জীবনবেদ

জীবনবেদ [১৬তম পর্ব]

-ড. এমদাদুল হক

১০৯
জীবনের স্বাভাবিক গতি হচ্ছে ক্রমবিকাশ। ক্রমবিকাশ মানে, নিম্নতর স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে আরোহন এবং উচ্চতর স্তর থেকে আরো উচ্চতর স্তরে আরোহন। জীবনধারা বহমান আছে শুধু এই কারণেই যে, জীবনের বিকাশ সম্ভব, জ্ঞানের বিকাশ সম্ভব। জীবন মানেই আরো অভিজ্ঞতা অর্জনের, আরো জ্ঞান অর্জনের সম্ভাবনা।

জীবন প্রগতিরই আরেক নাম। প্রগতি মানেই হলো অবস্থানের পরিবর্তন, নিরন্তর পরিবর্তন। কিন্তু এই শাশ্বত নিয়মটি কেউ মানতে চায় না। মানুষ অগ্রগতি চায়- কিন্তু অবস্থানের পরিবর্তন চায় না। এ কেমন অজ্ঞতা?

মানুষ উড়োজাহাজে উঠতে চায়- কিন্তু গরুর গাড়ি ছাড়তে চায় না। এ কেমন গোঁড়ামি?

মানুষ উচ্চতর জ্ঞান চায়- কিন্তু মগজে ঠাসা সংস্কারধর্ম ছাড়তে চায় না। তাহলে জ্ঞান কীভাবে সম্ভব?

জগতে এমন কিছু নেই যা পরিবর্তনের অভিঘাত এড়াতে পারে। জীব, জড় তথা সমগ্র মহাবিশ্বে চলছে পরিবর্তনের নিরন্তর লীলা। পরিবর্তন শব্দটি উচ্চারণ করার সময়টুকুর মধ্যেই ঘটে যাচ্ছে মহাজাগতিক পরিবর্তন।
পরিবর্তনই জ্ঞানের প্রবেশ পথ। যে পরিবর্তনের সিঁড়িতে পা রাখেনি, সে কবে যে জ্ঞানের পথ থেকে ছিটকে পরে গেছে, নিজেও জানে না।

সুতরাং সনাতনবাদ, বুদ্ধবাদ, শান্তিবাদ থেকে শুরু করে সুফিবাদ, মার্ক্সবাদ এমনকি বিবর্তনবাদসহ আশীর্বাদ ধন্যবাদ পর্যন্ত, যত বাদ আছে- সব বাদ। কারণ বাদের কোনো পরিবর্তন নাই। আর পরিবর্তন না থাকলে মূর্খ অনন্তকাল মূর্খই থেকে যাবে, পাখিরা আর গান গাইবে না, নদী আর চলবে না, বাতাস আর বইবে না।

১১০
সহজ জীবন খুবই সাদাসিধে আর সাধারণ- খ্যাতির বিড়ম্বনা নাই, অর্থের ঔদ্ধত্য নাই, জ্ঞানের আত্মাভিমান নাই, ক্ষমতার দাপট নাই।

বাসনার জীবন লোভ, শত্রুতা, হিংসা, ঈর্ষায় ভরা। অনেক টাকা। সাবধানে থাকতে হয়। চারিদিকে নাম ডাক। হিসাব করে চলতে হয়। ‘আরো’, ‘আরো’ করতে করতে জীবন শেষ। তবু মানুষ ছুটছে বাসনার পিছে। কারণ সহজ হওয়া সহজ নয়। মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত সহজ হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ‘কিছু একটা’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে।

বাসনা মানুষকে সেই ঐশ্বর্য থেকে দূরে নিয়ে যায়, যা তার সঙ্গেই থাকে। বাসনা কি? বাসনা হলো দখলে রাখার ব্যাকুলতা। মানুষ বুঝতেই পারে না যে- যে যা দখলে রাখতে চায়- সে তার দখলে চলে যায়।

বাসনা কখনো পূরণ হয় না। আর বাসনার নিরাকরণ ছাড়া শান্তিও সম্ভব না। শান্তি লাভের বাসনা, ঈশ্বর লাভের বাসনাও কিন্তু বাসনা। যখন সব বাসনার নিরাকরণ ঘটে তখন প্রেম জ্ঞান শান্তি ঈশ্বর এমনিতেই আসে। কারণ এগুলো আত্মার প্রকৃতি।

আমরা ভয় পাই, যদি বাসনা না থাকে নিষ্ক্রিয়তা আসবে, নাম-যশ খ্যাতি, অর্থ, বিত্ত প্রতিপত্তি হারিয়ে যাবে। কেন এই ভয়?

