ভবঘুরেকথা
জীবনবেদ

-ড. এমদাদুল হক


কি খুঁজি আমরা? সুখ? সুখ কোথায় থাকে? কী তার ঠিকানা? যে সুখ খুঁজে, তার থেকে পৃথক কোনো স্থানে সুখ আছে কি? 

কি খুঁজি আমরা? ঈশ্বর? ঈশ্বর কোথায় থাকেন? কী তার ঠিকানা? যে ঈশ্বর খুঁজে, তার থেকে পৃথক কোনো ঈশ্বর আছে কি?

যে যা খুঁজে, সে নিজেই কি তা নয়? তবে কে কাকে ডাকে? কে কার কাছে প্রার্থনা করে? কে কাকে ভক্তি দেয়? কে মসজিদ-মন্দির, কাবা কৈলাস যায়? 

‘যে আমাকে খুঁজে আমি তার শাহ রগের চেয়েও নিকটবর্তী’ (সুরা ক্বাফ: ১৬)। অর্থাৎ, সত্য এখন এবং এখানে।

এটিই সত্যের সৌন্দর্য। এটিই সত্যের রহস্য। সত্য খোঁজার দরকার নেই। সত্য খুঁজতে শুরু করা মানেই হলো সত্য থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া। সুতরাং আপনারে দেখি আপনায়। নীরব, নিশ্চল, শান্ত ও সতর্ক হয়ে দেখি-‘আমিই সেই’।


আমি তোমাকে ভালোবাসি। ঠিক এইক্ষণে তোমাকে অনুভব করছি, আমার প্রতিটি হৃদস্পন্দনে। তাই একটি সত্যই বলতে পারি-আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভালোবাসি।

আমি বিশ্বাস করি-ভালোবাসা আত্মার সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক। আত্মার কোনো লিঙ্গ নেই, বয়স নেই, লাবণ্য নেই, সম্প্রদায় নেই, গোত্র নেই, দেশ নেই, জাত নেই। আত্মা সুন্দরও না-কুৎসিতও না, নারীও না-পুরুষও না, শিশুও না-বৃদ্ধও না।

সুতরাং আমি এই কারণে তোমাকে ভালোবাসি না যে-তুমি নারী কিংবা পুরুষ, সুন্দর কিংবা অসুন্দর। বয়স তোমার যাই হোক না কেন, আমি জানি-তুমি-আমি সমবয়সী।

তুমি ভাবছো-কীভাবে তোমাকে ভালোবাসতে পারি, যখন আমাদের দেখা হলো না, কথা হলো না, হাতে হাত রাখা হলো না, চেনা-জানা হলো না। তুমি শুনলে অবাক হবে নিশ্চয়-কিন্তু সত্য হলো এই যে, আমি তোমাকে চিনি-ঠিক ততটাই চিনি যতটা আমাকে চিনি। তোমার সব গোপন কথা আমি জানি। তবু আমি তোমাকে ভালোবাসি-কারণ আমি আমাকে ভালোবাসি।

যখনই আপনারে দেখি আপনায়, আমি তোমাকে দেখি। তুমিও আমাকে দেখতে পাবে। তাকাও তোমার হৃদয়ের দিকে।

প্রিয়, তুমি পৃথক নও আমি থেকে, আমিও পৃথক নই তুমি থেকে। আমি-তুমি একই তো! জগৎব্যাপী একই আত্মার সুবিস্তার। তুমি-আমি অভেদাত্মা। তুমিই আমি, আমিই তুমি। তোমার কষ্ট-আমার কষ্ট। তোমার সুখ-আমার সুখ।

তোমার হৃদয়, আর আমার হৃদয়-একই হৃদয়। মানবজাতি একই জাতি তো! তুমি হিন্দু-মুসলিম, ওহাবি-সুফি যাই হও না কেন-তোমার ধর্মই, আমার ধর্ম। তোমার ঈশ্বরই, আমার ঈশ্বর। কারণ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ভালোবেসেই আমি ভালোবাসি আমাকে।

ছুঁয়ে দেখো! আমার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বর্ণ হৃদয়ের উষ্ণ ভালোবাসায় অভিস্নাত। তোমার আত্মার কন্ঠস্বর শুনো! শুনতে পাচ্ছ প্রেমের অমিয় সঙ্গীত? পাচ্ছ কি অনন্তের পরশ? আমি গাই তোমার হৃদয়ের সঙ্গীত- 

