জীবনবেদ

জীবনবেদ [১৯তম পর্ব]

-ড. এমদাদুল হক

১৭০
ধর্মান্ধরা যুক্তি পছন্দ করে না, যখন তারা ধর্ম কথা বলে। এ ছাড়া যুক্তি মোটামুটি সকলেরই পছন্দ।

মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণী যুক্তি বুঝে না, কারণ মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর সুশৃঙ্খল চিন্তা করার সামর্থ্য নেই। ধর্মান্ধরাও মানুষ। তাদেরও সুশৃঙ্খল চিন্তা করার সামর্থ্য আছে। জীবনযাপনে তারাও যুক্তি মেনে চলে, শুধু ধর্ম প্রসঙ্গে তারা যুক্তি হারিয়ে ফেলে। অথচ, যুক্তির উৎপত্তি ধর্ম থেকেই।

Logos শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন হেরাক্লিটাস। হেরাক্লিটাসের সময়টিকে বলা হয় ‘সফিস্ট যুগ‘ (সুফি যুগ?)। আালেকজান্দ্রিয়ার ফিলোর দর্শনে Logos ছিলো একটি আধ্যাত্মিক অস্ত্র। প্লেটো ও প্লোটিনাস দর্শনের ভিত্তিই তো যুক্তি। হেগেলের মতে যুক্তিই প্রজ্ঞা।

যুক্তি হচ্ছে চিন্তার সর্বাপেক্ষা উন্নত রূপ। যুক্তি দিতে হলে দুই বা ততোধিক বচনের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। যেমন:

ঘন কালো মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়।
ঘন কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে।
সুতরাং বৃষ্টি হবে।

বুঝাই যাচ্ছে, সিদ্ধান্তের যথাযথতা নির্ভর করে হেতুবচনের সত্যতার উপর। তাই সঠিক যুক্তি দিতে হলে চিন্তা নির্ভুল হওয়া প্রয়োজন এবং ‘কীভাবে’ যুক্তি দিতে হয় তাও জানা প্রয়োজন।

মানুষ যুক্তিশীল প্রাণী। তাই ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষেও যুক্তি থাকা আবশ্যক। মুখে বলছি ‘বিশ্বাস করি’, অথচ বিশ্বাস করার মতো কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না- এটি বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন মানুষের জন্য চরম অস্বস্তিকর অবস্থা। এই অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থার নাম ‘সংশয়’। পক্ষান্তরে, বিশ্বাস হলো সংশয়মুক্ত একটি অবস্থা।

সংশয় স্তর থেকে বিশ্বাস স্তরে পৌঁছানোর জন্য প্রচেষ্টাকে বলা হয় অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধানে রত ব্যক্তিই সুফি, সত্যানুসন্ধানী বা ধার্মিক। ধর্মপথে যাত্রা শুরু হয় সংশয়জনিত উত্তেজনা থেকে এবং এই যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটে বিশ্বাসে উত্তরণের মাধ্যমে। তাই প্রায় সব মৌলিক শাস্ত্রেই বিশ্বাস না হওয়া পর্যন্ত গবেষণা করার উপদেশ রয়েছে।

যুক্তির লক্ষ্য সত্য আবিষ্কার করা। ধর্মের লক্ষ্যও একই। তাই, ধর্ম ও যুক্তির মধ্যে বিরোধিতা থাকতে পারে না।
যেহেতু বাস্তব জীবনে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত মানুষ গ্রহণ করে না, সেহেতু ধর্মকেও বাস্তব জীবনযাপনে গ্রহণ করতে হলে, যুক্তি থাকা চাই।

দুঃখজনকভাবে, আমাদের ‘অতিরিক্ত’ ধর্মশাস্ত্রগুলোতে এমনকিছু উদ্ভট বচন সন্নিবেশিত হয়েছে, যা সংশয় উদ্রেগ করে এবং বিশ্বাসের ভিত্তিটিকেই নাড়িয়ে দেয়। যেমন, জনাব বুখারি একটি হাদিসে উল্লেখ করেছেন- “কোনো মুসলমানের ৩টি শিশু সন্তান মারা গেলে ঐ শিশুদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে (শিশুর পিতামাতা) বেহেস্ত দান করবেন।

