ভবঘুরে কথা
অচেনা যোগী কাজী নজরুল

-প্রণয় সেন

ভক্তি সাধনার এতো গভীর তত্ত্ব কে বলছেন, না একজন অ-হিন্দু, কাজী নজরুল ইসলাম। কবি নজরুলকে সবাই চেনেন, যোগী নজরুলকে খুব কম লোকেই জানেন, তিনি ছিলেন একজন উচ্চস্তরের ক্রিয়াযোগী। লাল বাবার শিষ্য যোগী বরদা চরণ মজুমদারের কাছে নেন ক্রিয়াযোগের দীক্ষা।

জীবনের মধ্যাহ্নকালে প্রথম জীবনের জীবনাদর্শ থেকে তিনি সরে এসে আধ্যাত্মিকতায় বাধ্য হয়েছিলেন। দারিদ্র্য, অপমান, শোক, অপবাদের মানসিক পীড়ন থেকে মুক্তির জন্যে তিনি হয়তো এমুখো হন একটু শান্তির জন্যে। মুর্শিদাবাদ জেলার একটি গ্রামের নাম নিমতিতা। গ্রামের জমিদার বাড়ির এক মেয়ের বিয়ে। পাত্র কলকাতা হাইকোর্টের উকিলের ছেলে। বরযাত্রী হয়ে কবি নিমতিতায় যান। কবি এই গ্রামে গিয়ে আপন গুরুদেব, শ্রী বরদাচরণের দেখা পেয়ে লেখেন: ‘সহসা একদিন তাঁহাকে দেখিলাম। নিমতিতা গ্রামের এক বিবাহ সভায় সকলে বর দেখিতেছে, আমার ক্ষুধাতুর আঁখি দেখিতেছে আমার প্রলয় সুন্দর সারথীকে। সেই বিবাহ সভায় আমার বধূরূপিনী আত্মা তাঁহার চিরজীবনের সাথীকে বরণ করিল। অন্তঃপুরে মুহুর্মুহু শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, হইতেছে; চন্দনের শুচি সুরভি ভাসিয়া আসিতেছে; নহবতে সানাই বাজিতেছে এমনি শুভক্ষণ আনন্দবাসরে আমার সে ধ্যানের দেবতাকে পাইলাম। তিনি শ্রী শ্রী বরদাচরণ মজুমদার মহাশয়।  আজ তিনি বহু সাধকের পথ প্রদর্শক।’

লালগোলার রথবাজার পেরিয়ে এমএন একাডেমি স্কুলের আগে মনসা মন্দিরের বাঁ দিকে একটি হলুদ রঙের জীর্ণ মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা আজ আমাদের অনেকেরই মনে নেই। ইতিহাস সচেতন মানুষ অবশ্য এই বাড়ির গুরুত্ব জানেন। লালগোলার মহারাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ রায় তাঁর পৌত্র ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের জন্য এক জন গৃহশিক্ষকের খোঁজ করছিলেন। তলব করা হল তাঁকে। তিনি তখন মুর্শিদাবাদের অরঙ্গাবাদের নিমতিতায় একটি স্কুলের শিক্ষকতা করছেন।


বাংলার আকাশে বাতাসে তখন ধ্বনিত হচ্ছে স্বাধীনতার জয়গান। দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত প্রাণ বাংলার যুবা-বৃদ্ধ অনেকেই। আর তাঁদের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলা তথা ভারতবর্ষের বীর সন্তান সুভাষচন্দ্র বসু

যেখানে স্বয়ং রাজা তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন, না গিয়ে আর উপায় কী! সেই ডাকে সাড়ে দিয়ে চলে আসেন লালগোলা। কিছুদিন ধীরেন্দ্রনারায়ণ রায়কে পড়ানোর পরে রাজা তাঁকে লালগোলার এমএন একাডেমিতে শিক্ষকতার কাজে নিযুক্ত হতে বলেন। আর তখন থেকেই পাকাপাকিভাবে তিনি থাকতে শুরু করেন এই বাড়িতে।

বরদাচরণের ডাকে সাড়া দিয়ে কে না এসেছেন এই বাড়িতে! কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে তবলা শিল্পী ওস্তাদ আতা হোসেন, সঙ্গীত শিল্পী কাদের বক্সের পদধূলিতে ধন্য হয়েছিল লালগোলার এই বাড়ি। ঋষি অরবিন্দের সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মিক যোগ। চিঠিপত্রের আদান-প্রদান চলত তাঁদের মধ্যে। কিন্তু কখনও সরাসরি দেখা করেননি তিনি। তবে এ বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল ঋষি অরবিন্দের ভাই বারীন ঘোষের। বাংলার আকাশে বাতাসে তখন ধ্বনিত হচ্ছে স্বাধীনতার জয়গান। দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত প্রাণ বাংলার যুবা-বৃদ্ধ অনেকেই। আর তাঁদের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলা তথা ভারতবর্ষের বীর সন্তান সুভাষচন্দ্র বসু।

