কেন ডুবলি না মন গুরুর চরণে

কেন ডুবলি না মন গুরুর চরণে

-মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ

মাই ডিভাইন জার্নি : নয়

কি আছে এই পোড়া শহরে! কি এতো প্রেম তাহার সাথে!! কিছুই বুঝি না ছাই। দিন দিন এই শহরে নি:শ্বাস নেওয়াও কষ্টকর হয়ে পরছে। ঘিঞ্জি বসতি, সারি সারি বাক্স বাক্স বাড়িঘর, এরই মাঝে ঠেসে ঠেসে বসবাস; দম বন্ধ করা এই জীবন যাপন। এতো গেলো ঘরের কথা। আর ঘরের বাইরের কথা কি বলি।

তার অবস্থা তো আরও করুণ। অসহনীয় ট্র্যাফিক জ্যাম মূল সড়ক ছেড়ে গ্রাস করে নিচ্ছে অলিগলি-মাঠ-ঘাট, অত্যাচার-অবিচার-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে কোনোমতে টিকে থাকা অবশিষ্ট সবুজের ছায়াবিথীও, স্বচ্ছ জলাশয় তো অণুবীক্ষণ যন্ত্রে খুঁজতে হয়, বাতাসে সীসার রেকর্ড মাত্রা, শব্দদূষণে কানে তালা লাগার জোগার।

আর মানুষ! সে তো পরশ্রীকাতরতায় মগ্ন। সততা এখানে মূল্যহীন, বিশ্বাস তো ডুবে গেছে অতল জলে। তারপরও দিন কয়েক এ শহরের বাইরে থাকলেই পেছন থেকে কে যেন টেনে ধরে। কে যেন খুব কাছ থেকে বুকের পাজড়ের উপর চেপে বসে ফিরে আসার আহ্বান করে।

এমনই প্রেম তাহার সাথে। প্রেয়সীর মতোই। যাকে না দেখলে মাতোয়ারা হয় মন। আবার সারাক্ষণ পাশাপাশি থাকলে খুনসুটি হয়।

দূরে থাকলে যেমন প্রেম উছলে পড়ে তেমনি পাশাপাশি থাকলে কখনোসখনো প্রেমে ঘাটতিও হয়। মনোমালিন্য হয়। দূরত্ব বাড়ে। তেমনি যখন এ শহরে বাস করতে করতে হাঁসফাঁস উঠে যায়। যান্ত্রিকতা-কংক্রিটের নগরায়ণ যখন অসহ্য ঠেকে তখন চোখ যায় ঘরের কোণে ঝুলে থাকা ধুলো জমা ব্যাগটার দিকে।

হাতড়ে হাতড়ে দেখতে হয় পকেটের অবস্থা। সংক্ষিপ্ত হিসেব-নিকেষ, তারপর বেড়িয়ে পরা। তবে এ যাত্রা একমুখি নয়; মাত্র দিন কয়েকের সজীবতা নিয়ে আবার এই পোড়া শহরেই ফিরে আসা। কেউ দিব্যি দেয়নি তবুও ফিরে আসা।

এইসব যাওয়া-আসার ফাঁকে মনের গহীনে একটা প্রশ্ন জাগে, আমি অক্সিজেন নিতে এ শহর ছেড়ে দূরে কোথাও যাই নাকি অক্সিজেন নিতে এ শহরে ফিরে আসি? বিষয়টা বেশ গোলমেলে। এর কোনো একটা সিদ্ধান্তে স্থির থাকা কঠিন।

যাক সে কথা, এভাবেই চলে যায় জীবনের অলস চাকা। এভাবে চলতে চলতে যখন সমস্ত গন্তব্য ধূসর হয়ে উঠে। টানেলের শেষে যখন কোনো আলো দৃশ্যমান হয় না তখন আমার সকল গন্তব্য এক বিন্দুতেই মিশতে চায়; তা আর অন্য কোথাও নয় সাঁইজির ধাম।

সেবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। যেতে হবে এটুকুই জানতাম, এরবেশি কোনরকম পরিকল্পনাও ছিল না। কেবল বেড়িয়ে পরার আগে সুমন দাস বাউলকে ফোন দিলাম। কথা হলো কুষ্টিয়ায় দেখা হবে। আমি ঢাকা থেকে আর সুমন দাস খুলনা থেকে রওনা হলাম সাঁইজির ধামের উদ্দেশ্যে। চললাম সেইপথে যেখানে সাঁইর বারামখানা।

সকালের কাঁচা রোদে বাস এগিয়ে চলছে সাঁইজির ধামের দিকে; মাঝখানে আমি সিটে মাথা ঠেকিয়ে দেখছি প্রকৃতি; আর পেছনে দূরত্ব বাড়ছে মায়ার শহর ঢাকার। সেই ঢাকা যা চারশ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দিন দিন বসোবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে।

একসময় বুড়িগঙ্গা-বালু-তুরাগ থেকে শিরা-উপশিরার মতো যে খাল-বিল-জলাশয় পুরো শহরে রক্তনালির মতো চলমান ছিল। সে সব আজ কেবলই ইতিহাস। শহরের প্রাণশক্তির আধার, সেসব জলাধার আমরা একের পর এক বন্ধ করে তার উপর পাকা সড়ক বানিয়েছি। গাছপালা-বনজঙ্গল কেটে বানিয়েছি আকাশচুম্বী ভবন।

নিজেদের বসতি আরেকটু আরামদায়ক করার অভিলাসে শত শত বছর ধরে যে পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ-গাছপালা শত-সহস্র বাধাবিপত্তি-প্রকৃতিক দূর্যোগে টিকে ছিল তাদেরকে আমরা শুধু বাস্তুছাড়া করেই থামি নি। দিনদিন তাদের বেঁচে থাকা দূরূহ করে তুলেছি।

এই যে অগণিত প্রাণ বাস্তু ছাড়া হলো এবং হচ্ছে, অগণিত প্রাণ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় প্রতিনিয়ত; তাদের এতো এতো অভিশাপ মাথায় নিয়ে এই শহরে আমরা সুখে-শান্তিতে রূপকথার মতো বসবাস করবো এটা ভাবাই কি অবান্তর নয়?