একজন স্ত্রীলোক জিজ্ঞেস করল, দুটি সন্তান মরলে? রাসুল উত্তর দিলেন, দুটি সন্তান মরলেও বেহেস্তে যাবে। বিবি আয়শা প্রশ্ন করলেন, একটি সন্তান মরলে? রাসুল উত্তর করলেন, একটি সন্তান মরলেও বেহেস্ত নসিব হবে।”

একইভাবে সুফি সাধকদের ঘিরেও প্রচুর অযৌক্তিক বিবৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যেমন, তাযকেরাতুল আউলিয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে- “একদিন রাবেয়া ফুরাত নদীর তীরে বসে আল্লাহর ধ্যান করছিলেন, এমন সময়ে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ সাধক হযরত হাসান বসরী সেখানে এসে হাজির হলেন।

তিনি তাঁর জায়নামাযখানি পানিতে ভাসিয়ে বলেন, আসুন দু’রাকাত নামায এখানে আদায় করি। হযরত রাবেয়া এক মহূর্ত চুপ থেকে নিজের জায়নামাযখানি শূন্যে উড়িয়ে বললেন- ‘আসুন জনাব! আমরা একটু বেড়িয়ে আসি’।

পানিতে কিংবা শূন্যে জায়নামায বিছিয়ে নামায পড়ার মতো প্রাকৃতিক বিধিলঙ্ঘনকারী ঘটনা নবীজীর জীবনেও ঘটেনি।

বিধাতা সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।

যিনি বিধির সৃষ্টি করেছেন তিনি বিধাতা। বিধি অমান্য করলে যে বিধাতাকেই অমান্য করা হয়, এই সহজ কথাটি জানা থাকলে, এ ধরনের অযৌক্তিক বিবৃতির অবতারণা হতো না।

যে বিষয়ে মন সংশয়মুক্ত হয় তা সত্য।
যে বিষয়ে মন সংশয়যুক্ত হয় তা অসত্য।

সুতরাং যেসব বর্ণনা সংশয় বৃদ্ধি করে তা বর্জনীয়। যা যুক্তি নির্ভর নয়, যা বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে গ্রহণ করা যায় না, ধর্ম পালনের জন্য তা মেনে নেওয়ার অনিবার্যতা নেই। কুরআন সুস্পষ্টভাবে এ সিদ্ধান্তের পক্ষে। কুরআনে ৪৯ বার বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। যেমন, সুরা আনফালের ২২ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জন্তু হচ্ছে সেই সব বধির-বোবা লোক, যারা জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না‘।

সুরা ইউনুস এর ১০০ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘যারা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করে কাজ করে না, তিনি তাদের উপর অপবিত্রতা বা অকল্যাণ চাপিয়ে দেন।’ সুরা মুলকের ১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘জাহান্নামিরা বলবে, যদি আমরা কথা শুনতাম এবং বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে বুঝতাম, তাহলে আজ আমাদের জাহান্নামের বাসিন্দা হতে হতো না’।

যুক্তি হারিয়ে ফেলা মানে বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলা। বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলা মানে ধর্ম হারিয়ে ফেলা। যা যুক্তিসঙ্গত, তা-ই ন্যায়সঙ্গত। যারা যুক্তিকে অস্বীকার করে তারা ন্যায়কেও অস্বীকার করে।

সুতরাং অযৌক্তিক বিবৃতি না মানার অধিকার মানুষের থাকা উচিত এবং মেনে নিতে বল প্রয়োগ করা হলে, শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

