শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পাঁচ

ঈশ্বর-সাধনের ফল

প্রশ্ন হইল-ঈশ্বর-সাধনের ফল কি?

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

চিত্তপ্রশান্তি, নিশ্চিন্ততা, গভীর তৃপ্তি, অনাবিল শান্তি,-এই হ’ল ঈশ্বর-সাধনের প্রধান ফল। এই ফলের জন্য লোকে ভগবানকে ডাকে এবং ডাকার ফলে এই জিনিষ পায় ব’লেই ভগবান্ যাদের প্রত্যক্ষ হন নি, তারাও তাঁকে ডাকে।
প্রশ্ন।-ঈশ্বর-সাধনে কি অলৌকিক শক্তি লাভ হয়?

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

কারো হয়, কারো হয় না। -কিন্তু যাদের হয়, তাদের মধ্যে যিনি সব চেয়ে বড় অলৌকিক শক্তিটী লাভ করেন, তিনি লাভ করেন ভগবান্ কে ভালবাসার শক্তি। জগতের সকল শক্তির চেয়ে এই শক্তি বড়। সমুদ্রশোষণের শক্তি, মেঘাকর্ষণের শক্তি, লোকচিত্তমোহনের শক্তি, সব শক্তি প্রেম কর্ বার শক্তির কাছে তুচ্ছাতিতুচ্ছ।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

কিন্তু অনেক মানুষ ক্ষুদ্র লোভেই ঈশ্বর-সাধন করে। আবার অনেক সময়ে ক্ষুদ্র লোভ পরিহার ক’রে ঈশ্বর-সাধন কর্ল্লেও তার ফলে সাধারণ অলৌকিক শক্তি লাভ হয়। যেমন, লোকের রোগ নিরাময় করা, মনের কথা জানা, ভবিষ্যৎ ব’লে দেওয়া,

অপরের অজ্ঞাতসারে তাকে গন্তব্য পথ থেকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসা বা তাকে দিয়ে তার অজ্ঞাতসারে নিজের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করিয়ে নেওয়া, ইচ্ছানুসারে হিংস্র পশুদের উপরেও নিজ প্রভাব বিস্তার ক’রে তাদের বশীভূত করা প্রভৃতি। কিন্তু এদের প্রত্যক্ষ ফল লোকপ্রতিষ্ঠা। এরা সাধককে অহঙ্কৃত, দর্পিত ও বৃথা কাজে রত করিয়ে শেষ পর্য্যন্ত ঈশ্বর-চিন্তন ভুলিয়ে দেয়।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

এই জন্যই খাঁটি লোকেরা ঐশ্বর্য্য অর্থাৎ অলৌকিক শক্তিকে বিপদ জ্ঞান ক’রে বর্জ্জন করেন। তাঁরা কেঁদে কেঁদে বলেন,-

“হে প্রভো দয়াময়, আমার সকল শক্তি, সকল প্রতিষ্ঠা তুমি কেড়ে নাও দয়াল, কেড়ে নাও। আমার মুখের শোভা কেড়ে নাও, আমার ভাষার যাদু কেড়ে নাও, আমার কণ্ঠের মধু কেড়ে নাও, আমার সব বৈশিষ্ট্য কেড়ে নাও, আমার সাধনবিঘ্ন ভজনবিঘ্ন লোকপ্রিয়তা কেড়ে নাও।”

অখণ্ড-সংহিতা সপ্তম খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৭৩ – ২৭৪)

প্রচার্য্য কি?

একজন প্রশ্ন করিলেন,-আমাদের প্রচার্য্য বিষয় কি?

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

ভগবান্ সর্ব্বজীবের পিতা, মাতা, পতি এবং প্রভু, ভগবানের সঙ্গে আমাদের ইহাই প্রকৃত সম্বন্ধ। এই সম্বন্ধের পরিচয় লাভই জ্ঞান।

এই জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হ’য়ে তাঁর সন্তানদের কুশল-কল্পে আত্মসুখলোভহীন সেবা বিতরণই আমাদের পালনীয় ব্রত এবং সকল ঐহিক কর্ত্তব্যকে তাঁর চরণসেবার সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত রেখে পালন করাই মায়ামোহের মরীচিকা থেকে আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ পথ।-সর্ব্বজীবের নিকটে এই হচ্ছে আমাদের একমাত্র প্রচার্য্য।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

প্রকারভেদে এরূপও বলা যায় যে, তুমি এবং পরমেশ্বর এক এবং অভিন্ন, তোমাতে ও তাঁতে কোনো ভেদ নেই,-এই যে অভেদ সম্বন্ধ, তাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নামই জ্ঞান। এই জ্ঞানে প্রদীপ্ত হ’য়ে নিখিল সৃষ্টির আদ্যন্তহীন বৈচিত্র্যের প্রতিটি বিকাশের মধ্যে নিজেকে প্রত্যক্ষ ক’রে যার যেখানে যেটুকু অভাব,

