বামন অবতারের কাহিনী

বামন অবতারের কাহিনী

-অগ্নিপুরাণ (পৃথ্বীরাজ সেন)

বিবস্বানের পুত্র শ্রাদ্ধদেব বৈবস্বত হলেন সপ্তম মনু। বর্তমানে চলছে তার রাজত্বকাল। শ্রাদ্ধদেবের দশ পুত্র- ইক্ষাকু, নভর্গ, ধৃষ্ট, শ্ব্যাতি, নিষ্যন্ত, নার্ভাগ, দির্ষ, তরুষ পৃষধ এবং বসুমান।

এই সময়কালে কশ্যপের ঔরসে অদিতির গর্ভে দেবগণের কনিষ্ঠ বামনরূপী শ্রীহরির আবির্ভাব ঘটে।

বিশ্বকর্মা তাঁর দুই কন্যা ছায়া ও সংজ্ঞাকে দান করেছিলেন সূর্যের হাতে। সংজ্ঞার গর্ভে তিন পুত্র-কন্যার জন্ম হয়। যম, যমুনা ও শ্রাদ্ধদেব। ছায়ার পুত্র-কন্যাদের নাম গধান, শমৈশ্বর ও কন্যা তপতী। সূর্যের আর এক স্ত্রীর নাম বড়থা, তিনি অশ্বিনী কুমার দ্বয়ের জন্ম দিয়েছিলেন। সন্তুরপ বিয়ে করেছিলেন সূর্যতনয়া তপতাঁকে।

সপ্তম মন্বন্তর শেষ হলে সূর্যপুত্র সাবৰ্ণি অষ্টম মনুর কাল শুরু হবে। এই সময় বিরোচনের পুত্র বলি হবেন তাদের তৃন্দ্রা। যে দৈত্যরাজ বলি বামনদের প্রার্থনায় তিন পা সমান ভূমি দান করার অঙ্গীকার করে সসাগরা পৃথিবীই অর্পণ করেছিলেন। আর শ্রীহরি তাকে কৌশলে সুতলে গিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রাখেন।

নবম মনু হবেন বরুণের পুত্র দক্ষ সাবর্ণি। উপমন্যুর পুত্র ব্রহ্ম, সাবর্ণি- দশম মনু, ধর্ম সাবর্ণি- একাদশ মনু, রুদ্রসাবর্ণি- দ্বাদশ মনু, দেব সাবর্ণি- ত্রয়োদশ মনু এবং ইন্দ্র সাবর্ণি- চতুর্দশ মনু। এইভাবে এক কল্প শেষ হবে।

হে রাজন! সকল মন্বন্তর অধিপতি, মনু পুত্রগণ, মুণিগন, ইন্দ্রগণ, দেবগণ- সকলে পরমেশ্বরের দ্বারা চালিত হয়ে থাকে, তিনিই সব কিছুর নিয়ামক।

ইন্দ্রের দ্বারা পরাজিত ও ভ্রষ্টত্রী হলে মহাত্মা বলিকে শুক্রাচার্য আবার জীবিত করে তুললেন। গুরু তাকে বিশ্বাজিত যজ্ঞ করার আদেশ দিলেন। সেই যজ্ঞের আগুন থেকে একটি রথ উঠে এল। তাতে সিংহ চিহ্নিত ধ্বজা রয়েছে মহামূল্যবান মণি খচিত।

এর পর্ব উঠে এল সুবর্ণ রঞ্জিত দিব্যধনু অক্ষয় শরযুক্ত তূণীর দ্বয় ও দিব্য কবচ। শেতামহ প্রহ্লাদ অম্লান পুষ্পযুক্ত একটি মালা ও শুক্রাচার্য একটি শঙ্খ দান করলেন।

বিরাট সেনাদল নিয়ে বিরোচন পুত্র বলি যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে ইন্দ্রপুরী আক্রমণ করলেন। প্রাসাদের চারপাশ সৈন্য দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে শঙ্খে ফুঁ দিলেন। শঙ্খধ্বনি শুনে ইন্দ্র বুঝতে পারলেন বলি যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।

বলির এমন দুঃসাহসে ইন্দ্র বিস্মিত হলেন। দেবগুরু বৃহস্পতি বললেন- হে দেবেন্দ্র, ভগবান, শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া এই বলিকে কেউ বিনাশ করতে পারবে না। তাই তোমাদের ততদিন অন্যত্র সরে থাকাই শ্রেয়।

