মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ – এক

মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ – এক

-আবু ইসহাক হোসেন

ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

পণ্ডিত কানা অহংকারে
গ্রামের মতব্বর কানা চুগোল খোরে
সাধু কানা আনবিচারে;
আন্দাজী এক খুঁটি গেড়ে
চিনে না সীমানা তার।।

বাউল এক সময়ে বাংলা সাহিত্যে শব্দ বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যার শাব্দিক অর্থ হলো- এলোমেলো, পাগল, ক্ষ্যাপাটে প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু কালেকালে এই বাউল শব্দটি দর্শনে রূপ লাভ করে। যা আমাদের বাংলার মা, মাটি থেকে উদ্ভুত নিজস্ব দর্শন।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং চিন্তক ড আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘ বাউল মত বাংলার মত, বাঙালির ধর্ম। দেশি ভাবে বিদেশী প্রভাবে এটি উদ্ভুত হয়েছে- সমাজের নিচুতলার ধর্ম না হয়ে উপরতলার মানুষের ধর্ম হলে এটি যে শুধু বাঙালির জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করতো তা নয়- এর উদার মানবিকাতার জন্য বিশ্বে বাঙালীর গৌরবকে বাড়িয়ে তুলতো।’

এখানে তিনটি বিষয় খুব গুরুত্বের সাথে আলোচনার দাবি রাখে তা হলো-

১. এটি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন দর্শনের প্রভাবে উদ্ভুত হয়েও এদেশের আপন দর্শন।
২. এটি সমাজের নিচুতলার মানুষের ধর্ম এবং
৩. এটি মানবিকতায় পরিপূর্ণ ধর্ম।

অর্থাৎ বাউল এখন আর শুধু শব্দ বিশেষণ বা দর্শনই নয়। এটি বাঙালী সমাজের নিচুতলার মানুষের ধর্ম। বাউলকে ধর্ম চিন্তকের ভাষ্যে বাউলকে গৌর্ণধর্ম, উপাসক সম্প্রদায় এবং বাঙালীর দর্শন হিসেবে অনায়াসে কবুল করে নেয়া যায়।

তাই আমরা শব্দ নয় দর্শন নিয়ে আলোচনা করবো। যে দর্শন বাঙালীর জীবনচর্চার সারাৎসারকে ধারণ করে বিকাশ লাভ করেছে। সাধারণে বাউল দর্শন লোকায়ত দর্শনের প্রতিনিধি হলেও বাউল পথ-মতের অনুসারীদের কাছে এটি অনেকটাই ধর্ম হিসেবে মান্য।

বাউলধর্মকে ভক্ত-অনুসারীগণ গুরুবাদী মানবধর্ম হিসেবে আত্মস্থ করে সাধনার ভেতর দিয়ে তা চর্চা করে থাকেন। তাই আমরা বাউলচর্চার ক্ষেত্রে দুটি ধারা লক্ষ করি। একটি হলো ‘পণ্ডিতিধারা’ আর অন্যটি ‘সাধনার ধারা’।

পণ্ডিতগণ যেমন সাধনার চর্চা করেন না, তেমনি সাধকগণও যুক্তির বিচারে বাউল দর্শনকে মানার চর্চা করেন না। আর এ কারণেই বাউলচর্চা দুই ক্ষেত্রেই একপেশে এবং অসম্পূর্ণ। তার কারণ শুধু পণ্ডিতি জ্ঞান দিয়ে যেমন বাউল সাধনার সারাৎসার উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তেমনি শুধু সাধনার ধারায় বাউল সাধনার বস্তুনিষ্ঠতা অনুভব করাও অসম্ভব।

যার কারণেই শিষ্যগণ লালন ফকিরের মতকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে মান্য করতেন। এ সম্পর্কে হিতকরী পত্রিকা বলছে, ‘ইনি বড় গুরুবাদ পোষণ করিতেন। অধিক কি ইহার শিষ্যগণ ইহার উপাসনা ব্যতীত কাহারও উপাসনা শ্রেষ্ঠ বলিয়া মানিত না।’

সুতরাং লালন ফকিরের সম্প্রদায় এবং তাঁর অনুসারীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের গড়পড়তা ধারণা সঠিক নয়। যাঁরা লালন ফকিরের সাধনার ধারা সম্পর্কে জানেন তাঁরা জানেন যে, লালন ফকিরের সম্প্রদায়ের সাধনা শুদ্ধাচারী সাধনা- সত্য সুপথের সাধনা।

