপ্তি। স্বরূপতঃ পার্থক্য কিছুই নেই, যত পার্থক্য মানবীয় ভাষায় আর সম্প্রদায়গত মতামতে।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োদশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৫ – ২৬)

অর্থপিশাচের ধ্যানজপ

অপর একজন যুবকের প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-ধ্যান-জপ চিত্তের প্রশান্ততা আনয়ন করে, আত্মস্বরূপ দর্শনের পথ প্রশস্ত করে। কিন্তু অর্থপিশাচের কখনো ধ্যানজপ সফল হয় না। নিজের নাড়ীকে যে টাকার তোড়ার মধ্যে পুতে রেখেছে, তার ধ্যানজপ নামে মাত্র হয়, কাজে কিছুই হয় না।

এই জন্যেই ধনবান্ মাত্রেরই দানব্রত গ্রহণ করা উচিত। নিজ জন্মবারে কিম্বা দীক্ষার বারে অথবা গুরুবারে, কিংবা সর্ব্বসাধারণের মান্য উৎসবাদির তিথিতে অর্থ-

পিপাসা নাশের সঙ্কল্প নিয়ে দান করা কর্ত্তব্য। এই দানের উদ্দেশ্য হবে, অর্থলিপ্সার নাশ, মান-সম্মান লাভ নয় বা প্রতিষ্ঠা অর্জ্জন করা নয়। এক একটী মুদ্রা হস্ত থেকে হস্তান্তরে পতিত হবে আর সঙ্গে সঙ্গে ভাব্ তে হবে,-“হে অর্থ, তোমাকে নিয়ে আমার যত চিত্ত-মালিন্য, তোমার সংশ্রবে এসে আমার যত জড়-মুগ্ধতা, সব তোমার সাথে সাথে চ’লে গিয়ে আমাকে শুদ্ধচেতা ও নির্ম্মলেন্দ্রিয় করুক।”

প্রতি নির্দ্দিষ্ট দিনে ভাবের অনুশীলন কত্তে কত্তে যখন মন আপনি কতকটা ক্লেদ-নির্ম্মুক্ত হ’য়ে আস্ তে থাক্ বে, ধ্যানজপ্ জম্ বে তখন। তার আগে নয়।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

তপঃপরায়ণ সাধুসন্তেরা ধনবান্ ব্যক্তিদের অত্যন্ত অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেন। ধনীরা জানেও না যে, তারা কত অবজ্ঞার পাত্র। চতুর্দ্দিকের মোসাহেবেরা যখন ভিমরুলের পালের মত ব’সে অবিরাম গুণ-গুঞ্জন করে, তখন ধনীদের মাথা ঘু’রে যায়। তারা ভাবে যে, জগতের প্রত্যেকটী জীবই বুঝি তাদের স্তাবক হ’য়ে জন্মেছে এবং তাদের স্তাবকতা করাই বুঝি দুনিয়ার লোকের একমাত্র কৃতকৃত্যতা।

এই ভ্রমের বশে তারা অনেক সময়ে অনুগ্রহ ক’রে সাধুদের দান কত্তে যায়, অমুক মঠে চাঁদা দেয়, অমুক আশ্রমে ভূমি দেয়, অমুক প্রতিষ্ঠানে দালান-ইমারত তু’লে দেয়। কিন্তু এরা জানে না যে, ঈশ্বর-পরায়ণ সন্তেরা এসব ধনীদের স্তাবকতা করা বা তোয়াক্কা রাখা নিতান্তই অনর্হ কাজ ব’লে গণ্য করেন।

তাঁদের জীবন ভগবানের দাসত্ব করবার জন্যে, ধনের দাসত্বের জন্য নয়। প্রকৃত বৈষ্ণব বিষয়ী দেখলে দশ হাত দূরে দিয়ে পথ চলেন, যেন বিষয়ীর বিষাক্ত ছায়ার স্পর্শে নিজ ইষ্ট-ধ্যানানুরত মন বিষয়-বিষে জর্জ্জরিত না হয়। নিষ্কিঞ্চন সাধুরা রাজা, মহারাজা বিষয়ীর পাপপরিম্লান মুখমণ্ডলের ধ্যান ক’রে স্বীয় ইষ্টের ধ্যান থেকে ক্ষণকালের জন্যও বিরত না হ’তে হয়।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

ধন ছাড়া জগতে চলা অসম্ভব, কিন্তু তার জন্য পরমধনে বঞ্চিত হবার মত নিদারুণ দুর্ভাগ্য আর কি আছে? জীবন ধারণের জন্য, মানুষের মত বেঁচে থাক্ বার জন্য যে ধনের আবশ্যকতা, তাতে অনাদর ক’রো না কিন্তু লক্ষ্য রাখ পরমধনে।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োদশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৯৩ – ৯৫)

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এক
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দুই
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তিন
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চার
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পাঁচ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ছয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সাত
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আট
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : নয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দশ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এগারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : বারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চোদ্দ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পনেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ষোল
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সতেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আঠারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : উনিশ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!