কারণ- বিরোধমুক্ত, বাসনামুক্ত, প্রেমময়, আনন্দময় জীবন আমাদের কাছে অজানা। আমরা ভাবতেই পারি না যে, বাসনাহীন জীবনেও থাকতে পারে সৃষ্টি সুখের উল্লাস। আমরা ভাবতেই পারি না যে, জীবনের এমন অধ্যায় রয়েছে যেখানে প্রতিযোগ নেই, বিরোধ নেই।

আমরা ভাবতেই পারি না যে, জীবনের এমন মহিমাময় অধ্যায় রয়েছে যেখানে কলম গান গায়, রঙধনু পাহাড়ে উড়ে বেড়ায় শুভ্র পারাবত।

১২১
অহং একাকিত্ব পছন্দ করে না- অহং সঙ্গ চায়, বিনোদন চায়, কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায়। একা হলেই যদি অস্বস্তি লাগে, হতাশা আসে, ব্যর্থতার উপলব্ধি হয় কিংবা নিজেকে পরিত্যক্ত মনে হয়, তবে বুঝতে হবে এসব অহং-এর খেলা।

নদী যেমন সমুদ্রের কাছাকাছি এলে ধীর হয়ে যায় তেমনি জীবন সত্যের কাছাকাছি এলে ধীর হয়ে যায়। আত্মা চায় নীরবতা। আত্মোপলব্ধির পথ- নীরবতার পথ, একাকিত্বের পথ। তাই এই পথ অনুসরণ করা যায় না।

ধর্ম অনুসরণ করা সহজ, তরিকা অনুসরণ করা আরো সহজ। কেন সহজ?

সহজ এই কারণে যে, কোনো একটি গোত্রের সদস্য হয়ে গেলে মনে হয়- ‘আমি আর একা নই’। গোত্র এক ধরনের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এর বিনিময়ে সবচেয়ে মূলবান যে জিনিসটি হরণ করে, তা হলো একাকিত্ব, নীরবতা।
সব ধর্ম, সব মতবাদ, সব গুরু, ধ্যানের সব কলা-কৌশল মন থেকে মুছতে না পারলে মনে শূন্যতা সৃষ্টি হয় না। শূন্যতা ছাড়া পূর্ণতার উপলব্ধিও সম্ভব না।

ধর্ম নেই, গোত্র নেই, ঈশ্বর নেই, গুরু নেই, কী আছে তবে? কিছু নেই। কোথাও কেউ নেই। করার কিছু নেই। বলার কিছু নেই। পড়ার কিছু নেই। জানার কিছু নেই। কোথাও যাওয়ার নেই। কারও আগমনের অপেক্ষা নেই। এই হলো একাকিত্ব।

আমি একা। আমি এক।

আমার আছে আমি। আমির সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমি। একা, সম্পূর্ণ একা। একাকিত্বের এই সময়টুকু সহ্য করা বড়ই কষ্টকর। কিন্তু কষ্টের নদী পার না হয়ে কৈলাসে পৌঁছানোর আর কোনো পথ নেই।

নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্ব কিন্তু এক নয়। নিঃসঙ্গতা হলো সঙ্গের অভাব। একাকিত্ব হলো একত্বের ভাব।

১২২
শাস্ত্রে এমন অনেক পাপের ধারণা আছে যা আইন অনুযায়ী অপরাধ নয়। পাপের ধারণা বিকশিত হয়েছে পরকালের ধারণাকে ভিত্তি করে। অপরাধের ধারণা বিকশিত হয়েছে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলার কথা বিবেচনা করে।

অপরাধ সে-সব ব্যক্তিগত বিষয়ের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত নয়, যার সামাজিক প্রভাব নেই। কিন্তু পাপ একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ের সঙ্গেও সম্বন্ধযুক্ত।