১৭১
“আদবে আউলিয়া, বেয়াদবে শয়তান”- এর চেয়ে নিখাদ সত্য বুঝি আর নাই।

আদব কি? শিষ্টাচার। ভদ্র, মার্জিত, সৌহাদ্যপূর্ণ আচরণ।

আত্মোন্নয়ন কি? আত্মোন্নয়ন হলো আচরণ পরিশোধন প্রক্রিয়া।

দীক্ষা নেওয়া মানে এমন একজনকে খুঁজে পাওয়া যার আচরণ অনুসরণীয়। অনুসরণ মানে চরণ ধরা নয়- আচরণ ধরা।

যে ভদ্র আচরণ করতে শিখেনি তার দীক্ষা এখনো শুরুই হয়নি, এটি সকল অধ্যেতার কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত। আদব ছাড়া, এমন আর কোনো গুণ নেই যা মনুষ্যত্বের পরিচয় বহন করে। মানুষের সংজ্ঞা হলো তার আচরণ। যে যেমন আচরণ করে সে তেমন মানুষ। যে অভদ্র আচরণ করে সে অভদ্র। যে ভদ্র আচরণ করে সে ভদ্র। যে বোকার মতো আচরণ করে সে বোকা, যে বুদ্ধিমানের মতো আচরণ করে সে বুদ্ধিমান।

ব্যবহারে বংশের পরিচয়। মাতাপিতার পরিচয় সন্তানের আচরণ। ধর্মের পরিচয় আচরণ। আচরণ ভালো না কিন্তু ধর্ম ভালো এটি হতে পারে না। জাতিসত্তার পরিচয় আচরণ। কেননা জাতির ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি প্রকাশিত হয় আচরণে।

শিষ্য আচরণের মাধ্যমে বহন করে গুরুর পরিচয়। নিষ্ঠুরতা পশুর জন্য স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু মানুষের জন্য নয়। নিষ্ঠুর আচরণের অন্তরালে পরিশুদ্ধ মন থাকে না। কোমল আচরণের অন্তরালেও নিষ্ঠুর মন থাকে না।

পরার্থপর মনোভাব সম্যক আদবের ভিত্তি রচনা করে। একজনের লাভ যেন আরেকজনের ক্ষতির মাধ্যমে অর্জিত না হয়। একজনের ইবাদতও যেন আরেকজনের বিরক্তির কারণ না হয়। ওয়াজ, নসিহতের শব্দ যেন এমন মানুষের কানে না যায়, যে তা শ্রবণ করতে প্রস্তুত নয়।

কথাবার্তা যেন পরিষ্কার ও সুন্দর হয়। অঙ্গভঙ্গিতে যেন বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি স্নেহ এবং বন্ধুদের প্রতি প্রীতির প্রকাশ থাকে। খাওয়ার সময় যেন বড়টির দিকে চোখ না যায়। পোশাক পরিচ্ছদ যেন মার্জিত ও রুচিশীল হয়।

আচরণের মাধ্যমে প্রতিদিন যে শুদ্ধতা অর্জিত হয় তা-ই একদিন পরিপূর্ণ আত্মশুদ্ধির রূপ নেয়। “ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালি কনা বিন্দু বিন্দু জ্বল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল”। জীবনে বড় ত্যাগের সুযোগ কমই আসে, কিন্তু উত্তম আচরণের সুযোগ আসে প্রতি মুহূর্তেই।

যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, তার আচরণ এমনিতেই শুদ্ধ হয়ে যায়। ভেতরটা শুদ্ধ না করে বাহিরে লোকদেখানো ভদ্র আচরণ ভান মাত্র। ভান করে জীবনে বড় কিছু পাওয়া যায় না। অচিরেই তা সকলের চোখে ধরা পড়ে যায়। তাছাড়া, প্রত্যেক প্রতারক চূড়ান্তভাবে নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করে।

আদবের উপর কেবল সে-ই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যার প্রবৃত্তির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। বেয়াদব কখনো জ্ঞানের জগতে প্রবেশাধিকার পায় না। তাই আদব আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।

১৭২
“সে সৎ, সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, বিশ্বস্ত, পরোপকারী, বিনয়ী কিন্তু ধার্মিক নয়”- এমন একটি বচন যদি যথার্থ হয়, তবে এই বচনটিও যথার্থ হওয়া উচিত যে- “সে অসৎ, মিথ্যাবাদী, দুষ্কৃতকারী, অবিশ্বস্ত, স্বার্থপর, উদ্ধত কিন্তু ধার্মিক।”

আমরা জানি- অসৎ, মিথ্যাবাদী, দুষ্কৃতকারী, ধার্মিক হতে পারে না। তাহলে, এটি মেনে নিতে অসুবিধা কোথায় যে সৎ, সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ধার্মিক?

