জীবনবেদ

-ড. এমদাদুল হক

২১
এক ব্যক্তির অনেক টাকা। কীভাবে টাকা খরচ করবে, তা সে ভেবে পায় না। তাই ঠিক করলো বিদেশ থেকে নানা রঙের দুর্লভ সুন্দর গরু মহিষ এনে কুরবানির ইদে জবাই করবে। প্রতিবছর সে তা-ই করে। এবারও করেছে। মনোহর পশু জবেহ করে সে মজা পায়। মানুষ দেখতে আসে-তার নাম ফাটে।

টাকা উপার্জন করা সহজ-খরচ করা কঠিন। যে কোনো ইডিয়ট টাকা উপার্জন করতে পারে কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে টাকার মালিক হয়ে যেতে পারে। ইডিয়টরা টাকা খরচ করে ইডিয়টের মতো। টাকা খরচ করার সম্যক পথ কোনটি?

সব টাকা বিলিয়ে দিয়ে নিজে দরিদ্র হওয়া কি ঠিক? কিংবা নিজের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা রেখে উদ্বৃত্তের সমুদয় বিলিয়ে দেওয়া? কি করা যায়? ট্রাষ্ট? এতিমখানা? মসজিদ? মাদ্রাসা? হাসপাতাল? নাকি অন্যকিছু? যেই বুদ্ধি দিয়ে মানুষ টাকা উপার্জন করে, সেই বুদ্ধি দিয়েই যদি টাকা খরচ করে, তবে খরচও কিছু একটা অর্জনের প্রচেষ্টা।

যে মন টাকা উপার্জনে ব্যস্ত সে মনে দরদ থাকে না। টাকা উপার্জনের নেশায় মানুষ হৃদয়হীন হয়ে যায়, নিষ্ঠুরতা তখন স্বভাবে পরিণত হয়। হৃদয়হীনের কাছে টাকা থাকা মৌচাকে মধু থাকার মতো। মৌচাকের মধু যেমন মৌমাছির জীবনে অভিশাপ, তেমনি হৃদয়হীনের টাকা তার জন্য অভিশাপ।

বুদ্ধি দিয়ে টাকা ইনভেস্ট করা যায় কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে টাকা খরচ করা যায় না। টাকা খরচ করতে প্রেম লাগে। আত্মা লাগে। প্রেম ছাড়া মানবসেবাও শোষণের কৌশল মাত্র।

২২
টাকা দিয়ে কি জীবনের ক্ষতিপূরণ হয়? হয় না। তবু ক্ষতিপূরণ দেওয়া-নেওয়া হয়। লোকে বলে, পুত্র শোক সয়-টাকার শোক সয় না। কেন? মানুষ টাকা এতো ভালোবাসে কেন?

কারণ টাকার ক্রয়ক্ষমতা বিপুল। টাকা দিলে নাকি বাঘের দুধও মিলে। গুরুর আর্শীবাদ থেকে শুরু করে বারাঙ্গনার নিবেদন-সবকিছুই কেনাবেচার বস্তু। লোকে আলু, ছোলা, বাখর খানি তো বেচেই-চোখের মণিও বেচে। বুদ্ধিজীবীরা বুদ্ধি বেচে। মৎস্যজীবীরা মৎস্য বেচে। আইনজীবীরা আইন বেচে।

টাকা দিয়ে কি ধর্ম কেনা যায়? যায় তো! ধর্মজীবী আছে না! ধর্মজীবীরা ধর্ম বেচে। স্বাধীনতা? তাও কেনা যায়। টাকা থাকলে বিশ্ব নাগরিক হওয়া যায়। যেখানে খুশি যাওয়া যায়। যা খুশি করা যায়। সবার জন্য সবুজ পাসপোর্ট। লাল, নীল পাসপোর্ট-তাদের জন্য।

দরিদ্রদের জন্য মানিলন্ডারিং আইন আছে, ধনীদের জন্য আছে সুইজ ব্যাংক। সিএমএইচ সবার জন্য না। আইনের চোখে সবাই কি সমান? সিআইপির জন্য যে আইন, মফিজের জন্যও কি সেই আইন?