ব্যক্তিগতভাবে কেউ পাপের ধারণায় বিশ্বাস না করতে পারে, কিন্তু অপরাধের ধারণায় বিশ্বাস করতে বাধ্য। কেন? কারণ মানুষ সাম্প্রদায়িক জীব নয়- মানুষ সামাজিক জীব। ঈশ্বরের আইন মানা কিংবা না মানার স্বাধীনতা মানুষের আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের আইন না মানার স্বাধীনতা কারো নেই।

পাপ চিন্তা করাও পাপ- কারণ পাপ-পুণ্যের বিচারক অন্তর্যামী। অপরাধ চিন্তা করা অপরাধ নয়, কারণ কে কী চিন্তা করে, তা জানার সাধ্য আদালতের নেই। তার মানে, সব পাপ অপরাধ নয়, কিন্তু সব অপরাধই পাপ।

ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কিছু করা পাপ, মানুষের বিরুদ্ধে কিছু করা পাপ ও অপরাধ। সুতরাং পাপের বিচার ঈশ্বর করুক এবং অপরাধের বিচার মানুষ করুক।

কিন্তু হচ্ছেটা কি?

প্রায় প্রত্যেক সাম্প্রদায়িক সমাজে পাপীর প্রতি নির্দয়তা এবং অপরাধীর প্রতি উদারতা দেখা যায়। যেমন, সাম্প্রদায়িক সমাজে শুধু বিশ্বাস ভিন্ন হওয়ার কারণে নির্মম শাস্তি দেওয়ার ঘটনা ঘটে, যা একদিকে পাপ, অন্যদিকে অপরাধ।

যদি কেউ এমন কোনো কাজ করে- যা শুধু স্রষ্টার বিরুদ্ধে যায়, মানুষের বিরুদ্ধে না যায়, তবে এর শাস্তি দেওয়ার অধিকারী কে? নিশ্চয়ই স্রষ্টা।

কিন্তু হচ্ছেটা কি?

মানুষ স্রষ্টার কাজে হস্তক্ষেপ করছে। স্রষ্টা কিন্তু মানুষের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করছেন না। এমন কোনো নজির নেই যে, স্রষ্টা দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন!

মানুষ মানুষের কর্তব্য ভুলে স্রষ্টার কর্তব্য পালন করা শুরু করেছে, তাই সমাজে স্রষ্টার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারো নেই কিন্ত হত্যা করার, খুন করার, গুম করার, ধর্ষণ করার, চুরি করার, লুট করার সাহস দেখাতে পারছে যে কেউ।

মানুষ পাপের শাস্তি দিচ্ছে, আর অপরাধীকে ভোট দিচ্ছে।

মনুষ্য ধর্মবোধের এই অধঃপতন কতই না মর্মান্তিক!

১২৩
সমস্যার মধ্যে বসবাস করতে-করতে এক ধরনের সমস্যা-প্রীতি যেন জন্ম নিয়েছে আমাদের মধ্যে। সব সময় চোখ থাকে সমস্যার দিকে। সারাদিন আমরা কথা বলি সমস্যা নিয়ে। অনেকে দাওয়াত দিয়েও সমস্যা শোনায়।

বিনোদন মাধ্যমগুলোর প্রধান আলোচ্য বিষয় সমস্যা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়- সমস্যাও বুঝি এক প্রকারের বিনোদন!

জনসাধারণকে বিনোদন দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে মাঝে-মধ্যে সমস্যা উৎপন্ন করা হয় কিনা, কে জানে? হতেও পারে!

রাজনীতিকদের মূল কাজ সমস্যা সমাধান করা, নাকি উৎপন্ন করা? হিটলার সমস্যা সমাধান করতে চেয়েছিলেন, নাকি সমস্যা উৎপন্ন করতে চেয়েছিলেন? স্তালিন? মাও সেতুং? বুশ? গর্বাচেভ?

