স্বরূপ সন্ধানী দার্শনিক

স্বরূপ সন্ধানী দার্শনিক

-খান জিয়াউল হক

মনোরঞ্জন গোঁসাই: স্বরূপ সন্ধানী দার্শনিক

কবে সাধুর চরণ ধুলি মোর লাগবে গায়,
আমি বসে আছি আশা সিন্ধু কুলে সদায়।।

জনমভর গুরুর চরণধুলির সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছেন সাধক লালন সাঁই। মানুষের মাঝেই তাঁর মুক্তি। ঈশ্বর, আল্লাহ্, গড, ভগবান কিছুই যেন মেলা দায় যদি আপনারে না চেনা যায়। লালন বারবার বলেছেন, মানুষ ধর মানুষ ভজ তবেই পাবে তাঁরে।

মানবতার মহান বাণীকে পাথেয় করে ফকির লালন সাঁই যে পথের সন্ধান করেছেন, সে পথেরই সন্ধানে জীবনভর নিজেকে মগ্ন রেখেছিলেন মনোরঞ্জন গোঁসাই। ব্যক্তিগতভাবে মনোরঞ্জন বসু ও তার পরিবারের সাথে আমার সখ্যতা অনেকদিনের।

মনোরঞ্জন গোঁসাই একেবারেই সাধারণ একজন মানুষ। পেশায় চিকিৎসক। মাগুরা অঞ্চলে লালন ও বাউল দর্শন প্রচারে এবং মানব মুক্তির মন্ত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কাজ করেছেন। সাধারণ মানুষের সাথে তার ওঠা-বসা। জীবনাচরণে অত্যন্ত সাদামাটা এই মানুষটির সাথে কথা বলে বোঝা যায় না, কি এক অপার্থিব সত্যের সন্ধানে তিনি ঘুরে বেড়ান।

সাধারণের মাঝেই খুঁজে বেড়ান অসাধারণ কিছু। সত্যিই তাই, শুধু ঈশ্বর ইশ্বর করে ডাকলেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানুষের মাঝেই তো ঈশ্বর।

সত্যি কথা বলতে কি মনোরঞ্জন বসুর সাথে কথা বলে কারো মনে হয়নি তিনি একজন সাধক। কিন্তু যখনই তার দর্শন নিয়ে কথা উঠেছে তখনই বোঝা যেত কত গভীরে ভাবতে পারেন তিনি। তার লেখা পড়ে তাকে মেলানো কঠিন। এত সুন্দর মানুষের ভাবনা এত সুদূরে যেতে পারে?

আমরা ধর্ম পালন করতে গিয়ে ঈশ্বরকে খুঁজতে গিয়ে কখনো কখনো নিজেকেই ভুলে যাই। অথচ আমি আমাকে চিনতে না পারলে কি করে খুঁজে পাব ঈশ্বরকে?

শুধু কি আল্লা বলে ডাকলে তাঁরে
পাবি ওরে মন পাগলা,
যেভাবে আল্লাতালা বিষম লীলা
ত্রিজগতে করছে খেলা।।

কতজন জপে মালা তুলসিতলা
তাতে লয়ে মালার ঝোলা,
কতজন হয় উদাসী তীর্থবাসী
মক্কাতে দিয়াচে মালা।।

আপনাকে আপনি চেনা সেই বটে উপাসনা। সত্যি বলতে হয় মনোরঞ্জন বসু নিজেকে চেনার চেষ্টায় সচেষ্ট ছিলেন সর্বদা। তাই বোধহয় প্রয়োজন হয়নি নিজেকে প্রকাশ করার। কথাগুলো বলছি এ কারণেই যে, তার লেখা পড়ে যে বোধের ভাষা প্রকাশিত হয় বাস্তব জীবন সেই বোধকে তিনি কাজে লাগাতে চেয়েছেন মানবপ্রেমের মাঝে।

কখনো নিজেকে জ্ঞানীরূপে প্রকাশ করতে চাননি। পৃথিবীময় এখন হানাহানি চলছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী। সত্যিকারের মানবপ্রেম আজ বিলীন প্রায়। অথচ যুগযুগ ধরে সব ধর্মের মানুষকে মানব প্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে সাধনায় মত্ত ছিলেন ফকির লালন সাঁই।

সেই ধারাবাহিকতায় তাঁর ভক্ত মনোরঞ্জন গোঁসাইও মানবতার জয় গান গেয়েছেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। মনোরঞ্জন গোঁসাইয়ের লেখা পড়ে আমি অবাক হয়েছি তার বোধের বিস্তার দেখে। অগাধ তার জ্ঞান। অসীম তার ভাবনা। তিনি নিজেই লিখেন বাউল গানের শিল্পীর অভাব নেই কিন্তু প্রকৃত বাউলের বড় অভাব। সত্যিই তাই।

লালন সাঁইয়ের গান আজ অনেকেরই বাণিজ্যিক উপকরণ। বাউল পোশাক পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন চ্যানেলে লালনের গান গেয়ে এখন অনেক অর্থ আয় করা যায়। লালন সঙ্গীত এখন ব্যবসায়িক সম্পদ। আর এসব পোশাকি শিল্পীরা নিজেকে আবার বাউল বলেও পরিচয় দেয়।

কিন্তু বাউল দর্শন না থাকলে তাকে বাউল বলা যায়? আজ যত শিল্পী বাউল গান করেন তার সকলে যদি সত্যিকারের বাউল দর্শনকে ধারণ করত তবে আমরা একটু হলেও একটি শ্রেণীহীন, জাতপাতহীন, অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণে এগিয়ে যেতে পারতাম।

আর সেই স্বপ্নই আমি দেখি মনোরঞ্জন গোঁসাইয়ের লেখায়। সমাজ, রাষ্ট্র, গোটা বিশ্ব এখন বিভাজিত। শ্রেণী, সম্পদ আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় মানবপ্রেম থেকে। এমনকি যে ধর্ম আমাদেরকে মানবমুক্তির পথ দেখায় সেই ধর্মকে নিয়েই আমরা মেতে উঠি হানাহানিতে।

লালন সাঁই, কোকিল সাঁই, মনোরঞ্জন গোঁসাইরা যুগে যুগে সেই মানবমুক্তির পথ খুঁজে বেড়িয়েছেন। এ রকম মানবমুক্তির দর্শনকে ছড়িয়ে দিতে আরো অনেক মনোরঞ্জন গোঁসাইয়ের খুব প্রয়োজন।

…………………………………….
আরো পড়ুন:
ফকির মনোরঞ্জন গোঁসাই
আমার দেখা কবিরাজ গোঁসাই
আমার পিতা ভক্ত মনোরঞ্জন গোঁসাই ও তাঁর দর্শন

মরমী সাধক মহেন্দ্রনাথ গোস্বামী
মনোরঞ্জন গোঁসাই: স্বরূপ সন্ধানী দার্শনিক

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!