তার সেটুকু দূর ক’রে দেওয়াই যে জীবনের পরম ব্রত, এই কথাটী সর্ব্বত্র প্রকাশ ক’রে ধরাই আমাদের কর্ত্তব্য। জীবন্ত জাগ্রত প্রাণীর স্পর্শে নিষ্প্রাণ ও অনুভূতিহীনের অন্তরে এই তত্ত্বকে উজ্জীবিত করা চাই, এইটীই জগতে একমাত্র প্রচার্য্য বিষয়। অন্য বিষয়ে বাক্যালাপ বৃথা আয়ুক্ষয় মাত্র।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োদশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ১৯০ – ১৯১)

পিতৃমাতৃ-ঋণ

ঢাকা বাংলাবাজার নিবাসী জনৈক পত্রলেখকের পত্রের উত্তরে শ্রীশ্রীবাবামণি লিখিলেন,-

আমার ভিতরে দুই-চারিটা তুচ্ছ স্তরের সদ্ গুণ দেখিয়া বা আবিষ্কার করিয়া তুমি ত’ কতই না প্রশংসা করিতেছ। কিন্তু তুমি ইহা জান কি যে,আমার ভিতরে আরও বহু প্রকারের সদ্ গুণ থাকিলে থাকিতে পারে, যাহা যথাযোগ্য সাধনার অভাবে আজ পৰ্য্যন্ত স্ফুরিত হইতে পারে নাই?

জান কি যে, এই সকল সদ্ গুণ আমি নিজে সৃষ্টি করি নাই, সৃষ্টিকর্ত্তা শ্রীভগবান্ ইহার স্রষ্টা এবং তিনি আমার পিতামাতার শরীরের গঠনের মধ্যে সুকৌশলে এইগুলিকে এবং ইহাদের চাইতেও অধিকতর অনেক সদ্ গুণকে সম্পুটিত করিয়া রাখিয়াছিলেন বলিয়াই আজ তুমি আমার ভিতরে কয়েকটা সদ্ গুণ আবিষ্কার করিতে পারিতেছ?

আমরা পুত্রকন্যার জাতি পিতৃমাতৃঋণ বিস্মৃত হইয়া যাই এই জন্য যে, আমরা একদিকে অজ্ঞান, অন্য দিকে অকৃতজ্ঞ। পিতামাতার কাছে, পিতামহ পিতামহীর কাছে, মাতামহ মাতামহীর কাছে, ঊর্দ্ধ্বতন সাত পুরুষের প্রতিটি দম্পতীর কাছে ঋণ স্বীকার করিলে আমাদের মহত্ত্ব কমে না, বাড়ে।

এই কথা আমরা জানি না বা বুঝি না বলিয়াই এই অসম্যগ্-দর্শন। পিতামাতা আমাদিগকে স্বেচ্ছায় জন্মদান করিয়া থাকুন বা না থাকুন, তাঁহাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা পোষণ আমাদের অবশ্য-কর্ত্তব্য কর্ম্ম। ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে সত্য সত্যই আমরা ধর্ম্মচুত্য হইয়া থাকি।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োবিংশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৮০ – ২৮১)

ধর্ম্মই ভারতের জাতীয় প্রতিভা

অদ্যকার বক্তৃতায় শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

এক এক বাগানে এক এক রকমের ফুল ফোটে ভাল। পাথুরে-কাঁকুরে মাটিতে এক রকমের ফুল ভাল ফোটে, বেলে মাটিতে আর এক রকমের ফুল ভাল ফোটে, আঠালো মাটিতে আবার আর এক রকমের ফুল ভাল ফোটে। যে বাগানের মাটিতে পাথর, কাঁকর, বালি, এঠেল মাটির অংশ সবই আছে, সে বাগানে সব রকমের ফুল ফোটে ভাল।

ভারতবর্ষের অবস্থা ঠিক্ তাই। এদেশের মাটিতে সব দেশের সব ধর্ম্মমত সমান সৌন্দর্য্যে ফুটেছে, এটা একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার। এ ব্যাপার সম্ভব হ’ল কি ক’রে? এ ব্যাপার সম্ভব হ’ল এই জন্য যে, ভারতের ঋষিরা সুদূর অতীতে ধ্যানদৃষ্টিতে দেখেছিলেন, জেনেছিলেন, বুঝেছিলেন যে, সর্ব্বধর্ম্মই একস্থানে তোমাকে পৌছে দেবে, কোনো ধর্ম্মই কোনো ধর্ম্ম থেকে নিকৃষ্ট নয়, সকলের ধর্ম্মের নিরূপিত ঈশ্বরই প্রকৃত প্রস্তাবে একজন ঈশ্বর।