এতো ধ্বংসলীলা পরও নূন্যতম অনুশোচনা মনে না নিয়ে এই যে সর্বক্ষণ এই শহরকে অপরাধী ভাবছি; তাতে কি আদৌ সত্যকে অস্বীকার করা যাবে? নিম্নআয়ের মানুষদের প্রতিনিয়ত চোখে আঙ্গুল দিয়ে বৈষম্য দেখিয়ে তাদের পাশাপাশি বিলাশবহুল জীবনযাপন করে আমরা কি আদৌ সুখি?

এভাবে কি সুখি হওয়া যায়? আয়নায় তাকিয়ে কি নিজেকে শুদ্ধ মানুষ মনে হয়? নাকি সকল দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে মচমচে চপ্পল পরে বুক ফুলিয়ে হাঁটতে পারলেই সাত খুন মাপ?

এই শহর কি কয়েক দশক আগেও এমনি ছিল? এ শহরের মানুষ কি এমনি ছিল? এতো জটিলতা-এতো কুটিলতা এসব কি আজকের মাত্রায় ছিল? আমার কেনো যেন মনে হয় এমনটা ছিল না।

যদিও অন্যায়-অবিচার ছিল, দলাদলি ছিল, পারস্পরিক ঝগড়াঝাঁটি ছিল, পরশ্রীকাতরতা ছিল, গোলা-পিস্তল ছিল; কিন্তু সবশেষে কোথায় যেন একটা মমত্ব ছিল, একটা আশ্রয় ছিল।

সেটা এখন আর দেখা মেলে না। নাকি সব একই ছিল!!! হয়তো আমি এতোটাই ছোট ছিলাম যে এসব দেখবার মতো চোখই সৃষ্টি হয়নি। এর কোনটা সঠিক তা আমার জানা নেই। তবে সে সব দিনগুলো কিন্তু সত্যই অন্যরকম ছিল। দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। আজকাল ভাবলে কাল্পনিক মনে হয়।

সেই সব দিনের কথা ভাবতে গেলেই আমার কাছে মনুমেন্টের মতো ধোলাইখালের উপরের কাঠের পুলটার কথা খুব মনে পরে। কতো ঘটনার সাক্ষী হয়ে কাঠের পুল দাঁড়িয়ে ছিল কতকাল। আজ আর কাঠের পুল নেই, ধোলাই খালও নেই সেখানে চকচকে সড়ক।

তবে সেই রাস্তায় গেলে আজো চোখের সামনে যেন সব পরিষ্কার চিত্রায়িত হয়। বর্ষায় ধোলাই খালে স্বচ্ছ জল, দুই পারে বিশাল বিশাল গাছ, খাল পাড় ঘেঁষে মঠ-মন্দির-খেলার মাঠ। পুলের ঢালে বসে থাকা সেই অন্ধ ভিখারি; পাশে বসা তার সহধর্মীনির একটানা অদ্ভুত কণ্ঠে কোরান পড়ে যাওয়ার সুর জেনো আজো কানে বাজে।

এই অন্ধ ভিখারি অন্য সব ভিখারি থেকে ছিল বেশ আলাদা। রীতিমত সৌখিন। আশপাশের সকল ভিখারির মধ্যে তিনি ছিলেন সবচাইতে জনপ্রিয়। লোকে তাকে ডাকতো কানা ফকির বলে। ধবধবে সাদা গাত্রবর্ণের কানা ফকিরের পুরো শরীরে বসন্তের গোটা গোটা দাগ দৃশ্যমান হলেও বেশ নূরানী চেহারা ছিল তার।

শুনেছিলাম বসন্ত রোগে তিনি অন্ধ হয়েছিলেন। কানা ফকির পরনের কাপড় যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতেন ঠিক তেমনি পুলের ঢালে যে অংশে বসতেন সে জায়গাটাও রাখতেন পরিচ্ছন্ন। ঘাসের উপর একেএকে মাদুর-কাঁথা-চাঁদর চাপিয়ে পরিপাটি করে তার একপাশে তিনি আর অন্যপাশে তার সহধর্মিণী বসতো। বেশ ভাব ছিল বুড়াবুড়ির তা তাদের দেখলেই টের পাওয়া যেত।

কানা ফকিরকে সব সময়ই সবুজ না হলে নীল রঙের পাঞ্জাবী পরতে দেখেছি আর মাথায় সাদা টুপি। ভোরবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় দেখতাম। রিকশার মধ্যে হেলান দিয়ে কানা ফকির কালো চশমা পরে চুপচাপ বসে আছে। আর রিকশাচালক রাস্তার পাশের জায়গাটা ঝাড়ু দিচ্ছে।

সব পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে গেলে চালক ছেলেটা তাকে ধরে ধরে আসনের একপাশে বসিয়ে দিয়ে চলে যেত রিকশা নিয়ে। কানা ফকির আয়েস করে পাশের খুঁটিতে ঢেলান দিয়ে পরপর গোটা কয়েক সিগারেট টানতো। শেষের সিগারেটের সাথে এক কাপ চা। অল্পসময় পরই দেখা যেতো রিকশাচালক ফকিরের সহধর্মিনীকে নিয়ে হাজির।

মুখের উপর একহাত ঘোমটা টানা ফকিরের সহধর্মিণী এসে বেশ সময় নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে পান বানিয়ে স্বামীকে দিতো। কানা ফকির আয়েশ করে পান চিবুতে চিবুতে সিলভারের বোলটা এগিয়ে দিতো সামনের দিকে।

তার সহধর্মিণী তৎক্ষণে কোরান শরীফ পড়তে শুরু করে দিতো। কানা ফকির একহাতে ছোট্ট তসবি ধরে বসে থাকতো। এভাবেই শুরু হয়ে যেতো তাদের প্রাত্যহিক দিনলিপি।

আবুলের হোটেল থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা, পরটা-ভাজি, দুপুরে ধোয়া উঠা সিঙ্গারা, বিকেলে পুরি-সমুচা সবই আসতো ফকিরের আসনে দফায় দফায়। হাতের লাঠিটা দিয়ে পাশের তারখাম্বায় বারি দিয়ে শব্দ করলেই টং দোকানি পৌঁছে দিতো সিগারেট।

এভাবে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যার আলো নিভে গেলে ফকিরের সহধর্মিণী ভিক্ষার পাঠ চুকিয়ে বাড়ি চলে যেত একই রিকশায়।

