শ্যমাচরণ লাহিড়ী মহাশয়

২১.
অকালমৃত্যু বলিয়া শোক করিও না, জীবের পক্ষে কালাকাল মনে হয়, কালের অকাল নাই, এজন্য জীবের কর্তব্য কেহই কিছু করে না, সমস্তই ভগবান করেন, উপলক্ষ্য মাত্র। সেই গুরু-ভগবানে লক্ষ্য রাখিতে বিধিপূর্ব্বক চেষ্টা করুন, ইহাতেই মঙ্গল।

২২.
সব ভক্তের তাদের গুরুকে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করা, অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শিষ্য গুরুকে যত আত্মসমর্পণ করতে পারেন, ততটা তিনি তাঁর গুরুর থেকে যোগের সূক্ষ্ম থেকে অতিসূক্ষ্ম কৌশলগুলি শিখতে পারেন। আত্মসমর্পণ ছাড়া, গুরুর থেকে কিছু পাওয়া যায় না।

২৩.
যতদিন জন্ম মৃত্যুর অধীনে থাকবে ততদিন সুখ দুঃখ, হাসি কান্না, রোগ শোক, জরা ব্যাধি, হিংসা ক্রোধ, মন ও ইন্দ্রিয়দের ছলনা, যারা তোমার জীবনের শত্রু তাদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। তাই তোমরা যত তাড়াতাড়ি পার এদের অতীতে গিয়ে সুন্দর মানুষ হও এবং চির শান্তি লাভ কর।

২৪.
শ্বাসকে সর্ব্বদা নাড়িলে চাড়িলে শ্বাসের নির্বাণ হয় অর্থাৎ স্থির হয়, স্থিরত্বের নাম যোগ। জীব মাত্রেই চঞ্চল অতএব স্থির পদ ব্যতীত গতি নাই- প্রাণায়ামে স্থির হয়। পাখা টানাতে চলে, মনি করিলে টানা জায় মন না চলিলে টানিতে ইচ্ছা করে না, মন স্থির হইলে অনাবশ্যক ইচ্ছা করে না, অনাবশ্যক কার্য্য না করার নাম ইচ্ছা রহিত।

২৫.
মায়া কর্তৃক হাড়মাস দেখা যাইতেছে, তাহা যত শীঘ্র যায় অর্থাৎ মায়ার বিষয় যত শীঘ্র যায় ততই ভাল। ভাল মন্দ তথায় নাই। আমার বলিতে যাহা কিছু আছে তাহা গুরুকে অর্পণ করা চাই। অর্পণ হইলে তাহাতে আর স্বত্ব থাকে না। যখন দেহ অর্পণ করেছেন তখন নিজের দেহ দেখলেই ত আমাকেই স্থুলেতে দেখা হয়। এইরূপ ভাবে আমার দেহ সব। শ্রদ্ধা ও ভক্তির সহিত ক্রিয়া কর।

২৬.
তোমার পৈতার ভার বেশী না জটার ভার বেশ? তুমি কি সাধু বলে নিজেকে প্রচার করতে চাও যাতে তোমায় লোকে মান্য করে এবং কিছু অর্থ উপার্জন হয়? দেখ গেরুয়া পরলে লোকে যদি সাধু হতে পারে; তবে গাধা ঘোড়া সাধু হত। তাদের ও ত গেরুয়া রং, তবে তাদের সাধু বলবে না কেন? ওসব পাগলামী ছেড়ে দিয়ে সংসারে থাক, স্বোপার্জ্জনে জীবিকা নির্ব্বাহ কর, আর ঈশ্বর সাধন কর। অপরের দান লইয়া জীবন যাত্রা নির্ব্বাহ করবে না।

২৭.
আত্মসূর্য্যরূপী নারায়ণ ভগবান জগদীশ্বর যিনি সর্বব্যাপী তিনি আমিই। ভিতরের এক জ্যোতি দেখিলাম যাহা আত্মসূর্য্য হইতে আসিতেছে তাহাও আমি। যাহা আমি তাহাই সেই নিরাকারের রূপ। বুদ্ধির অতীত যে বৃহৎ কূটস্থ স্বরূপ অনন্ত রূপ তাহাই ভগবান, উহা অতীব নির্মল। আমিই সেই অক্ষয় পুরুষ। অক্ষর অর্থাৎ জীবাত্মা যখন নিজেকে নির্গুণ অর্থাৎ গুণাতীত ও পরমাত্মা হইতে অভিন্ন বলিয়া জানিয়া তাঁহাতে বিলীন হন, তখনই তিনি অক্ষর পদবাচ্য।

