ফকির লালন সাঁই

লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব এগারো

-মূর্শেদূল মেরাজ

তবে এটিও স্বীকার করে নিতে হবে যে, ভাবগানের অর্থ সকল সময় একই অর্থ স্থায়ী হয় না। এটি নির্ভর করে ব্যক্তি মানুষের জ্ঞান-মেধা-বিচার-বিবেচনা ও শুদ্ধা-বিনয়-ভক্তির উপর। একই শব্দ সাধনার এক এক স্তরে ভিন্ন ভিন্ন মানে হয়ে যায়।

তাই ভাব গানের অর্থ নির্দিষ্ট করা সাধকের জন্য ভয়ঙ্কর। তবে যারা সাধক নন। কেবল গবেষক-লেখক তাদের কাছে এই অর্থ অতীব গুরুত্ববহ।

অন্যদিকে লালনের যে কয়টি গান সমাজ জীবনে অধিক পরিচিতি পেয়েছিল একসময়। তার বেশিভাগেই রয়েছে জাত না মানার এক বাণী। সেই গান শুনে অনেকেই লালনকে জাতের বিরুদ্ধে কথা বলা এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখে থাকেন।

তাই অনেকে তাঁকে ভালোবাসেন। কিন্তু লালন আদতে মানবজাতির জন্য কি মতাদর্শ দিয়ে গেছেন সেটা বুঝবার চেষ্টা করেন না। আসলে বুঝতে চাওয়া বেশ কঠিন। বুঝতে গেলে ডুবতে হয়। জনপ্রিয়তার মোড়ক খোসে পড়ে গা থেকে।

ঝা ঝকঝক জীবন ছেড়ে ফকিরিতে মনোনিবেশ করতে হয়। এ এমনই এক যাতা কল। যে একবার ঢুকে পরেছে। তাকে পিষে শুদ্ধ করার প্রকৃয়া চলমান থাকে। আর যারা উপরি উপরি ঘুরে বেড়ায়। আনন্দ লোটে তাদের হিসেব আলাদা।

তাই লালনকে গভীর ভাবে ভাবতে গেলে বিপদ। মহাবিপদ। তার থেকে আর বের হতে পারা যায় না। সে কারণে উপরি উপরি তাঁকে নিয়ে কথা বলাই সারা হয়। লালনকে নিয়ে যে সকল আলোচনা/সভা/সমিতি/সেমিনার হয়। তা লালন ভাবধারাকে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে এমনটা দেখা যায় না।

কেবল আজকের সমাজে লালনের মতো মানুষের দরকার। লালন এই এই ভালো কথা বলেছেন। এমন সমাজ প্রত্যাশা করেছেন। এমন সব কথা বলে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বক্তৃতার টেবিল গরম করা হয় মাত্র।

তবে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও হয়। যেখানে লালনকে বুঝবার চেষ্টা করা হয়। চুয়াডাঙ্গার এক প্রবীণ ফকির একবার উপহাস করে বলেছিলেন, “তোমারাই বলো বাপ। দুই পাতা পইড়া। কয়েক পাতা লেইখ্যা। সেই লেখা আইনা লালনের অনুষ্ঠানে পাঠ করে।

লালন মতাদর্শের মূল ভাবই হলো বিনয়-ভক্তি-প্রেম। যার মাঝে এই ত্রয়ীভাব বিরাজ করে না। তার কাছ থেকে লালন মতাদর্শের শিক্ষা নেয়া বিপদজনক। তাই যত্রতত্র জ্ঞান সন্ধানের জন্য বা জ্ঞান বিতরণ করে লালনকে প্রচার প্রসার করা কঠিন।

সেই সব শোনায় কারে? শোনায় সাধুগুরুদের। যারা কিনা লালনের উপর পিএসডি কইরা বইসা আছে। আরে এইখানে তাদের বলতে দে। যারা লালনরে সারাজীবন ধইরা বুঝবার চেষ্টা নিতেছে। তারাই এখনো তার তল খুঁইজা পায় না।

তোরা দুই পাতা পইড়া কি বুঝলি। আর কি বুঝাইতে আইলি। এই সব কথা তরা শহর যায়া শোনা। যারা শোনে নাই। এইখানে এইসব বক্তিমা দেওয়ার মানে কি? নিজেরে জ্ঞানী প্রমাণ করা?”