কানা ফকির সেখান থেকে মোড়ের টং দোকানের বেঞ্চিতে এসে বসতো। সেখানে বেশ রাত পর্যন্ত চলতো তুমুল আড্ডা। পাড়ার এমন কেউ নেই যে কানা ফকিরকে দিনে ২/১ টাকা না দিতো। আবার সন্ধ্যার সময় দেখা যেতো সেই কানা ফকিরই সকলকে চা-বিড়ি খাওয়াচ্ছে।

আড্ডায় কানা ফকির ভিখারি হিসেবে উপস্থিত হতেন না। তখন তিনি সকলের বন্ধু বা বড় ভাই বা চাচা।

এইরূপ চিত্রকল্পই ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া ঢাকার ইতিহাসে। তবে পাড়ায় কিছু এলিট শ্রেণীও ছিল যারা এসব থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতে পছন্দ করতো। অনেকে এইসব আড্ডায় যুক্ত হতে চাইলেও পারিবারিক ঐতিহ্যের বেড়া টপকাতে পারতো না। আবার কেউ কেউ এসবের ধার ধারতেন না। সব রকমের মানুষই ছিল।

সেসময় পান থেকে চুন খসলেই প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ভিখারি খাওয়ানোর একটা রেওয়াজ ছিল। আর ভিখারি খাওয়ানোর তালিকা হলে সবার উপরে থাকতো কানা ফকিরের নাম। এছাড়া প্রতিদিন এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে এটা-সেটা খাবারের বাহারি পদ তো পৌঁছে যেতই কানা ফকিরের আসনে।

সেই সব খাবার বাটি-টিফিন ক্যারিয়ারে বন্দি হয়ে তার আসনের একপাশে জমা হতো। তিনি অবশ্য সব আইটেম খেতেন না। খাওয়ার সময় সব খুলে খুলে দিতো তার বৌ। তিনি গন্ধ শুকে শুকে নির্বাচন করতেন কোনটা খাবেন কোনটা খাবেন না।

আর বাকিগুলো আশপাশে থাকা অন্য ভিখারিদের মাঝে বিলি করে দিতেন। সেজন্য দুপুরে গুটি কয়েক ভিখারি পুলের আশপাশে ঘুরঘুর করতো।

দুপুরবেলাতেই অন্য ভিখারিরা তার পাশে ভিড়তে পারতো অন্যসময় পুরো কাঠেরপুলটা তার দখলে থাকতো। এখানে অন্য কেউ তার অনুমতি না নিয়ে বসতে পারতো না। এভাবেই চলছিল কানা ফকিরের আয়েসী জীবন।

এমনি এক শীত শীত দিনে স্কুল থেকে ফিরে দেখি কয়েক পাড়ার লোকজন জড়ো হয়েছে কাঠের পুলকে ঘিরে। জানলাম কানা ফকির মারা গেছে। ধুপখোলা মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে মসজিদের মাইকে ঘোষণার পরপরই নতুন নতুন গল্প পুরো পাড়া জুড়ে ছড়িয়ে পরতে লাগলো।

পাড়ার আড্ডাখানা সূত্রে জানা গেলো, কানা ফকিরের নাকি দুইখানা পাঁচতলা বাড়ি আছে কয়েক পাড়া দূরেই।

এক ছেলে আমেরিকায় থাকে। অন্য ছেলেমেয়ের একজন ডাক্তারি পড়ছেন; অন্যরা একটু বখে গেছে। সন্ধ্যা হতে হতে জানা গেলো কানা ফকিরের আসলে এক বৌ না। ঘোমটার আড়ালে ছিল তিন বৌ। তারা নাকি পালা করে এসে তার সাথে ভিক্ষা করতে বসতো।

বিশাল ঘোমটা কখনো তুলতেন না বলে কেউ এতোদিন জানতেই পারেনি এক নয় তিন বৌ কানা ফকিরের।

একখানা চকচকে বিশাল গাড়ি দিয়ে জানাজায় আসলো তার নতুন ঢাকায় থাকা আরেক বৌয়ের পরিবারের লোকজন। ভিখারি ভদ্রলোকের আরেক খানা গাড়িরও সন্ধান পাওয়া গেলো যেটা তার কন্যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা নেওয়া করে।

ব্যাংকে কত টাকা আছে তা নিয়ে নানা ধোয়াশা খবর এলো। এমন এমন সব অংক শোনা যেতে লাগলো তা বিশ্বাস করা কঠিন। খুচরা টাকা-পয়সা নাকি কয়েক বস্তা পাওয়া গেছে।

সেদিন গভীররাত পর্যন্ত মুরব্বিরা পাড়ার দোকানে বসে চা-সিগারেট খেয়ে কপাল থাপড়ালো আর বলতে লাগলো, হায় হায় বদ’টা করছে কি। আমাগো টাকা-পায়সা নিয়া বাড়ি-গাড়ি কইরা ফেলছে। আর আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকি? তিন তিন খান বিয়া করছে? আর আমরা???

দফায় দফায় আড্ডা। আলোচনা। পিছিয়ে নেই পাড়ার নারীরাও। তারাও বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে আড্ডার মহল গরম করলো। কানা ফকিরের যে বৌ’রা এক হাত ঘোমটা দিয়ে এতদিন দৃশ্যমান ছিল নগরে তারাই নাকি এখন একজন আরেকজনের চুলের মুঠি ধরে মারামারি করে সম্পত্তি ভাগা ভাগিতে মত্ত্ব হয়েছে।

কোটিপতি ফকির শিরোনামে পরদিন বেশ কয়েকটা পত্র-পত্রিকায় নিউজ হলো। পাড়ার যারা পত্রিকা রাখে না বাড়িতে তারাও মোড়ের দোকান থেকে পত্রিকা নিয়ে সকালের শুভ সূচনা করলো।

বেশ কয়েকদিন পাড়া থমথমে হয়ে রইলো। প্রথম দুদিন আবুল হোটেল বন্ধ থাকলো, পাড়ার আরেক আড্ডাখানা মোড়ের লন্ড্রিখানা বন্ধ, টংদোকান বন্ধ, মোড়ের ফেরিওয়ালাদের পর্যন্ত দেখা পাওয়া গেল না। না না, ঘটনা অন্যকিছু না।

কানা ফকিরের জন্য মন খারাপ-টারাপ করে নয়; কানা ফকিরের উপর চমর রাগ-ক্ষোভ থেকে সব বন্ধ; সকলের একই কথা, হারামজাদা করছে টা কি?

