ফকির লালন সাঁই

লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব বারো

-মূর্শেদূল মেরাজ

তখন এই সোশ্যাল মিডিয়া আবার মানুষকে সুযোগ করে দিয়েছে, নিজেকে প্রকাশ করার। নিজের কথা বলবার। নিজের ভাব-ভাবনাকে শেয়ার করার। নিজের আবেগ-অনুভূতি ব্যক্ত করার।

কিন্তু ঐ যা হয় আর কি। যথাযথ ব্যবহারের অভাবে সোশ্যাল মিডিয়াতেও লোকজন মুখোশ পরে বসে থাকে। সেখানেও মেকি জীবনের গল্প বলে চলে। যে জীবনটা সে যাপনই করে না। সেই জীবনটাকেই তুলে ধরে জাতে উঠতে চায়।

যে ভাবনাটার সাথে তার কোনোরূপ যোগসূত্র নেই। সেই ভাবনাটা শেয়ার করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় সকলের। যা লেখা হয়ে উঠছে না তাও লিখে চলেছে। যা ছবি হয়ে উঠছে না তাও পোস্ট করেই চলছে। প্রতারকরাও সুযোগ বুঝে প্রতারণার নিত্য নতুন ফায়দার জাল বুনছে।

নোংরামি যেমন হচ্ছে। তেমনি আবার কিছু সৃজনশীল-মননশীল-রুচিশীল কাজও হচ্ছে। হচ্ছে শুদ্ধচর্চা। শুদ্ধচিত্তের মানুষের মিলনমেলাও হচ্ছে কোথাও কোথাও। আসলে সবকিছুতেই তো মানুষ নিজের রুচির বহিঃপ্রকাশ করে। বাজার থেকে সকলে কি আর একই বই খরিদ করে?

যার যা মনে ধরে সে সেই বই-ই কিনে আনে। তেমনি একান্ত বাধ্য না হলে প্রত্যেকেই তাই করতে চায়; যা তার মন চায়-প্রাণ চায়-চিত্ত চায়। আসলে ভালো-মন্দ মিলায়ে সকলি। যাক সেসব কথা। নতুন প্রযুক্তিকে অবজ্ঞা করবার কিছু নেই।

তাহলে পিছিয়ে পরতে হয়। তবে নতুনকে জোর করে যেমন গ্রহণ করা ঠিক না। তেমনি পুরাতনকে অবহেলা করাও যথাযথ নয়। পুরাতনকে বুঝে-শুনে নিলে নতুনকে ব্যবহার করা-গ্রহণ করা সুন্দর হয়-ভালো হয়। বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কম।

নতুন প্রযুক্তি জায়গা করে নেবেই। এটাই নতুনের ধর্ম। তাই সময়মতো তাকে বুঝে-শুনে নিলেই তার ব্যবহার ভালো হয়। নইলে বিপদ ঘটে। যা আমাদের সমাজে প্রায়শই হয়ে থাকে। আমরা নতুনকে গ্রহণ করতে গিয়ে অনেকটা সময় নিয়ে নেই।

সেই ফাঁকতালে আড়ানি লোকজন তাতে ঢুকে পরে বিষয়টাকে নষ্ট করে তোলে। আর যখন নষ্ট হয়েই যায়, তখন আমরা সেটাতে প্রবেশ করে নাক সিটকাতে শুরু করি। অন্যদিকে নতুনকে ব্যবহারের জন্য বিজ্ঞাপনের লোভনীয় টোপ তো পাতাই থাকে।

সেই টোপে ধরা পরে আমরা অনেকেই নিজস্বতাকে হারাই। অন্যের ভাবনাকে নিজের চিন্তা বলে বিশ্বাস করতে শুরু করি। এতেই বাঁধে গন্ডগোল। বিপত্তি। তারপরও সকল প্রতিবন্ধকতা, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে কিছু মানুষ সকল জায়গাতেই চেষ্টা করে যায় শুদ্ধতার চর্চায়।

অনেকে বেশ দক্ষতার সাথে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে আবার লালনের ইমেজ ব্যবহার করে নানারূপ নোংরামিও করে যাচ্ছেন। আসলে সকল জায়গাতেই তো সব রকম লোক থাকেই। তাই নিজ বিবেচনাতেই খুঁজে নিতে হবে সঠিক মানুষটিকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু মানুষ নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফকির লালন ও তাঁর মতাদর্শকে শুদ্ধরূপে প্রচার করার। সাঁইজির বাণী সংরক্ষণ করার। এক জায়গার করার। একই সাথে চেষ্টা চালাচ্ছেন একই মতের মানুষদের একত্রিত করার। তাদের মাঝে শুদ্ধতা প্রচার করার।

আবার কিছু মানুষ আছে যারা নিজেরা কিছুই করবে না। কিন্তু অন্যে কি করলো তাতে কি কি ভুল আছে তারা তা খুঁজে খুঁজে বের করবে। আর কিছু খুঁজে পেলে তা শুধরে না দিয়ে তুমুল সমালোচনা করে বিতর্কে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।