কতজনকে মফিজ বানিয়ে একজন সিআইপি তৈরি হয়, সে খবর রাখো? আইন দ্বারাই তৈরি করা হয় আইনত বৈষম্য-ধনী গরিবের বৈষম্য। সম্মান পাওয়ার জন্য আর কিছু লাগে না, টাকা হলেই চলে। টাকা ছাড়া তুমি কি? কিচ্ছু না।

যেই পৃথিবীতে টাকার এতো দাম সেই পৃথিবীতে সত্যের দাম কত? ন্যায়ের দাম কত? জ্ঞানের দাম কত? প্রেমের দাম কত? যে টাকাকে এতো ভালোবাসে, তার কৃষ্ণ প্রেম থাকে কোথায়? যে টাকাকে এতো ভালোবাসে, তার ঈশ্বর থাকে কোথায়?

২৩
যীশু ভক্তদের বললেন, ‘আমি তোমাদের সত্যি বলছি, ধনী ব্যক্তির পক্ষে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করা কঠিন হবে’। ভক্তরা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকায় তাঁর দিকে- ‘বলে কী’! তিনি এবার আরো দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি তোমাদের সত্যি বলছি, ধনীর পক্ষে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করার চেয়ে বরং ছুঁচের ফুটো দিয়ে উট প্রবিষ্ট হওয়া সহজ।’

এর তাৎপর্য এটি নয় যে, স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করার জন্য ধনীরা তাদের টাকা বিলিয়ে দরিদ্র হয়ে যাক। এর তাৎপর্য হলো, উপার্জন দ্রোহবর্জিত হোক, ন্যায়ভিত্তিক হোক। একজনের লাভ যদি অন্যজনের ক্ষতির মাধ্যমে অর্জিত না হয়, তবে সেই উটের মতো ধনী হওয়ার সুযোগই থাকে না।

মানুষ ঠকিয়ে, শ্রমের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে, পণ্য দ্রব্যে ভেজাল দিয়ে, মজুতদারি করে কিংবা মাত্রাতিরিক্ত লাভের মাধ্যমে অর্জিত টাকা দান করাতে কোনো পুণ্য নেই।

গরু মেরে জুতা দান-দান নয়-অপমান। দুষ্কৃতিকারীদের টাকায় নির্মিত মসজিদ কিংবা দরবারগুলো হলো শয়তানের আড্ডাখানা (মসজিদে জারার)। এগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন দ্বীনের নবী মোহাম্মদ (সা)।

রক্ত দিয়ে রক্ত ধোয়া যায় না। প্রস্রাব দিয়ে ওজু করা যায় না। অন্যায়ভাবে উপার্জিত অর্থ ন্যায়ভাবে খরচ করা যায় না। কিছু লোম ছেঁটে ফেললেই কি উট ছুঁচের ফুটো দিয়ে ঢুকে?

২৪
টাকা বিনিময়ের মাধ্যম। বিনিময় ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না-মরতেও পারে না। জীবনে টাকা, জীবনান্তেও টাকা। সভ্যতা গড়েছে টাকা। অসভ্যতা কে গড়েছে? যখন টাকা ছিল না তখনও মানুষ ছিল, কিন্তু এতোটা অসভ্য ছিল না।

কেউ যদি বলে, ‘আগে টাকা কামাও, পরে প্রেম করতে এসো!’ তবে সে কি চায়? টাকা নাকি প্রেম? টাকা। সুতরাং ইঞ্জিন মাপো হর্সপাওয়ারে, পুরুষ মাপো ব্যাংক ফিগারে। বাহিরে থাকুক অঢেল টাকা। ভিতরটা হোক বেজায় ফাকা। ক্ষতি কি?