আমাগো টাকা নিয়া মৌজমাস্তি করছে আর আমরা খাটা-খাটনি করে জীবন শেষ করতেছি? প্রথম দিন টেনেটুনে কাটিয়ে দেয়ার পর সকলেই অস্থির হয়ে উঠলো; দোকান বন্ধ বলে কি আড্ডা হবে না?

এ তো হতে পারে; একটু পরনিন্দা-পরচর্চা না করলে আর কিছুতেই চলছে না যখন; তখন বাড়ি বাড়ি থেকে চেয়ার বেঞ্চ এনে পাড়ার মাথায় বিশাল আড্ডার আয়োজন হলো। কারখানার ধোঁয়ার মতো সিগারেট-বিড়ি পুরলো। আড্ডা লাগোয়া বাসাবাড়ি থেকে চা গেলো কেটলি কেটলি।

রাত বাড়ে আড্ডা ফুরায় না। সন্ধ্যায় যারা যাবো কি যাবো না করছিল কিন্তু রাত বারার সাথে সাথে তারাও ঘরে টিকতে না পেরে একে একে যোগ দিতে শুরু করলো আড্ডায়। আড্ডার সেই সব রসের গল্প বললে রাতের পর রাত ফুরিয়ে যাবে।

আমরা পাড়ার দেয়ালের উপর বসে বসে বড়দের কাণ্ড দেখছিলাম। সুমন ভাইয়ের বাবা তো সকলের মাঝে দাঁড়িয়ে কানা ফকিরের চরিত্র অভিনয় পর্যন্ত করে দেখালেন। সকলে হো হো করে হাসতে লাগলো পাড়া কাঁপিয়ে।

কত অল্পতেই মানুষের সে কি আনন্দ, তাই না! একটু নিরলস পরনিন্দা-পরচর্চা করে নিজের ব্যর্থ জীবনের শোধটুকু সুদে-আসলে আদায় করে নেয়া। আসলে এটাই ছিল ঢাকার চিত্র। আড্ডা! জ্বি মশাই আড্ডা। এই আড্ডাই বাঙালীর প্রাণ। ঢাকার প্রাণ।

সেই আড্ডায় শিল্প-সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ছাপিয়ে পরনিন্দা-পরচর্চাও স্থান পেত। কিন্তু তা কখনোই চরম মাত্রায় পৌঁছাতে দেখিনি। সেই সব হারিয়ে আজ প্রাণ খুলে প্রাণ খোলা মানুষের আড্ডা সংর্কীণতার মোড়কে আটকে ব্যক্তি অহমিকায় প্রকাশের আড্ডায় পরিণত হয়েছে।

আর এই সব থেকেই দূরে আরো কিছুটা দূরে যাওয়ার অভিপ্রায়ই মাটি স্পর্শ করলাম সাঁইজির ধামের।

পরদিন বেলা করে ঘুম থেকে উঠে ফোন করে জানা গেলো নহির সাঁইজি নিজ বসতবাড়ি প্রাগপুরের হেমাশ্রমেই আছেন। আমি আর সুমন দাস বাউল অলস সময় কাটিয়ে ধীরেসুস্থে রওনা দিলাম। পথে বাজানের বাড়িতে নেমে দুপুরের সেবা নেয়ায় অনেকটা দেরি হয়ে গেলো।

বার দুয়েক নহির সাঁইজি ফোন করলেন। দেরি হচ্ছে কেনো? কোনো ঝামেলায় পরলাম কিনা। রাস্তা ভাঙ্গা থাকায় বাসও ধীরে ধীরে চলতে লাগলো। রাত প্রায় নয়টা সাড়ে নয়টার দিকে ঘেমে-নেয়ে নহির সাঁইজির বাড়িতে গিয়ে পৌঁছালাম। এর আগে নহির সাঁইজির দরশন পেয়েছি কিন্তু কাছ থেকে কখনো আলাপচারিতা হয়নি।

সাধারণত যা হয়, অপরিচিত কারো বাড়ি গিয়ে উঠলে প্রথমেই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। নাম কি, বাড়ি কোথায়, কেনো আসছি নানাবিধ অবান্তর প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয় পরিচয় পর্ব। নহির সাঁইজি সেই সব ধার ধারলেন না।

দুই হাত জড়ো করে ভক্তি দেয়ার পরই বললেন, বাপ! অনেক দূর থেকে আসছেন। আগে মুখ হাতে পানি দেন। আমি বললাম, সাঁইজি গোসল করতে চাই।

উনি নিজে পথ দেখিয়ে চাপকলের কাছে নিয়ে গেলেন। বাড়িতে লোকজন তেমন ছিল না। সাঁইজির একজন গুরু ভাই আর সেবিকা নীধি। সাঁইজি নিজেই আমাদের জন্য সাবান-গামছা ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন এই বয়সে।

আমরা যতই বলি সাঁইজি আপনি বসেন কিছুই লাগবে না। আর যা কিছু লাগবে আমরা নিজেরাই নিয়ে নিতে পারবো। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

একে একে নাস্তা-চা-রাতের খাবার শেষে শুরু হলো ম্যারাথন আলোচনা। এটাকে আলোচনা বা আলাপচারিতা বলা যায় কিনা সেটা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ আছে। কারণ নহির সাঁইজি একাই বলে চলছিলেন আমি আর সুমন দাস শুনে যাচ্ছিলাম কেবল।

সকল সময় আলাপ জমে না। সাধারণত বেশিরভাগ প্রথম আলাপচারিতা কেবল গালগল্পে ফুরিয়ে যায়।

তবে যোগে যোগ মিলে লগ্ন পূর্ণতা পেলে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আলোচনা জমে ক্ষীর হয়ে যায়। সে রাতেও সেরূপ অল্পসময়েই নহির সাঁইজির সাথে আলাপচারিতা জমে উঠলো। মধ্যরাত পর্যন্ত আলোচনা চললো একটানা।

নহির সাঁইজির যে গুণটা আমাকে মুগ্ধ করলো তা হলো তার অদ্ভুত রকমের স্থিরতা। অল্পকিছু কথা বলে এমন একটা জায়গায় এসে নহির সাঁইজি থেমে যান যেখান থেকে চিন্তার শুরু হয়।