পৃথিবীর ইতিহাসে সেই সব রাজনীতিকরাই স্মরণীয় হয়ে আছেন, যারা বড় বড় সমস্যা উৎপন্ন করতে পেরেছেন, কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারেন নি।

সমস্যার অন্ত নেই জীবনে। বাড়ি না থাকা যেমন সমস্যা, তেমনি যত বড় বাড়ি তত বড় সমস্যা। গাড়ি না থাকার সমস্যা ১টি, কিন্তু গাড়ি থাকার সমস্যা অনেক। টাকা না থাকা, সমস্যা তো বটেই। বেশি টাকা থাকাও সমস্যা। ১টাকার ১টি সমস্যা; ১কোটি টাকার ১কোটি সমস্যা। বিয়ে না হওয়া ১টি সমস্যা। বিয়ে হওয়া ১কোটি সমস্যা। সন্তান না হওয়া ১টি সমস্যা। সন্তান হওয়া ১কোটি সমস্যা।

সমস্যার সঙ্গে ব্যক্তিত্বেরও একটি সংযোগ আছে। যত বড় ব্যক্তিত্ব তত বড় সমস্যা। যে যত দক্ষতা অর্জন করে তার সমস্যাগুলোও তত জটিল হয়। অন্যদিকে, সমস্যা যত জটিল হয় সমাধানের সামর্থ্য তত পরীক্ষিত হয় এবং দক্ষতাও তত বৃদ্ধি পায়। দুষ্টচক্র।

কারো জীবনে এমন সমস্যা আসে না, যার সমাধান দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই। সমস্যার মধ্যেই সমাধান সুপ্ত থাকে।

মনোযোগ যদি সমস্যার দিকে থাকে, তবে সমস্যা বৃদ্ধি পায়। তাই সব সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হলো সমস্যার দিকে মনোযোগ না দেওয়া।

সম্যক জীবনযাপনে চাওয়া-পাওয়া কম, অর্থ-বিত্ত কম, সমস্যাও কম।

কথিত আছে, উয়াইস করনিকে দেখে খলিফা ওমর এতই অভিভূত হলেন যে, খেলাফতের প্রতি তার ঘৃণা জন্ম হলো। তিনি বলে উঠলেন, “কেউ কি আছেন, এক টুকরো রুটির বদলে খেলাফত ক্রয় করবেন?”

উয়ায়েস করনি বললেন- “যার কোনো বুদ্ধি নেই, একমাত্র সে-ই তোমার খেলাফত ক্রয় করবে! যদি সত্য বলে থাকো, তবে খেলাফত ছুঁড়ে ফেলে দাও, যার ইচ্ছা হয় কুড়িয়ে নিক, কেনা-বেচার দরকার কি?” খলিফা ওমর খেলাফত ছাড়েননি। তিনি সাধক ছিলেন না- শাসক ছিলেন। তাঁর দরকার ছিল খেলাফতের সমস্যা- উয়ায়েস করনির প্রেম নয়।

যার সমস্যার দরকার নেই, সে সমস্যা ফেলে দিলেই পারে!

যার সমস্যার দরকার সে কুড়িয়ে নিলেই পারে! অবশ্য মনের মতো সমস্যা কুড়িয়ে পাওয়া যায় না- উৎপাদন করতে হয়। এটি কোনো ব্যাপারই না! মানুষ সৃষ্টিশীল প্রাণী। যার যে রকম সমস্যা দরকার সে সেই রকম সমস্যা চাইলেই উৎপন্ন করে নিতে পারে!

সমস্যা ফেলে দিতে সাহস লাগে, জ্ঞান লাগে।

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন-
জীবনবেদ : পর্ব এক
জীবনবেদ : পর্ব দুই
জীবনবেদ : পর্ব তিন
জীবনবেদ : পর্ব চার
জীবনবেদ : পর্ব পাঁচ
জীবনবেদ : পর্ব ছয়
জীবনবেদ : পর্ব সাত
জীবনবেদ : পর্ব আট
জীবনবেদ : পর্ব নয়
জীবনবেদ : পর্ব দশ
জীবনবেদ : পর্ব এগারো
জীবনবেদ : পর্ব বারো
জীবনবেদ : পর্ব তেরো
জীবনবেদ : পর্ব চৌদ্দ
জীবনবেদ : পর্ব পনের
জীবনবেদ : পর্ব ষোল
জীবনবেদ : পর্ব সতের
জীবনবেদ : পর্ব আঠার
জীবনবেদ : পর্ব উনিশ
জীবনবেদ : পর্ব বিশ
জীবনবেদ : শেষ পর্ব

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!