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’র স্রষ্টা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র সুরসাধক, সুর সম্রাট দিলিপ রায় বহুবার এসেছেন এই বাড়িতে। প্রসঙ্গত বলে রাখি দিলিপ রায় ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্রের কলেজ জীবনের বন্ধু দিলীপকুমার রায়। তিনিও বহু বার বরদাচরণের সঙ্গে দেখা করে গিয়েছেন এই বাড়িতে।

সেই সময় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক চরম সন্ধিক্ষণ। সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতি পদ ত্যাগ করেছেন তখন। মহাত্মা গাঁধীর নেতৃত্বে চালিত সমস্ত কংগ্রেস-শক্তি সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে। নতুন কর্মপন্থা নির্বাচনে সুভাষচন্দ্রের তখন ব্যস্ততার সীমা নেই। সেই সময়ে এক দিন গ্রীষ্মের ছুটিতে লালগোলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মহাশয় কলকাতা বেড়াতে আসেন। সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে তিনি অতিশয় আগ্রহী। সমস্ত জরুরি কাজ ফেলে সুভাষচন্দ্র সে দিন সকাল আটটার সময় বরদাবাবুর কাছে উপস্থিত হন। তারিখটা ছিল ১৯৩৯ সালের ১২ জুন। বাংলা ২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৪৬ সাল। আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগের এক দিন। সুভাষচন্দ্রকে সঙ্গে করে বরদাচরণ একটি ঘরে প্রবেশ করেন। বরদাচরণ তখন কলকাতায় মোহিনীমোহন রোডের একটি বাড়িতে ছিলেন। ঘরে ঢুকে বরদাচরণ নির্দেশ দেন, তিনি ঘর না খোলা পর্যন্ত কেউ যেন দরজায় ধাক্কা না দেয়। টানা আড়াই ঘণ্টা ভেতরে চলে আলোচনা। আর আলোচনার পরে যখন তিনি বাইরে আসেন তখন দেখা যায় সুভাষচন্দ্রের চোখ মুখ লাল। যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছেন।

সুভাষকে তাঁর গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি একটিও বাক্যালাপ না করে নিঃশব্দে গাড়িতে গিয়ে বসেন। গাড়িতে ওঠার আগে দেখা যায় তাঁর পদক্ষেপও যেন স্বাভাবিক নয়। পরের দিন সন্ধ্যায় সুভাষচন্দ্র ফের দেখা করতে যান বরদাচরণের সঙ্গে। স‌োয়া দু’ঘন্টা কাটিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে। পরেরদিন অবশ্য আসার কথা ছিল না সুভাষের। কী কারণে তিনি এসেছিলেন এবং এতক্ষণ সময় কাটিয়ে গিয়েছেন তা খোলসা করে কিছু বলেন নি যোগী মহাশয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, পরেরদিন বিশেষ কাজে সুভাষের কলকাতার বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। উপস্থিত তাঁর কাছের লোকেরা বরদাচরণকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সব কিছু খুলে বলা সম্ভব নয়। অতীত জীবনটাই সুভাষবাবুর কাছে খুলে ধরেছিলাম। যে কথা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না এমন কথাও তাঁর সামনে তুলে ধরেছিলাম।’


তিনি পেয়েছিলেন কি এমন কিছু মন্ত্র যা তাঁকে পুরোপুরি বাকস্তব্ধ করে দিয়েছিল? ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্রের দেখা হয়েছিল যোগী মহাশয়ের সাথে। আর তারপরেই ১৯৪১ সালের ২৬ জানুয়ারি সুভাষের অন্তর্ধানের খবর ছড়িয়ে পড়লো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।