ইন্দ্র তখন অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে অন্য রূপ ধারণ করে স্বর্গ ছেড়ে চলে গেলেন।

প্রহ্লাদের পৌত্র বলি হলেন ত্রিভুবনের অধীশ্বর। তিনি শত অশ্বমেধ যজ্ঞও করলেন।

এইভাবে দেবতাগণ দৈত্যগণের ভয়ে অদৃশ্য ভাবে লুকিয়ে থাকলে দেবমাতা অদিতি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি স্বামী কশ্যপকে সব কথা জানালেন। পুত্রদের দুর্দশার কথা জানিয়ে প্রতিকারের উপায় বের করতে বললেন।

কশ্যপ স্ত্রীকে পরম পুরুষ ভগবান জনার্দনের পুজো করার উপদেশ দিয়ে বললেন- ভগবান তোমার মনের ইচ্ছা পূরণ করুন।

এরপর প্রজাপতি কশ্যপ ভগবানের পাদপদ্ম বন্দনা করার নিয়মবিধি বলে দিলেন।

ফাল্গুন মাসের শুক্লাপ্রতিপদ থেকে দ্বাদশী পর্যন্ত বারোদিন পয়োব্রত পালন করে শান্ত মনে ভগবান শ্রীহরির আরাধনা করতে হয়।

পাদ্য আচমনীয় স্নান, বস্ত্র উপবীত, গন্ধ, ধূপ, মন্ত্র ও আহ্বান এইসব উপকরণের সাহায্যে দ্বাদশার মন্ত্র জপ করবে করজোড়ে বলবে- দেবতাগণ আর স্বয়ং লক্ষ্মীদেবী যার পাদপদ্মে সৌরভ কামনা করে উপাসনা করে থাকেন।

সেই ভগবান শ্রীবিষ্ণুর প্রতি প্রণাম জানাই। শ্রীবিষ্ণুর স্তব শেষে চারদিক প্রদক্ষিণ করবে। তারপর ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে প্রণাম নিবেদন করবে। ভগবানের প্রসাদি ফুল মাথায় গ্রহণ করবে, তারপর তাকে বিসর্জন দেবে।

বারোদিন ধরে নিষ্ঠা সহকারে পয়োব্রত পালন করতে হবে। এই বারোদিন বিছানায় শোবে না, রোজ তিনবার স্নান করবে, অসৎ কথাবার্তা বলবে না, কামবাসনা করবে না, উত্তম খাদ্য গ্রহণ করবে না।

প্রত্যেকদিন অনুষ্ঠানের শেষে হোম, পূজা সমাপ্ত করে ব্রাহ্মণদের ভোজন করাবে।

ত্রয়োদশীর দিন স্নান সেরে পট্টবস্ত্র পরিধান করে শাস্ত্র অনুসারে পঞ্চামৃত দিয়ে বিষ্ণু মূর্তিকে স্নান করাবে। দুধ দিয়ে চরু তৈরি করবে। বিষ্ণুকে তা নিবেদন করবে। আচার্য ও ব্রাহ্মণদের বস্ত্র ও ধেনু দান করবে। ব্রাহ্মণদের তুষ্ট করতে পারলে বুঝবে, শ্রীহরি তোমার প্রতি সদয় হয়েছেন।

শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠাসহকারে যে ভক্ত শ্রীবিষ্ণুর পাদপদ্ম বন্দনা করে, তার অভিলাষ তিনি পূর্ণ করেন। হে ভদ্রে, তুমিও তোমার ঈপ্সিত বর লাভ করবে।

স্বামীর উপদেশকে মস্তকে ধারণ করে দেবমাতা অদিতি পয়োব্রত অনুষ্ঠান করতে শুরু করলেন শঙ্খ- চক্রগদাপদ্মধারী শ্রীবিষ্ণু তার সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। অদিতি সেই পরম পুরুষের চরণে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু বন্যা বয়ে গেল। শরীর তখন কম্পমান।

শ্রীবিষ্ণু বললেন-আমি অন্তর্যামী, সকলের মনের বাসনা অবগত আছি। হে দেবী, আমি কথা দিচ্ছি, তোমার গর্ভে জন্ম নিয়ে তোমার পুত্রগণকে রক্ষা করব।