অসুবিধা আছে। কারণ শাস্ত্র ও শাস্ত্রজ্ঞরা শিখিয়েছেন- “তারাই ধার্মিক- যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, শাস্ত্র সম্মত আচার-অনুষ্ঠান পালন করে, স্বর্গ-নরক, দেবদূত, অবতার এবং শাস্ত্রে বিশ্বাস করে।”

ধর্মগুলো এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করতেই চায় না যে, বিশ্বাস যাই হোক- সৎ, সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, বিশ্বস্ত, পরোপকারী, বিনয়ী ব্যক্তি ধার্মিক। দুঃখজনক হলেও সত্য- ধর্ম থেকে নৈতিকতা পৃথক হয়ে গেছে; কিন্তু আচার-অনুষ্ঠান ধর্মের সঙ্গে যুক্ত আছে।

আফসোস! ধর্মশিক্ষার সিলেবাসে সততা, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও বিনত হওয়ার শিক্ষা নাই কিন্তু আচার-অনুষ্ঠান পালন এবং শাস্ত্র মুখস্থ করার শিক্ষা আছে।

যদি এমন হতো যে, ধর্ম বিষয়ে সে-ই সবচেয়ে বেশি নাম্বার পাওয়ার যোগ্য যে নম্র, ভদ্র, বিনয়ী, পরোপকারী ও সত্যবাদী, তবে কেমন হতো?

ধর্মগুলোতে ‘কিছু উদ্দেশ্য’ হাসিলের জন্য ‘কিছু পদ্ধতি’ দেওয়া আছে। যেমন, ইসলাম ধর্মে সালাত একটি পদ্ধতি। সালাহ অর্থ দহন- কোনোকিছুকে কাঙ্ক্ষিত আকার দেওয়ার জন্য পোড়ানো।

বাঁকা বাঁশ সোজা করার জন্য কিংবা ধাতব পদার্থকে নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার জন্য যেমন দহন একটি পদ্ধতি তেমনি মানব চরিত্রের বক্রতা সোজা করার জন্য দহন একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিটি অনুশীলনের উদ্দেশ্য হলো সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা ও বিনয় অর্জন।

একইভাবে যাকাতও একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য পরোপকার, ন্যায়পরায়ণতা।

মানুষ উদ্দেশ্য ভুলে গেছে, আর পদ্ধতি নিয়ে মেতে আছে। ভয় দেখানো হচ্ছে, একবেলাও যদি কেউ সময়মতো দহন পদ্ধতি অনুশীলন না করে, তবে ২কোটি ৮৮লক্ষ বছরের নরক বাস নির্ধারিত আছে।
কী তাজ্জব ব্যাপার! তাই না?

এরচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার হলো, এদের দাপট! যারা ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে একই উদ্দেশ্য হাসিল করার প্রচেষ্টা করছে তাদেরকে বিধর্মী, কাফের, নাস্তিক, মুরতাদ আখ্যা দেওয়া! এরচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, হামলা করা, হত্যা করা।

তথাকথিক গুরুবাদীরাও কি কম যায়? কীভাবে একজন গুরুবাদী এমন হিংসাত্মক বিবৃতি দিতে পারে যে, “যার মুর্শিদ নাই তার মুর্শিদ শয়তান?” নিজেকে সৎ, সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, বিশ্বস্ত, পরোপকারী, বিনয়ী হিসেবে গড়ে তোলার সমস্ত পদ্ধতিকে ‘শয়তানের পদ্ধতি’ আখ্যা দিয়ে, আপন পদ্ধতি প্রচারের শিক্ষা দিয়েছে কোন গুরু? কেমন গুরু সে?