বরদাচরণ ও সুভাষচন্দ্রের মধ্যে এমন কিছু কথাবার্তা হয় যা চিরকাল কেউ জানবেন না। সুভাষচন্দ্রের সে দিনের আসা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজ তাঁকে যোগের বিশেষ প্রক্রিয়া বলে দিলাম। ধ্যানে বসিয়েছিলাম, অনেকক্ষণ ধ্যানস্থ ছিলেন!’ কী এমন বিশেষ আলোচনা হয়েছিল সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে, আমরা পুরোপুরি জানি না। জানার বিশেষ আগ্রহ থাকলেও আজ তা জানার বিশেষ সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা অনুমান করতে পারি যে, এমন কোনও কথা হয়েছিল যার জন্য সুভাষচন্দ্রের চোখ-মুখ সে দিন রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছিল। স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিজের জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করে দেওয়া সুভাষ সেদিন হয়তো এমন একজন গুরুর খোঁজেই ছিলেন। তিনি পেয়েছিলেন কি এমন কিছু মন্ত্র যা তাঁকে পুরোপুরি বাকস্তব্ধ করে দিয়েছিল? ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্রের দেখা হয়েছিল যোগী মহাশয়ের সাথে। আর তারপরেই ১৯৪১ সালের ২৬ জানুয়ারি সুভাষের অন্তর্ধানের খবর ছড়িয়ে পড়লো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।

যোগী বরদাচরণ মজুমদার ছিলেন গৃহী ক্রিয়াযোগী। তাঁর যোগশক্তির কথা তখন জনাকয়েক অন্তরঙ্গ ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বরদাচরণ গুরুবাদী ছিলেন না। তাঁর কাছে যেসব অধ্যাত্মসাধন পিপাসু ব্যক্তিরা যেতেন সবার সামনেই তিনি তাদের নির্দেশ দিতেন। বরদাচরণ মাঝেমাঝে কলকাতায় গিয়ে ভবানীপুরের মোহিনীমোহন রোডে থাকতেন। সেসময় নজরুল ও আরও অনেকে বরদাচরণের কাছে যেতেন। তেমনি বরদাচরণও গিয়েছেন কবি নজরুলের ভাড়াবাড়িতে। দুজনের মধ্যে আত্মিক সর্ম্পক গড়ে উঠেছিল। এ প্রসঙ্গে নজরুল লেখেন: ‘সারাজীবন ধরিয়া বহু সাধু সন্ন্যাসী, যোগী, ফকির, দরবেশ খুঁজিয়া বেড়াইয়া যাহাকে দেখিয়া আমার অন্তর জুড়াইয়া গেল, আলোক পাইলো, তিনি আমাদেরই মত গৃহী। এই গৃহে বসিয়াই তিনি মহাযোগী শিবস্বরূপ হইয়াছেন। এই গৃহের বাতায়ন দিয়াই আসিয়াছে তাহার মাঝে বৃক্ষ জ্যোতি।’

‘আমার যোগসাধনার গুরু যিনি তাঁহার সম্বন্ধে বলিবার ধৃষ্টতা আমার নাই। সে সময়ও আজ আসে নাই। আমার যাহা কিছু শক্তির প্রকাশের আধার মাত্র তাহাকে জানাইবার আজ আদেশ হইয়াছে বলিয়াই জানাইলাম।’

কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব থেকেই টান ছিল সাধু-সন্ন্যাসীর ওপর। শৈশবেই তিনি পিতার পরিত্যক্ত মাজার শরীফ ও মসজিদের দেখভাল করেছেন। হয়তো এই সময় থেকেই তাঁর মনে ধর্মীয় অনুভূতি অঙ্কুরিত হতে থাকে। কিশোরকালে তিনি মাঝে মাঝে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন। দু’চার দিন পর ফিরে এলে শোনা যেত তিনি পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলে সাধু-সন্ন্যাসী বা কোনো ফকিরের সঙ্গ লাভ করে এসেছেন। সাধুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কথা তিনি বর্ণনাও করেছেন। এক সংবর্ধনা সভায় তিনি বলেন: ‘যে সত্য সৃষ্টির আদিতে ছিল, এখনও রয়েছে এবং অনন্তেও থাকবে- এই সত্যটাকে যখন মানি তখন আমাকে যে ধর্মে ইচ্ছে ফেলতে পারে না। …আমি হিন্দু, আমি মুসলমান, আমি খ্রিস্টান, আমি বৌদ্ধ, আমি ব্রাহ্ম। আমি তো ধর্মের বাইরের (সাময়িক, সত্যরূপ) খোলাসটাকে ধরে নেই। গোঁড়া ধার্মীকদের ভুল তো ঐখানেই; ধর্মের আদত সত্যটা না খুঁজে ধরে আছেন যতসব নৈমিত্তিক বিধি বিধান। এরা নিজের ধর্মের উপর এত অন্ধ অনুরক্ত যে কেউ এতটুকু নাড়াচাড়া করতে গেলেও ফোঁস করে ছোবল মারতে ছোটেন।’

