হরিচাঁদ গুরুচাঁদ মতুয়া

বিধবাবিবাহ প্রচলন ও বর্ণবাদীদের গাত্রদাহ

-জগদীশচন্দ্র রায়

গুরুচাঁদ ঠাকুরের নারী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রগতিতে উচ্চবর্ণীয়দের মধ্যে একদিকে যেমন গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায় অন্যদিকে সেই আগুনে ঘৃতাহুতি দেয় বিধবাদের বিবাহ চালু করায়।

কারণ তৎকালীন বর্ণবাদীরা সেন্সাস রিপোর্টে নম: ঘরের মহিলাদের প্রতি ঘৃণা জনক কথা লিখে রেখেছিল-

বিধবা প্রসঙ্গে লিখে কথা কদাচার।
তারা নাকি কভু নাহি মানে সদাচার।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২৪৪)

বিধবা নারীর কথা লিখিয়াছে যাহা।
মম কণ্ঠে উচ্চারণ নাহি হবে তাহা।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২৪৫)

চণ্ডাল গালি মোচনের একটা বড় অধ্যায় হচ্ছে বিধবা বিবাহ প্রচলন ও বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করণ। সি এম মীড সাহেব জনগণনার রিপোর্টে দেখেন যে, চণ্ডাল (নম:) বিধবা মহিলাদের প্রতি রিপোর্টে মিথ্যা ও কুৎসিত মন্তব্য লিখে রেখেছে। যে সব কথা মুখে বলাও ভদ্রতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়।

তার মধ্যে একটা কথা যে, ‘তারা নাকি কভু নাহি মানে সদাচার।’ নম: ঘরের বিধবা মহিলারা নাকি কোনো প্রকার ‘সদাচার(?)’ অর্থাৎ বৈদিকতার নিয়ম নীতিকে মানে না। আর প্রকারান্তরে এই মহিলাদের চরিত্রের উপরও কলঙ্কের ছাপ লাগিয়েছে।

এই কলঙ্ক দূর করার জন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর মীড সাহেবের পরামর্শ মতো সকলকে বিধবাদের বিবাহ দেবার জন্য আহ্বান জানান।

যদি নিজ ইষ্ট চাও বিধবাদের বিয়ে দাও।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২৫২)

গুরুচাঁদ ঠাকুর ভক্তদের বলেন, ‘আমিও মীড সাহেবের কথা মত ঠিক করেছি যে, বিধবার বিভা দিব নম:কুল তরাইব।’ (গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২৫২)

আর তোমাদেরও এই কাজ করার জন্য আমি অনুরোধ করছি। এখন বল, কে কে এই কাজের জন্য এগিয়ে আসবে?’

এ কথা শোনার পর ভক্তমণ্ডলীর মধ্যে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। ঠাকুরের আদেশ মেনে নেবে, না কী করবে, সেটা নিয়ে ভাবনায় পড়ে যায়। তারপর দেবীচাঁদ বলেন যে, ‘ঠাকুর আমি একজন সামান্য মানুষ। তবে আমার দ্বারা যদি সমাজের কোন কাজ হয়, তাহলে আমি অবশ্যই করব। বিধবাদের বিবাহ দেওয়া কেন আপনি যে আজ্ঞা করবেন আমি তাই পালন করব।’

দেবীচাঁদের কথা শুনে গুরুচাঁদ ঠাকুর ভীষণ আনন্দিত হন-

তেরশত ষোল সালে বারুণী সময়।
বিধবা বিবাহ দিতে প্রভু আজ্ঞা দেয়।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২৬১)

১৯১০ সালে মার্চ মাস নাগাদ (বাংলা ১৩১৬ সাল), বারুণীর সময় অর্থাৎ হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মদিন পালনের মাসে (১১ই মার্চ) গুরুচাঁদ ঠাকুর পতিত জাতির মধ্যে বিধবাবিবাহ প্রচলন করেন। আর বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে নির্দেশ দেন।

এরপর দেবীচাঁদ তাঁর গ্রামে পৌঁছে তাঁর ভক্তগণকে গুরুচাঁদ ঠাকুরের ‘বিধবা বিবাহের’ আজ্ঞা পালন করার জন্য অন্য সকল ভক্তদেরকে গুরুচাঁদ ঠাকুরের আদেশ পালন করার জন্য নির্দেশ দেন।

গোপালের মত নিয়া শ্রীনাথ করিল বিয়া
আর বিয়া করে কতজন।
ফরিদপুর, খুলনা বরিশাল এক থানা
ত্রিশ জনে বিবাহ করিল।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২৫৪)

গুরুচাঁদ ঠাকুরের আজ্ঞা পালন করার জন্য দেবীচাঁদের নির্দেশ মতো প্রথম বিধবা বিবাহ করেন শ্রীনাথ। তারপর একের পর এক বিধবাবিবাহ চলতে থাকে। ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল জেলায় মোট ত্রিশজন বিধবা বিবাহ করেন। কিন্তু এই ঘটনা দেখে উচ্চবর্ণীয়দের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়-

সামাজিক ব্যক্তি যত সবে যেন বজ্রাহত
বলাবলি করিতে লাগিল।
মতুয়ার এ কি কাণ্ড ক্রিয়া কর্ম লণ্ড ভণ্ড
জাতি ধর্ম আর নাহি থাকে।
বিধবার দিল বিয়ে কার কাছে বুদ্ধি নিয়ে
হেন কর্ম করে ঝাঁকে ঝাঁকে।।

