মায়া

মায়া

-দ্বীনো দাস

মায়াতে মত্ত হলে
গুরুর চরণ না চিনিলে,
সত্য পথ হারাইলে
খোয়ালে গুরুবস্তু ধন।।

-ফকির লালন সাঁই

ভ্রান্তি, অজ্ঞানতা, মরীচিকা, সম্মোহিত অবস্থার সৃষ্টি করে এই মায়া। সৃষ্টিকুলের সমগ্র জীব মায়া কর্তৃক সম্মোহিত হয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। সাধারণ জীব (মানুষ) এই সৃষ্টি রূপী মায়াকে চিনতে পারে না। তাই তাদের নানারূপ কষ্ট ক্লেশদায়ক জীবনযাপন ও প্রকৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত জন্মমৃত্যুর চক্র চলতে থাকে।

সৃষ্টিকুলের সৃষ্টি এই মায়া দ্বারা। যে আপন গুরু প্রদত্ত পথে সঠিকভাবে চলে এই সৃষ্টি রহস্য জেনেছে। সেই কেবল ঐ মায়াকে চিনেছে।

সৃষ্টির শুরুতেই স্রষ্টার ইচ্ছা হলো লীলা করার। আর লীলা একা হয় না। তাই তার ইচ্ছা ও হুকুমে প্রথমে (নির্গুণ ব্রহ্মই স্রষ্টা) ইচ্ছা হওয়া মাত্রই তার নূর হতে ‘মা’-এর সৃষ্টি হল। তখন এই মা হল স্বগুণ ব্রহ্ম মা, ঐ মা হতে তার পর সৃষ্টি হল একজন নারী-একজন পুরুষ। এই নিয়ে শুরু হল সৃষ্টির লীলা।

নির্গুণ-স্বগুণের (জাত-সেফাত) সন্ধিস্থলে অপ্রাকৃত ভূমিতে এই সেফাত রূপী মায়ের সংসার। আর এটাই হল ভাবলোক বা নিত্যলোক। যিনি নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্ম (জাত) তিনিই সাকারে স্বগুণে এসে লীলা করছেন। সাঁইজি লালন ফকিরের ভাষায়-

অখন্ড মন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচর।।
[অখন্ডমন্ডলাকারে যিনি ব্যাপ্ত তিনিই সর্ব্বশক্তিমান স্রষ্টা]

সূক্ষ্মজ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য
সাধকের উপলক্ষ।।

-ফকির লালন সাঁই

আমার জানা মতে, সাধনকর্ম বা সাধনপথ তিন প্রকার- ১. জ্ঞানপথ ২. যোগপথ এবং ৩. ভক্তিপথ। যোগপথ ও জ্ঞানপথ সাধনা করার জন্য সাধক খুব কম জন্মায়। আর খুব কমই দেখা যায় এই পথের সাধকদের। এই দুই পথ সাধারণের জন্য নয়। এ পথে চাই অনেক অনেক ধৈর্য আর ব্রহ্মচর্য (পবিত্র জীবনযাপন)। এগুলোই এ পথের মূল। সেকারণেই হয়তো এ পথের সাধক খুবই কম পাওয়া যায়।

এবার বাকী থাকলো ভক্তিপথ। এ পথ খানিকটা সোজা। বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে অবতার পুরুষরা দুনিয়াতে এসে ভক্তিপথ দেখিয়েছেন। এ পথে শুধু অন্তরস্থল থেকে করা চাই ; একনিষ্ঠ বিশ্বাস।

তবে যে পথই অবলম্বন করা হোক না কেন তাতে চাই- জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি। আর জ্ঞান না থাকলে আমরা সাধারণরা বুঝতে ভুল করবো।

স্বগুণের সাধনা হয়-নির্গুণের সাধনা হয় না। স্বগুণের সাধনা হলেই নির্গুণের প্রাপ্তি ঘটে বা লাভ করা যায়। তারপর সাধক যার যার মত করে সুখ ও তার অবগাহন উপলব্ধি করে। জ্ঞানপথ দিয়ে যেমন ইশ্বরের সাধন করা যায় না। তেমনি ভক্তিপথ দিয়ে ব্রহ্মার (নির্গুণ-পরমাত্মা) সাধন চলে না। এরূপ সাধনায় কেবল গোলমাল সৃষ্টি হয়।

