ভবঘুরে কথা
বেণীবাধব ব্রহ্মচারী

-শ্রী সুভাষ চন্দ্র বর্মণ

সনাতন ধর্ম বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্ম। এই ধর্ম কোনো ব্যক্তি বিশেষের দ্বারা সৃষ্ট নয় বা কোনো ব্যক্তি বিশেষের তৈরি অনুশাসনেও এই ধর্মের অনুসারীগণ পরিচালিত নয়। যুগে যুগে পৃথিবীতে ভগবান মানবদেহ ধারণ করে অবতাররূপে আবির্ভূত হয়েছেন এবং অধর্ম দূরীকরণ, ধর্ম স্থাপন ও লোক শিক্ষাদানের বহু দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। বিশ্বামিত্র, মধুছন্দা, বশিষ্ঠ, ব্যাসদেব, নারদমুনি, বাল্মীকি প্রমুখ সত্যদ্রষ্টা ঋষিগণ ধ্যানযোগে যে সত্যবস্তু উপলদ্ধি করেছিলেন তা সব গুরু-শিষ্য পরম্পরায় আমাদের মধ্যে এসেছে।

আবার যুগে যুগে বহু মহাপুরষ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে জগতের কল্যাণের জন্য কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জন্য অনেক উপদেশ রেখে গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেমন- স্বামী প্রণবানন্দ, স্বামী নিগমানন্দ, তৈলঙ্গস্বামী, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, স্বামী পরমানন্দ, শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী এবং শ্রীশ্রী বেণীমাধব ব্রহ্মচারী এবং আরও অনেকে।

এইসব অবতার পুরুষ সত্যদ্রষ্টা ঋষি এবং মহাপুরুষগণের আদেশ, নির্দেশ ও উপদেশে সনাতন ধর্ম প্রতিষ্ঠিত এবং সনাতন ধর্মের রত্ন ভাণ্ডারকে যাঁরা মহা মূল্যবান সম্পদে পরিপূর্ণ করেছেন তাঁদের মধ্য শ্রীশ্রী বেণীমাধব ব্রহ্মচারী একজন।

গুরু ভগবান গাঙ্গালী সর্বশাস্ত্র বিশারদ। আর শিষ্যদ্বয় শ্রীশ্রীলোকনাথ ও শ্রীশ্রী বেণীমাধব ছিলেনৈ সর্বত্যাগী। ত্যাগী-ত্যাগীর মহামিলনের কারণই বৈদিক যুগের লুপ্ত জ্ঞানযোগ গুরু ভগবান গাঙ্গুলী তাঁর দুই শিষ্যের মাধ্যমে পুনরায় জাগরিত করেন। এর মূল শক্তি গুরু ভাগবান গাঙ্গুলী সর্ব সাধনলব্ধ জ্ঞানকে শিষ্যদ্বয়ের মাঝে প্রয়োগ করেছেন সুনিপুনভাবে। গুরুর কৃপা ব্যতীত আত্মদর্শন হয় না।

রত্নগর্ভা বঙ্গ জননীর কোল আলোকিত করে ১১৩৭ বঙ্গাব্দে এক শুভলগ্নে পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট অঞ্চলে কাঁকড়া-কচুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীশ্রী বেণীমাধব ব্রাহ্মচারী। ফুটফুটে চাঁদের মত আলোকিত, ত্যাগের আদর্শের মূর্ত প্রতীক। মা-বাবার আশার আলো। পবিত্র কাঁকড়া-কচুয়া গ্রামে জন্ম হয়েছিল ভারত বিখ্যাত শাস্ত্রজ্ঞপণ্ডিত গুরু ভগবান গাঙ্গুলীর। সর্বশাস্ত্র বিশারদ মহাপণ্ডিত ছিলেন তিনি। একই গ্রামে জন্ম হয়েছিল পূর্ণব্রহ্ম জগদৃত শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারীর।

আমাদের গর্বের কচুয়া গ্রাম। কচুয়া গ্রামকে আমরা ত্রিবেণী সঙ্গম বলি- গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর মিলন ক্ষেত্র ত্রিবেণীর মতো সুপ্রাচীন দীর্ঘ গঙ্গা বা দ্বিতীয় গঙ্গা যা আজ দিগঙ্গা নামে পরিচিত। সেই পবিত্র গঙ্গার অন্তর্গত কচুয়া গ্রামে আর একটি ত্রিবেণী সঙ্গম হয়েছিল তিন মহাপুরুষের আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে। সেই তিন মহাপুরুষ হলেন- গুরু ভগবান গাঙ্গুলী, লোকনাথ ব্রহ্মচারী এবং বেণীমাধব ব্রহ্মচারী।