যে আরেকজনকে শয়তান আখ্যা দেয়, সে নিজেই শয়তান হয়ে যায় নি তো!

সময় এসেছে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার: হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আস্তিক, নাস্তিক, জাতি, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে যারা সৎ, সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, বিশ্বস্ত, পরোপকারী, বিনয়ী তারা ধার্মিক। যারা অসৎ, মিথ্যাবাদী, দুষ্কৃতকারী, বিশ্বাসঘাতক, স্বার্থপর, উদ্ধত তারা অধার্মিক।

১৭৩
শৃঙ্খলাই জীবন। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, সুস্থ-অসুস্থ, আস্তিক-নাস্তিক, ওহাবি-সুফি- যে-ই বিশৃঙ্খল জীবনযাপন করে, শাস্তি পাওয়ার জন্য তাকে মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করলেও পুরস্কার পাওয়ার জন্য পরকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না।

শৃঙ্খলা শুরুতে সুন্দর, শেষেও সুন্দর। শৃঙ্খলা ছাড়া সত্যের কাছে পৌঁছানো যায় না। অনুষ্ঠান, গান-বাজনা, আর নাচানাচি করে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছে যাওয়ার গল্পগুলো ভুয়া।

আমাদের ডানা নেই; আমরা উড়তে পারি না। পা আছে। আমরা আরোহন করতে পারি। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতে হলে আরোহনের বিকল্প নেই।

বিশ্রাম প্রয়োজন শুধু শক্তি নবায়নের জন্য। যারা বিশ্রামকেই আরোহনের উপায় বানিয়ে নেয় তারা হারিয়ে যায় মেঘের আড়ালে।

আমরা সবাই ঘুরছি। পৃথিবীও ঘুরছে। জগতের ঘূর্ণনটি ছন্দোময়, কারণ বর্তনের পথটি বৃত্তাকার। জীবন চলার পথটিও যদি বৃত্তাকার হয়, তবে জীবনের ঘূর্ণনটি ছন্দোময় হয়। জীবনবৃত্তটির অঙ্কন সহজ হয় যদি আহার, নিদ্রা, স্নান ইত্যাদি দৈনন্দিন কর্মগুলোর সময়বিন্দু ঠিক থাকে।

একই প্রকারে চিন্তাকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা চাই যেন বর্তিত হয় লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এবং জানা, বুঝা ও উপলব্ধির জন্য চিন্তাবৃত্তটি সর্বদা উন্মুক্ত থাকে।

ঘুরে তো সবাই। বৃত্ত সবাই রচনা করতে পারে না। যারা বৃত্ত রচনার প্রচেষ্টায় মগ্ন থাকে, তাদের মধ্যে অপবিত্রতা প্রবেশ করতে পারে না।

মালী যেমন প্রস্ফুটিত পুষ্পের সৌন্দর্য দেখে বাগান পরিচর্যার কষ্ট ভুলে যায় তেমনি সুশৃঙ্খল ব্যক্তি পবিত্রতা, প্রজ্ঞা, করুণা এবং প্রেমের ফুল দেখে শৃঙ্খলা পালনের কষ্ট ভুলে যায়।

বিশৃঙ্খল জীবনযাপনে দুঃখ ও ব্যাধির আক্রমণ অবশ্যম্ভাবী। সে এতো দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়ে যে, জীবনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই পরাজয় মেনে নেয়।

শৃঙ্খলা কষ্টকর। কিন্তু কষ্ট ছাড়া সুখ লাভ হয় না। প্রথমে কষ্ট, এরপর সুখ। প্রথমে শ্রম, এরপর বিশ্রাম।
শুরুতে চাষাবাদের কষ্ট এরপর পুষ্প প্রস্ফুটনের আনন্দ।