জ্ঞানপথে (প্রত্যক্ষ দর্শন) বিশ্বাসের প্রয়োজন নাই। আর ভক্তিপথে কঠোর সংযমের দরকার নাই। অবশ্যই যে পথেই সাধনা করা হোক না কেন- জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি সবখানেই থাকা চাই। তা না হলে মানুষ একে অপরকে কিভাবে চিনবে? কাছে আসবে? ভলোবাসবে নিগূঢ় ভাবে?

সত্য বলা, ব্রহ্মচর্য পালন (পবিত্র জীবনযাপন) এটা মানা বা পালন করলেই ধর্মের পথে চলা যায়। আর একটা বিষয় অতীব জরুরী সেটা হল-জননেন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে সন্মানের চোখে দেখা। তার অপব্যবহার করলে কিরূপ কুফল হয় তা গভীরভাবে ভাবতে হবে।

যদি কেউ ভোগ আর ঐশ্বর্য চায়, তবে তাকে রজোগুণে আশ্রয় নিতে হবে। আর যদি কেউ সাধুগুণের ভাব নিয়ে চলতে চায় তাহলে তাকে সাত্ত্বিকগুণে চলতে হবে। আর তমোগুণের কথা সেতো পশুবৃত্তি। আজ সব জায়গায় দেখছি তমোসাচ্ছন্ন তমোগুণের প্রভাব।

নিয়মনীতি পালন করলে পবিত্র জীবনযাপন (ব্রহ্মচর্য) করলে একদিন সত্যিকার ধর্মবোধ তার জাগবেই। আর তখন সে দুনিয়াকে ভাল কিছু দিতে পারবে। সে যে ধর্মেরই হোক না কেন। আমরা যদি সাত্ত্বিক গুণের অধিকারি হই তাহলে সমগ্র জগৎ আমাদের পিছনে ছুটবে। নিয়মনীতি পালনে একদিন আমাদের জ্ঞান জাগবেই-

মায়ার বশে কাঁদবি বসে আর কতকাল
ওরে মন তোর শিয়রেতে এল মহাকাল,
একদিনান্তে মনভ্রান্তে ভজলি না মন গুরুর চরণযুগল
যে দিন এসে ঘিরবে তোরে সেদিন পড়ে রবে মায়াজাল।।

-ফকির লালন সাঁই

এই মায়া ভালভাবে জানতে গেলে একটু আলোচনার গভীরে যেতে হবে। জানা জরুরী- কর্ম ও তার ফল প্রাপ্তি ভোগ।

কর্ম তিন প্রকার- ১. মোহবশের কর্ম- তামসিক, ২. লোভের বশে কর্ম- রাজসিক, ৩. নিষ্কাম ও সেবাকরার কর্ম- সাত্ত্বিক। সাধু কর্ম হল জীবজগতের মঙ্গল ও সেবা চিন্তা করা।

সাধনার উচ্চর্মাগের পৌঁছাতে গেলে অবশ্যই আহার/খাদ্য সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। কারণ খাদ্যের গুণ মোতাবেক প্রবৃত্তি বা কর্ম প্রবাহিত হয়।

আধ্যাত্মশক্তি যা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বা সমন্বয় বিকশিত এবং স্থাপিত করে। এই শক্তি অর্জন করতে হলে কিসে ভালো কিসে মন্দ, কেমন আহার-বিহার করা উচিত এটা আগে ভাবতে হবে।

খাদ্য বিচারে দেখা যায় জীবের শরীর থেকে প্রাণ ত্যাগ হবার পরপরই শরীরের প্রতিকূল বিষ, শক্তি একত্রিত হয়ে পড়ে এবং খুব দ্রুত তা বাড়তে বা ছড়াতে থাকে। এর শেষ পরিণাম হল দেহে পচন।