আর চিন্তা করতে করতে যে সমাধানের দিকে মস্তিষ্ক এগিয়ে যায় নহির সাঁইজি নিরবতা ভেঙ্গে ঠিক সেই জায়গা থেকেই শুরু করেন পরবর্তী আলোচনা। নিরবতার পুরোটা সময় চোখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকেন। সেই সময় আমার মনে হচ্ছিল নহির সাঁইজি যেন আমার মাথার ভেতরে বসে কথা কইছেন।

আমি যা ভাবছি তা যেন পড়ে ফেলছেন। তাই আমার আর কথা বলা বা কোনোরূপ প্রশ্ন করা বা উত্তর দেয়ার প্রয়োজন পরছিল না। যদিও সাঁইজির কথায় প্রশ্ন-উত্তর-জিজ্ঞাসা ছিল প্রচুর।

নহির সাঁইজি তার জীবনের কথা-সাধনার কথা বলছিলেন একনাগারে। শেষরাতে যখন বিছানায় পিঠ ঠেকালাম তখন মাথার ভেতর একটা প্রশ্নই ঘুরছিল। যা আমাকে আর ঘুমাতে দেয়নি সুবেহ সাদেক পার হয়ে যাওয়ার পরও। দুই কামরার হেমাশ্রমের শয়নকক্ষে সকলেই মৃদু ও উচ্চস্বরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল।

কেবল আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ক্রমশ রাতের আধার কেটে গিয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা ভোর দেখছিলাম। ভাবছিলাম কিভাবে সাধুগুরুরা প্রবেশ করে মস্তিষ্কের ভেতরে?

কি তাদের সাধনা? সাধুগুরুর এই রূপ দেখেই কি ভক্ত খুঁজে পায় গুরু? মানুষ হয়ে মানুষের ভেতরে পরমের সন্ধান পায়? সাধুগুরুর মহিমা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই দৃশ্যপট পাল্টে রাতের বদলে দিন।

পুকুর পাড়ে বসে সুমন দাস বাউলকে যখন বলছিলাম তিনি সব শুনে বললেন, বিষয়টা এমন নাও হতে পারে দাদা। আসলে সাঁইজির বয়স হয়েছে তাই এই স্থিরতা। আপনি বেশি বেশি ভাবছেন।

আসলেই কি তাই? সবই আমার দুই রাত না ঘুমানোর পাশ্বপ্রতিকৃয়া মাত্র! আদৌতে এমন কিছুই ঘটেনি? এমন কিছুই ঘটে না!! সবই অসল মস্তিষ্কের দুর্বল ভাবনা মাত্র!!! হয়তো সুমন দাস বাউলের কথাই ঠিক। আসলেই এসব কিছুই না সবই কল্পনা মাত্র।

তবে আমি সেদিন একটা বিষয় খুব পরিষ্কার বুঝেছি আমার খোঁজটা এতো সংক্ষিপ্ত না। দু’পা ফেল্লাম আর লক্ষ্যে পৌঁছে গেলাম এমনটা আমার ক্ষেত্রে হবে না। আমাকে আরো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে সেই রূপ দর্শনের জন্য যে রূপ দেখলে আমি ফানা হবো। তার চরণে লুটায়ে পরবো। আর থাকবে না সেই আকুতি-

যদি গৌর চাঁদকে পাই।
গেল গেল এ চার কুল
তা’তে ক্ষতি নাই।।

কি ছার কুলের গৌরব করি
অকুলের কুল গৌর হরি,
এ ভব তরঙ্গে তরী
গৌর গোঁসাই।।

জন্মিলে মরিতে হবে
কুল কি কার সঙ্গে যাবে,
মিছে কেবল দুই দিন
ভবে,কুলের বড়াই।।

ছিলাম কুলের কুলবালা
স্কন্ধে লয়ে আছলা ঝোলা,
লালন বলে গৌর বালা
আর কারে ডরাই।।

নহির সাঁইজি সেই রাতে বলেছিলেন, “একজনমের র্কীতিতে গুরুর সন্ধান পাওয়া যায় না বাপ। জন্মজন্মান্তরের সুর্কীতি লাগে গুরুর দর্শন পেতে। আর পরমের দর্শন পেতে কয় জনম লাগে তার হিসাব নেই। কিন্তু কীর্তি যদি যথাযথ হয় তাহলে একজনমেও হতেই পারে।”

কত জনম লাগবে সেই রূপের দর্শন পেতে ভেবে ভেবে কুল পাই না। কি সেই রূপ যা দেখলে এই ব্যাকুল আত্মা বলে উঠবে- “ঐ রূপ যখন স্মরণ হয়/থাকে না লোকলজ্জার ভয়”। এই যে যাত্রা… এই যে চলাচল… তা কি গুরুর সন্ধান? নাকি পরমের সন্ধান??

কাকে খুঁজবো??? প্রশ্নটা শুনে নাম ভুলে যাওয়া এক সাধুগুরু বলেছিল, “বাপ! সবকিছুর একটা উছিলা লাগে; চুল কাটতে গেলে যেমন নাপিত লাগে, মামলা করতে গেলে যেমন উকিল লাগে, পড়াশোনা করতে গেলে যেমন শিক্ষক লাগে, জন্ম নিতে গেল যেমন মা-বাপ লাগে তেমনি পরমকে পাইতে গেলে গুরু লাগে।

নিজেরে জানতে গেলে গুরু বিনা সাধন হয় না। গুরুই শিষ্যর মধ্যে সেই আলোক জ্যোতিকা প্রজ্বলিত করে। যার আলোতে জ্ঞানের বিকাশ হয়। আর যে জ্ঞানী হয় সেই তাঁর সন্ধান পায়। জ্ঞান প্রাপ্তিই আসল কথা। এই জ্ঞান সাধারণ জ্ঞান না বাপ। সামাজিক বা ধার্মীয় জ্ঞানও না; এটা হইলো আধ্যাত্মিক জ্ঞান।

সকলে এই জ্ঞান ধারণ করতে পারে না। তাই গুরু যারে উপযুক্ত মনে করে তারে এই জ্ঞান দান করে। এই জ্ঞান গুপ্তজ্ঞান সকলরে দেয়া যায় না। এই জ্ঞান ধারণ করার জন্য নিজেরে প্রস্তুত করতে হয়। নিজে প্রস্তুত না হইলে গুরুও জ্ঞান দিতে পারে না। তবে উপযুক্ত গুরুর দরশন পেয়ে গেলে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় না বাপ।”

সাধু শেষে একটা শব্দ জুড়ে দিলেন “উপযুক্ত গুরু”; এই উপযুক্ত শব্দটাই সকল বিভ্রান্তির মায়াজ্বালের ধোয়া তোলে। একটু সময় নিয়ে সাধুকে বলেছিলাম, সাধু! উপযুক্ত গুরু চিনবে কি মতে?