আরেক সাধক একবার বলেছিল, “বুঝলা বাপ সিনেমার নায়ক আছে না? নায়ক?? তাদের কথা বিশ্বাস করবা না। তারা কখনো নিজের কথা বলে না। তারা বলে পরিচালকের কথা। পরিচালক যা বলে তারা তাই বলে। সংলাপ যা লেখা থাকে। তারা তাই বলে যায়।

চিত্রনাট্যের বাইরে কয়জন শিল্পী কাজ করতে পারে? সে সর্বোচ্চ পারে চিত্রনাট্য বাছাই করতে। কোন সিনেমাটা করবে। কোন সিনেমাটা করবে না। সেটা সে নির্বাচন করার ক্ষমতা রাখে। যদি তার মার্কেট ভালো থাকে। যখন হাতে কাজ থাকে না।

তখন সব সিনেমাতেই কাজ করতে হয় বাপ। চিত্রনাট্য পছন্দ হোক বা না হোক। তাই বাবা অভিনয় শিল্পীদের কথায় নাচবা না। তারা নিজেরাই অন্যের কথায় নাচে। তার কথায় নাচাই ভালো যে নিজের বুদ্ধি-বিচার-বিবেচনায় নাচতে পারে। তাই না বাপ?”

লালন মতাদর্শের মূল ভাবই হলো বিনয়-ভক্তি-প্রেম। যার মাঝে এই ত্রয়ীভাব বিরাজ করে না। তার কাছ থেকে লালন মতাদর্শের শিক্ষা নেয়া বিপদজনক। তাই যত্রতত্র জ্ঞান সন্ধানের জন্য বা জ্ঞান বিতরণ করে লালনকে প্রচার প্রসার করা কঠিন।

অতিথিরা চলে গেলেন পাঁচ তারকা হোটেলে ডিনার করতে। আমন্ত্রিত অতিথিরা ডিনার বক্স হাতে বেড়িয়ে গেলেন। এই হলো আমার অভিজ্ঞতা। তবে সকলের অভিজ্ঞতা যে এমন তা কিন্তু নয়। অনেকের হয়তো ভালো ভালো অভিজ্ঞতা আছে।

চেষ্টা সকলে সকলের মতো করুক। ভালো করুক সেই প্রত্যাশা তো থাকলোই। কিন্তু একটু বুঝে করলে তা আরো শতগুণ কার্যকর হবে বলেই এই কথাগুলো বলা।

এইতো কয়দিন আগে এক সেমিনারে গিয়েছিলাম দর্শক হিসেবে। সেখানে লালনকে নিয়ে কথা হবে। উপমহাদেশের অনেকেই উপস্থিত। একটা স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজন করেছে। ভাবলাম নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে।

কিন্তু সেখানে যারা গুণজন ছিলেন তারা কথা বলার সুযোগ পেলেন না তেমন। এমনিতেই সমযের অনেক পরে অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রধান অতিথি আসতে দেরি করেছেন। তারপর কেবল সুন্দরী নারীদের কথা বলবার সুযোগ দেয়া হলো।

যারা যৌনাবেদনময়ী সাজে সজ্জিত হয়ে রং-ঢং করে পুরো সময় জুড়ে যা বলে গেলেন। তা এক কথায় বলতে গেলে দাঁড়ায়, লালন না থাকলে পৃথিবীর মানবিকই হইতে পারতো না। যা বোঝা গেলো, তা হলো লালন ফকিরের গান ভিন্ন তারা তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছুই অবগত নন।

যাক আলোচনা শেষ হলেই বাঁচি। শেষে একটা ডকুম্যান্টারি দেখানো হবে বাউল-ফকিরদের নিয়ে; তাই বসে আছি। কিন্তু মূল আলোচক রাজনৈতিক বক্তৃতায় ঢুকে গেলেন। ডিনারের সময় চলে আসলো। তাই ডকুম্যান্টারি দেখানো ড্রপ করা হলো।

অতিথিরা চলে গেলেন পাঁচ তারকা হোটেলে ডিনার করতে। আমন্ত্রিত অতিথিরা ডিনার বক্স হাতে বেড়িয়ে গেলেন। এই হলো আমার অভিজ্ঞতা। তবে সকলের অভিজ্ঞতা যে এমন তা কিন্তু নয়। অনেকের হয়তো ভালো ভালো অভিজ্ঞতা আছে।

সেই ভালো অভিজ্ঞতা সকলের হোক সেই প্রত্যাশায়। জয়গুরু।।

লালন চর্চায় সাক্ষাৎকার-

লালনের মতাদর্শ বুঝতে গিয়ে সাক্ষাৎকার একটি গুরুপূর্ণ অনুসঙ্গ হতে পারে। এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্ম হতেই পারে। তবে কাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হবে সেই বিবেচনাও একই সঙ্গে জরুরী। আসলে যারা লিখেন, যারা ধারণ করেন তার পেছনে একটা ক্ষীণ হলেও উদ্দেশ্য বিরাজ করে।

সেই উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয়। সেই উদ্দেশ্য যদি শুদ্ধ হয়। সৎ হয়। প্রেমময় হয়। ভক্তিপূর্ণ হয়। তবে সেই কাজও হয় সুন্দর। যদিও তার লোকপ্রিয়তা পাওয়া শক্ত। কারণ বর্তমান সমাজের মানুষ সত্য বচন শোনার চেয়ে অন্যের প্রতি করা কুটুক্তি শুনতেই বেশি আগ্রহী।

