অল্পকথায় ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্পকথা

অল্পকথায় ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্পকথা: পর্ব তিন

-মূর্শেদূল মেরাজ

এতো সব কেলেংকারীর পরও তারা মুখ দিয়ে একবার ক্ষমা পর্যন্ত চায় নি। আর আমরাও তাদের বিচারের মুখোমুখি করবার সময় পাইনি। বাধ্য করতে পারিনি তাদের কাছ থেকে কড়ায়-গণ্ডায় নিজেদের বুঝ বুঝে নিতে। আমরা এসব মূল ঘটনার বিচার না চেয়ে-তাদের বিচারের মুখোমুখি না করে।

আশ্চর্যজনকভাবে গত অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে আমাদের ছোটখাটো সমস্যাগুলোর বিচার করার জন্য তাদেরই দ্বারস্থ হয়েছি।

আপনার কি মনে হয়? বিষয়টা ভাবনার নয়? আমরা কি নিছকই আমাদের সমস্যা নিয়ে তাদের কাছে ছুটে যাই? যাদের নিজেরাই পৃথিবী জুড়ে অন্যায়-অবিচার করেছে বা করে চলেছে?

এ কি কেবলই আমাদের মুলার পেছন পেছন চলা? নাকি আমরা নিজেরাই মুলা হয়ে আমাদের পিছু পিছু বহু মানুষকে নিয়ে চলছি???

ভাবতে অবাক লাগছে কি? আমরা আজ তাদের কাছ থেকেই হিউম্যান রাইটস তথা মানুষের অধিকার সম্পর্কে শিখছি, যারা সকল রাইটস ভায়োলেট করে নরক গুলজার করেছিল? এখানে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে। আরে মশাই যুদ্ধে তো কৃষ্ণও অংশ নিয়েছিল।

রাষ্ট্র বা ধর্ম যেমন তার জনতাকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে থাকে। তেমনি সূত্রধরেরাও জগতের জীবকুলকে নানা স্তরে ভাগ করে তাদের কার্য চালিয়ে যায়। যেমন ধরা যাক, একটা নতুন কোনো প্রতিষেধক বাজারে ছাড়বে কোনো ঔষধ কোম্পানি তার জন্য ড্রাগ ট্রাইলের ব্যবস্থা করতে হবে।

নবী মোহাম্মাদ তো স্বয়ং যুদ্ধ করেছে। তাহলে মশাই আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান, মুসলিনি, হিটলারকেই কেনো কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাচ্ছেন?

আমি বিনয় করে বলি কি, মশাই এদের কাউকে নিয়েই এই আলোচনা নয়। আলোচনা হলো কারা এসব ঘটনার ফায়দা নেয় তাদের নিয়ে বুঝবার চেষ্টা মাত্র। আদতে আমরা গোটা মানবজাতিই এই সূত্রধরদের হাতের পুতুল।

জীবনের এই রঙ্গমঞ্চে কেউ তাদের হয়ে খেলছে এবং তার জন্য তারা পারিশ্রমিক পাচ্ছে। আরেক দল তাদের সহযোগী হয়ে গলাবাজি করছে। আরেকদল তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছে। এখানে সবচেয়ে গোবেচারা হলো এই তৃতীয় দল এবং তার শত-সহস্র-লক্ষ-কোটি উপদল।

কারণ তাদের অনেকে জানতেই পারে না বা মানতেই পারে না তারাও আদতে সূত্রধরদেরই স্বার্থে কাজ করে চলেছে। অথচ তারা তাদের চিরশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে জীবনকে কত কঠিন করে তোলে।

তবে আশার কথা হলো, সবকিছু ছাপিয়ে কিছু মানুষ সত্যি সত্যি সূত্রধরদের ভিত নাড়িয়ে দিয়ে লড়ে যান। তাদের মতাদর্শকে বশে আনতে বা দিক ঘুড়িয়ে দিতে একটু সময় লাগে তাদের। আর এই ফাঁক তালে সেই মতাদর্শ বা শিল্প ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা হয়ে টিকে থাকে।

হয়তো সেই মতাদর্শ গল্প, গান, গ্রন্থ, চিত্র বা চলচ্চিত্র হয়ে পুঁজিবাদির বৈঠকখানাতেই শোভা বাড়ায়। তারপরও উপযুক্ত সন্ধানী তার গোপন ভাষা ঠিকই বুঝে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে তা কতদূর সফল হয় তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে।

অথচ আমরা চাইলেই যে কোনো দর্শনকে আরো নান্দনিক উপস্থাপন করতেই পারি। নিজেদের দর্শনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য না করেও। তারপরও সেই সূত্রধরদের সুতার টানে আমরা এমনটাই করি। এতেই পুরস্কৃত হই আমরা। নিজস্বতাকে ভাঙলেই স্বীকৃতি মেলে।