সে কারণে মানুষ মারা গেলে লাশকে তাড়াতাড়ি সমাধীকার্য সম্পাদন করা হয়। এবং সমাধীকার্য সম্পাদন শেষে উপস্থিত সকলে স্নান-গোছল করে। যাতে ঐ পচনশীল জীবানু আমাদের কোন ক্ষতি করতে না পারে।

প্রাণশক্তির ভিত্তিতে মানুষের শরীর আর জানোয়ারের শরীরের তেমন কোন পার্থক্য নেই। প্রাণশক্তির মৌলিকতত্ত্ব- বায়ুপ্রাণ, সূর্যপ্রাণ, জলপ্রাণ ও ভূমিপ্রাণ। এইসব তত্ত্বের ভারসাম্য নষ্ট হলেই আমাদের শরীর অসুস্থ হয়ে পরে। এইসব প্রাণশক্তি গাছপালা, উদ্ভিদদের মধ্য সম্পূর্ণভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে।

এই শক্তিকে প্রত্যক্ষরূপে আহার হিসাবে নিলে মঙ্গল হয়। গাছগাছড়া, ফলমূল, সবজি হলো প্রাণশক্তির স্বাভাবিক ভাণ্ডার। যা দীর্ঘসময় ধরে মজুত থাকে, যা কিনা ছেঁড়া বা কাটাকুটির পরেও ঐ প্রাণশক্তি নিহিত থাকে। এই কারণে এগুলোই হল সজিব বা সাত্ত্বিক আহার।

অন্যদিকে যখন প্রাণ শরীর ত্যাগ করে, প্রাণশক্তি তখন খুব দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। মৃত শরীর তখন প্রতিকূল শক্তি প্রবাহকে আকর্ষিত করে। ফলে শরীরে পচনের কাজ শুরু হয়ে যায়। এছাড়া আমরা যখন ভয়, চিন্তা, ক্লেশ, দ্বেষ, উদ্বেগ-যন্ত্রণা বা মৃত্যুভয়ে ছটফট করি বা এইসব দ্বারা আচ্ছন্ন থাকি।

তখন আমাদের শরীরে জৈবীয় রাসায়নিক (bio-chemical) পরিবর্তন হয়ে বিষের মত আমাদের শরীরে ছড়িয়ে পরে এবং শরীরে নানাপ্রকার রোগ এসে হাজির হয়।

ঠিক তেমনি মানুষ যখন তার আহারের জন্য জ্যান্ত-জানোয়ার হত্যা বা জবাই করে। তখন ঐ জ্যান্ত পশু ভয়ে আক্রান্ত থাকে এবং খুব দ্রুত তার পুরো শরীরে জৈবীয়-রাসায়নিক পরিবর্তন হয়। আর ঐ রসায়নরূপী বিষ দ্রুত পুরো শরীরে ছড়িয়ে পরে। এই বিষ- ভয়, শোক এবং ব্যথার জন্য অতি অত্যাধিক মাত্রায় উৎপন্ন হয়।

যে মানুষ ঐ জীবের মাংস খায়, তা যে কোন পশু-পাখি যারই হোক না কেন। একই সঙ্গে ঐ বিষ খায়ও। সেই সঙ্গে নঞর্থক-শক্তিকেও পরোক্ষভাবে গ্রহণ করে ফেলে। এই নঞর্থক শক্তিই পরে ধীরে ধীরে শরীরের মধ্যে এর প্রভাব ফেলতে থাকে। পরিণামে মানুষ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করে ও পশুবত্তিসম কর্ম করে ।

উদ্ভিদদের মধ্যে বিদ্যমান চেতন, পশুর মধ্যেকার চেতনার থেকে একেবারেই আলাদা। যতটুকু মানুষের প্রাণ শক্তির জন্য প্রয়োজন তা আমরা শাকসবজি, ফল, ডালের মধ্যে পেয়ে যাই। আমরা যদি দীর্ঘজীবন লাভ করতে চাই এবং নিজেদেরকে পরিশ্রমী ও সৈনিক করতে চাই। তাহলে প্রকৃতির কাছে আমাদের অনেককিছু শিখতে ও গ্রহণ করতে হবে।

