শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর মতুয়া

-জগদীশচন্দ্র রায়

বুদ্ধিহীন সরলতা আর নাহি চলে হেথা
কূট-বুদ্ধি বটে দরকার।।
(গুরুচাঁদ চরিত, পৃ-৪৪৩)

প্রকৃতপক্ষে ভারতের মূল অধিবাসীগণ হচ্ছে সহজ সরল প্রকৃতির। তারা বংশ পরম্পরায় সুখে-শান্তিতে জীবন যাপন করত। কিন্তু বহিরাগত আর্যদের আক্রমণের ফলে এই ভারতীয় মূল অধিবাসীগণ নিজেদের সরলতার জন্য আক্রমণকারী আর্যদের কাছে পরাজিত হন।

আর্যরা ধীরে ধীরে সব ক্ষমতা নিজেদের কুক্ষিগত করে নেয়। মূল ভারতীয়দেরকে সম্পূর্ণ ভাবে গোলাম করে রাখার জন্য তারা তাদের সুবিধা মতো বিভিন্ন নীতি নিয়ম তৈরি করে, বিভিন্ন গ্রন্থে গল্প কাহিনী লিখে সেগুলো মানতে বাধ্য করে।

এ রকমই আর একটি কাহিনী হচ্ছে- ‘রাম কর্তৃক শম্বুক হত্যা’। এখানেও শম্বুক শূদ্র হয়ে নিজে শিক্ষালাভ করেন এবং অন্যকেও শিক্ষিত করে তোলার কাজ করতে থাকেন। কিন্তু বৈদিকবাদী নিয়মে এটাকে অপরাধ বলে গণ্য করে তাঁকে হত্যা করে সমগ্র মূলবিনাসীদের শিক্ষার অধিকারকে হত্যা করা হয়।

গল্প কাহিনীগুলো যেসব গ্রন্থে লেখা হয়, তার নাম দেওয়া হয় ধর্মীয় গ্রন্থ। সেসব গ্রন্থ নাকি ভগবানের মুখ নি:সৃত বাণী। সেখানকার অসংখ্য কাহিনীর মধ্যে একটা হচ্ছে ‘মহান বীর একলব্যের কাহিনী’। যেখানে একলব্য তার প্রতিভা বলে নিজেই কারো কাছে ধনুবির্দ্যা না শিখে সর্বশ্রেষ্ঠ বীর হিসাবে পরিগণিত হয়।

কিন্তু একজন ‘অধিবাসী’ সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ হবে এটা যেন কল্পনাতীত! তাই তার সঙ্গে ছলনা করে একলব্যের সারা জীবনের সাধনার অস্ত্রকে গুরুদক্ষিণার নামে আঙুল কেটে নেওয়া হয়। সাধারণ মানুষকে শেখানো হয় ‘একালব্যের গুরুভক্তি’।

যেটা বাস্তবে একজন বীরের প্রতিভাকে সারা জীবনের জন্য মৃত্যু ঘটানো হয়। কিন্তু শুধু এই সরলতা ও নির্বুধ্দিতার ফলে আজও মানুষ এই চালাকিকে বুঝতে না পেরে অন্ধ হয়ে আছে।

এ রকমই আর একটি কাহিনী হচ্ছে- ‘রাম কর্তৃক শম্বুক হত্যা’। এখানেও শম্বুক শূদ্র হয়ে নিজে শিক্ষালাভ করেন এবং অন্যকেও শিক্ষিত করে তোলার কাজ করতে থাকেন। কিন্তু বৈদিকবাদী নিয়মে এটাকে অপরাধ বলে গণ্য করে তাঁকে হত্যা করে সমগ্র মূলবিনাসীদের শিক্ষার অধিকারকে হত্যা করা হয়।

এখানেও ঘটে একই চালাকি। গ্রহণ করা হয় সাধারণ মানুষের নির্বুদ্ধিতা ও সরলতার সুযোগকে। যাতে এই সাধারণ মানুষেরা আসল উদ্দেশ্যকে বুঝতে পেরে সংগ্রামে লিপ্ত না হয়।