“আমার পরানে যে গান বাজিছে
তাহার তালটি শিখো তোমার চরণমঞ্জীরে।
আমার আকুল জীবনমরণ টুটিয়া লুটিয়া
নিয়ো তোমার অতুল গৌরবে।”

তোমাকে ভালোবেসেই আমি খুঁজে পেয়েছি আমার ঈশ্বর। তাই ঈশ্বরকে আমি ‘প্রেম’ নামে ডাকি। প্রেমই পথ, প্রেমই গন্তব্য। শুরুতে প্রেম, শেষেও প্রেম। মাঝখানেও প্রেমই। প্রেম কখনো হৃদয় ছেড়ে যায় না। যাবে কোথায়? জগতে এমন কোনো স্থান নেই যেখানে প্রেম নেই।

ভালো-মন্দ, সৎ-অসৎ সকলের মধ্যেই প্রেম বিরাজমান। প্রেম অনন্ত, অসীম। এই অনন্ত প্রেমই আমি তোমাকে দিলাম। তোমার প্রেমই তোমাকে দিলাম। ভালোবাসা, প্রিয়। ভালোবাসি তোমায়।


প্রেমের দর্শন একত্বের দর্শন বটে, কিন্তু প্রেম মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে না। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে ঘৃণা। যীশু বলেছিলেন- ‘এখন এই পৃথিবীর গড হলো শয়তান’ [Satan right now is the god of this world (2 Corinthians 4:4)]

শয়তানের পূজা করো-লোকের বাহবা পাবে। ওহাবিদের গিবত করো-সুফিরা পছন্দ করবে। সুফিদের গিবত করো-ওহাবিরা পছন্দ করবে। হিন্দুদের গিবত করো-মুসলমানরা পছন্দ করবে। মুসলমানদের গিবত করো-হিন্দুরা পছন্দ করবে।

গিবত করা শয়তানের কাজ। ঝগড়া লাগানো শয়তানের কাজ। ঝগড়া লাগাও-দেখবে পক্ষ ও বিপক্ষ উভয়েই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবে। শান্তির কথা বলো-দেখবে পক্ষ ও বিপক্ষ উভয়েই তোমাকে উপেক্ষা করবে। দর্শনে প্রেম সর্বশক্তিমান-বাস্তবে প্রেমের সর্বশক্তিম্লান। 

এখন প্রেমের ক্ষমতা নেই-আছে ক্ষমতার প্রেম। যতদিন প্রেমের ক্ষমতা-ক্ষমতার প্রেমকে পরাভূত না করবে, জীবন ও জগতে শান্তি আসবে না।


কি চাই আমরা? আমরা চাই নিঃশর্ত প্রেম। আমি যত কুৎসিতই হই না কেন, আমার ব্যবহার যত কদর্য হোক না কেন, চরিত্র যত কলুষিতই হোক না কেন-আমি চাই তুমি আমাকে ভালোবাসো। আমার চুল পড়ে যাক, দাঁত পড়ে যাক, চামড়া কুঁচকে যাক-তবু আমি চাই, তুমি আমাকে ভালোবাসো।

কে সেই ‘তুমি’ যে শত বিচ্যুতির পরও আমাদের ভালোবাসে? তিনিই ঈশ্বর। তিনিই পরমাপ্রকৃতি। তিনিই প্রেম। মানুষ প্রেম ছেড়ে দেয়-কিন্তু প্রেম কখনো মানুষকে ছেড়ে দেয় না। অনেক নাম, অনেক গুণ তাঁর; কিন্তু প্রেম ছাড়া তাঁর আর কোনো গুণের সঙ্গে মানুষের একরূপতা নেই। মানুষ সর্বশক্তিমান নয়, সর্বজ্ঞ নয়, সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা সয়ম্ভু নয়-মানুষ প্রেমিক।

মানুষের অন্তঃস্থিত তৃষ্ণা প্রেম-অনন্ত তৃষ্ণা প্রেম। ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান। কী রূপে বিরাজমান? প্রেম রূপে। মানব জীবনের লক্ষ্য কি? এই অনন্ত প্রেমের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা।

কীভাবে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব? প্রেম দেওয়ার মাধ্যমে। যে যত দেয়, তার সংযোগ তত প্রশস্ত হয়। যে দেয় না, তার সংযোগ সংকীর্ণ হয়ে যায়।