রাষ্ট্র বা ধর্ম যেমন তার জনতাকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে থাকে। তেমনি সূত্রধরেরাও জগতের জীবকুলকে নানা স্তরে ভাগ করে তাদের কার্য চালিয়ে যায়। যেমন ধরা যাক, একটা নতুন কোনো প্রতিষেধক বাজারে ছাড়বে কোনো ঔষধ কোম্পানি তার জন্য ড্রাগ ট্রাইলের ব্যবস্থা করতে হবে।

তখন তা যদি কোনো উন্নত বিশ্বে তা করতে চায়। তাহলে তাকে অনেক কঠিন বিধিনিষেধ-নিয়মনীতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কারণ হিসেবের মারপ্যাচে উন্নত দেশের মানুষের দামও উন্নত। তাই তখন তা হয়তো অনুন্নত কোনো দেশে ট্রাইলের ব্যবস্থা করা হলো।

এতে হয়তো অনেক মানুষ মারা গেলো। অনেক মানুষ পার্শ্বপ্রতিকৃয়া নিয়ে বেঁচে রইলো। সে সব ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে সেসব নির্যাতন-নিপিড়নের কথা বাইরে প্রকাশই পাবে না। উল্টো তারা যে দরিদ্র দেশে এই পরীক্ষা চালিয়েছে সেই জন্য তাদের বাহাবা জানাবে গোটা বিশ্ব।

কলোনী আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে যে, আমাদের নিজেদের যা কিছু আছে, বা যা কিছু অর্জন তা সকলই খারাপ। তাই এতো বছর পর আজও আমরা প্রগতীশীলতার নামে যে সকল শিল্প নির্মাণ করি তার অনেকাংশেই জড়িয়ে থাকে নিজেদেরকে খারাপ প্রমাণ করে অন্যের দর্শনকে মহৎ প্রমাণ করার প্রবণতা।

অথচ আমরা চাইলেই যে কোনো দর্শনকে আরো নান্দনিক উপস্থাপন করতেই পারি। নিজেদের দর্শনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য না করেও। তারপরও সেই সূত্রধরদের সুতার টানে আমরা এমনটাই করি। এতেই পুরস্কৃত হই আমরা। নিজস্বতাকে ভাঙলেই স্বীকৃতি মেলে।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে তবে কি আমাদের নিজস্বতা এতোটাই মহান যে তাকে কোনো প্রশ্নই করা যাবে না? তার সবকিছু মেনে নিয়ে তার মতেই সব করতে হবে? তবে কি এই লেখা মূলকে ধরে থাকবার কথা বলে মৌলবাদীতাকে বাহবা দিতে চাচ্ছে?

ষড়যন্ত্রের একটা ছোট্ট গল্প বলি। এই তো কিছুদিন আগেও, আমাদের ঠাণ্ডা-কাশি হলে নানী-দাদীরা জোর করে বাসক পাতা-তুলশি পাতা খাওয়াতো। দাঁতের ব্যাথা হলে পেয়ারা গাছের কঁচি পাতা সিদ্ধ করে গড়গড়া করাতো। এই রকম আরো কত কি ঘরোয়া প্রতিষেধক-প্রতিরোধক ছিল। তাই না?

বিষয়টা আসলে তেমন নয়। বিষয়টা হলো, প্রথা না ভাঙলে নতুন পথ পাওয়া যায় না সত্য। কিন্তু আগে নিজেকে না বুঝে। নিজস্বতাকে না বুঝে প্রথা ভাঙলে তা আপাত মধুর মনে হলেও। তা কোথাও গিয়ে পৌঁছায় না। ভ্রান্তি তৈরি করে।

ব্রহ্মাণ্ডের মূল সত্য কি তা আগে জানা প্রয়োজন। আমরা আদতে কাদের পক্ষে, কিসের পক্ষে কাজ করবো বা করছি সে বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে হবে। আমরা যা ভাবছি নিজেরা করছি, নিজেরা ভাবছি তা কি প্রকৃতপক্ষেই আমাদের নিজস্ব ভাবনা?

নাকি সেসব আমাদের ভাবানো হচ্ছে সেটাও নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

আমরা শেষ বিচারে কি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সেটা স্পষ্ট করে না জানলে সবই মুলার পেছনে ছোটা ভিন্ন অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ নিজস্বতাকে ভালো না বাসতে পারলে। মনের মাঝে যে দৈন্যতাটা সৃষ্টি হয় তা কাটিয়ে উঠা বেশ কঠিন। নইলে বিদেশী সিগারেট টানতে টানতে স্বদেশী আন্দোলনের ডাক দেয়াই সারা হবে।

ষড়যন্ত্রের একটা ছোট্ট গল্প বলি। এই তো কিছুদিন আগেও, আমাদের ঠাণ্ডা-কাশি হলে নানী-দাদীরা জোর করে বাসক পাতা-তুলশি পাতা খাওয়াতো। দাঁতের ব্যাথা হলে পেয়ারা গাছের কঁচি পাতা সিদ্ধ করে গড়গড়া করাতো। এই রকম আরো কত কি ঘরোয়া প্রতিষেধক-প্রতিরোধক ছিল। তাই না?