কেউ কেউ চেষ্টা করছে কোথায় কি ঘটছে। কে কোন পদ গাইছেন তা প্রচার করায়। কেউ কেউ চেষ্টা করছেন লালন সাঁইজিকে নিয়ে লিখতে। কেউ কেউ চেষ্টা করছেন যারা লিখেছেন তাদের লেখাগুলো প্রচার করায়। বা একত্রিত করায়।

তবে সব কাজই যে ভালো, সুন্দর, শুদ্ধ হচ্ছে তা হয়তো নয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি মানুষ যখন সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বেশি সময় ব্যায় করে তাই এই মাধ্যমটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিবেচনায় হয়তো অনেক সাধুগুরুভক্তপাগলরাও সোশ্যাল সাইটে প্রবেশ করছেন।

অনেকে বেশ দক্ষতার সাথে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে আবার লালনের ইমেজ ব্যবহার করে নানারূপ নোংরামিও করে যাচ্ছেন। আসলে সকল জায়গাতেই তো সব রকম লোক থাকেই। তাই নিজ বিবেচনাতেই খুঁজে নিতে হবে সঠিক মানুষটিকে।

লালন চর্চায় সোশ্যাল মিডিয়া আদোতে কোনো গুরুত্ববহন করবে কিনা সেটা সময় নির্ধারণ করবে। তবে যুক্তিপূর্ণভাবে এই মাধ্যমকে ব্যবহার করা গেলে ভালো কিছু হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই সকলের কাছে সেই প্রার্থনা রেখেই শেষ করছি। জয়গুরু।।

লালন চর্চায় লাইভ/অনলাইন

সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বর্তমানে সাধুগুরুভক্তরাও প্রবেশ করেছে অনলাইন লাইভ সেশনে। এরমাঝে আয়োজন করে যেমন লাইভের আয়োজন করা হয়। তেমনি যে কেউ যে কোনো জায়গায় যে কোনো পরিবেশে লাইভে চলে যায়।

এতে করে অনেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও যেমন লাইভে চলে আসে। তেমনি আবার অনেকে নিজেই ঘটা করে লাইভে এসে কথা বলেন। প্রযুক্তির আধুনিকায়নকে গ্রহণ করা মন্দ নয়। তবে আগে প্রযুক্তিকে বুঝে নেয়া জরুরী। কারণ অনেক সাধুগুরুই আছেন তারা জানেনই না ফেসবুক কি। ইউটিউব কি।

কথা বললে কি হবে। কারা শুনবে। কি হবে। তাদের কোনোরূপ ধারণা নেই। এতে ভিউ বাড়ানোর জন্য নবীনরা সাধুগুরুদের মুখ থেকে এমন সব কথা বের করতে চায়। যাতে অধিক মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। বিষয়টা ভালো কি খারাপ সেটা ভিন্ন আলোচনা।

কিন্তু বিষয়টা সম্পর্কে বিন্দু পরিমাণ ধারণা না থাকায়। অনেকেই কি বলা উচিৎ আর কি বলা উচিৎ নয়। সে সম্পর্কে অবগত নন। তবে এই কথার উত্তরে অনেকেই বলতে পারেন। সাধুগুরুদের আবার রাখঢাক কি মশাই? তাদের তো সকল কিছুই উন্মুক্ত হওয়া উচিৎ।

ছল, ছলাকলা করবে কেনো তারা? তারা কোনো কিছুকে আড়াল করবে কেনো? শুধু নিজের ভক্তদের জন্য সকল কিছু জমিয়ে রাখবে কেনো? সকলের জন্যই তা উন্মুক্ত করতে হবে। সাধারণ কথায় তা মিথ্যা নয়। কিন্তু একটু বুঝবার চেষ্টা করলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

কিছু শিক্ষা থাকে যা গণ। তা সকলের জন্যই উন্মুক্ত থাকে। যে কেউ চাইলেই তা পড়তে পারে। আবার কিছু বিষয় থাকে যা বয়সভিক্তিক আলাদা করা হয়। আবার কিছু বিষয় থাকে যা মেধার পরিমাণ নির্ধারণ করে আলাদা করা হয়।

বা কোনো অনুসারী-অনুরাগীর ভেতরে সেই ভাব না প্রকট হয়। ততক্ষণ যথার্থ গুরু গুরুতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন না। করা উচিৎও নয়। কিন্তু বিষয়টা অনেকক্ষেত্রেই সংরক্ষিত থাকছে না অনলাইনের দৌরাত্ব্যে। এটি যে কেবল নবীন যারা ভিউ বাড়ানোর শিকারে বেড়িয়েছে তাদের বুঝবার জ্ঞানের অভাব তাই নয়।

প্রায় সকল বিষয় সম্পর্কে জানতে গেলেই আগে ফান্ডামেন্টাল ক্লাস করানো হয়। যাতে কোনো বিষয়ে প্রবেশ করার জন্য প্রাথমিক জ্ঞানটা শিক্ষার্থী নিয়ে নিতে পারে। ফান্ডামেন্টাল ক্লাসের পর ধীরে ধীরে শিক্ষক তার পাঠ এগিয়ে নিয়ে যায়।