১০

প্রেমের সিনেমা দেখলেও চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। ওয়াজ শুনলে বিরক্তি আসে। কেন? কারণ, সিনেমা কাল্পনিক হলেও হৃদয়ের কথা বলে। ওয়াজ ধর্ম সংক্রান্ত হলেও শোনা কথা বলে। প্রেম ছাড়া-তসবিহ গোনার চেয়ে-পয়সা গোনাও ভালো।

জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কোনটি? যখন হৃদয়ে প্রেম ছিল। আনন্দের সেরা উপলব্ধি কখন হয়েছে? যখন প্রেমাস্পদের সঙ্গে ছিলাম। কখন মনে হয়েছে যে, মেঘের মতো আকাশে ভাসছি? যখন আমি তাকে ভালোবেসেছি এবং সে আমাকে ভালোবেসেছে।

যারা জীবনে একবার হলেও প্রেমের স্বাদ পেয়েছে কেবল তারাই বুঝতে পারে-প্রেমহীন জীবন বেঁচে থাকার উপযুক্ত না। যারা ভালোবাসাকে ভালোবাসে না, তারা বুঝেনি প্রেম কি। তারা বুঝেছে কাম, দুঃখ, প্রবঞ্চনা। তাদের প্রেম শুরু হয়েছে অগ্নি দিয়ে, শেষ হয়েছে ছাই দিয়ে-হৃদয়ে রেখে গেছে নিকোটিন। তারা প্রেমের মহিমাকে মলিন করে রেখেছে একটি ঘটনার তিক্ত অভিজ্ঞতায়।

তাদের প্রতিকার রয়েছে প্রেমেই। বাস্তবে সব দুঃখের প্রতিকার প্রেম। প্রত্যেক মানুষ হয় প্রেম পাওয়ার জন্য উদগ্রীব, না হয় প্রেম দেওয়ার জন্য উদগ্রীব। সুতরাং মানুষের প্রতি মানুষের সম্যক সাড়া হলো প্রেম। প্রেম বেষ্টন করে রেখেছে প্রতিটি জীবন, প্রতিটি অস্তিত্ব।

কিন্তু প্রেম যদি কেবল একজনকে কেন্দ্র করে বর্তিত হয়, তবে নিজেকে জানা আরেকজনের উপর নির্ভরশীল হয় এবং প্রেমের নামে শুরু হয় দুঃখের আবাদ।

সমস্যার সমাধান-ভালোবাসাকে ভালোবাসা; শুধু একজনকে নয়-সবাইকে, সবকিছুকে ভালোবাসা। মানুষ বদলায়-ভালোবাসা বদলায় না। সুতরাং ভালোবাসি, ভালোবাসা।

১১
আমি বাঙালি, তুমি বৃটিশ-গরমিল।
আমি মানুষ, তুমিও মানুষ-মিল।
আমি মুসলিম, তুমি হিন্দু-গরমিল।

এখানে তুমি সুরক্ষা চাও, ওখানে আমি সুরক্ষা চাই-মিল।
আমি ওহাবি, তুমি সুফি-গরমিল।
আমি শান্তি চাই, তুমিও শান্তি চাও-মিল।
আমি ভৃত্য, তুমি মালিক-গরমিল।

আমার ক্ষুধা আছে, তোমারও ক্ষুধা আছে-মিল।
আমি পুরুষ, তুমি নারী-গরমিল।
আমি প্রেম চাই, তুমিও প্রেম চাও-মিল।
মিল-গরমিল সবকিছুতেই আছে।

যে মিল খুঁজে-মিল পায়।
যে গরমিল খুঁজে-গরমিল পায়।
আমি মিলও খুঁজি না, গরমিলও খুঁজি না
যা আছে, তা আছে। আলহামদুলিল্লাহ।

১২
উন্নতি কাকে বলে?

আগে গরুর গাড়িতে চলতাম-ঘণ্টায় ২ মাইল গতিতে। এখন বিমানে চলি-ঘণ্টায় ৮০০ মাইল গতিতে। উন্নতি। আগে তলোয়ার দিয়ে মারত-এখন বোমা দিয়ে মারে। উন্নতি। আগে ২০ মাইল হেঁটে তোমাকে দেখতে যেতাম। এখন ফেসবুকে তোমাকে দেখি। উন্নতি।

আগে চিঠির অপেক্ষা করতাম-এখন ভিডিও কলের অপেক্ষা করি। উন্নতি। মতিঝিলে ঝিল নেই, হাতিরঝিলে হাতি নেই, কলাবাগানে কলা নেই। উন্নতি।

বাস্তবে এগুলোই উন্নতির স্মারক। মাথাপিছু আয় বাড়লে উন্নতি বলে-মাথাপিছু প্রেম বাড়লে উন্নতি বলে না। প্রেম বাড়লো নাকি কমলো, তা পরিমাপের ফিতা নাই। আসল কথা হলো, সন্দেহের অবকাশই নাই যে, আমাদের অনেক উন্নতি হচ্ছে। কীভাবে?