মতুয়াদের বাদ দাও সমাজেতে নাহি নাও
খৃষ্টানের মত ব্যবহার।
কর তারে হুকা বন্ধ নাপিত ব্রাহ্মণ বন্ধ
এক সঙ্গে করো না আহার।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২৫৪)

যে বৈদিকবাদীরা নম:শূদ্রদেরকে ‘চণ্ডাল’ বলে গালি দিয়েছে। বিধবা নারীদের প্রতি অসম্মানজনক কথা সেন্সাস রিপোর্টে লিখিয়েছে। যে কথা মুখেও আনা যায় না। সেই ‘চণ্ডাল’ গালি মোচনের উদ্দেশ্যে এবং বিধবা নারীদের বিবাহ দেবার মতো মহৎ কাজ যখন মীড সাহেবের পরামর্শ মতো গুরুচাঁদ ঠাকুরের নির্দেশে শুরু হয়েছে; তখন বৈদিকবাদীদের গাত্রদাহ শুরু হয়ে যায়।

তাদের মাথার উপর যেন বজ্রাঘাত হয়। কারণ তারাই তো সমাজকে সুদীর্ঘ কাল ধরে কলুষিত করে রেখেছে। আর আজ তারা এই সমাজ সংস্কার মূলক কাজ দেখে বলতে শুরু করেছে যে, ‘মতুয়ারা এসব কি কাণ্ড শুরু করেছে। তারা তো দেখছি খ্রিস্টানদের মতো কোনো জাতি ধর্ম মানে না। এদেরকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করা দরকার। এদের সঙ্গে সমস্ত ধরনের সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে’ -এই বলে বৈদিকবাদীরা ঘোষণা করে।

নম:জাতি তথা পিছিয়ে রাখা সমাজের লোকেরা দেখুন যে, বৈদিকবাদীরা আপনাদের চণ্ডাল ও অস্পৃশ্য বলে গালি দিয়েছে; আপনাদের ঘরের মা বোনদের প্রতি ঘৃণ্য কথা লিখে রেখেছে। তা ছাড়া আপনাদের নিচু জাত বলে ঘৃণাও করে।

যখন আপনারা এর থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সমাজ সংস্কারের কাজ করছেন, তখন সেই বৈদিকবাদীরা আবার আপনাদের সামাজিক বহিষ্কার করার কথা ঘোষণা করছে। এর থেকে আপনারা আর কবে কী শিখবেন? আর কতদিন এই উচ্চবর্ণীয়দের গোলামী করবেন?

সমাজের বিধবাদের বিবাহ দেওয়ার কাজ যখন সমাজের মধ্যে একটা জাগরণের অধ্যায় হিসাবে দ্রুতগতিতে চলছে, তখন দেবীচাঁদ, গোপালকে সঙ্গে নিয়ে গুরুচাঁদ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আর বিধবা বিবাহের সমস্ত ঘটনা জানান।

গুরুচাঁদ ঠাকুর তখন মীড সাহেবকে ডেকে এই শুভ সংবাদটা দেন। তখন মীড সাহেব ভীষণ খুশি হন। তিনি দেবীচাঁদ ও গোপারের ফটো তুলে বিলাতে পাঠিয়ে দেবার কথা জানান। পরে তিনি যখন এই সমাচার পাঠান ইংরেজদের কাছে তখন বলেন যে-

এই জাতি পিছে নহে নারীর সম্মানে।।
বিধবা বিবাহ প্রথা এরা মান্য করে।
ব্যভিচারী নহে তারা এজাতিয় ঘরে।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-২৫৭)

‘এরা বিধবা বিবাহ দেওয়ার কাজ করেছে। এরা নম:শূদ্র জাতির লোক। এরা ‘চণ্ডাল’ নয়। এরা শিক্ষিত ও ভদ্রলোক। এই জাতির লোকেরা নারীদের অনেক সম্মান করে। এই সমাজের নারীরা অনেক ভদ্র, শীল ও বিনয়ী। তারা কখনোই ব্যভিচারী নয়।

……………………………
গুরুচাঁদ ঠাকুরের সমাজসংস্কার ও মুক্তির দিশা

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………
আরো পড়ুন:
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: এক
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: দুই
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: তিন

শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: এক
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: দুই
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: তিন

তারকচাঁদের চরিত্রসুধা
অশ্বিনী চরিত্রসুধা
গুরুচাঁদ চরিত
মহান ধর্মগুরু হরিচাঁদ নিয়ে প্রাথমিক পাঠ
হরিলীলামৃত
তিনকড়ি মিয়া গোস্বামী
শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর

……………………………
আরো পড়ুন:

মতুয়া ধর্ম দর্শনের সারমর্ম
মতুয়া মতাদর্শে বিবাহ ও শ্রদ্ধানুষ্ঠান
মতুয়াদের ভগবান কে?
নম:শূদ্রদের পূর্ব পরিচয়: এক
নম:শূদ্রদের পূর্ব পরিচয়: দুই
মতুয়া মতাদর্শে সামাজিক ক্রিয়া

বিধবাবিবাহ প্রচলন ও বর্ণবাদীদের গাত্রদাহ
ঈশ্বরের ব্যাখ্যা ও গুরুচাঁদ ঠাকুর
বিধবাবিবাহের প্রচলন ও গুরুচাঁদ ঠাকুর

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!