সাধু ফিক্ করে হেসে বলছিল, সে নিয়ে চিন্তা নাই বাপ; যদি কপালে থাকে তাহলে ঐ চোখে চোখ পড়লেই বুইঝা যাবেন বাপ। এ জিনিস তো আর ফেরিওয়ালার কাছে পাওয়া যায় না। কপাল নিয়া জন্মাইতে হয়।

সাধুরা সকল সময়ই রহস্য করে কথা বলেন। রহস্য নিয়েই তাদের যত কর্মযজ্ঞ; তাই তাদের কথায় রহস্য থাকবে সে আর নতুন কি? কিন্তু এই রহস্য ভেদ করা আমার মতো সাধারণের পক্ষে বেশ জটিল। কারণ সাধুরা কেবল রহস্য করেই থামেন না।

কথার ভেতরে এমন কিছু বীজ পুতে দেন যা উর্বব ভূমি পেলে প্রতিনিয়ত ডালপালা বিস্তৃত করেই চলে। অনবরত ঠকঠক করে দরজায় কড়া নেড়ে মনে করিয়ে দেয় সেই তাড়নার কথা। আমার মস্তিষ্ক উর্বর না হলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই বীজ বিস্তার লাভ করতে শুরু করে দেয়।

সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও অনেক সাধু-গুরুর সাথেই তো সাক্ষাৎ হলো। প্রাণের খুব কাছে কাছে কেউ অবস্থানও করে কিন্তু সেই চোখ কোথায় পেলাম। যে চোখে চোখ পরলে আর পেছন ফিরে থাকতে হবে না। ফুরাবে এ ধারিত্রীচারণ… সূচনা ঘটবে ব্রহ্মচারণ…

রসুল কে চিনলে পরে
খোদা পাওয়া যায়,
রূপ ভাঁড়ায়ে দেশ বেড়ায়ে
গেলেন সেই দয়াময়।।

জন্ম যাঁহার এই মানবে
ছায়া তাঁর পড়ে নাই ভূমে,
দেখ দেখি তাই বর্তমানে
কে এলো এই মদিনায়।।

মাঠে ঘাটে রসুলেরে
মেঘে রয় ছায়া ধরে,
জানতে হয় লেহাজ করে
জীবের কি সেই দরজা হয়।।

আহমদ নাম লিখিতে
মিম হরফ কয় নফি করতে,
সিরাজ সাঁই কয় লালন
তোকে কিঞ্চিৎ নজির দেখাই।।

একবার এক সাধকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আচ্ছা সাধু! এমন কি হতে পারে যে গুরুর দরশন পেয়েও শিষ্য তাকে চিনতে পারলো না? সাধক হেসে বলেছিল, বাপ! সবতো চোখের সামনেই আছে, যার চোখ আছে সে দেখতে পায়। যার চোখ খোলে নাই সে দেখতে পায় না। গুরুর চরণ ধরে সেই জ্ঞান দৃষ্টি খুলতে হয়।”

সাধু! গুরু ছাড়া কি সেই দিব্যদৃশ্য খোলে না? গুরু ছাড়া কি পরমকে লাভ করা সম্ভব না? প্রশ্নটা শুনে সাধক অনেক সময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর দীর্ঘক্ষণ হাতের চায়ের কাপের তলানীতে জমে থাকে শেষ চুমুকের চায়ের নিচে যে চা-পাতা ডুবেছিল তার দিকে তাকিয়ে থাকলো।

একটা দীর্ঘ নি:শ্বাস ফেলে বললো, বাপ! আপনার কপালে দু:খ আছে। আমি অনেকটা সময় দিয়ে গলা পরিস্কার করে বললাম, কেনো সাধু? এক চুমুকে শেষ চা টুকু পান করে কাপখানা দোকানীকে ফেরত দিয়ে সাধু মহাশয় সোজা হাঁটা দিলেন। আমি তার পিছু পিছু।

অনেকটা এগিয়ে একজায়গায় দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করলেন, সেটাও সম্ভব বাপ; তবে সে পথ অনেক কঠিন, অনেক ধৈর্য্য, অনেক অধ্যাবশায় লাগে। এটা ঘুর পথ, এই পথে গেলে এতো চক্করে পরতে হয় বাপ; যার হিসাব নাই। যদি সেই চক্কর থেকে বের হওয়ার মনোবল থাকে তাহলে সে পথে যাওয়া ভালো। নইলে বিপদ।

একথা বলে সাধু জনারণ্যে মিশে গেলো। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একা। আজো যেমন আছি। তবে কি আমি সেই চক্করের ফাঁদে পরে গেছি? এই বন্দিদশা থেকে কে আমায় বের করবে? নাকি চক্করের ভুলভুলাইয়ায় ঘুরতে হবে জন্মজন্মান্তরে? মনে পরে যায় সাঁইজি’র পদ-

না হলে মন সরলা
কি ধন মেলে কোথায় ঢুঁড়ে,
হাতে হাতে বেড়াও
কেবল তওবা পড়ে।।

মুখে যে পড়ে কালাম
তাইরি সুনাম হুজুর বাড়ে,
ও যার মন খাঁটি নয় বাঁধলে কী হয়
বনে কুঁড়ে।।

মক্কা মদিনা যাবি
ধাক্কা খাবি মন না মুড়ে,
হাজি নাম পাড়ানোর লভ্য কেবল
জগৎ জুড়ে।।

মন যার হয়েছে খাঁটি
মুখে যদি গলদ পড়ে,
তাতে খোদা নারাজ নয় রে
লালন ভেড়ে।।

একদিন রাতরাত আবহওয়ায় বাড়ি ফিরছি রিকশা করে। পুরান ঢাকার কলতাবাজারের অন্ধকার অংশ থেকে একটা মটর সাইকেল পিছু নেয়া শুরু করলো। সেসময় এই রাস্তাটা খুবই নির্জন হয়ে যেত সন্ধ্যা লাগার পর থেকেই। ছিনতাই-রাহাজানি নিত্যদিনের ঘটনা। সেসব ভেবে আমিও আৎকে উঠলাম।

রিকশাওয়ালাও হয়তো কিছু টের পেয়েছে। সেও হঠাৎ করে মটর সাইকেলকে সাইড না দিয়ে জানপরাণ দিয়ে টানতে শুরু করলো। কারণ কয়েক’শ গজ সামনে গেলে আবার আলোকিত রাস্তার ঘনবসতির মধ্যে পরবো। সম্ভবত রিকশাচালক সেই আশায় ছুটছে। আমার ভেতরটা ধরফর করে উঠলো। কিন্তু রিকশা কি আর মটরসাইকেলের সাথে পারে?