অভিধান বলছে-উন্নতি শব্দটির উদ্ভব √নম্ ক্রিয়া থেকে; উদ+√নম্+তি হলো উন্নতি। √নম্ ক্রিয়ার অর্থ হলো নামিয়ে দেওয়া। নামিয়ে দেওয়া উন্নতি হয় কি করে? হয়। কারণ, ‘বড়’ দুই ভাবে হওয়া যায়। প্রথম ভাবটি হলো নিজে বড় হওয়া; দ্বিতীয় ভাবটি হলো তোমাকে ছোট করে, আমি বড় হওয়া।

দ্বিতীয় ভাবে বড় হওয়াকে বলে উন্নতি। প্রথম ভাবে বড় হওয়াকে বলে নতি। এবার বলো, কি চাও তুমি? উন্নতি নাকি নতি?

১৩
প্রজাপতিটা ধরতে গেলেই উড়ে যায়। কতো করে বুঝিয়ে বললাম- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমার কোনো ক্ষতি আমি করবো না’। বুঝে না, সে বুঝে না। সে কি বললো জানেন? সে বললো- ‘তুমি যদি আমাকে একটুও ভালোবাসতে, তবে বুঝতে-তোমার স্পর্শই আমার জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি! আমি তোমাকে ধরতে পারি, তুমি আমাকে না!’

ঘুঘু ধরতে গেলাম, সেও উড়ে যায়। তাকেও কোমল স্বরে বললাম, ‘ধরা দাও প্রিয়, আমি তোমাকে ভালোবাসি। ঘুঘু বলল, ‘জানি, তুমি আমাকে খাঁচায় ভরবে।’

এখন বিকেল। বসে আছি নদী তীরে; ভাবছি-কী ভালো লাগতো যদি একটি পাখি এসে বসতো আমার স্কন্ধে! পাখিরা আসে না। তারা বুঝে-আমরা গরু ছাগল ভেড়া মহিষ মুরগী খাই, কবুতর খাই, চড়ুই খাই, ঘুঘু খাই, নদী খাই, পাহাড় খাই, গাছ খাই। 

জীব-জন্তু পশু পাখি প্রজাপতি বৃক্ষ ফুল নদী সমুদ্র আকাশ কেউ আমাদের কাছে নিরাপদ না। সবাই ভয় পায়। কাউকে আমরা অভয়দান করতে পারিনি যে, আমার দ্বারা তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। অভয়দান করতে টাকা লাগে না, ক্ষমতা লাগে না, বিত্ত লাগে না-প্রেম হলেই চলে। আর প্রেম তো সবার সঙ্গে সর্বদাই থাকে। তবু, অভয়দান করতে পারি না কেন?

ভাবতে-ভাবতে কখন যেন চিৎ হয়ে শুয়ে পরেছি ঘাসে। চোখ বুজে আসছে। দেহ স্থির-শবের মতো। শ্বাসের শব্দও টের পাচ্ছি না। হঠাৎ একটি কোমল স্পন্দন ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র অস্তিত্বে। অনুভব করছি-একটি পাখি বসে আছে আমার বুকে। কি যে অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে আমার! 

আনন্দে যেন পাথর হয়ে যাচ্ছি। চোখ মেলে দেখতেও পারছি না, কী পাখি-কী তার নাম! শুধু মনে হচ্ছিল-এভাবেই কেটে যাক জীবন। 

তুমি কি না, সেই পাখীটিকেই ঢিল মারলে! তাকিয়ে রইলাম তোমার দিকে, অশ্রুভরা চোখে। কি বলবো? কি-ই বা বলার আছে?

