ভবঘুরে কথা
ফকির সামসুল সাঁইজি

-ফকির সামসুল সাঁইজির বক্তৃতা

আমাদের মধ্যে সবারই একটা কৌতুহল সৃষ্টি হয় যে এতো নবী রাসুল কিতাবধারী পৃথিবীতে এসেছে এর আগের থেকে অদ্যাবোধি যত নবী রাসুল। কিন্তু লালন সাঁইজি তো কোনো নবী নন। অথচ লালনের বাণী-লালনের কথা কেনো স্মরণ করবো? কেনো মানবো? এটা নিয়ে একটা কৌতুহল কিন্তু আমাদের মাঝে কাজ করে। কিন্তু দেখেন এই যে শুভ্র বস্ত্রধারী বেহাল সাধুুগুরু বসে আছেন। কোথা থেকে তারা এই শুভ্র বস্ত্রধারী হলেন? সাঁইজির বাণী থেকে আমি বলতে চাই-

একই কোরান পড়াশোনা
কেউ মৌলভি কেউ মাওলানা।
দাহেরিয়া হয় কতজনা
তারা মানেনা শরার কাজি।।

কোথা থেকে আসলো এই শুভ্র বস্ত্রধারী সাধুুগুরু? কেনো তারা আজকে দাহেরিয়া হয়ে গেলেন? কোথা থেকে হয়ে গেলেন? যেই কোরান থেকে মৌলভী হওয়া হলো, মওলানা হওয়া হলো, সেই কোরআন থেকে তারা দাহেরিয়া হয়েছে? আজকে তাদের আর কোনো শরিয়তের কর্ম দেখা যায় না। তাদের নামাজ দেখা যায় না, তাদের রোজা দেখা যায় না, তাদের কুরবাণী দেখা যায় না, তাদের কোনো কৃষ্টি-কালচার শরিয়তে দেখা যায় না। কোথা থেকে তারা সেটি নিয়েছে? কোরআন থেকে নিয়েছে। তাহলে! কোরআনের যেটা মজ্জা, কোরআনের যেটা নির্যাস সেটুকু সাধুুগুরুরা নিয়ে তারা লালন লালন করছে। লালন যে কোরআন থেকে গোটা বিশ্ববাসীকে আত্মমুক্তির জন্য আহ্বান করেছেন-অবগত করেছেন। লালনকে একটু প্রচ্ছন্নভাবে আলোচনা করতে চাই। সাঁইজি বললেন-

একবার এসে এই নদীয়ায়
মানুষ রূপে হয়ে উদয়,
প্রেম বিলায়ে যথা তথায়
গেলেন প্রভু নিজপুরে।।

তাহলে, সাঁইজিকে একটু প্রচ্ছন্নভাবে আমি তুলে ধরলাম। কে নিয়ে আসছিলেন নদীয়াতে; মানুষরূপে উদয় হয়ে উনি ধর্ম প্রচার করে গেলেন। তারপর আবার উনি নিজপুরে চলে গেলেন। তো মানুষরূপে উদয় হওয়ার পূর্বে সে কি ছিল? একটু যদি আমরা গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করি এই বাণীটুকু নিয়ে- নিজপুর কোথায়? আল্লাহ্ আত্মরূপে সমস্ত মানুষের মাঝে বিরাজ করছেন তাই সাঁইজি বললেন,

আপনারে চিনলে যাবে অচেনারে চেনা
ও যার আপন খবর আপন আর হয়না।।

সক্রেটিস বলেছিলেন, “নো দাইসেল্ফ”। যে নিজকে চিনলো সে ঈশ্বরকে চিনলো। এই যে নিজপুরে সাঁই। কোরাআনে বলেছে- যে নবসকে চিলবো সেই রবকে চিনলো অর্থাৎ আল্লাহকে চিনলো। তো সাইজি একসময় মানুষরূপে উদয় হয়েছেন। আজোও যে মানুষরূপে বিরাজ করছেন-

যথায় কাল্লা তথায় আল্লা
এমনি রে সেই মক্করউল্লা,
অবোধের মক্কা হিল্লা
সদাই তাই খোঁজে।।

আল্লাহ্ কোথায় আছেন? কাল্লায় কাল্লায় আল্লাহ্। যত কল্লা তত আল্লাহ্। এক কল্লার সাথে আরেক কল্লার কোনো মিল নাই। প্রতিটা কল্লা স্বতন্ত্র, যদি এক কাল্লার সাথে আরেক কাল্লার মিল থাকতো তাহলে কাল্লায় কাল্লায় শরিক হয়ে যেত। লা শরিক। তাই তিনি আবার আরেক জায়গায় প্রচ্ছন্ন করে তুলে ধরেছেন-

আমি লালন একই শিরে
ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে,
ভুগেছিলাম পক্সজ্বরে
মলম শাহ্‌ করেন উদ্ধার।