তৎকালীন চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখে একদিকে তিনি লিখেছেন শ্যামাসংগীত, বৃন্দাবন গীত, আগমনীসংগীত, শিবসংগীত, কীর্তন, ভক্তিগীতি ও ভজন। অপরদিকে লিখেছেন ইসলামী গজল। ব্যাখ্যা দিয়েছেন তৌহিদের একশ্বরবাদের।

প্রথম মহাযুদ্ধের সময় করাচি সেনানিবাস থেকে কলকাতায় ফিরে এসে তিনি পুরোদমে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। অল্পদিনের মধ্যেই কবি সাহিত্য প্রতিভায় উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন। এই আলো পৌঁছে যায় রাজনৈতিক মজলিসে, সাহিত্যিক আড্ডায় এমনকি সাধু সন্ন্যাসীদের আখড়াতেও। ফলে নজরুল এই শ্রেণীর মানুষেরও স্নেহ লাভ করেন। অনেক সময় সাধুরাই শিষ্যদের পাঠিয়ে নজরুলকে ডেকে পাঠাতেন। অনেক থেকে একের পথে যে পর্যটন তা পরিপূর্ণ হয় সাধুসঙ্গের প্রবর্তনায়। তাই ধোঁয়া দেখলেই আগুন অনুসন্ধানী নজরুল ছাই সরিয়ে দীপগর্ভ কিছু মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তিনি ছিলেন পথিক এবং আগ্রহী। সাহিত্য পথে তার জিজ্ঞাসা চিরজাগরুক। কিন্তু সাধুদের কাছে তিনি কী জানতে চেয়েছেন? কী পেয়েছেন? তা আমাদের অজানা। তারপরও অনুভব করা যায় তিনি মনের জোর পেয়েছিলেন। স্বতন্ত্র বেগ পেয়েছিলেন বলেই কুসংস্কারের বিধিনিষিধের বেড়া অকুতোভয়ে ডিঙিয়ে গেছেন।


তাঁর কারাবরণ, সমাজচেতনা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, গান এবং ধর্মবোধের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এ জেলার কিছু মানুষ নজরুলের কাব্য ও গানের ওপর বিশিষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

প্রাচীন বালুচর জিয়াগঞ্জে তিনি কবি ও রাজনৈতিক নেতা জগদানন্দ বাজপেয়ীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কাদের বক্স্ মিঞা, মুঞ্জে খাঁ (মঞ্জু খাঁ), উমাপদ, নলিনীকান্ত নজরুলের গানে ফেলেছিলেন দীর্ঘছায়া। আর গুরু বরদাচরণ মজুমদারের চরণচিহ্ন কবিসত্ত্বার অতি গভীরে ছাপ ফেলেছিল। তাঁর কারাবরণ, সমাজচেতনা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, গান এবং ধর্মবোধের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এ জেলার কিছু মানুষ নজরুলের কাব্য ও গানের ওপর বিশিষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য কারাদণ্ডের সূত্রে ১৯২৩-এর মে মাসের কোনো একসময় নজরুল বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। বর্তমান মানসিক রোগের হাসপাতালটি ছিল কারাগার। এখানকার নানা গালগল্প একদা বহরমপুরে শোনা যেত। এ জেলে আইনভঙ্গের জন্য ১৯২৩-এর ১০ ডিসেম্বর, নজরুলকে বিচারকের এজলাসে আনা হয়। জেলা কংগ্রেসের নেতা জ্ঞান সরকার, প্রখ্যাত উকিল ব্রজভূষণ গুপ্ত নজরুলের পক্ষ নিয়ে জেল সুপারকে নাজেহাল করে নজরুলকে নির্দোষ প্রমাণ করেছিলেন। অবশেষে ১৫ ডিসেম্বর নজরুল বহরমপুর জেল থেকে ছাড়া পান। শহরের মানুষ জেলের বাইরে থেকে নজরুলের গান শুনতেন। সে কালের বিপ্লবী ঐতিহ্যের কেন্দ্র কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্রেরা মিছিল করে জেলগেট থেকে নজরুলকে নিয়ে আসেন সায়েন্স মেসে। জেলমুক্তির পর বেশ ক’দিন নজরুল বহরমপুরে ছিলেন। যুবকরা সে সময়ে বহরমপুরকে নজরুলের গানে মুখর করে তোলে।