১৪
মানুষের ধর্মচিন্তাগুলো একেবারেই বিগড়ে গেছে। ধর্মের নামে চলছে অর্থহীন কথার বিরামহীন উদ্ধৃতি। সবকিছুকেই এখন মনে হচ্ছে-অং চং বং। সাধারণ বিষয়েও তীব্র মতবিরোধ।

“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র”-কুরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় একজন বলছে-এখানে ‘স্ত্রী’ অর্থ-বিবাহিত স্ত্রী, আরেকজন বলছে গুরু।

আল্লাহর আরশ কোথায়? কেউ বলছে সপ্ত আসমানের উপরে, কেউ বলছে সর্বত্র, কেউ বলছে স্ত্রীযৌনাঙ্গে। কুরবান অর্থ কি? কেউ বলছে ত্যাগ, কেউ বলছে পশু জবাই। বনের পশু, নাকি মনের পশু? এ নিয়েও মতভেদ প্রচুর।

‘কুরবানির ঈদ’ অর্থ কি ‘পশু জবাইয়ের উৎসব’? উৎসবের প্রয়োজনে পশু জবাই হতে পারে, কিন্তু ‘পশু জবাইয়ের উৎসব’ হয় কি করে? তাজ্জব ব্যাপারই বটে! যাওয়ার জন্য দৌঁড়াচ্ছে সবাই-কিন্তু কোথায় যাবে, কেউ জানে না।

ধর্মের সব আচার-অনুষ্ঠান এখন একেবারেই তাৎপর্যহীন। সব অনুষ্ঠানই বিনোদনের উপলক্ষ্য মাত্র। ধর্মভীরুরা অনুষ্ঠান এলে খুব উজ্জীবিত হয়ে উঠে। অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে-যেই লাউ, সেই কদু কিংবা তার চেয়েও মন্দ।

তাই বলি-ধর্মকর্ম ধর্ম নয়-যা আমরা ধারণ করি, যা আমাদের মধ্যে ধৃত আছে, যা জীবনযাপনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য-তাতেই রয়েছে ধর্মাধর্ম। ধর্ম সংস্থাপনের ক্ষেত্র জীবন-শুধুই জীবন।

যদি আহার, নিদ্রা, মৈথুন, স্নান, চলন-বলন, আয়-ব্যয় ও সম্পর্কের মধ্যে ধর্ম না থাকে, তবে থাকে কোথায়?

১৫
চলতে চলতে সব পথ এখন প্রথা হয়ে গেছে। প্রথা মানেই অতীত। মানুষ এখন আর প্যাপীরাসে লেখে না। অথচ প্যপীরাসে লেখা পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে কেন? প্যাপীরাস যুগে মানুষ যা পরতো, খেতো, এখন তা পরে না, খায় না। তখন যেভাবে চলতো, বলতো, ঘুমাতো এখন সেভাবে চলে না, বলে না, ঘুমায় না।

ধর্ম (ধরম) তো ধারণ করা। ধারণ বদলায়, ধরম বদলায় না কেন? কারণ, ধরমে এখন ধারণ নাই-আছে প্রথা, স্রেফ প্রথা। প্রথা মানুষ পালন করে-ধারণ করে না। ছোবড়াতে যেমন রস থাকে না তেমনি প্রথার মধ্যে ধারণ করার মতো কিছু থাকে না।

জীবন নদীর মতো। নদীর গতিপথ আগে থেকে তৈরি থাকে না। অথচ মানুষ কেন ভাবছে যে, তার চলার পথ হাজার বছর আগে বাপ-দাদারা তৈরী করে রেখে গেছে?

প্রথা পালনে সত্য মিলবে না, মিলবে না, মিলবে না। সত্য বহমান। যে সত্যকে জানতে চায় তাকেও হতে হবে বহমান।

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন-
জীবনবেদ : পর্ব এক
জীবনবেদ : পর্ব দুই
জীবনবেদ : পর্ব তিন
জীবনবেদ : পর্ব চার
জীবনবেদ : পর্ব পাঁচ
জীবনবেদ : পর্ব ছয়
জীবনবেদ : পর্ব সাত
জীবনবেদ : পর্ব আট
জীবনবেদ : পর্ব নয়
জীবনবেদ : পর্ব দশ
জীবনবেদ : পর্ব এগারো
জীবনবেদ : পর্ব বারো
জীবনবেদ : পর্ব তেরো
জীবনবেদ : পর্ব চৌদ্দ
জীবনবেদ : পর্ব পনের
জীবনবেদ : পর্ব ষোল
জীবনবেদ : পর্ব সতের
জীবনবেদ : পর্ব আঠার
জীবনবেদ : পর্ব উনিশ
জীবনবেদ : পর্ব বিশ
জীবনবেদ : শেষ পর্ব

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!