বাউলেরা বলে থাকে, ‘জ্ঞানই ধর্ম, ধর্মই সত্য, সত্যই আল্লাহ্’। অর্থাৎ সত্য-সুপথের সাধনা ছাড়া আল্লাহকে পাবার কোনো রাস্তা নেই। সুতরাং লালন ফকিরের সাধনা মানেই শুদ্ধ প্রেমের সাধনা।

কিন্তু আমরা এখনো দেখি যে নানা ধরনের কদাচারি সাধনার ধারায় এখনো কোনো কোনো সম্প্রদায় লিপ্ত রয়েছে- এবং সাধারণ মানুষ তাদেরও বাউল ভাবে বা লালন ফকিরের সম্প্রদায়ের অনুসারী ভাবে। আমাদের আসল গলদই সেখানে।

বাউল সম্পর্কে বিশেষ করে লালন সম্প্রদায়ের বাউল সম্পর্কে নির্বিচারী ধারণা সঠিক নয়- বরং সচেতন ভ্রান্তির কুফল। আমি সেই ছেলেবেলা থেকেই সাধুসঙ্গের সাথে পরিচিত। অনেক সাধকের সান্নিধ্যে ধন্য। বলাই বাহুল্য যে পারিবারিক ঐতিহ্যিক ভাবেই লালন ফকিরের সম্প্রদায়ের সাথে সখ্যতা।

কিন্তু আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় লালন ফকিরের সম্প্রদায়ের সাধকগণের ভেতরে কোনো ধরণের ব্যভিচার লক্ষ করিনি। লালন ফকিরের ভুবন জোড়া জনপ্রিয়তা এবং মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে অনেকেই হয়তো লালন ফকিরের মতের অনুসারী বলে নিজেদের পরিচয় দিয়ে গর্ব বাড়িয়ে থাকে। কিন্তু তারা আসলে লালন ফকিরের মত-পথ সম্পর্কে কিছুই জানে না বা মানে না।

মনোরঞ্জন গোঁসাই বাউল সাধনার একজন শুদ্ধাচারী পুরুষ এবং লালন মতের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। লালন সাঁইজি বলেছেন ‘না বুঝে মজ না পিরিতে’ এবং বলাই বাহুল্য যে আমরা যাদের বাউল সাধক বা লালন ফকিরের অনুসারী বলে জানি- তাদের বেশিরভাগই না বুঝে মজার দল।

এরা না জানে বাউল পথ-মতের অনুসন্ধান, না জানে বাউল সাধনার সঠিক ধারা। সে কারণে তারা কোনোভাবেই লালন ফকিরের পথ-মতকে প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু এটাও ঠিক যে অনেক বাউল সাধকই আছেন যাঁদের মাধ্যমে লালন ফকিরের তত্ত্ব এবং দর্শন সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।

মনোরঞ্জন গোঁসাই তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি লালন ফকিরের শুদ্ধাচারী- অর্থাৎ বীরভদ্র কর্তৃক প্রচারিত বাউল মতের একজন পণ্ডিত এবং সাধক ছিলেন। তিনি বাউল পথ-মতকে নির্বিচারে মানেন নি। তিনি বাউল পথ-মত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করে করে, তবেই মানতেন।

অর্থাৎ লালন ফকিরের সেই তত্ত্ব ‘আগে বুঝে পরে মজো’ এর সার্থক রূপকার তিনি ছিলেন। অর্থাৎ আমরা বলতে চাচ্ছি মনোরঞ্জন গোঁসাই এর ভেতর লালন চর্চার দুটি ধারাই বহমান ছিল। তিনি একই সাথে পণ্ডিতি ধারা এবং সাধনার ধারাকে সমানভাবে চর্চা করতেন।

যার ফলে তাঁর জীবনচর্চার মধ্যে বাউল পথ-মতের শুদ্ধাচারী ধারা শনাক্তযোগ্য ভাবে পরিস্ফুট হতে দেখা গেছে। তিনি নিজে যেমন বাউলের শুদ্ধাচারী সাধনার চর্চা করতেন। তেমনি বাউল দর্শনের সর্বজনীন দিকটাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার মানসে।