লোকনাথ এগারো বছরে পদার্পণ করেন। বৈদিক কর্মযজ্ঞে নিপুণ, প্রবীণ ভগবান গাঙ্গুলী এক অতি শুভলগ্নে স্থির করলেন তাঁর উপনয়নের সংস্কারের জন্য। সেই সঙ্গে সর্বসমক্ষে ঘোষণা করেন তাঁর সিদ্ধান্ত যে, ঐ একই দিনে তিনিও তাঁর গার্হস্থ্য ধর্ম ত্যাগ করে লোকনাথকে সঙ্গে নিয়ে অরণ্যবাসী হবেন শাশ্বত সত্যলাভের জন্য। একথা শুনে বাবা লোকনাথের বাল্যবন্ধু বেণীমাধব বললেন- লোকনাথ আমিও তোর মতো সন্ন্যাাষী হবো। বাবা লোকনাথ বেণীমাধবকে অনেক বারণ করেছেন কিন্তু বেণীমাধব কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তিনিও লোকনাথের সাথে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করবেন। তাই গুরু ভগবান গাঙ্গুলী স্থির করলেন লোকনাথের সমবয়সী খেলার সাথী বেণীমাধবের উপনয়ন সংস্কারও একই দিনে হবে।

বেণীমাধবের পিতা-মাতা এবং পরিবারের উপর এই ঘোষণা যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই মনে হয়। বেণীমাধবের মা পরম স্নেহভরে সন্তানকে বুকে টেনে নেন, আদর করে বোঝান সাধু জীবনের কষ্ট এবং কৃচ্ছের কথা। মা বলেন, ‘বেণী তুই বালক, তুই জানিস না ও পথ কত কঠিন। অনিশ্চয়তায় ভরা কন্টকময় পথে তোকে আমি কি করে ছেড়ে দিই বাছা?’ লোকনাথের বাবা-মা জন্ম থেকেই তাঁকে উৎসর্গ করে রেখেছেন ভগবানের সেবার জন্য। কিন্তু তোকে নিয়ে যে আমাদের কত আশা, তুই আমাদের প্রাণে এত আঘাত করিস না। সংসারে থেকে বাবা-মা’র সেবা করে কত মুনি-ঋষি ভগবান দর্শন করেছেন, তুইও সেই পথ বেছে নে, ঠিক তাঁর কৃপা পাবি।

জন্মান্তরের শুদ্ধ সংস্কারের বীজগুলো সাত্ত্বিক আধারে অঙ্কুরিত হয়ে উঠেছে বেণীমাধবের অন্তরে। তাই মাতার কাতর ক্রন্দন, পিতার যুক্তি কিছুই তার বালক মনের দৃঢ় সঙ্কল্পকে টলাতে সক্ষম হয়নি। বেণীমাধব যে লোকনাথের কেবল খেলার সাখী নয়, সে যে তাঁর আত্মার আত্মীয়, সারা জীবনের বন্ধুর কৃচ্ছময় সাধন পথের সহযাত্রী। এ যে ঈশ্বর প্রদত্ত বিধান। কোনভাবেই বেণীমাধবকে তার অটল সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্যূত করা যাবে না।

গুরু ভগবান গাঙ্গুলী বেণীমাধবের উপনয়ন সংস্কার একই সঙ্গে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং লোকনাথের সঙ্গে বেণীমাধবকেও সঙ্গে নেবেন বলে বালক বেণীমাধবকে প্রতিশ্রুতি দেন। আচার্য গুরুর মুখ থেকে প্রতিশ্রুতির বাক্য শুনে দুই বালকই ঐ দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে।

একাদশ বছর বয়স্ক দুই বালক সন্ন্যাসীকে নিয়ে বৃদ্ধ মহাপণ্ডিত ভগবান গাঙ্গুলীর গৃহত্যাগের খবর যেন চারিদিকে ছড়িয়ে পরে। গ্রামের লোকজন একে একে ভিড় করে উক্ত অনুষ্ঠানে। বৈদিক আচারে উপনয়ন সংস্কারের শুভ দিনটিতে দলে দলে উৎসুক নর-নারী এসে উপস্থিত হন অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে। উপস্থিত নর-নারীগণ চোখের জলে বিদায় জানান দুই বালক সন্ন্যাসী ও মহাপণ্ডিত গুরু ভগবান গাঙ্গুলীকে। সবচেয়ে বেশি ভেঙ্গে পরেন বেণীমাধবের মমতাময়ী মা। তাকিয়ে আছেন বেণীমধবের দিকে, আজই তাঁর প্রাণপ্রিয় বেণীমাধব গৃহত্যাগী হবে, আর তিনি সন্তানকে কোনদিন দেখতে পাবেন না। হায়রে অভাগা মা! কত ধৈর্য তোমার। জগতের মঙ্গলের জন্য সন্তানকে পাঠালে সন্ন্যাসী করে!

