জীবনবেদ

-ড. এমদাদুল হক

৬৬
তাঁর প্রেম নাকি নিঃশর্ত। অথচ তিনি শর্ত দিলেন- ‘যারা আমার আদেশ মেনে চলবে তাদের জন্য জান্নাত, যারা আদেশ মেনে চলবে না তাদের জন্য অনন্তকালের জাহান্নাম’। জাহান্নামের বর্ণনা শুনলে মগজ ফুটতে থাকে। সব সমস্যার শুরু এখান থেকেই।

আদেশ মানতে হলে জানতে হবে আদেশগুলো কি? জানতে হলে পড়তে হবে, যারা জানে তাদের কাছে যেতে হবে। কার কাছে যাবো? কোথায় পাওয়া যাবে আদেশ-নিষেধের সত্য তালিকা? আদেশ পালনের পদ্ধতি কি হবে? নিষেধ থেকে বেঁচে থাকবো কীভাবে? কে আমাকে পথ দেখাবে?

যেখানে ডিমান্ড আছে সেখানে সাপ্লাই তো থাকবেই। যেখানে ডিমান্ডও আছে, সাপ্লাইও আছে সেখানে বাজার তো থাকবেই। যেখানে বাজার আছে সেখানে আড়তদার, দালাল, বিজ্ঞাপন, মাইকিং, পোস্টারিং, মার্কেটিং তো থাকবেই।

সুতরাং যা হবার তাই হলো, ধর্মজীবী শ্রেণী তৈরি হলো। দালাল তৈরি হলো, আড়তদার তৈরি হলো। জমে উঠলো ধর্মব্যবসা। ১৬ কোটি মানুষের এই বঙ্গদেশে অর্ধকোটি মানুষের জীবিকা হয়ে উঠলো ধর্মব্যবসা।

মার্কেটিং-এর প্রয়োজনেই তৈরি হলো অসংখ্য পথ, অসংখ্য মত, অসংখ্য পদ্ধতি। আমাজনের মতো জাইগান্টিক কর্পোরেশন তৈরি হলো। তারা দোকান খুলে বসলো অভিজাত এলাকায়।

আমরা হারিয়ে গেলাম অসংখ্য পথে। পড়ে গেলাম মহা গোলকধাঁধায়। কিনলাম আশীর্বাদ, হয়ে গেলো অভিশাপ। বিশ্বাস করে বুলিতে পড়ে গেলাম চোরাবালিতে। করলাম আশা, হইলাম নিরাশা।

একজন বলে এটি ১০০% ঠিক, আরেকজন বলে, তার কাছে নাকি সহিহ দলিল আছে- ঐটিকে যে ঠিক বলে, তাকে কতল করা যায়েজ। সর্বনাশ! কোন দিকে যাই? সবই কি ঠিক? নাকি সবই বেঠিক?

কেউ বলে, সব বেঠিক একটি ছাড়া। সেটি কোনটি? সবাই বলে- তারটি। কোনটি যে ঠিক, আর কোনটি যে বেঠিক বুঝতে বুঝতেই জীবন শেষ।

আর সত্য? সত্য তো বসে আছে যাপনের অপেক্ষায় জীবনের কলতানে।

৬৭
তিনি কি অভাবী?

আসমান জমিনে যা কিছু আছে সবই তো তাঁর। তাঁরই যদি অভাব থাকে, তবে কি দিয়ে তিনি তাঁর অভাব পূরণ করবেন?

আমার বিশ্বাস, উপবাস, সাতপাক ঘোরা দিয়ে তিনি তাঁর কোন অভাব মোচন করবেন? আমি তার কী ক্ষতি করেছি যে, তিনি আমাকে আগুনের জুতা, আগুনের পোশাক, আগুনের বিছানা, আগুনের ছাওনি, আগুনের খাদ্য দিবেন?

তিনি কি প্রশংসার কাঙাল?

আমি তাঁর প্রশংসা করলাম কিংবা না করলাম, তাতে তাঁর কী আসে যায়? পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু যিনি, তিনি কি এতো নির্দয় নিষ্ঠুর হতে পারেন যে, প্রশংসা না করার কারণে তাঁরই সৃষ্টির মাথার উপর টগবগে ফুটন্ত পানি ঢেলে দিবেন? তাতে তাঁর লাভ কী?

তাঁর যদি প্রশংসার এতোই প্রয়োজন থাকতো, তবে তো তিনি আমাকে সেইভাবেই তৈরি করতে পারতেন যে, তাঁর প্রশংসা ছাড়া আমি আর কিছু করতেই পারতাম না!