তাই যেখানে সত্যের কথা বলা হয়। মৌলিক কথা বলা হয়। শুদ্ধ জ্ঞানের আলোচনা করা হয়। সেখানে লোকের ভিড় হয় না। তবে সত্য সত্যই। তার জনপ্রিয় হওয়ার দায় নাই। এই সহজ সত্য মেনে যারা এই কাজটি করে চলেছেন তাদের চরণে ভক্তি।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু বেশিভাগ ক্ষেত্রেই তার কোনো ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। এই কাজে রাষ্ট্র বা অন্য কেউ এগিয়ে আসেন নি। তাই হয়তো ইচ্ছে থাকা সত্বেও অনেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি শুরু করেও শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন নি।

তাই ধারাবাহিকতার বিচারে বলতে গেলে এখনো লালন সাঁইজিকে নিয়ে বা ঘিরে এই কাজটি সেভাবে শুরুই হয়নি। বর্তমানে মিডিয়ায় প্রচারের উদ্দেশ্যে যে সকল সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করা হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। আবার যারা আনুষ্ঠিকভাবে সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্যেও ভিন্ন।

পুরানো সকল কিছু ভুলে নবীন প্রজন্ম লালনকে ভালোবেসে এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজে এগিয়ে আসবে একদিন; সেটাই চাওয়া। আশার কথা হলো নতুন প্রজন্মের অনেকেই নতুন করে ভাবতে শিখছে। তারা এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায় কাঁধে তুলে নিবে এটাই প্রত্যাশা।

প্রায় কোনো মহলই লালন বা লালন সাঁইজির মতাদর্শ তুলে ধরবার চেষ্টায় সেভাবে নাই। প্রথম পক্ষ সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করছে নিজে খ্যাতি পাওয়ার বা অর্থ উপার্জনের নির্মিত্তে।

অন্য দিকে যারা ঘটা করে আয়োজন করে বিজ্ঞাপনের অর্থে এসকল আয়োজন করছেন। তারা বেশিভাগ ক্ষেত্রেই নিজের কথাটা অন্যের মুখ থেকে বলিয়ে নেয়ার একটা সূক্ষ্ম প্রয়াস করে থাকেন। এতে দর্শক-স্রোতা-পাঠকের আগ্রহ বাড়ার চেয়ে ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়।

আবার কেউ কেউ বিষয়টাকে এতো বেশি কিতাবে করে তোলেন। এতো বেশি রসকষহীন, গুরুগম্ভীর করে তোলেন যে। সাধারণে তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

এখনো অনেক জ্ঞানীগুণী জন রয়েছেন যাদের সাক্ষাৎকার নেয়া প্রয়োজন। তা শুধু লালন সাঁইজির মতোবাদকেই নয়। মতবাদকে ধারণ করতে গিয়ে কি সংগ্রাম করতে হয় মানুষকে তাও উঠে আসবে। উঠে আসবে অনেক অজানা কথা। যা নতুন করে আমাদের ভাবতে শেখাবে। তাতে একমুখি চিন্তা থেকে বেড়িয়া আসা সহজ হবে।

পুরানো সকল কিছু ভুলে নবীন প্রজন্ম লালনকে ভালোবেসে এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজে এগিয়ে আসবে একদিন; সেটাই চাওয়া। আশার কথা হলো নতুন প্রজন্মের অনেকেই নতুন করে ভাবতে শিখছে। তারা এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায় কাঁধে তুলে নিবে এটাই প্রত্যাশা।

সেই সকল নবীন সাধুগুরুভক্তপাগলদের চরণে আগে থেকে ভক্তি দিয়ে রাখলাম। জয়গুরু।

লালন চর্চায় সোশ্যাল মিডিয়া-

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত গণমাধ্যম হলো সোশ্যাল মিডিয়া। জনপ্রিয় বেশকিছু সোশ্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন মাধ্যম যুক্ত হচ্ছে। সেগুলো বিভিন্ন বয়স, বিভিন্ন পেশাজীবী সহ দেশ-কাল-পাত্র ভেদেও আছে জনপ্রিয়তার ভিন্নতা।

আধুনিক সময়ের এই বিচ্ছিন্নতার কালে মানুষ যখন ক্রমশ একাকীত্বের করাল গ্রাসে ডুবে যাচ্ছে। যখন পাশাপাশি বসবাস করেও প্রতিটা মানুষ অনেক দূরের বাসিন্দা। যখন মানুষ আর মানুষের বন্ধু হয়ে উঠতে পারছে না। ক্রমশ প্রতিযোগী-প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।

(চলবে…)

<<লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব দশ ।। লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব বারো>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………………
আরো পড়ুন-
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব এক
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব দুই
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব তিন
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব চার
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব পাঁচ
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব ছয়
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব সাত
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব আট
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব নয়
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব দশ
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব এগারো
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব বারো
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব তেরো

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!