উপনয়ন সংস্কার সম্পন্ন করেন আচার্য গুরু ভগবান গাঙ্গুলী। এবার বিদায়ের পালা। দুই বালক সন্ন্যাসী পৃথক পৃথকভাবে পিতা-মাতার কাছ থেকে আর্শীবাদ গ্রহণ করবেন। ভিক্ষার ঝুলি হাতে বেণীমাধব ভিক্ষা গ্রহণ করে এবং গুরুর আদেশ নিয়ে পিতা-মাতার কাছে এসে উপস্থিত হন। বিদায়ের অনুমতি এবং আর্শীবাদ গ্রহণ করার জন্য। উপস্থিত সকলেই করলেন লোকনাথ ও বেণীমাধব যেন পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে পারেন।

বৃদ্ধ গুরু ভগবান গাঙ্গুলী দুই বালক সন্ন্যাসীর হাত ধরে চলছেন গ্রামের পথ-প্রান্তরে। উদাসীন মন। নিরলসভাবে চলছেন। প্রথমে স্থির করলেন মহাশক্তির মহাপীঠ কালীঘাট যাবেন। পরমকৃচ্ছ এবং ত্যাগ তিতিক্ষাময় মহাতীর্থ কালীঘাটের জগন্মাতার চরণে প্রণাম নিবেদন করে তাঁর কৃপা ভিক্ষা চেয়ে নিয়ে তিনজন রওনা হন লোকচক্ষুর অন্তরালে কঠিন ব্রহ্মচর্য সাধনের ঐকান্তিক ইচ্ছা নিয়ে পরম লক্ষ্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে। গুরু ভগবান বেছে নেন এমন এক স্থান যা নিরবচ্ছিন্ন ব্রহ্মচর্য সাধনের জন্য হবে অতি অনুকূল। অথচ ইচ্ছামত তিনি নিজেই সংগ্রহ করে আনতে পারবেন ভিক্ষালব্ধ আহার সামগ্রী।

কিছুদূর অগ্রসর হয়ে তাঁরা অরণ্যানীর মধ্যে একটি নিভৃত স্থান বেছে সাধু-সন্ন্যাসীর বসবাসযোগ্য করে নেন। এক সময় গুরুদেব তাঁদের ব্রহ্মানুষ্ঠানে নিয়োগ করলেন। প্রথমে নক্তব্রত আরম্ভ হলো। ‘নক্ত’ শব্দটির অর্থ রাত্রি। এ ব্রতে দিনের বেলা গুরুনির্দিষ্ট জপে তবে অনাহারে কাটিয়ে রাতে হবিষ্য ভোজন করতে হয়। গুরু ভগবান গাঙ্গুলী শিষ্যদ্বয়কে ব্রত সাধনে বনের মধ্যে রেখে দিনের শেষভাগে ভিক্ষা সংগ্রহের জন্য নিজে লোকালয়ে যেতেন এবং তিল ও দুধ সংগ্রহ করে আনতেন। তাঁর দিব্যমূর্তি দর্শনে গৃহীরা তাঁকে সাধক মনে করে সাধ্যমত ভিক্ষা দান করে কৃতার্থ হতেন।

সংযম নক্তব্রতের অন্যতম অঙ্গ সুতরাং শিষ্যদ্বয়ের ও নিজের প্রয়োজন যতটুকু ততটুকুই প্রতিদিন ভিক্ষা করেন। ভিক্ষা সগৃহীত হলেই যথাসময়ে শিষ্যদরে কাছে চলে আসতেন। শিষ্যগতপ্রাণ গুরু। গুরু এসে নিজ হাতে ভ্ক্ষিালব্ধ তিলদুগ্ধ দিয়ে হবিষ্য প্রস্তুত করেন এবং দেবতাকে নিবেদন করে শিষ্যদের আহার করাতেন এবং নিজেও আহার করতেন। ব্রহ্মচর্যের এই অবস্থায় যোগসাধন ও আহার করতেন এবং নিজেও আহার করতেন। ব্রহ্মচর্যের এই অবস্থায় যোগসাধন ও আহার বিষয়ে নিয়মাদি পালন অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। দেহরক্ষার জন্য আহার অনুষ্ঠানের নিয়ম অনুসারে ব্রতগুলির নাম যথাক্রমে নিম্নরূপ:

নক্তব্রত- সারাদিন উপবাস থেকে রাতে একবার আহার গ্রহণ।
একান্তরা- পুর্ণ একদিন উপবাস থেকে পরের দিন একবার আহার গ্রহণ।
ত্রিরাত্রি- তিন দিন উপবাস থেকে চতুর্থ দিনে আহার।
পঞ্চাহ- পাঁচ দিন উপবাস থেকে ছয় দিনে আহার।
নবরাত্রি- নয় দিন উপবাস থেকে দশ দিনে আহার।
দ্বাদশাহ- বারো দিন উপবাস থেকে তের দিনে আহার।
পঞ্চদশাহ- পনেরো দিন উপবাস থেকে ষোল দিনে আহার।
সবশেষ মাসাহ- এক মাস উপবাস।

…………………………………………………………..
গ্রন্থসূত্র:
১. শ্রীশ্রীলোকনাথ মাহাত্ম্য -শ্রী কেদারেশ্বর সেনগুপ্ত।
২. শিবকল্প মহাযোগী শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী -শ্রীমৎ শুদ্ধানন্দ ব্রহ্মচারী।

…………………………………………………………..
আলোকচিত্র:

বেণীমাধব ব্রহ্মচারীর জন্মভিটা ও লোকনাথ ব্রহ্মচারী

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!