মিনিট পার হওয়ার আগেই মটর সাইকেল প্রচণ্ড হর্ণ দিতে দিতে রিকশার পাশাপাশি চলে এলো। পাতি মাস্তানের মতো পোষাক পরা এক যুবক আমার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে বললো ভাই আমারে চিনছেন? আমি ফালান।

নামটা শোনার পরই যেন স্মৃতি পেছন দিকে দ্রুত দৌড়াতে শুরু করলো। তখনো আমরা কাঠের পুলের সেই বাসাতেই ভাড়া থাকতাম। একদিন মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে বাসায় ফিরে দেখি ছোট্ট উঠানের পরে খোলা বারান্দায় আমার বয়সী একটা ছেলে বসে কি যেনো খাচ্ছে।

আমাকে দেখে হে হে করে হাসতে থাকলো। নাম জানলাম ‘ফালান’। নতুন বুয়ার ছেলে। এই ছেলে অতি বদ। কারো কথাই নাকি শোনে না।

আমাদের ভাড়া বাসার জানালা দিয়ে দূর থেকে কাঠের পুলের মাঝের সমতল উঁচু অংশের অনেকটা দেখা যেতো। প্রধান সড়ক লাগোয়া হওয়ায় বাসার সামনের দিকের গেট সব সময়ই বন্ধ থাকতো। ছোট্ট উঠান আর বারান্দা পেরিয়ে প্রথম যে ঘরটা ছিল তার জানালা দিয়ে অলস দুপুরে আমি তাকিয়ে তাকিয়ে পুলের উপর দিয়ে চলে যাওয়া বা ফিরে আসা মানুষগুলোকে দেখতাম।

দূরত্ব খুব বেশি না হলেও বড় রাস্তা দিয়ে কোথাও একা যাওয়া বারণ ছিল বিধায় মন চাইলেও সেখানে যেতে পারতাম না। পুলের উঁচু অংশটার দু’পাশে বিশাল অশ্বত্থ গাছ দুইটা চোখের সামনের আকাশ আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকতো শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায়; তাতে বসে থাকা শকুনের পাল এখনো স্পষ্ট চোখে ভাসে।

প্রতিক্ষণে ভাবতাম দৌঁড়ে সেই অশ্বত্থ তলায় যাই। যদিও তখন সেগুলোকে বটগাছ বলেই জানতাম। পুলের বা’পাশে ছিল অনুচ্চ দেয়াল ঘেরা বিশাল এক মাঠ।

মাঠের এক কোণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের একটা অফিসঘর। সেই অফিস ঘরের পাশে আরেকটা অশ্বত্থ গাছ; এটার আকার অন্য দুটি থেকে অনেকটা ছোট হলেও আকারে কোনোটাই কম ছিল না। আর পুলের ডান পাশে ছিল বহুদিন আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা তেলের মিল। বর্ষায় খালের পানি বেড়ে গেলে দিগন্ত জুড়ে চকমচে সবুজে ভরে যেতো পুরো দৃষ্টির সীমানা।

জানালা দিয়ে পুলের পাশের বড় বড় ঘাসের মাঠটার দিকে তাকিয়ে ভাবতাম একদিন আমিও একাই যাব ঐখানে। দৌঁড়ে বেড়াবো বিশাল ঘাসের ভেতরে। কিন্তু তার অনুমতি ছিল না। ঐখানে জ্বীন-ভূত থাকে এমন সব কথা বলে ভয় দেখিয়ে রাখা হতো।

বড়রা ছোটদের ছোটবেলা থেকেই কেনো যে মিথ্যা বলে ভয় দেখায় কে জানে। হয়তো বড়দের এতো সময় নেই ছোটদের ছোট ছোট ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়ার।

যে সময়টাতে জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে এসব কথা ভাবতাম তখনই ফালান এসে উপস্থিত হয় আমার শৈশবে। ফালানের মা পুত্রকে বারান্দায় একটা বাটিতে কিছু খাবার খেতে দিয়ে কঠিন করে বলতেন এই জায়গা থেকে নড়লে শক্ত মাইর।

সেও বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হে হে করে হেসে উঠতো। কিছু সময় ঠিকঠাক বসেও থাকতো। তারপরই দরজা খুলে পালাতো।

ধীরে ধীরে তার সাথে আমার একধরনের সখ্যতা গড়ে উঠলো। স্কুল থেকে এসে ফালানকে যেদিন পেতাম সেদিন আড্ডা জমে যেত। সে তার বিশ্বয়কর অভিযানের কথা বলতো একের পর এক।

সে কত দূরে একা একা যেতে পারে, কি করে চলন্ত রিকশার পেছনে ঝুলে পরতে পারে, শীতকালে কি করে কাঠের পুলের নিচ দিয়ে পার হওয়া যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। ফালান সব সময়ই হে হে করে হাসতো।

একবার হাসতে শুরু করলে সে আর থামতে পারতো না। কথা বলার সময় বড় মাথাটা এমনভাবে নাড়তো যেন ধর থেকে মাথাটা ঝিটকে পরবে। পরনের শার্টের বোতাম খেয়ে ফেলা তার অন্যতম বদবাস ছিল।

প্রথম প্রথম ওর বোতামছাড়া শার্ট দেখে আম্মা আমার পুরানো শার্ট ওকে দিতো; কিন্তু কিছু সময় পরই দেখা যেত সব বোতাম খেয়ে নিয়েছে। জিজ্ঞাসা করলেও হে হে শব্দ করে হাসতো।