এরপর ভগবান কশ্যপের মধ্যে প্রবেশ করলেন। দীর্ঘকাল তপস্যা দ্বারা সংরক্ষিত সেই বীর্য অদিতির গর্ভে স্থাপন করলেন। অদিতির গর্ভে স্বয়ং শ্রীহরি প্রবিষ্ট হলেন। দেবতারা মহোল্লাসে তাঁর চরণ বন্দনা করলেন।

এইভাবে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অদিতির গর্ভ হতে আবির্ভূত হলেন। জলভরা মেঘের মতো তার গায়ের রং, কানে কুণ্ডল, বক্ষে শ্রী বৎস চিহ্ন শোভা পাচ্ছে। পায়ে নূপুর হাঁটু পর্যন্ত বনফুলের মালা, বিভিন্ন অলঙ্কারে তিনি সুসজ্জিত।

তারপর তিনি পিতা মাতার ন্যায় খর্বাকৃতি বামনরূপ ধারণ করলেন। তার উপনয়ন দেওয়া হল। দেবতা ও মহর্ষিগণ তাকে নানারকম উপহারে ভূষিত করলেন।

নর্মদা নদীর তীরে ভৃগুকচ্ছ নামক স্থানে ভৃগুবংশীয় দৈত্যরাজ বলি যজ্ঞের আয়োজন করেছেন। বামনদেব সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।

অনিন্দ্যকান্তি বামনরূপী শ্রীবিষ্ণুকে দেখে দৈত্যরাজ বলি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি তাকে বসার আসন দিলেন। তার চরণ বন্দনা করলেন।

বলিরাজ জানতে চাইলেন, তার এখানে আগমনের কারণ কী তিনি আরো বললেন- আপনি যা কিছু প্রার্থনা করবেন। সব আমি নির্দ্বিধায় দান করব।

বামনদেব বললেন- হে রাজন, আপনার দানের কথা আমি শুনেছি। সেই কারণেই আমার এখানে আসা। তবে আমি খুব বেশি কিছু চাই না। আমার পাদ পরিমিত ত্রিপাদ ভূমি হলেই আমার চলবে, আপনি আমায় তা ভিক্ষা দিন।

মহাদানবী বলি হো হো করে হেসে উঠলেন- হে ব্রাহ্মণ কুমার, তোমার বয়স অল্প, তার ওপর অনভিজ্ঞ। স্বার্থ বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই আমি ত্রিভুবনের একমাত্র রাজা। তুমি চাইলে আমি এক-একটা দ্বীপ দান করতে পারি। আর তুমি কিনা সামান্য তিন পা ভূমি প্রার্থনা করছ?

শোনো, এমন ভূমি প্রার্থনা করো যা তোমার জীবন নির্বাহের কাজে লাগে। প্রহ্লাদের নাতি। কী করে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে কপটতার আশ্রয় নেয়। কথা রাখতে গিয়ে যদি প্রাণ দিতে হয়, তা করতেও আমি রাজি, তথাপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারব না।

বললেন- হে গুরুদেব, আমি সত্য হতে বিচলিত হতে পারব না, আমায় ক্ষমা করবেন।

গুরু শুক্রাচার্য বলির একথা শুনে অত্যন্ত রেগে গেলেন তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি, আমাকে পর্যন্ত অবজ্ঞা করতে তোমার কুণ্ঠা হচ্ছে না, তোমার দর্প চূর্ণ হবে। তুমি শ্রীভ্রষ্ট হবে। এই আমি অভিশাপ দিলাম।

তথাপি বলিরাজ তার কর্তব্যে অনড় রইলেন। তিনি কমণ্ডলু থেকে জল গ্রহণ করার জন্য ঢাললেন। কিন্তু জল পড়ল না। আসলে শুক্রাচার্য দৈত্যরাজ বলিকে রক্ষা করার জন্য কীট হয়ে কমন্ডলুর জলের মুখে বসে ছিলেন। তাই জল পড়ছিল না।

বামনদেব এবার এগিয়ে এলেন। কমন্ডুলের নলের মুখের ময়লা সরানোর জন্য কুশের খোঁচা দিলেন, কীটরূপী শুক্রাচার্যের একটা চোখে আঘাত লাগল। সেটি নষ্ট হয়ে গেল। এবার কমণ্ডলু থেকে হল গ্রহণ করে দৈতরাজ বলি সঙ্কল্প করলেন এবং বামনদেবের তিন পাদ পরিমিত জমি দান করলেন।