মানুষ চেনার উপায় টাকা। টাকা দিলে ধার-ফিরে নাকো আর। নেয়ার বেলায় দারুণ ভদ্র-দেয়ার বেলায় নিদারুণ অভদ্র। টাকা নিতে মজা-দিতে বেমজা। টাকা দিলে ভক্তি-না দিলে আসক্তি। টাকা ইজ্জৎ, টাকা জগৎ। টাকা ভোগ, টাকা সম্ভোগ।

টাকা মানে সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ। সাম্যবাদ? তাও টাকা। মিউটেশন টাকা, মেডিটেশনও টাকা। টাকা ছাড়া লোক-তীর ছাড়া ধনুক। টাকা থাকলে সুখ, না থাকলে অসুখ। টাকা থাকলে দয়ালু-না থাকলে মালু। টাকা থাকলে কর্মা-না থাকলে অকর্মা। টাকা থাকলে জ্ঞান-না থাকলে অজ্ঞান।

টাকা থাকলে বুদ্ধি বাড়ে। বুদ্ধিটি হলো-তেল মাথায় ঢাল তেল, ন্যাড়া মাথায় ভাঙ বেল। টাকা যখন কথা বলে, ঈশ্বর তখন নীরব থাকে। একমাত্র টাকাই ১০০% ধর্মনিরপেক্ষ। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি, নাসারা, আস্তিক, নাস্তিক, সুফি, ওহাবি কারো কাছ থেকে টাকা নিতে সমস্যা নাই।

সব সমস্যার সমাধান-টাকা। সব প্রশ্নের উত্তর টাকা। একমাত্র টাকাই ইহার বাহককে চাহিবা মাত্র মূল্য দিতে বাধ্য থাকে। পৃথিবী ঘুরে সূর্যের চারিদিকে। মানুষ ঘুরে টাকার চারিদিকে। টাকাও ঘুরে-আজ আমার, কাল তোমার, পরশু আরেকজনের।

চাকা ঘুরে টাকায়। কিন্তু টাকা না থাকলে মাথা ঘুরে। প্রেম না থাকলে হৃদয় ঘুরে। কিন্তু মানুষ প্রেমের দাসত্ব করে না-দাসত্ব করে টাকার। এই পৃথিবী টাকার গোলাম। যে যাকে প্রাধান্য দেয় সে তার গোলাম। যে টাকাকে প্রাধান্য দেয় সে টাকার গোলাম।

টাকা গোলাম হিসেবে খুব ভালো, কিন্তু টাকার গোলাম হওয়ার চেয়ে মন্দ আর কি হতে পারে? টাকা থাকলে বিপদ মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু টাকা যদি বিপদের কারণ হয়, তবে এর চেয়ে মন্দ আর কি হতে পারে?

টাকা থাকলে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়। কিন্তু টাকা যদি রোগ ডেকে আনে, তবে এর চেয় মন্দ আর কি হতে পারে? টাকা থাকলে সম্পর্ক ভালো রাখা যায় । কিন্তু টাকার জন্য যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়, তবে এর চেয়ে মন্দ আর কি হতে পারে?

টাকা না থাকলে টাকা ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না। টাকা থাকলে, টাকা ছাড়া সব ভাবা যায়। ইহাই টাকার সবচেয়ে বড় গুণ। ব্যঞ্জনে লবণ বেশি হলেও বিস্বাদ, কম হলেও বিস্বাদ। টাকা হলো জীবনের লবন। ব্যঞ্জনে লবণের পরিমাণটি ঠিক রাখা যেমন জরুরি তেমনি জীবনে টাকার পরিমাণটি ঠিক রাখা জরুরি।

২৫
রিপু অর্থ শত্রু। কোনো বৃত্তিই রিপু নয়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য জীবনের জন্য একান্ত প্রয়োজন। জীবনধারা বহমান রাখতে কাম অপরিহার্য। কামের ধ্বংসে জীবনের ধ্বংস ঘটবে। সুতরাং কাম রিপু নয়।