একবার চট্টগ্রামের স্বনামধন্য সাধু তারাচরণ গিয়েছেন কলকাতায়। তার শিষ্য মতিলাল রায় একদিন নজরুলের কাছে গিয়ে গুরুর আহ্বান নিবেদন করেন। সময়সুযোগ বুঝে কবি তাকে একটি দিন দেন। সে অনুযায়ী মাতিলাল এসে কবিকে নিয়ে গেলেন বালিগঞ্জের একটি বাড়িতে। নজরুলকে দেখা মাত্র তারাচরণ দাঁড়িয়ে নজরুলকে অভ্যর্থনা জানান। দিব্য দৃষ্টিসম্পন্ন সাধু নজরুলের ভেতরে কিসের আলো দেখেছিলেন তা তিনিই জানেন। ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে কাজী নজরুল ইসলাম আধ্যাত্মিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পরেন।

১৯৩৮-৩৯ সালে গ্রামোফোন কোম্পানিতে অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে কবির স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে। এরই মধ্যে তখন তিনি শুরু করেন আধ্যাত্মিক যোগসাধনা, তন্ত্র-মন্ত্রের অলৌকিক জগতে বিচরণ। একদিন কলকাতার বরাহ নগরের যোগেন্দ্র বসাক রোড থেকে একজন ভদ্রলোক গিয়ে নজরুলকে অনুরোধ করলেন তার গুরুর কাছে যাবার জন্যে। গুরুর নাম নিরালম্ব স্বামী। নজরুল তার সাথে দেখা করতে যান। প্রণাম করেন। স্বামীজী পরম স্নেহভরে নজরুলকে গ্রহণ করলেন। তার অনুরোধে কবি অনেকগুলো গান পরিবেশন করেন। স্বামীজীর আশীর্বাদ ও গৃহস্থের আপ্যায়নে পরিতৃপ্ত হয়ে কবি সেদিন ঘরে ফেরেন।

অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ কাজী নজরুল ইসলাম জানতেন, নদী, গাছ আর প্রকৃত সাধুর স্বভাব একই রকম। সাধুর বচনে আর দেখানো সত্যে অনেকেই উপকৃত হন। কলকাতার ঝামা পুকুরে এক শিষ্যবাড়িতে অবস্থান করছিলেন সাধু নৃপেন্দ্রনাথ। তিনি স্মরণ করলেন নজরুলকে। একজন ভক্ত এসে কবিকে নিয়ে গেলেন তার কাছে। নজরুল গিয়ে দেখলেন প্রশস্ত ও পরিচ্ছন্ন ঘর। মেঝের উপর বসে আছে ভক্তের দল। ঘরের এক কোণায় একটি কার্পেটের আসনে বসে আছেন নৃপেন্দ্রনাথ। পরম সমাদরে তিনি নজরুলকে স্বাগত জানান। ভক্তকে আদেশ করলেন নজরুলের জন্যে একখানি স্বতন্ত্র আসন দেয়ার। নৃপেন্দ্রনাথের স্নেহে, সমাদরে ও সদালাপে তৃপ্ত হয়ে নজরুল বিদায় নেন।

আরও কয়েকজন সাধুসন্তের সঙ্গলাভ করেছেন নজরুল। সাধুমনস্ক নজরুল নিজেই বলেছেন: ‘যিনি আমায় চালাইতেছিলেন সেই অদৃশ্য সারথি আমায় চলিতে দিলেন না। লেখার মাঝে, বলার মাঝে সহসা প্রকাশিত হইয়া পড়িত সেই অদৃশ্য সারথির কথা। নিজেই বিস্মিত হইয়া ভাবিতাম। মনে হইত তাঁহাকে আমিও দেখি নাই ; কিন্তু দেখিলে চিনিতে পারিব। এই কথা বহুবার লিখিয়াছি ও বহু সভায় বলিয়াছি।’

পশ্চিম বাংলা থেকে প্রকাশিত ১৯৭২ সালের অক্টোবরে ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় নলিনী কান্ত সরকার (১৮৮৯-১৯৮৪) তার এক লেখায় জানান, বরদাচরণের ১৯৪০ সালের ১৮ নভেম্বর জীবনাবসান ঘটে। এর দেড় বছরেই মধ্যেই ১৯৪২ সালে কাজী নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর ছেলে বুলবুলের মৃত্যুর পর থেকে নজরুলের মধ্যে অধ্যাত্ম সাধনার যে প্রবণতা দেখা যায় প্রমীলার অসুস্থতার পর থেকে তা আরও বেড়ে যায়। পরলোক নিয়েও তিনি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন।

ঋণ স্বীকার : আচার্য্য  দেবলীনা শাস্ত্রী।
আনন্দবাজার পত্রিকা ।।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!