২৮.
ধ্যানের সাহায্যে সব সমস্যার সমাধান কর। ঈশ্বরের সঙ্গে প্রকৃত যোগাযোগের জন্য অলাভজনক ধার্মিক আলোচনা বিনিময় কর। উদ্ধত আধ্যাত্মিক আবর্জনা থেকে নিজের মন পরিষ্কার রাখ; অনুভূতির তাজা, নিরাময়ক জলের মধ্যে সব ধুয়ে যাক। অন্তরের সক্রিয় পথনির্দেশনার যোগসূত্রে নিজেকে বাঁধ। জীবনের সব সমস্যার জবাব আছে ঐশ্বরিক শক্তির কাছে। যদিও নিজেকে বিপদে ফেলার জন্য মানুষের উদ্ভাবনীয দক্ষতা অবিরাম, অসীম সাহায্যকারীও কম সমৃদ্ধ নয়।

২৯.
শিষ্যা অভয়া কলিকাতা থেকে গুরু দর্শণে কাশীর উদ্দেশ্যে রওনা হলো। ষ্টেশনে এসে দেখে বাণারস এক্সপ্রেস সবে মাত্র ছেড়ে গেল। গুরুদেবকে স্মরণ করে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে অভয়ার দুঃখে কান্না এলো। এমন সময় দেখা গেল যান্ত্রিক ক্রটির জন্য ট্রেনটি প্লাটফর্মের শেষে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে। অভয়া অনায়াসে ট্রেনে উঠে পড়ল। কাশীতে পৌঁছে গুরুদেবকে প্রণাম করতেই গুরুদেব বললেন ট্রেন ধরার জন্য একটু আগে রওনা দিতে হয়। কত ঝামেলায়ই না আমাকে ফেলতে পার। পরের ট্রেনে কাশী এলে এমন কি ক্ষতি হত। অভয়া বুঝলো গুরুদেবের কিছুই আজানা নেই।

৩০.
ক্রিয়া সত্য আর সব মিথ্যা। ক্রিয়ার অভ্যাসই বেদপাঠ। ক্রিয়াই যজ্ঞ। এই যজ্ঞ সকলের করা উচিত। মনের ত্রাণ অবস্থার নাম মন্ত্র। কেহই ম্লেচ্ছ নহে, মনই ম্লেচ্ছ। নারায়ণ সকল ঘটেই বিরাজ করিতেছেন। কেহই কিছু করে না, সমস্ত ভগবান করেন, জীব উপলক্ষ্য মাত্র। সেই গুরু-ভগবানে লক্ষ্য রাখিতে বিধিপূর্ব্বক চেষ্টা করুন। হইতেই মঙ্গল। আত্মাই গুরু। মনের এই প্রকার বল লইয়া ক্রিয়া করিতে হইবে-কেহ কাহারও নহি, কেহ আমার নহে। একদিন নিশ্চয় সকলকে সব ছাড়িতেই হইবে। সেদিন যে কাহার কবে হবে নিশ্চয় নাই। লোকে নিশ্চিন্ত থাকে, কিন্তু সে অবস্থা হঠাৎ আসে।

৩১.
সর্বদা মনে রাখবে যে তুমি কারোর নও এবং কেউ তোমার নয়। গভীরভাবে চিন্তা কর হঠাৎ কোন একদিন তোমায়, এই বিশ্বের সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই এখন থেকে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। প্রত্যেকদিন ঈশ্বরের অনুভূতির ব্যোমযানে চড়ে, আসন্ন মৃত্যুর বিশুদ্ধ যাত্রায় নিজেকে প্রস্তুত করো। মোহের বশে তুমি নিজেকে হাড়, মাংসের একটি জীবন হিসাবে ভাবছ, যা প্রকৃতপক্ষে সমস্যার বাসা। নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ধ্যান করো, খুব দ্রুত নিজেকে সকল কষ্ট থেকে মুক্ত, অবিচ্ছিন্ন উপাদান হিসাবে দেখতে পাবে। দেহের অধীন বন্দী হওয়া বন্ধ কর; ক্রিয়ার গোপন চাবি ব্যবহার করে, আত্মায় মুক্ত হতে শেখ।

৩২.
একদিন গভীর রাতে হঠাৎ কাশিমণি দেবীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি দেখেন তার স্বামী লাহিড়ী মহাশয় আসন থেকে উর্দ্ধে অনেকখানি উঠে স্থির হয়ে শূন্যে অবস্থান করছেন। এ দৃশ্য তিনি আগে কখনও দেখেন নি। তিনি ভাবলেন একি সত্যি না স্বপ্ন। স্ত্রীর মনের কথা বুঝতে পেরে যোগীরাজ শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললেন না গো না তুমি স্বপ্ন দেখছ না এ সত্যি। অনেকদিন তো কেটে গেল এবার তামস নিদ্রা থেকে জেগে ওঠ। এই কথা বলে যোগীরাজ নেমে এসে স্বীয় আসনে সমাসীন হন। কাশিমণি দেবী সাথে সাথে স্বামীর চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত হয়ে দীক্ষা লাভের প্রার্থনা জানান। যোগীরাজ আনন্দের সঙ্গে সহধর্মিণীকে দীক্ষা ও যোগসাধনা দান করেন।