তিনি কিছু চান, আর পাবেন না, এটি হতেই পারে না। তিনি ব্যর্থ হতে পারেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা এমন এক ঈশ্বরের কল্পনা করতে সক্ষম হয়েছি যিনি ব্যর্থ। যিনি আমাকে দিয়ে তার প্রয়োজন মিটাতে ব্যর্থ হয়ে চরম নিষ্ঠুর হয়ে যাবেন। আমরা ভেবে দেখি না- পরম করুণাময় চরম নিষ্ঠুর হবেন কি করে? অসীম দয়ালু অপরিসীম নির্দয় হবেন কি করে?

কেন আমরা এমন ঈশ্বরের কল্পনা করলাম? কারণ আমরা ব্যর্থ। যে যেমন, তার ঈশ্বর কল্পনাও তেমন। মানুষ তার মন থেকে উচ্চতর ঈশ্বরের কল্পনা করতে পারে না। নিষ্ঠুর মানুষের ঈশ্বর কল্পনা নিষ্ঠুর তো হবেই।

রাবেয়া বসরি এক হাতে জ্বলন্ত মশাল, আরেক হাতে পানির পাত্র নিয়ে ছুটছেন। এক লোক জিজ্ঞেস করলো- ‘পাগলী! এতো হন্তদন্ত হয়ে যাচ্ছো কোথায়’?

রাবেয়া বললেন- ‘লোকে নাকি তাঁর ইবাদাত করে, দোজখের ভয়ে আর বেহেস্তের লোভে। আমি আগুন দিয়ে বেহেস্ত পুড়িয়ে ফেলবো, আর পানি দিয়ে দোজখের আগুন নিভিয়ে ফেলবো, যাতে মানুষের হৃদয় থেকে লোভ ও ভয় দূর হয় এবং প্রেম প্রতিষ্ঠিত হয়’। সেই দোজখ এখনো নিভেনি। সেই বেহেস্ত এখনো পুড়েনি।

যে হৃদয়ে এতো লোভ ও ভয়ের বসবাস, সে হৃদয়ে ভালোর বাস থাকবে কি করে?

৬৮.
আমরা বাস করছি এক বিদ্বেষ ভরা পৃথিবীতে। যুদ্ধ, নিপীড়ন, ধর্ষণ লেগেই আছে। অথচ এই পৃথিবীর পরিচালক আল্লাহ!

ছয় বছরের শিশু ধর্ষিত হয়- আল্লাহ নীরব। মসজিদে বোমা হামলা হয়- আল্লাহ নীরব। আমাজন পুড়ে ছাই হয়ে যায়- আল্লাহ নীরব।

আমাজনের আগুন কি তিনি নিভাতে পারতেন না? জগতে এমন কোনো ঘটনা কি ঘটতে পারে, যদি তিনি না চান? তবে কেন তিনি শিশুটির ধর্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখলেন? কেন তিনি আগুন নিভালেন না?

এই প্রশ্নের উত্তর এমনকিছু, যা আমরা মানতে পারি না। কারণ আমরা এমন আল্লায় বিশ্বাস করতে পারি না, যে আল্লাহ নিরপেক্ষ। কেন পারি না? পারি না, কারণ আমরা নিরপেক্ষ নই।

সবাই আল্লাহকে ডাকে তার পক্ষে থাকার জন্য। এবং প্রত্যেকেই মনে করে আল্লাহ তার পক্ষেই রয়েছেন। সাপ যখন ব্যাঙ ধরে তখন সাপও মনে করে আল্লাহ তার পক্ষে।

ব্যাঙ কি মনে করে?

ভালো কিছু ঘটলে আমরা বলি- এটি আল্লাহর রহমত।

মন্দ কিছু ঘটলে বলা যাবে না যে, এটিও আল্লাহর কীর্তি! ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন’ কথাটি বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কি বিপদেই না পড়েছিলেন? অথচ, আল্লাহর মাল আল্লাহ ছাড়া, আর কার সাধ্য আছে নিয়ে যাবার?

তিনি সর্বশক্তিমান।

সাধ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি নীরব, নির্বিকার। তাঁর এই নির্বিকারত্ব প্রমাণ করে:

ক. আমাদের ইচ্ছাই তার ইচ্ছা। মন্দ ঘটছে কারণ কেউ না কেউ চায় এইগুলো ঘটুক। চাওয়ার প্রতি নিষ্ঠা প্রমাণিত হয়েছে- না চাওয়ার প্রতি নিষ্ঠা প্রমাণিত হয় নাই। তিনি সাপের সঙ্গেও আছেন, ব্যাঙের সঙ্গেও আছেন, চাওয়ার প্রতি যার নিষ্ঠা প্রবল- সে-ই বিজয় লাভ করে।

খ. জগতে যখন যা ঘটে, তা থেকে ব্যতিক্রম কিছু ঘটার প্রয়োজন নাই। যখন যা ঘটা অত্যাবশ্যক, তখন ঠিক তা-ই ঘটে।