ক্রোধ জীবনরক্ষার মূল। ক্রোধের উচ্ছেদে জীবন নাশের সম্ভাবনা বিস্তর। ধর্মরক্ষার অনিবার্য উপাদানও ক্রোধ। ক্রোধ আছে বলেই অধর্ম প্রতিরোধ করার সম্ভাবনা আছে। আইনের শাসন রাষ্ট্রীয় ক্রোধ। রাষ্ট্রীয় ক্রোধের অনুপস্থিতিতে নৈরাজ্য অনিবার্য। সুতরাং ক্রোধ রিপু নয়।

লোভ হলো অর্জনস্পৃহা। অর্জনস্পৃহা ব্যতীত জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব। প্রয়োজনীয় অর্জন দোষের তো নয়ই বরং জীবনের প্রধান কর্তব্য। লোভ হলো বেঁচে থাকার জ্বালানি। লোভ না থাকলে মানুষ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে। জীবন ও সভ্যতার চাকা থেমে যাবে। সুতরাং লোভ রিপু নয়।

মোহ হচ্ছে দুনিয়ার প্রতি মায়া, আকর্ষণ। দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুই মোহনীয়। দুনিয়ার প্রতি যদি মোহ না থাকে তবে মানুষ বাঁচতে চাইবে না-মরতে চাইবে। সুতরাং মোহ রিপু নয়।

মদ্ শব্দের অর্থ-অহঙ্কার। অহঙ্কার আল্লাহর গুণ। মানুষের মধ্যে তাঁর গুণে গুণান্বিত হওয়ার যে ইচ্ছা সুপ্ত আছে তা অহং-এর জন্যই। অহং না থাকলে সত্য হওয়ার বাসনাও থাকবে না। সুতরাং মদ্ রিপু নয়।

মাৎসর্য অর্থ পরশ্রীকাতরতা। আরেকজনের শ্রী দেখেই শ্রী অর্জনের জন্য কাতরতা জন্মায়। পরশ্রীকাতরতা ছাড়া জীবন শ্রীহীন হয়ে যাবে। সুতরাং মাৎসর্য রিপু নয়।

পরমাপ্রকৃতি রিপু দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেননি। প্রয়োজনীয় মাত্রায় সববৃত্তিই আত্মবিকাশের সহায়ক শক্তি। বৃত্তিগুলি তেজপূর্ণ। নিয়ন্ত্রণ না করলে সহজেই প্রয়োজনের মাত্রা অতিক্রম করে। সমস্যা বৃত্তির মধ্যে নয়-সমস্যা নিয়ন্ত্রণে। নিয়ন্ত্রণ মানে বিনাশ নয়। গাড়ি চলতে থাকলেই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়।

 

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন-
জীবনবেদ : পর্ব এক
জীবনবেদ : পর্ব দুই
জীবনবেদ : পর্ব তিন
জীবনবেদ : পর্ব চার
জীবনবেদ : পর্ব পাঁচ
জীবনবেদ : পর্ব ছয়
জীবনবেদ : পর্ব সাত
জীবনবেদ : পর্ব আট
জীবনবেদ : পর্ব নয়
জীবনবেদ : পর্ব দশ
জীবনবেদ : পর্ব এগারো
জীবনবেদ : পর্ব বারো
জীবনবেদ : পর্ব তেরো
জীবনবেদ : পর্ব চৌদ্দ
জীবনবেদ : পর্ব পনের
জীবনবেদ : পর্ব ষোল
জীবনবেদ : পর্ব সতের
জীবনবেদ : পর্ব আঠার
জীবনবেদ : পর্ব উনিশ
জীবনবেদ : পর্ব বিশ
জীবনবেদ : শেষ পর্ব

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!