সেজন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেছেন, এই নির্বুদ্ধিতা ও অতি সরলভাব ত্যাগ করতে হবে। কেউ কিছু বললেই তার কথায় একবাক্যে বিশ্বাস না কর নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে হবে; না হলে সময় নিয়ে বিশ্বস্ত নিজের কারো কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এই ধরণের বহু কাহিনী আছে। যেসব থেকে গুরুচাঁদ ঠাকুর বিষয়ের আসল অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি তাঁর জীবনে বুদ্ধিহীন সরলতাকে ত্যাগ করে কূট কৌশলী হয়েছিলেন। যার ফলে তিনি অস্ট্রেলিয়ান মিশনারীর সহযোগিতা নিয়ে অনুন্নত সমাজের মানুষদের জন্য শিক্ষার প্রসার তথা অন্যান্য সামাজিক সুবিধা করায়ত্ত করেছিলেন।

বাংলার নম:জাতিকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করা থেকে বিরত করেছিলেন। পাশাপাশি বৈদিকধর্মের কবল থেকে অনুন্নতদের মুক্ত করে স্বতন্ত্র মতুয়া ধর্মের ছত্রছায়ায় এনে সামাজিকভাবে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এছাড়া গান্ধিজী চিত্তরঞ্জন দাসের মাধ্যমে স্বদেশী আন্দোলনে যোগদানের আহ্বান জানালে, সেই আহ্বানকে গুরুচাঁদ ঠাকুর ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দেন; সঙ্গে কীভাবে আন্দোলন করতে হয়, পত্র লিখে তার পরামর্শ দেন।

কারণ তৎকালীন পরিস্থিতিতে অনুন্নত শ্রেণীর প্রতি ব্রিটিশ সরকারের বিরাগভাজন বা চক্ষুশূল না করিয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দেন এবং নম: তথা অনুন্নত শ্রেণীর লোকদের সুবিধা ও অধিকার আদায়ের পথকে প্রশস্ত করেন। যার ফলে এই অনুন্নত জাতির লোকেরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। এটা গুরুচাঁদ ঠাকুরের সঠিক বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগের দূরদর্শিতা।

গুরুচাঁদ ঠাকুর যেভাবে কৌশলের মাধ্যমে মতুয়া তথা সমগ্র পিছিয়ে রাখা সমাজের সার্বিক উন্নতি করেছিলেন, ঠিক তেমনি ভাবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমানের মতুয়া তথা সামাজিভাবে পিছিয়ে পড়ারা যেন ব্রাহ্মণ্যবাদের ষড়যন্ত্রের শিকার না হন এবং কূটকৌশলের মাধ্যমে বিচার বুদ্ধির প্রয়োগ করেন, এটাই ছিল তাঁর বিধান।

কারণ মতুয়া তথা পিছিয়ে রাখা শ্রেণীর মানুষেরা স্বভাবগত দিক দিয়ে সাধারণত খুব সরল। অন্যের কথার আগে পিছে বিচার না করেই মেনে নেন। আবার নিজের মনের কথঅও অকপটে বলে দেন। যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা অন্যের কাছে ধোঁকা খান।

সেজন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেছেন, এই নির্বুদ্ধিতা ও অতি সরলভাব ত্যাগ করতে হবে। কেউ কিছু বললেই তার কথায় একবাক্যে বিশ্বাস না কর নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে হবে; না হলে সময় নিয়ে বিশ্বস্ত নিজের কারো কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

……………………………
গুরুচাদ ঠাকুরের সমাজসংস্কার ও মুক্তির দিশা

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………
আরো পড়ুন:
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: এক
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: দুই
গুরুচাঁদের বারো গোঁসাই: তিন

শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: এক
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: দুই
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ও নবযুগের যাত্রা: তিন

তারকচাঁদের চরিত্রসুধা
অশ্বিনী চরিত্রসুধা
গুরুচাঁদ চরিত
মহান ধর্মগুরু হরিচাঁদ নিয়ে প্রাথমিক পাঠ
হরিলীলামৃত
তিনকড়ি মিয়া গোস্বামী
শ্রী ব্রজমোহন ঠাকুর

……………………………
আরো পড়ুন:

মতুয়া ধর্ম দর্শনের সারমর্ম
মতুয়া মতাদর্শে বিবাহ ও শ্রদ্ধানুষ্ঠান
মতুয়াদের ভগবান কে?
নম:শূদ্রদের পূর্ব পরিচয়: এক
নম:শূদ্রদের পূর্ব পরিচয়: দুই
মতুয়া মতাদর্শে সামাজিক ক্রিয়া

বিধবাবিবাহ প্রচলন ও বর্ণবাদীদের গাত্রদাহ
ঈশ্বরের ব্যাখ্যা ও গুরুচাঁদ ঠাকুর
বিধবাবিবাহের প্রচলন ও গুরুচাঁদ ঠাকুর

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!