গ. যদি ঘটনা প্রতিহত করতে কেউ নিষ্ঠাবান হয়, তবে তাও সময়ের প্রয়োজন এবং অত্যাবশ্যক।

৬৯
সৃষ্টি থেকে পৃথক স্রষ্টা কল্পনা করে ঈশ্বরবাদীরা নিজের অজান্তেই নিরীশ্বরবাদী হয়ে উঠে। উত্তাপ যেমন অগ্নি থেকে পৃথক নয় তেমনি স্রষ্টা পৃথক নয় সৃষ্টি থেকে। সমুদ্রে যেমন ঢেউ আছে তেমনি ঢেউয়ের মধ্যে সমুদ্র আছে। স্রষ্টা যেমন সৃষ্টির মধ্যে আছেন তেমনি স্রষ্টার মধ্যে রয়েছে সৃষ্টি।

স্রষ্টা ভুলে সৃষ্টির সেবা যেমন- সৃষ্টি ভুলে স্রষ্টার সেবাও তেমনি।

যে স্রষ্টাকে ভালোবাসে সে তাকে ভালোবাসে সৃষ্টির মধ্যে। সৃষ্টিকে ভালোবাসা মানে সকলের মধ্যে ভালো দেখা- ভালো থাকা, ভালো রাখা। সুতরাং কেউ যদি দাবি করে যে, স্রষ্টা তাকে নিরীহ মানুষকে হত্যা করার হুকুম দিয়েছে, তবে তা নিশ্চয়ই স্রষ্টার হুকুম নয়- স্যাটানিক ভার্সেস।

তাহলে কেন কুরআন, বেদ, গীতা, বাইবেলে স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে পৃথক করা হয়েছে?

উত্তর: স্রষ্টা ও সৃষ্টি যে এক, তা বুঝার জন্য।

যদি ঠাণ্ডা না থাকতো, শুধু গরমই থাকতো, তবে গরম কী তা আমরা বুঝতে পারতাম না। একইভাবে খাঁটো না থাকলে লম্বা বুঝতাম না, স্থল না থাকলে জল বুঝতাম না। ভিন্নতা না থাকলে আমরা একত্ব বুঝতাম না। সমুদ্র দেখার জন্য সমুদ্রের বাইরে অবস্থান করা দরকার। তাই স্রষ্টা ও সৃষ্টির “পার্থক্যবিভ্রম” তৈরি করা হয়েছে।

এক বিন্দু জলকে সমুদ্র থেকে পৃথক করা হলো তার পৃথকত্ব ঘোষণা করার জন্য নয়- বরং এটি উপলব্ধি করার জন্য যে, সে একটি বিন্দু মাত্র নয়- গোটা সমুদ্র।

৮০
রজ্জুতে সর্প ভ্রম হয় কেন?

আচ্ছা, এটি কি সম্ভব যে কেউ যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করলো এই রজ্জুটিই সর্প, শুধু বিশ্বাস করার কারণেই একদিন রজ্জুটি সর্প হয়ে কামড় দিল এবং তার মুত্যু হলো?

হ্যাঁ, এটি সম্ভব। অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে বাস্তব জীবনে। কল্পিত ভূতের কল্পিত আক্রমণে মৃত্যুর ঘটনা পৃথিবীতে কম না!

একসময় মানুষ অন্ধভাবে বিশ্বাস করতো পৃথিবীর চারিদিকে সূর্য ঘুরে। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান..। পুরাণ, কুরাণ, বাইবেলেও রয়েছে এই বিশ্বাসের প্রতিফলন।

মানুষ বিষয়টি নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করে দ্ব্যর্থহীন যুক্তি পেলো, পৃথিবীর চারিদিকে সূর্য ঘুরে না- সূর্যের চারিদিকে পৃথিবী ঘুরে। ফলে ভ্রম কেটে গেলো। গড়ে উঠলো সূর্যকেন্দ্রিক বিজ্ঞান।

ভ্রম কেন হয়? আর কীভাবে দূর হয়?

ভ্রম হয় অন্ধবিশ্বাসের কারণে- দূর হয় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায়।

এখন সমগ্র মানবজাতি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে- “সূর্যের চারিদিকে পৃথিবী ঘুরে”।

এটিও ভ্রম নয় তো!

কে জানে, হতেও পারে। জীবন চলার পথে একটি সিদ্ধান্তই সঠিক, আর তা হলো, সব সিদ্ধান্তই বেঠিক হওয়ার সম্ভাবনা উন্মুক্ত আছে।

ভ্রমের উৎস অন্ধ বিশ্বাস। বিশ্বাসের স্থলে পর্যবেক্ষণ; উপাসানার স্থলে গবেষণা শুরু হোক- ভ্রম কেটে যাবে।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!