এবার বামনদেব একটি পদের দ্বারা বলির অধিকৃত সমুদয় ভূভাগ অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবী শরীরের দ্বারা আকাশ এবং বাহুসমূহের দ্বারা দিকসকল ব্যাপ্ত করলেন। দ্বিতীয় পদ রাখলেন স্বর্গের ওপরে। অধিকৃত হল মর্ত্যলোক, জনলোক ও তপোলোক শ্রীবিষ্ণু তার উৰ্দ্ধচরণ রাখলেন সত্যলোকে। কমলযোনি ব্রহ্মা সেই চরণের পুজো করলেন।

ব্যাপার স্যাপার দেখে দৈত্যরাজের সাঙ্গপাঙ্গরা অত্যন্ত ক্ষেপে গেল। সকলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাড়া করল সেই বামনকে, তাকে তারা বধ করবে। কিন্তু বলিরাজ তাদের পথ আগলে দাঁড়ালেন। বললেন- তোমরা রসাতলে চলে যাও।

ভগবানের অভিপ্রায় জেনে শ্রীবিষ্ণুর বাহন গরুড় দৈত্যরাজকে বরুণ পাশে আবদ্ধ করলেন।

শ্ৰীজনার্দন বললেন- হে দৈত্যরাজ, তিনপাদ পরিমিত জমি দান করবে বলেছিলেন, পৃথিবীর সকল স্থান জুড়ে আমার দুই পদ রেখেছি। তৃতীয় পা রাখার স্থান দান করো।

বলি বললেন- হে দেবশ্রেষ্ঠ, আপনি আমাকে মিথ্যেবাদী প্রতিপন্ন করতে চাইছেন, কিন্তু আমি তা হতে দেব না। আপনি আপনার তৃতীয় চরণ আমার মস্তকে স্থাপন করুন। ঐশ্বর্য ভ্রষ্ট হলেও আমি অপকীর্তি হতে যেমন ভয় ভীত হই অন্য কোনো ভাবে যত দুঃখ লাভ করিনা কেন, তাতে তেমন আমি ভীত নই।

এমন সময় সেখানে ভগবত বৎসল প্রহ্লাদ, সে হাজির হলেন। তিনি সেই বামনদেবকে প্রমাণ করে বললেন- হে ভগবান, ইন্দ্রপদ বলি লাভ করছে, আপনারই সহায়তায়। আর সেই ইন্দ্ৰত্ব আপনিই আবার কেড়ে নিলেন। এ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ব্যবস্থা।

বলির পত্নী সতী বিন্ধ্যাবলী, স্বামীকে বরুণ পাশে বাধা পড়ে থাকতে দেখে জনার্দনকে করজোড়ে প্রণাম নিবেদন করে বললেন- হে জনার্দন, এই ত্রিজগৎ আপনারই ক্রীড়াস্থল হিসেবে সৃষ্ট।

কিন্তু সামান্য বুদ্ধিধারী জীবগণ তা বিস্মৃত হয়। সেই নির্লজ্জ ব্যক্তিগণ আপনাকে, অর্থাৎ যিনি সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়ের অধীশ্বর, তাঁকেই দান করতে চায়।

ব্রহ্মা বললেন- হে ভগবান, হৃত সর্বস্ব দানকারী এই বলিকে আপনি বরুণ পাশ থেকে মুক্ত করুন। কপটতা শূন্য যে ব্যক্তি আপনার চরণে তুলসি বা এক ফোঁটা গঙ্গাজল দিয়ে বন্দনা করে, সে আপনার কৃপায় উত্তম গতি লাভ করে। আর এই বলি, নিজের সর্বস্ব অর্থাৎ বল দ্বারা অর্জিত স্বর্গাদি এমনকি নিজের দেহ পর্যন্ত দান করেছে, তাকে কেন এত দুঃখ পেতে হচ্ছে?