শৃঙ্খলা শৃঙ্খল নয়- শৃঙ্খলা হলো সুপথ। বিশৃঙ্খলা হলো বিপথ। বিপথে বিপদ। সুপথে নিরাপদ। শৃঙ্খলা ছাড়া স্বাধীনতা হলো নৈরাজ্য। স্বাধীনতা ছাড়া শৃঙ্খলা নিষ্ফলা।

১৭৪
১১৮টি গাড়ির আওয়াজ সাজিয়ে তৈরি হয়েছিল মিউজিক ভিডিও ‘ড্রাইভ মে জুনুন’। নানা গাড়ির নানা আওয়াজ। কম্পোজ করলে সুর! এক গাড়িরও কতো রকমের আওয়াজ! কোন গাড়ি কখন কোন গিয়ারে চলছে, ইঞ্জিনের শক্তি কেমন, অবস্থা কী ইত্যাদিও বুঝা যায় আওয়াজ শুনে।

মানুষের ভেতর থেকে যে স্বর বেরিয়ে আসে তাও ব্যক্তির শক্তি, গতি ও মানসিক অবস্থার চিত্র প্রকাশ করে। যেমন:

অস্পষ্ট স্বর সন্দেহ ও স্ববিরোধিতা প্রকাশক।
কম্পিত স্বর ভয় প্রকাশক।
অনুনাসিক স্বর ক্লান্তি ও অভিযোগ প্রকাশক।
প্রানবন্ত স্বর আনন্দ প্রকাশক।
করুণ স্বর দুঃখ প্রকাশক।
ভাঙ্গা স্বর হতাশা প্রকাশক।
কর্কশ স্বর ক্রোধ প্রকাশক।
কোমল স্বর দয়া প্রকাশক।
প্রশ্নবোধক স্বর বিস্ময় প্রকাশক।
দৃঢ় স্বর সাহস প্রকাশক।
দ্রুত স্বর চঞ্চলতা প্রকাশক।
মৃদু স্বর স্থিরতা প্রকাশক।
গম্ভীর স্বর ভালোবাসা প্রকাশক।
নীরব স্বর সম্মতি/অসম্মতি কিংবা উপেক্ষা প্রকাশক।
নীরবতা প্রেম প্রকাশক।
সব স্বর দিয়েই রচনা করতে হয় জীবনের সঙ্গীত।

ভাবের সঙ্গে স্বরের ঐক্যতান থাকলে সুর- না থাকলে বেসুর। অসুরও হতে পারে ক্ষেত্র বিশেষে। নরম স্বরে গরম ভাব- ভয়ঙ্কর। গরম স্বরে নরম ভাব- যত গর্জে তত বর্ষে না।

এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড একটি অর্কেস্ট্রা। অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের বৃন্দবাদন চলছে এখানে। এই মহা অর্কেস্ট্রা যিনি রচনা ও পরিচালনা করেন- তিনি এক মহা কম্পোজার।

স্বর হারায় না। প্রতিটি স্বর তার শক্তি অনুযায়ী তরঙ্গায়িত হয় । যে যেমন স্বর উচ্চারণ করে তেমন স্বরই ফিরে আসে তার কাছে।

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন-
জীবনবেদ : পর্ব এক
জীবনবেদ : পর্ব দুই
জীবনবেদ : পর্ব তিন
জীবনবেদ : পর্ব চার
জীবনবেদ : পর্ব পাঁচ
জীবনবেদ : পর্ব ছয়
জীবনবেদ : পর্ব সাত
জীবনবেদ : পর্ব আট
জীবনবেদ : পর্ব নয়
জীবনবেদ : পর্ব দশ
জীবনবেদ : পর্ব এগারো
জীবনবেদ : পর্ব বারো
জীবনবেদ : পর্ব তেরো
জীবনবেদ : পর্ব চৌদ্দ
জীবনবেদ : পর্ব পনের
জীবনবেদ : পর্ব ষোল
জীবনবেদ : পর্ব সতের
জীবনবেদ : পর্ব আঠার
জীবনবেদ : পর্ব উনিশ
জীবনবেদ : পর্ব বিশ
জীবনবেদ : শেষ পর্ব

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!