এই যে সাঁইজি তুলে ধরলেন নিজেকে, একেশ্বর উনি। এক শিরে- যার কেউ নাই; যার জনক নাই, জননী নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই পৃথিবীতে একা ছাড়া সে কেউ না; কেউ নাই তার। তাই আমি লালন একেশ্বরে-এক ঈশ্বর সে ; ভুগেছিলাম পক্সজ্বরে এটা তার ছল- যেন মানবধর্মকে উনি প্রচার করতে পারেন ; সাম্প্রদায়িক ধর্মকে যেন উৎখাত করতে পারেন; মানবতাবাদী ধর্মকে যেন প্রচার করতে পারেন বিধায় তিনি এমন একটা কায়দা করলেন ছল করলেন। তাজা মানুষ কালী নদীর পূর্বতটে এসে ভেলে লেগেছিলেন। তাজা মানুষ জলে ভেসে আসে না; মরা মানুষ জলে ভেসে আসতে পারে। তাজা মানুষ কি কোনোদিন আপনারা দেখেছেন যে, জলে ভেসে চলতে পারে? ভেসে যায়-ভেসে আসে এমনটি দেখেছেন? তাহলে লালন যে জীবিত; পূর্বের কোনো ইতিহাস লালনের নাই। খুব দু:খের সাথে বলতে হচ্ছে-খুব পরিতাপের বিষয় যত পণ্ডিত যত লেখক লালনকে মুসলমান-হিন্দু-কায়স্থ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে উপনীত যারা করেছেন লিখনীর মধ্য দিয়ে তারা নিতান্ত ভুল করেছেন; তারা লালনের এই মরমী চিন্তাকে বিসর্জন দিয়েছেন; লালনের কথাগুলোকে বিকৃতি করেছেন তারা। লালন পদে পদে নিজেকে তুলে ধরেছেন-

চার যুগের ভজনাদি
বেদেতে রাখিয়া বিধি
বেদের নিগূঢ় রসপাস্তি
সঁপে গেলেন শ্রীরূপেরে।।
আর কি গৌর আসবে ফিরে।

সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলি এই চারযুগের যত আনুষ্ঠানিকতা বেদে রেখে গেলেন; বাহ্যিক কৃষ্টি বেদে রেখে গেলেন তার বেদের এই নিযাস থেকে রসপন্থি যেটি সেটা শ্রীরূপের কাছে রেখে গেলেন। শ্রীরূপ বলতে গেলে আমরা কাকে বোঝাই? আমরা সবাই মর্মে মর্মে চিন্তা করি; প্রভু চলে গেলেন নিজরূপে। এখানে আবার রসপন্থি দিয়ে গেলেন শ্রীরূপের ; যদি কেউ আত্মশুদ্ধি করতে চায়-আত্মদর্শন করতে চায়-মুক্তি অর্জন করতে চায়-মোক্ষ লাভ করতে চায়-নির্বাণ পেতে চায় তাহলে শ্রীরূপের সাধনার দ্বারা আত্মশুদ্ধি-আত্মমুক্তি অর্জন করতে হবে। নচেৎ নয়। সেই পন্থাই সাঁইজি দিয়ে গেলেন। তাই বেদকে উপেক্ষা করে গুরুবাদীকে প্রাধান্য দিয়ে সাইজি বললেন-

বেদ-পুরাণে কয় সমাচার
কলিতে আর নাই- অবতার,
তবে যে কয় সেই গিরিধর
এসেছে দেখ।।

বেদ পুরাণ বলেছে কলিতে আর অবতার আসবে না, যে এই সংবাদ বেদ-পুরাণে দিয়েছেন সেই যে আবার গিরিধর, সেই যে অবতার, ধর্মাবতার হয়ে কলিতে এসে গুরু ভজনা করে গেলেন। তাই এই প্রেক্ষিতে আবারো বললেন সাঁইজি, বেদে যা নাই তাই যদি হয়; বেদে ছিল না কলিতে আর কোনো অবতার আসবে; কোনো নবী-রাসুল আসবে; একথা বেদে নাই। অথচ বেদকে উপেক্ষা করে যখন আবার কলিতে সৃজন হলেন-মানবরূপে উদয় হলেন তখন আবার কেনো বেদকে প্রাধান্য আমরা দেবো? তাই সাঁইজি বললেন, বেদে যা নাই তাই যদি হয়-সেটি যদি সত্য হয়ে থাকে তবে পুঁথি পড়ে কেনো মরতে যাস। ফকির লালন বলে,

ভজবো সদাই
ওই গৌরপদ।।

অবশ্য গৌরকে আর ভজবো না। গুরুরূপে গৌর ভজনা করবো-নিরাকার গৌরকে নয়। গুরুরূপে গৌর বিচরণ করছে। সেই গুরুরূপে আমরা গৌরকে ভজনার দ্বারা আত্মশুদ্ধি-আত্মমুক্তি-মৌক্ষ অর্জন করবো।

১১তম সাধুসঙ্গে ফকির সামসুল সাঁইজির বক্তৃতা

………………………………………………………………….
পড়ুন : সামসুল সাইজির আখড়া বাড়ির সাধুসঙ্গ
………………………………………………………………….

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!