তখন শ্রীবিষ্ণু বললেন- হে কমলযোনি, আমি যার প্রতি সদয় হই, তার সকল কিছু হরণ করি। কারণ ধন সম্পদ মানুষকে অহংকারী করে তোলে। আর সেই জন্য আমার প্রতি তাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। দৈত্য ও দানবগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এই বলি দুর্জয় মায়াকে জয় করেছে।

তাই বিপদের মধ্যে পড়েও দুঃখে ভেঙে পড়ে নি। ধন, স্থান সব গেল, শাপবদ্ধ হয়েও সংকল্প থেকে চ্যুত হয়নি। গুরুর তিরস্কার ও অভিশাপও তাকে সত্য থেকে এক তিল সরাতে পারেনি। তাই আমি তাকে খুশি দান করলাম, যা দেবতাদের কাছে দুষ্প্রাপ্য।

বলি পুনরায় আমারই সহায়তায় সাবৰ্ণি মন্বন্তরে এই স্বর্গের অধিপতি ইন্দ্র হবে। যতদিন না হচ্ছে, ততদিন সে বিশ্বকর্মার তৈরি করা সুতলে বাস করবে। আমার কৃপার প্রভাবে সেখানে তার মনে বা দেহে কোনো ক্লেশ বা পীড়ার উপদ্রব হবে না।

এবার শ্রীভগবান বলিকে বললেন- হে দৈত্যরাজ বলি, তোমার মঙ্গল হোক। তুমি তোমার আত্মীয় পরিজনদের নিয়ে সুতলে চলে যাও, খুব শিগগির তোমার দানবীর ভাবের বিনাশ ঘটবে। তুমি সর্বদা আমার দর্শন পাবে। আর যারা তোমার শাসনকে অগ্রাহ্য করেছে সেই সব দৈত্যরা আমার চক্রের দ্বারা ধ্বংস হবে।

বলির চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রুধারা বেরিয়ে এল। তিনি বললেন- হে ভগবান, নীচজাতি অধমকুলে জন্মলাভ করেও আপনি আমার প্রতি যে কৃপা করলেন, মনে হয় দেবগণও ওই কৃপা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

বলিরাজ বিষ্ণু ও ব্রহ্মাকে প্রণাম করে অনুচরদের নিয়ে সুতলে চলে গেলেন। বালির কাছ থেকে স্বর্গরাজ্যে উদ্ধার করে শ্রীহরি ইন্দ্রকে তা ফিরিয়ে দিলেন। এইভাবে অদিতির অভিলাষ পূর্ণ হল।

শ্রী প্রহ্লাদ বললেন- হে ভগবান, জগৎপূজ্য ব্রহ্মাদি দেবগণও যাঁর চরণ বন্দনা করেন, সেই আপনি অসুরযোনি লাভ করে আমাদের দ্বার রক্ষক হলেন। আমরা অতিশয় দুবৃত্ত খল স্বভাবের। কী করে আপনার কৃপা দৃষ্টি লাভ করলাম জানি না।

আপনার আচরিত কর্ম অত্যন্ত আশ্চর্যজনক। আপনি সর্বজ্ঞ, আপনি সর্বজীবের চৈতন্য স্বরূপ, আপনি সমদশী, আপনি ভক্তবাঞ্ছা কল্পতরু।

জনার্দন বললেন-হে বৎস প্রহ্লাদ, তোমার মঙ্গল হোক। তুমি সুতলে গমন করো। সেখানে পৌত্রের সঙ্গে বসবাস করলো। শঙ্খ -চক্র -গদা পদ্মধারী আমাকে সর্বদা দেখতে পাবে।

ভগবানের আজ্ঞা শিরোধার্য করে শ্রীপ্রহ্লাদ করজোড়ে তাকে প্রদক্ষিণ করলেন। তারপর প্রণাম করে ফিরে গেলেন সুতলের দিকে।

বামনরূপী শ্রীহরির এই আখ্যান যে পাঠ বা শ্রবণ করে, অথবা দেবকার্যে, পিতৃকার্যে যে কোন কাজে এই বামন চরিত কীর্তন করলে সকল বাসনা পূর্ণ হয়।

…………………….
অগ্নিপুরাণ
সম্পাদনা – পরিমার্জনা – গ্রন্থনা: পৃথ্বীরাজ সেন

…………………
আরো পড়ুন:
মৎস্য অবতারের কাহিনী
কূর্ম অবতারের কাহিনী
বরাহ অবতারের কাহিনী
নৃসিংহ অবতারের কাহিনী
বামন অবতারের কাহিনী
পরশুরাম অবতারের কাহিনী
শ্রীরাম অবতারের কাহিনী

বলরাম অবতারের কাহিনী

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!