আমার বন্দিদশার শৈশবে ফালানের কথাগুলো স্বপ্নের মতো মনে হতো। নিচু স্বরে কানের কাছে মুখ এনে বলতো আপনেরে একদিন নিয়া যামুনে; কাউরে বইলেন না। এইসব আশ্বাসবাণী শুনে মন চনমন করে উঠতো। তবে মনে সাধ থাকলেও সাহসে কুলাতো না। ভাবতাম একদিন আমিও…।

নাদের আলীর মতো ফালান অবশ্য ফাঁকি দেয়নি। আমার মাথা ঘরের ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করার আগেই এক দুপুরে সবার চোখের আড়ালে আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল সেই অশ্বত্থ গাছের ছায়াঘেরা মাঠটায়।

আমি ভয়ে আতঙ্কে উচ্ছ্বসে উদ্দিপনায় হাফাতে হাফাতে তার পেছন পেছন যাচ্ছিলাম আর পেছনে ভেঙ্গে পরছিল আমার পরাধীনতার সংস্কার।

অনেক পরে টিভিতে অপু-দুর্গার সেই কাশফুলের ভেতর দিয়ে দৌঁড়ে ট্রেন দেখতে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখে প্রথমটায় চমকে উঠেছিলাম। মনে পরেছিল ফালানের কথা।

সম্ভবত সবারই এইরকম একটা গল্প থাকে জীবনে; যা কিনা পথের পাঁচালী দেখতে দেখতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পর্দায় ছুটে চলা ট্রেনের শব্দের ভেতর দিয়ে দর্শক খুঁজে পায় শৈশবের সেই উত্তেজনার মাদল।

সেদিন রিকশা থামিয়ে ফালান আমাকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিল দামী হোটেলে। অনেক খাওয়া-দাওয়া আড্ডা হয়েছিল। শুনিয়েছিল তার রোমাঞ্চকর আর অনেক অনেক অভিযানের কথা। তবে সে সব অভিযান শৈশবের মতো নির্দোষ ছিল না।

আমি নতুন করে আর ফালানের সাথে বিশেষ যোগাযোগ রাখিনি। বাড়ি ফেরার রাস্তাও পাল্টে ছিলাম। নাহ্ সামাজিক বৈষম্যের সংস্কার থেকে নয়; ফালান ততদিনে ঢাকার এক টপ ট্যাররের নিচে কাজ করছিল। তখন সে ভিন্ন নামে পরিচিত।

যেদিন পত্রিকায় ফালানের এ্যানকাউন্টারের খবর পড়েছিলাম তখন আবার আমাকে ডুবিয়েছিল আমার শৈশবের নাদের আলীর ভাবনায়। ফালানই আমাকে প্রথম সীমানার বাইরে নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল। আমাকে দেখিয়েছিল সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে কি করে স্বপ্নের ভেতর ঢুকে পরতে হয়।

দুপুরের সেবা নিয়ে আমরা নহির সাঁইজির হেমাশ্রম থেকে রওনা হয়ে গেলাম। কিন্তু নহির সাঁইজি আমার মাথার ভেতরে আসন গেড়ে বসে রইলেন। সাধুগুরুদের প্রতি প্রেম বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন।

ফালানের মতো মানুষরা যেমন সীমারেখা পেরিয়ে নিজেকে নিজের থেকে দূরে বহুদূরে নিয়ে যাওয়ার দিগন্ত উন্মোচন করে; ঠিক তেমনি নহির সাঁইজির মতো সাধুগুরুরা সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড গুটিয়ে নিরবে-নিভৃতে নিজের ভেতরে প্রবেশ করার পথ দেখায়।

নিজেকে চিনতে শেখায়। এ যাত্রা তো নিজেকে চেনারই যাত্রা… নিজেকে জানারই যাত্রা…।

তবে এই অন্তহীন যাত্রার কোনো শুরুও নেই কোনো শেষও নেই। এ এক আজব ভুলভুলাইয়া। এই ভুলভুলাইয়ার সময়চক্রে গুরু আলোক বর্তিকা হাতে শিষ্যকে পথ দেখায়। আর যার গুরু নেই সে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়।

আমিও তাদেরই দলে চক্কর খেতে খেতে ভাবি একদিন আমিও…। কেউ যেন বহুদূরে বা বহুকাছে থেকে গেয়ে উঠে-

কেন ডুবলি না মন গুরুর চরণে।
এসে কাল শমন বাঁধবে কোন দিনে।।

আমার পুত্র আমার দারা
সঙ্গে কেউ যাবেনা তারা যেতে শ্মশানে
আসতে একা যেতে একা তা কি ভাবিসনে।।

নিদ্রাবশে নিশি গেলো
মিছে কাজে দিন ফুরালো চেয়ে দেখলি নে
এবার গেলে আর হবেনা পড়বি কুক্ষণে।।

এখনও তো আছে সময়
সাধলে কিছু ফল পাওয়া যায় যদি লয় মনে
সিরাজ সাঁই বলেরে লালন ভ্রমে ভুলিসনে।।

(চলবে…)

…………………………..
আরো পড়ুন:
মাই ডিভাইন জার্নি : এক :: মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
মাই ডিভাইন জার্নি : দুই :: কবে সাধুর চরণ ধুলি মোর লাগবে গায়
মাই ডিভাইন জার্নি : তিন :: কোন মানুষের বাস কোন দলে
মাই ডিভাইন জার্নি : চার :: গুরু পদে মতি আমার কৈ হল
মাই ডিভাইন জার্নি : পাঁচ :: পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
মাই ডিভাইন জার্নি : ছয় :: সোনার মানুষ ভাসছে রসে
মাই ডিভাইন জার্নি : সাত :: ডুবে দেখ দেখি মন কীরূপ লীলাময়
মাই ডিভাইন জার্নি : আট :: আর কি হবে এমন জনম বসবো সাধুর মেলে
মাই ডিভাইন জার্নি : নয় :: কেন ডুবলি না মন গুরুর চরণে
মাই ডিভাইন জার্নি : দশ :: যে নাম স্মরণে যাবে জঠর যন্ত্রণা
মাই ডিভাইন জার্নি : এগারো :: ত্বরাও গুরু নিজগুণে
মাই ডিভাইন জার্নি : বারো :: তোমার দয়া বিনে চরণ সাধবো কি মতে
মাই ডিভাইন জার্নি : তেরো :: দাসের যোগ্য নই চরণে
মাই ডিভাইন জার্নি :চৌদ্দ :: ভক্তি দাও হে

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!