যারা নিজেকে প্রমাণ করে করে এগিয়ে যায় শিক্ষকের সাথে। তারাই পরবর্তী শিক্ষার পাঠ পায় শিক্ষকের কাছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে। এভাবে এগুতে এগুতে শিক্ষার্থীদের মাঝে যারা মেধা-মননে শিক্ষকের মনে আসন করে নিতে পারে।

সেই উপযুক্ত শিক্ষার্থীরাই শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের সাথে যাত্রা করতে পারে। অধিকতর গবেষণার জন্য। তারপর শিক্ষার্থী সেই বিষয়ে নিজের তত্ত্ব শিক্ষকের সাথে আলোচনা-পর্যালোচনা করে কোনো মতে পৌঁছাতে চায়। এটাই মোটামুটি শিক্ষার গতি প্রকৃতি।

তাই সকলের জন্যই শিক্ষা উন্মুক্ত বিষয়টি এমন নয়। আগে সেই শিক্ষা ধারণের উপযুক্ত হতে হয়। তবেই শিক্ষা পাওয়া যায়। ভাববাদও তার বাইরে নয়। তাই উপযুক্ত শিক্ষার্থী তথা ভক্ত-শিষ্য যতক্ষণ পর্যন্ত গুরু প্রস্তুত করতে না পারেন।

বা কোনো অনুসারী-অনুরাগীর ভেতরে সেই ভাব না প্রকট হয়। ততক্ষণ যথার্থ গুরু গুরুতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন না। করা উচিৎও নয়। কিন্তু বিষয়টা অনেকক্ষেত্রেই সংরক্ষিত থাকছে না অনলাইনের দৌরাত্ব্যে। এটি যে কেবল নবীন যারা ভিউ বাড়ানোর শিকারে বেড়িয়েছে তাদের বুঝবার জ্ঞানের অভাব তাই নয়।

অনেক সরল সাধু আবার পোশাকী সাধুগুরুরা নিজেদের প্রচার-প্রচারণার জন্যও নানাবিধ কথা বলে থাকেন। নানাবিধ বিষয় লাইভ করার অনুমতি প্রদান করে থাকেন। যা মূল ভাবকে বিকৃত করে বলে অনেক সময় মনে হয়।

সকল কিছুই লাইভ করবার কোনো মানে হতে পারে না। এক ফেসবুক বন্ধুকে আনফ্রেন্ড করে ফেলায় তিনি মনে বেশ কষ্ট পেলেন। দিন কয়েক পর ফোন দিয়ে বললেন, ভাই আমাকে আনফ্রেন্ড করেছেন কেনো? আমার দোষ কি? আমি কি অপরাধ করলাম??

তবে এক সাধু বলেছিলেন, “আরে এসবে তো আরো ভালোই হইতেছে। মানুষ ভুলভাল বুঝতেছে। এতে লালনের মূল ভাব আড়ালেই থাইক্কা যাইবো। যে গুপ্ত ভাব। তা গুপ্তই থাইক্কা যাইবো।”

আমি তার সাথে দ্বিমত করে বলেছিলাম, আরে সাধু লালনের রহস্যময়তাকে রহস্যময় রাখবার জন্য স্বয়ং লালন ফকিরই যথেষ্ট। তার জন্য কোনো বেহেলাপানা করবার প্রয়োজন নেই। আর এই সব অযাচিত প্রচার-প্রচারনায় গুপ্ত মত কতটা আড়াল হচ্ছে তা জানি না। তবে শুদ্ধতা যে হারাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই।

তিনি আমার সাথে একমত হয়েছিলেন কিনা বুঝতে পারিনি। তবে আমার তাই মনে হয়। সাধুগুরুদের ভক্ত-শিষ্যদের উচিৎ নিজগুরুকে কিরূপে উপস্থাপন করবেন। যেহেতু প্রযুক্তি সম্পর্কে তার জ্ঞান গুরু হইতে কিঞ্চিৎ হইলেও যুগোপযোগী।

সকল কিছুই লাইভ করবার কোনো মানে হতে পারে না। এক ফেসবুক বন্ধুকে আনফ্রেন্ড করে ফেলায় তিনি মনে বেশ কষ্ট পেলেন। দিন কয়েক পর ফোন দিয়ে বললেন, ভাই আমাকে আনফ্রেন্ড করেছেন কেনো? আমার দোষ কি? আমি কি অপরাধ করলাম??

উত্তরে শুধু বলেছিলাম। ভাই আপনার একমাত্র কাজ হলো সারাদিন আপনি নিজের যত ছবি তোলেন তার সব পোস্ট করেন। সেগুলো কেমন হলো? সবগুলো দেয়ার উপযোগী কিনা। এতো ছবি দেয়ার কি প্রয়োজন এসব কি কখনো ভাবেন?

(চলবে…)

<<লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব এগারো ।। লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব তেরো>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………………
আরো পড়ুন-
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব এক
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব দুই
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব তিন
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব চার
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব পাঁচ
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব ছয়
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব সাত
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব আট
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব নয়
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব দশ
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব এগারো
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব বারো
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব তেরো

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!