কিন্তু একটা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের কানের কাছে বলা হলো। চোখের সামনে দেখানো হলো। এ সবই অপচিকিৎসা-অপসংস্কৃতি। এতে শারীরিক-মানুসিক ক্ষতি ভিন্ন আর কিছুই হয় না। ইত্যাদি ইত্যাদি বলতে বলতে কথাগুলো আমাদের বিশ্বাসে ঢুকিয়ে দেয়া হলো।

বলা হলো, সেই সব খাবার খাও যা বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়। সেই সব খাবারই ভালো যা দামী দামী রেস্টুরেন্টে বিক্রি হয়। অথচ হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের খাদ্য-তালিকা প্রস্তুত হয়েছিল। কোন সময় কি খেতে হবে। সকালে কি খেতে হবে।

দুপুরে কি খেতে হবে। বিকেলে কি খেতে হবে। রাতে কি খেতে হবে। কতটা খেতে হবে। কতটা খাওয়া যাবে না। কোন ঋতুতে কি খেতে হবে। কি খাওয়া বারণ। কার জন্য কি খেতে হবে। সর্বোপরি আমাদের খাদ্য তালিকাই ছিল আমাদের চিকিৎসার ফর্দ।

সাধকরা যেমন জানে শক্তিকে ধ্বংস করা যায় না। এর গতিপথ পরিবর্তন করে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শক্তিকে দমন করতে চাইলে তা আরো বেশি গতি নিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠে। তাকে প্রতিরোধ করা আর অনেক বেশি কঠিন। তাই সাধকরা ষড়রিপুকে দমন না করে তার গতিপথ পরিবর্তন করে; তাকে বশে নিতে চায়।

রান্নাঘর ছিল ঔষধালয়। খাবারঘর ছিল চিকিৎসা কেন্দ্র। তবে সবকিছুই যে সর্বোচ্চ ছিল বা যুগে যুগে যে পরিবেশ-প্রতিবেশ পরিবর্তন হয়েছে। তার সাথে সেই তালিকার পরিবর্তন হয়েছে কিনা সে সব আলোচনার বিষয়বস্তু হতেই পারে।

কিন্তু সেসবে না গিয়ে। আমাদের শিখিয়ে দেয়া বিদ্যায় আমরা ধরেই নিলাম সেসব সেকেলে বিষয়। রোজ রোজ মুরগি পোড়া-আলু খাজা-রুটির উপর সবজি-সস দিয়ে খাওয়াই আসলে প্রকৃত অভিজাত খাওয়া। তাই আমরাও এসব ছেড়ে আধুনিক মানুষ হয়ে উঠলাম।

তারপর বড় বড় কম্পানি থেকে সেই সবই অনেক দামে কিনে খাওয়া শুরু করলাম। বাসক পাতা না খেয়ে বড় কম্পানির বাসক সিরাপ খেতে আমরা বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এভাবেই আমাদের নিজস্বতাকে ভুল প্রমাণ করে। তা ব্যবসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

আমরা যা বিনে পয়সায় পেতাম। তাই আমাদের নির্বুদ্ধিতার জন্য আজ পয়সা দিতে কিনে খেতে হচ্ছে। আর তার চেয়ে বড় বিষয় হলো বিষয়টা আমরা ধরতেই পারছি না। এই যে ধরতেই না পারার বিষয়টা। এটাই হলো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এই তত্ত্বের খেলাটাই এমন। এখানে যারা ডুবে থাকবে তারা টের পাবে না কতটা পানিতে ডুবে আছে।

সাধকরা যেমন জানে শক্তিকে ধ্বংস করা যায় না। এর গতিপথ পরিবর্তন করে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শক্তিকে দমন করতে চাইলে তা আরো বেশি গতি নিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠে। তাকে প্রতিরোধ করা আর অনেক বেশি কঠিন। তাই সাধকরা ষড়রিপুকে দমন না করে তার গতিপথ পরিবর্তন করে; তাকে বশে নিতে চায়।

তেমনি ষড়যন্ত্রতত্ত্বকারীরাও শক্তিকে দমন করে না। তারা কেবল তার গতিপথ পরিবর্তন করে তাকে বশে নিয়ে আসে। তাই তারা নতুন প্রবর্তিত মত-পথ ধর্ম-দর্শনকে ভয় পায় না মোটেও। বরঞ্চ তারা দীর্ঘসময় তাকে পর্যবেক্ষণ করে।

(চলবে…)

অল্পকথায় ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্পকথা: পর্ব চার>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………….
আরো পড়ুন-
অল্পকথায় ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্পকথা: পর্ব এক
অল্পকথায় ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্পকথা: পর্ব দুই
অল্পকথায় ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্পকথা: পর্ব তিন
অল্পকথায় ষড়যন্ত্রতত্ত্বের গল্পকথা: পর্ব চার

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!