বাউল পথ-মতের গূঢ় দর্শনকে খুবই সহজ ভাষায় তিনি তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে তাঁর ‘বাউল মতের শিকড় সন্ধানে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা’ শিরোনামের ক্ষুদ্র অথচ তথ্যও তত্ত্বে পরিপূর্ণ বইটিতে। গ্রন্থটি পাঠ মাত্রেই সকল পাঠক তাঁকে পরম পণ্ডিতরূপে আবিষ্কার করতে পারেন।

বইটিতে বাউল দর্শন সম্পর্কে পণ্ডিতি তথ্য এবং তত্ত্বের সন্নিবেশ ঘটিয়ে, একই সাথে তিনি লালন ফকিরের দর্শনের পণ্ডিতি ধারা পরমতত্ত্বকে তুলে ধরেছেন। তাই আমাদের বিচারে মনোরঞ্জন গোঁসাই পরিপূর্ণভাবে লালন ফকিরের দর্শনকে বুঝে। বাউল সাধনার সঠিক পাঠ উন্মোচন করতে সমর্থ হয়েছেন।

আমরা আমাদের প্রবন্ধ শুরুই করেছিলাম লালন ফকিরের বিখ্যাত পদ দিয়ে এবং বুঝাতে চেয়েছিলাম লালন ফকিরের দর্শনের যে খণ্ডিত পাঠ। তার মাধ্যমে লালন ফকির বা তাঁর দর্শন কোনোটাই পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনি।

অর্থাৎ পণ্ডিত কানা এবং সাধু কানা’র হাতে লালন ফকিরের দর্শন খণ্ডিতভাবেই চর্চিত এবং সাধিত হয়ে এসেছে। যা পাঠককে লালন ফকিরের দর্শন ও তত্ত্ব সম্পর্কে খণ্ডিত ধারণাই দিয়েছে মাত্র। আর এ প্রসঙ্গে এ কথা বলাই বাহুল্য যে সেই খণ্ডিত জ্ঞানে বা তত্ত্বে লালন ফকিরকে পরিপূর্ণ উপস্থাপনের কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি।

তার কারণ ‘কানা’ মানে অন্ধজন অন্য লোককে পথ দেখাতে ব্যর্থ। তাই অন্ধের অনুকরণে সঠিক সত্য ক্রমেই দূরে সরে গেছে ভক্ত-অনুসাগীদের নিকট থেকে। লালন ফকিরের ভাষায় তাই বলা যায়-

এক কানা কয় আরেক কানারে
চল দেখি যাই ভবপারে,
নিজে কানা পথ চিনে না
পরকে ডাকে বারংবার।।

কিন্তু মনোরঞ্জন গোঁসাই প্রমুখের হাতে লালন ফকিরের পথ-মতের পুনর্জীবন ঘটেছে। লালন ফকিরের পথ-মত বা বাউল দর্শন যেটাই বলি সেটি মনোরঞ্জন গোঁসাই প্রমুখের চর্চার মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতার পথে অগ্রসর হয়েছে, মুক্ত হয়েছে পঙ্কিলতার দূষণ থেকে। এই কথাগুলো শুধু লেখকের কথার কথা নয়।

আমরা মনোরঞ্জন গোঁসাই এর ‘বাউল মতের শিকড় সন্ধানে: কিছু প্রাসঙ্গিক কথা’ থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরে বিষয়টিকে পরিস্কার করতে পারি। পণ্ডিত সাধক মনোরঞ্জন গোঁসাই অদীক্ষিত কানা অনুসারীদের হাতে বাউল পথ-মতের সাজা অনুসারী এবং বাউলদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে বলেছেন, ‘আজগবি বাউল, শখের বাউল, নামধারী বাউল, শিল্পী বাউল, নগর বাউল’।

এবং লালন ফকিরের আখড়া কেন্দ্রিক অদীক্ষিত ধান্দাবাজদেরকে তিনি একাডেমিক বাউল বলে শনাক্ত করেছেন। সেই সাথে তিনি বলেছেন যে এই একাডেমিক বাউলগণ মতে- মূলে লালন ফকিরের আদর্শ বা দর্শন অথবা পথ-মত যাই বলি তার বিরোধী।

(চলবে…)

……………………………….
আরো পড়ুন:
মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -এক

মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -দুই
প্রকাশের অপেক্ষায়…

মনোরঞ্জন গোঁসাই : বাউল সাধনার শুদ্ধপুরুষ -তিন

……………..
আবু ইসহাক হোসেন: লালন গবেষক

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!