একটা উদাহরণ দেখা যাক- মাংসাশী পশুর জীবন হয় স্বল্পদীর্ঘ, হিংস্র এবং কমপরিশ্রমী। অন্যদিকে নিরামিষভোজী পশুর জীবন হয় অনেক দীর্ঘ, শান্ত ও বেশি পরিশ্রমী। একটা বাঘের গড় আয়ু হয় ১৫ বছর। সে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮-২০ ঘণ্টা ঘুমায়। স্বভাবে হয় হিংস্র।

অন্যদিকে একটা হাতি ১০০ বছরেরও বেশি বাঁচে এবং অনেক বেশি পরিশ্রমী। আহার করে নিরামিষ। স্বভাবে হয় শান্ত। অতএব বিষয়টা পরিষ্কার আমিষ আহার করে দীর্ঘজীবন ও বেশি পরিশ্রমী হওয়া কোনোমতেই সম্ভব নয়। সুতারাং আমাদের সকলকে সুস্থ থাকতে হলে অবশ্যই নিরামিষ ভোজন বা আহার করা উচিত।

মানব শরীরের ও আধ্যাত্মিক চেতনার আরেক মহামারী বিষ হচ্ছে নেশা। এই নেশা প্রধানতঃ মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে এবং মানুষের অবচেতন মনের চাপা ভাবনাকে বাইরে বের করে নিয়ে আসে বা আনার জন্য প্রেরিত করে। এই চাপা ভাবনা প্রেমেরও হতে পারে আবার অপ্রেমের(ঘৃণা)ও হতে পারে।

এ সময় মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করে। কারণ তখন তার নিজের মস্তিষ্কের উপর নিজেরই নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মানুষ এ সময় অত্যন্ত হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। এর পরিণাম ভয়াবহ খারাপ হতে পারে।

নেশার কারণে সর্বদাই মানসিক অবসাদ হয়। নেশার প্রভাবে শরীরের স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিকূলতা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে শরীরে অবসন্ন হতে থাকে। যাহা (রূহ্ লতিফা বা মণিপুর চক্র, Solar plexus) ক্ষতি করে। এই চক্রের প্রধান তত্ত্ব হলো নূর বা অগ্নিতত্ত্ব, নেশার দ্রব্য হলো অগ্নিতত্ত্ব।

নেশা এই চক্র পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। সেই সঙ্গে কলব লতিফা- অনাহত চক্র (heart) ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এই ব্যাপারটা ভীষণ ভয়াবহ। মাদক যাই হোক তার পরিণাম ফল মন্দ। অন্যদিকে এই চক্রের প্রভাব অন্য সকল চক্রে গিয়ে পড়ে।

এই নেশা বা মাদক নিয়ে ফকির লালন সাঁইজির বলেছেন-

গাঁজায় দম চড়িয়ে মনা,
বোম কালি আর বলিও না-রে।।

তদ্রূপ জীব মাংস আহার এই চক্রগুলি সঙ্কুচিত করে, বিশেষ করে নষ্ট হয় গো-মাংসে। আপন গুরুর নির্দেশ মত আহার, বিহার, সাধন কর্ম ও নিজ প্রত্যাহিক কর্ম করাকে সাত্ত্বিক কর্ম বলে।

কর্মফল ৩ প্রকার- স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ। স্থূলদেহের কর্ম স্থূল; তা সূক্ষ্ম শরীর ভোগ করে। স্থূলদেহের মানসদ্ভব আশাগুলি সূক্ষ্ম ও কারণ শরীর ভোগ করে। কারণ শরীরই বীজ ভাণ্ডার, কারণ শরীরে সমস্ত বীজ জমা থাকে। এই নিয়েই মানবের জন্ম-মৃত্যু চক্র চলতে থাকে।

………………………………..
আরো পড়ুন:
কে বলে রে আমি আমি

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!