তাঁরা দেখেছিলেন যে, সর্ব্বভূতে ব্রহ্ম বিরাজমান। সুতরাং যে যেই প্রতীক নিয়ে, যে যেই প্রণালী নিয়ে উপাসনা করুক, ভগবানকেই শেষ পর্য্যন্ত পাবে, সুতরাং কারো সঙ্গে কারো বিরোধের প্রয়োজন নেই।

মোজেসের ধর্ম্ম আবিষ্কারেরও আগে, বুদ্ধের ধর্ম্ম আবিষ্কারেরও আগে, মহম্মদের ধর্ম্ম আবিষ্কারেরও আগে তাঁরা জেনেছিলেন, সব নদী সমুদ্রে যায়, সব জীব একই ব্রহ্মে পৌছে। এই জ্ঞানটুকু ভারতের মৃত্তিকাকে সহনশীল ও সহাবস্থানপরায়ণ ক’রে নিয়েছে।

তাই ধর্ম্মকে ভারতের জাতীয় প্রতিভা ব’লে বর্ণনা করা চলে। ভারতের ধর্ম্মবোধ যাতে জগতের সকল সদ্ধর্ম্ম-সাধনা ও ধর্ম্মবোধের সঙ্গে মৈত্রীভাব পোষণ ক’রে ক্রমবর্দ্ধিত হ’তে পারে, তার তত্ত্বানুশীলনের জন্যই ভারতে লক্ষ লক্ষ দেবমন্দিরের স্থাপন, একথা আমরা যেন না ভুলি।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োবিংশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৯৪ – ২৯৫)

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ছয়>>

……………..
আরও পড়ুন-
স্বামী স্বরূপানন্দের বাণী
স্বামী স্বরূপানন্দ : গুরু-শিষ্য 
স্বামী স্বরূপানন্দ : সরল ব্রহ্মচর্য্য
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : চিঠিপত্র
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ : উপাসনা
স্বামী স্বরূপানন্দ : কবিতা/গান
স্বামী স্বরূপানন্দ : উপদেশ
স্বামী স্বরূপানন্দ : উপদেশ  দুই

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এক
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দুই
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তিন
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চার
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পাঁচ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ছয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সাত
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আট
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : নয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দশ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এগারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : বারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চোদ্দ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পনেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ষোল
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সতেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আঠারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : উনিশ

…………………….
আপনার গুরুবাড়ির সাধুসঙ্গ, আখড়া, আশ্রম, দরবার শরীফ, অসাম্প্রদায়িক ওরশের তথ্য প্রদান করে এই দিনপঞ্জিকে আরো সমৃদ্ধ করুন- voboghurekotha@gmail.com

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
মহানবীর বাণী: এক
মহানবীর বাণী: দুই
মহানবীর বাণী: তিন
মহানবীর বাণী: চার
ইমাম গাজ্জালীর বাণী: এক
ইমাম গাজ্জালীর বাণী: দুই
গৌতম বুদ্ধের বাণী: এক
গৌতম বুদ্ধের বাণী: দুই
গৌতম বুদ্ধের বাণী: তিন
গৌতম বুদ্ধের বাণী: চার

গুরু নানকের বাণী: এক
গুরু নানকের বাণী: দুই
চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী
কনফুসিয়াসের বাণী: এক
কনফুসিয়াসের বাণী: দুই
জগদ্বন্ধু সুন্দরের বাণী: এক
জগদ্বন্ধু সুন্দরের বাণী: দুই
শ্রী শ্রী কৈবল্যধাম সম্পর্কে
শ্রী শ্রী রামঠাকুরের বাণী
শ্রী শ্রী রামঠাকুরের বেদবাণী : ১ম খন্ড
শ্রী শ্রী রামঠাকুরের বেদবাণী : ২য় খন্ড
শ্রী শ্রী রামঠাকুরের বেদবাণী : ৩য় খন্ড
স্বামী পরমানন্দের বাণী: এক
স্বামী পরমানন্দের বাণী: দুই
স্বামী পরমানন্দের বাণী: তিন
স্বামী পরমানন্দের বাণী: চার
স্বামী পরমানন্দের বাণী: পাঁচ
স্বামী পরমানন্দের বাণী: ছয়
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: এক
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: দুই
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: তিন
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: চার
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: পাঁচ
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: ছয়
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: সাত
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: আট
সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: নয়

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!