৩৩.
একবার যোগীরাজের এক শিষ্যা তাঁর একখানি ছবি চেয়ে নেয়। যোগীরাজ ছবি খানি দেওয়ার সময় শিষ্যকে বলেন, ‘যদি ভক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে ছবিটি মানো ত এটা হবে তোমার পরম আশ্রয়। আর যদি না মানো ত এটা একটি সামান্য ছবি।’ বহুদিন পর সেই শিষ্যা একদিন সন্ধ্যায় সময় এক গুরুভগ্নির সঙ্গে শাস্ত্রপাঠ করছিল। সামনের টেবিলে গুরুদেবের ছবিটি সযত্নে রাখা ছিল। সহসা বজ্রপাত হয় এবং জানালা দিয়ে তার একটি অংশ ঘরে এসে পড়ে। যে গ্রন্থটি তারা পাঠ করছিল সেটি বজ্রের আগুনে পুড়ে যায়। কিন্তু গুরুর কৃপায় তারা দুজনে বেঁচে গেল। এই সময় তারা আশ্চর্য হয়ে দেখে গুরুদেবের ফটো হতে কল্যাণমূর্তি নির্গত হয়ে তাদের দুজনের চারিদিক বরফের প্রাচীর তুলে আগুন হতে তাদের রক্ষা করেছে।

৩৪.
বারাণসীর রানামহল ঘাটে এক বৃদ্ধ রোজ শ্রীশ্রী শ্যামাচরণ লাহেড়ীর কাছে ক্রিয়াযোগে দীক্ষা দেওয়ার অনুরোধ জানাতেন। কিন্তু শ্যামাচরণ তাঁকে রোজই ফিরিয়ে দিতেন। অপর এক বৃদ্ধা এক দিন হঠাৎ এসে একই অনুরোধ জানালেন। শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ তাঁকে পর দিন সকালে আসতে বললেন। সঙ্গী ভদ্রলোক বললেন, ‘সে কী! বয়স্ক ভদ্রলোক তো রোজ ঘুরছেন।’ শ্যামাচরণ বললেন, ‘ওর এখনও সময় আসেনি।’ সময় কখন আসবে, না-আসবে সেটি গুরুই স্থির করবেন। গুরুর কাছ থেকে পাওয়া নিভৃত, ব্যক্তিগত সাধনা। কিন্তু ক্রিয়াযোগ কখনও মুফতে পাওয়া যায় না। শ্যামাচরণ লাহিড়ী জনপ্রতি পাঁচ টাকা দক্ষিণা নিতেন। তাঁর কিছু গরিব শিষ্যও ছিল। প্রথম শিষ্যই বারাণসীর ঘাটে এক ফুলবিক্রেতা। এঁদের হাতে শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ আগের দিন পাঁচ টাকা ধরিয়ে দিতেন।

৩৫.
যোগীরাজের প্রতিবেশী যুবক চন্দ্রমোহন ডাক্তারী পাশ করে তাঁকে প্রণাম করতে আসে। যোগীরাজ দেহ বিজ্ঞান সম্পর্কে তাকে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন। আর চন্দ্রমোহন বিশেষ উৎসাহে জবাব দিতে থাকে। সহসা যোগীরাজ বলে ওঠেন আচ্ছা বলতো তোমার ডাক্তারী শাস্ত্রে মৃতের সঙ্গা কি? আমাকে পরীক্ষা করে দেখত আমি জীবিত না মৃত। চন্দ্রমোহন যোগীরাজের দেহটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আশ্চর্য হয়ে গেল। হৃদপিণ্ড একাবারে স্তব্ধ ও নিষ্প্রাণ। সারা দেহের মধ্যে প্রাণের কোন ক্ষীণতম চিহ্নও খুঁজে পাওয়া গেল না। কিছুক্ষণ এই ভাবে নিজের দেহটি মৃতকল্প রাখার পর যোগীরাজ বলেন দেখ চন্দ্রমোহন, দৃশ্যমান এই বাস্তব জগতের বাইরে অতিসূক্ষ্ম অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্ম জগতের অনেক কিছু জানবার আছে। আধুনিক বিজ্ঞান তার সীমিত শক্তি দিয়ে সে জগতে যেতে পারে না।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!